Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

biswadip karmakar

Drama Tragedy


3  

biswadip karmakar

Drama Tragedy


রুপা

রুপা

6 mins 2.3K 6 mins 2.3K

রুপা,নামটি শুনলেই হিমু সাহেবের সেই রুপার কথা মনেপড়ে যায়।যাইহোক, পাঠকদের আগেই বলে রাখি,যে এই রুপা সেই রুপা নয়।

আমাদের গ্রামের পশ্চিমে ওদের বাড়ি।এখন ক্লাস টেন এ পড়ে, গায়ের রঙটা একটু চাপা হলেও মনের দিক থেকে সে একেবারে ধবধবে সাদা,আর এই কারণেই সে গ্রামের সকলেরই প্রিয় মেয়ে।গ্রামের প্রতি ঘরে ঘরে তার পরিচয় আর খাতিরদারী এত যে; সে যেকোনো বাড়িতে গেলেই ঘরের মেয়ের মতো আদর পায় ।তার পিছনে কারনও আছে,এই মেয়ে কোনো বাড়ি গিয়ে তো বসে থাকে না।যেমন সরকার বাড়ি গেল,গিয়ে বলে কাকি তোমার সব্জি কিগো আজ দেও কাটি ধুয়ে দেই,একটু পরেই হয়তো পাশের বাড়ি থেকে ডাকতে আসে ,এই রুপা..আমার মাছটা একটু কেটে দিয়ে যাস মা আমার।

আসলে এখন দিন অনেক পাল্টে যাচ্ছে,আগে তো এমন মানুষ অনেক দেখা যেত, যারা একটু খেতে দিলেই,এর হাতের কাজ,ওর হাতের কাজ এসব টুকটাক করে দেয়।কিন্তু এখন টাকা দিলেও এমন লোক পাবার উপায় নেই।

এবছর রুপা মাধ্যমিক দেবে, তাই আমি ওকে ডেকে বললাম,কিরে পাগলী এবার যে মাধ্যমিক, এখনতো একটু পড়াশোনা কর,কয়টা প্রাইভেট পড়িস এখন ? সে বললো দুইটা।


এখন হলো এমন প্রাইভেট এর যুগ যেখানে ছাত্ররা সাতটা বিষয়ের সাতটা প্রাইভেট পড়লেই ভালো রেজাল্ট করবে, এমনটাই লোকের বিশ্বাস।আমার এক ভাইপো সে কয়দিন আগে তার কাছে শুনলাম সেই নাকি আবার বারোটা প্রাইভেট পড়ছে।

সে যাইহোক,রুপা আগে থেকেই আমাকে একটু ভয় পায় তাই ওকে শুধু জানিয়ে রাখলাম যে কোনো অসুবিধা হলে আমাকে জানাবি,আর এবার ভালো রেজাল্ট হওয়া চাই।পাশদিয়ে একঝাঁক বাচ্চাদের দল যাচ্ছিল,সেই দলেই হারিয়ে গেল।আমার কথা যে ,কতটা কি বুঝলো,কে জানে ?

পরের দিন এক পরীক্ষার জন্যে কলকাতায় যাবো, দেখি রুপা যাচ্ছে,দেখে মনে হয় কত দুনিয়ার কাজের বোঝা তার মাথায়।

ডাকদিলাম, ওই পাগলী দ্বারা কোথায় যাচ্ছিস এত হনহনিয়ে ?তোকে না গতকালই বললাম যে,চার মাস আছে মাধ্যমিক এর এখন একটু পড়তে বয় বাড়িতে,তোর এই সমাজ সেবা পরে করলেও হবে,আর রেজাল্ট খারাপ হলে বাবা কিন্তু রিকশাওয়ালার সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে।তুই কি এখনই বিয়ে করবি নাকি পড়বি কি করবি বল ?(এই ডায়লগ টা খুব শোনা, যদিও এখনকার যুগে রিকশা আর দেখাই যায় না প্রায়।রাস্তা শুধুমাত্র টোটো আর অটোর ভিড়ে ঠাসাঠাসি।)

সে উত্তরদিল পড়বো,কাল থেকে পড়বো ভালো করে,তাই আজ একটু সরকার বাড়ি ঘুরে আসি ।

দুইদিন পড়ে ফিরলাম কলকাতা থেকে, দেখি রাস্তায় লোকে রুপার ব্যাপারে কিসব বলাবলি করছে।

বাড়ির কাছে আসতেই দেখলাম সব বাড়ির মহিলারা দলে দলে ফিরছে রুপাদের বাড়ি থেকে।আমার চোখে মাথায় কেমন একটা ঝটকা দিলো,মনে মনে ভাবছি কার যে কি হলো ?


