শারদ প্ৰেমের স্মৃতি
শারদ প্ৰেমের স্মৃতি
কিছুদিন আগে সমাপ্ত হয়েছে এ বছরের দূর্গা পুজো,পুজো নিয়ে আমাদের সবার মনেই নানারকম ভালো লাগা থাকে। নানা স্মৃতি জড়িয়ে থাকে এই পুজোকে ঘিরেই। কত রঙিন স্মৃতি, কত মধুর স্মৃতি। কেমন করে কেটে যায় সময়! পুজো প্রেম নিয়ে আমাদের কম বেশি সবারই অভিজ্ঞতা থাকে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে আমাদের সবারই কম বেশি অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে । যেমন লেগে থাকে ছোটবেলার অনেক মুহূর্ত। আবার কৈশোর ও যৌবনের অনেক মধুর স্মৃতিও সঙ্গে করে বড় হই আমরা। দুর্গাপুজো ভালো লাগার পাশাপাশি অনেক ভালো স্মৃতিও তৈরি করে। কত নতুন মানুষের মুখ দেখি আমরা, আবার অনেক মানুষের মুখ সারাজীবন আমাদের মনের মধ্যে থেকেই যায়। আমরা তা ভুলতেও পারি না। তাই না? পুজোর প্রেম বিষয়টা ঠিক তেমনই!
কত কত স্মৃতি সেই চারদিনে তৈরি হয়, আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মলিনও হয়ে যায়। পুজো প্রেম আমাদের কাছে ঠিক ততটাই প্রিয়।
আমরা একই কলেজে পড়তাম। আবার আমাদের বাড়িও ছিল কাছাকাছি। পাশের পাড়ার মেয়ে বলতে যা বোঝায়, আমার জীবনে ও ছিল ঠিক তাই। যাকে আমি ছোট থেকে অনেকবারই দেখেছি। যার প্রতি হয়তো সামান্য হলেও ভালো লাগা ছিল, কিন্তু কখনও প্রকাশ করতে পারিনি।
ভাবিওনি প্রকাশ করার কথা। কারণ, পড়াশোনা নিয়ে আমি এতটাই ব্যস্ত থাকতাম যে অন্য কোনও কিছুর প্রতি মন দেওয়ার সময় পাইনি। আবার সত্যি বলতে, পড়াশোনা করার পর খেলাধুলো ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতেই সব সময় কেটে যেত। যাওয়া আসার পথে মাঝেমধ্যে দেখা হত ঠিকই। কিন্তু কোনওদিন কথা বলা হয়নি।আসলে একটা ভালো লাগা ছিল, কিন্তু তখনও সেটা ভালোবাসায় পরিণত হয়নি। হয়ত আমরাও সেভাবে ভালো লাগাটাকে ভেবে দেখিনি। এছাড়া ঐ বয়সটা এরকম একটা সময় - যে সময়টা হল একটা রূপান্তরের সময়। ছোট থেকে বড়তে রূপান্তরের সময়। তখন না যোগ দেওয়া যায় ছোটদের দলে, আবার বড়রাও পাত্তা দেয় না। ফলে একটা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস হয়ে ওঠে।
এরপর অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে। আমরা সবাই থার্ড ইয়ারে উঠে গিয়েছি। আমার কলেজেই পড়ে ও। অল্প বিস্তর কথা হয়। একে অপরকে মেসেজও পাঠাই। কিন্তু তাও এক অদৃশ্য পাঁচিল ছিল আমাদের মধ্যে । আমি কখনও সেই সীমা পেরোতে চাইনি। কিছুটা ভয় পেতাম, এই কথাও ঠিক। এভাবেই সম্পর্কটা চলছিল,দেখতে দেখতে সে বছর দুর্গাপুজো এল। আমি সেদিন কলেজ থেকে ফিরছি, পাড়ায় সন্ধ্যার ফাংশানের প্রস্তুতি হচ্ছে।
মনে একটা খুশি খুশি ভাব কারণ এরপর অনেক দিন কলেজ ছুটি থাকবে। আমরা সন্ধ্যায় সবাই ফাংশানে গেলাম। সেখানে ওকে দেখে আমার মনে হল, আমার পা আর মাটিতে নেই। আমার চারদিকে সত্যিই সব কোলাহল থেমে গেল। একটা হলুদ কুর্তা পরে ও স্টেজে উঠল। ওকে এত সুন্দর আগে কখনও লাগেনি। কিংবা আমিও কোনওদিন এত ভালো করে দেখার সুযোগ পাইনি। মানে আমি ওর দিকে সেভাবে তাকাইনি আগে।কিন্তু ঐদিন
হলুদ কুর্তায় ওকে দেখে মনে হল, আমি আর কিছু চাই না। শুধুই ওকে চাই। হলুদ কুর্তা পরে ও যখন আমার মুখের সামনে দিয়ে ওড়না উড়িয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল, আমি অপলক তাকিয়ে রইলাম। আহা কী অপূর্ব সেই দৃশ্য। কেন জানিনা ওটা আমি ভুলতে পারছিলাম না, সেদিন রাত্রে চোখ বন্ধ করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই দৃশ্য।
এরপর দিন ছিল ষষ্ঠী। আমাদের আবার সেদিন দেখা হল। সন্ধ্যায় আমি ও আমার বন্ধুরা প্য়ান্ডেলে বসেছিলাম। ওর বন্ধুদের সঙ্গে ও মণ্ডপে এল ঠাকুর দেখতে । সাত পাঁচ না ভেবে আমি ওকে ডাকলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ওর সাথে কথাও বললাম। ও মিষ্টি হেসে আমার সঙ্গে কথা বলছিল। এত গান বাজছিল চারদিকে, যে সব কথা শোনা যাচ্ছিল না। তাই আমরা প্যান্ডেল থেকে একটু দূরে গিয়ে কথা বলছিলাম। এক সময় কথা শেষ হলে ও বাড়ি চলে গেল আর আমি প্যান্ডেলে এসে বন্ধুদের সাথে গল্প করতে শুরু করলাম। সেদিন বাড়ি ফিরতে রাত হল। তারপর ওর মেসেজ পেলাম। জানতে চাইল, পৌঁছেছি কিনা! আমি কী উত্তর দেব বোঝার আগেই আবার মেসেজ এল, “কাল বেরোবি?”
আমি আর সবদিক ভাবিনি। না ভেবেই উত্তর দিলাম, হ্যাঁ বেরোব। সপ্তমীর সন্ধ্যায় আমি আর ও বেরোলাম। কাছাকাছিই গিয়েছিলাম। দুজনে পাশাপাশি হাঁটলাম। অনেক কথা বললাম। ও যে আসলে আমায় পছন্দ করে, আমি তা বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু প্রকাশ করিনি। জানি না ও কী ভাবছিল। কতটা রাস্তা একসঙ্গে হেঁটেছিলাম, খেয়াল নেই। কিন্তু আমার আর সময়ের হিসেব ছিল না। এত ভিড়েও মনে হচ্ছিল যেন আমি আর ও শুধু হাঁটছি। সেদিনও অনেক রাত পর্যন্ত মেসেজে কথা হল। তবে ও আর আমায় বেরনোর কথা বলেনি। আমিও নিজে থেকে কিছু বলিনি।
পরদিন অষ্টমীর সকালে অঞ্জলি দিতে এল একটা লাল ঢাকাই জামদানি শাড়ি পরে। সেই শাড়িতে এতটা অপূর্ব লাগছিল ওকে! আমি বারবার ভাবছিলাম যে, এবার মনের কথা বলে দেওয়াই উচিত। কিন্তু না, বলা হয়নি। দুপুরে পাড়ার অন্য এক বন্ধুর বাড়িতে আমাদের আড্ডা বসল। সবাই মিলে সেখানে অনেক গল্প-ঠাট্টা করলাম। দুপুর গড়িয়ে তখন প্রায় বিকেল। চিলেকোঠার ঘরে আমাদের আড্ডা চলছে।
রোদ পড়তে সবাই ছাদে গেল। তখন হঠাৎ খেয়াল করলাম, সেই চিলেকোঠার ঘরে শুধুই আমরা দুজন। আর কেউ আশপাশে নেই। কোনও কথা হচ্ছে না। এত নিশ্চুপ চারদিক, আগে কখনও লাগেনি। আবার প্রচণ্ড ভয় লাগছিল। কিন্তু ও আমায় বলল, “তুই কি আমার সঙ্গে থাকবি?” আমি মুখে কোনও উত্তর দিইনি। ওর হাতটা ধরে শুধু মাথা নাড়লাম। এরপর ভেবেছিলাম, আজ অষ্টমীর দুপুরে চিলেকোঠায় যে সম্পর্ক শুরু হল, তা হয়তো সারাজীবনের। কথাবার্তাও হত।
এরপর আমাদের কলেজ শেষ হল। ও মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য বাইরে পড়তে চলে গেল। আমিও একটা চাকরির জন্য অন্য রাজ্যে গেলাম। তখন ভাবিনি যে এই সম্পর্ক এখানেই শেষ হয়ে যাবে। পরের বছর পুজোয় আর আমাদের দেখা হয়নি। আজ প্রায় ৩ বছর হয়ে গিয়েছে, আমাদের আর পুজোয় দেখা হয় না। আমাদের আর কখনও দেখা হয় না। কিন্তু এই বছর পুজোয় আমি বাড়ি ফিরছি, আমার মনে পড়ছে ওর কথা। যদি ওর সঙ্গে একবার দেখা হত! কিন্তু তবুও এটা আমার স্মৃতির মনিকোঠায় এখনও সতেজ রয়েছে, এই অপরিণত ভালোবাসা আমার একান্তই আমার সম্পদ এবং এক নিজস্ব গোপন আনন্দের ভান্ডার।