রাস্তায় লোকজনকে জিগ্যাস করলে,কিছু না বলে কেমন তাকিয়ে থাকছে মুখের দিকে।আমি আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি রুপার বাড়িতে গেলাম।বাড়ির সামনে মহিলারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কিসব বলাবলি করছে, কলপাড়ে রুপা অধভেজা অবস্থায়, আর ওর মা পাশে বসে কান্না করছে।কাকে যে কি বলবো কিছুই মাথায় আসছিল না।একটু পরে সেখানে থেকে যা বুঝলাম গতকাল বিকেলে কিছু অপরিচিত ছেলে ওকে জোর করে নিয়ে গিয়ে শারীরিক অত্যাচার করেছে।

রুপা নিস্প্রান দেহের মতো বসে আছে,তাই সবাই মিলে ওকে ঘরে নিয়ে গেলো, ওর কাকু ও কয়জন সবাইকে অনুরোধ করছে, দয়া করে বাড়ির সামনে ভিড়টা কমিয়ে দিন,আর আপনারা আপনাদের বাড়ি চলে যান।এসব ঘটনায় অভিযুক্ত দের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা না করে,মানুষ কেবল কেচ্ছা করতেই ভালোবাসে।

এক সপ্তাহ কেটে গেল,কিন্তু কারা এই কাজ করলো তাদের ধরা গেলো না,ওর বাড়ির লোক মেয়ের সন্মান এর কথা ভেবে আর পুলিশকে খবর করতে দেয়নি।গ্রামে এখনো এসব ব্যাপারে কোনো সচেতনতা জাগে না,কেউ বিরোধিতা করতে চায় না,ভাবে কি লাভ এসব করে,রাজ্যে আইনকানুন সবতো টাকার কাছে বিক্রি হয়েছে।ওসব খবর শহরে রোজ ছাপে,কিন্তু গ্রামের খবরাখবর কয়জন রাখে,ওই কয়জন নেতা ডেকে সালিশীসভা ওখানেই সব শেষ।মেয়েটা একেবারে নিস্তেজ হয়ে ঘরেই পড়ে আছে, কি আর করবে বাইরে গিয়ে লোকে যতরকম কথা ছড়াচ্ছে।কেউ কেউ বলছে, সারাদিন খালি টো টো করে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো, মেয়েদের এতো পা লম্বা হলে এমনি হয়, কি জানি কোথায় কিছু ছিল নাকি আগে, যা দিনকালের অবস্থা।


আমার মাথা গরম হচ্ছে এসব শুনে,ভাবছি যে,একটা মেয়ে যতোটা শারীরিক অত্যাচার করে,তার থেকে দ্বিগুনেরও দ্বিগুণ মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে এভাবে।ওইটুকু একটা মেয়ে সামনে বড়ো একটা পরীক্ষা, আমি আর বেশি কিছু ভাবাভাবি বাদ দিয়ে ওর বাড়িতে গিয়ে ওর সামনে গিয়ে বসলাম, রুপা দেখি তখনো চুপ করে দরজার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে।

আমি ওর হাতটা ধরে বললাম,কি রে পাগলী ? বলতেই তার ওই স্থির হয়ে যাওয়া চোখ দিয়ে জল উপরে আসছে, আর সে আমাকে ধরে অঝোরে কান্না, যে মেয়ে কোনো দিন ঠিক করে কথা বলার সময় পায় না তার এই অবস্থা দেখে আমি নিজেকে কোনোরকম সামাল দিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম কিচ্ছু হয়নি পাগলী।তোকে ভালো করে পরীক্ষা দিতে হবে ভালো রেজাল্ট করতে হবে, চিন্তা করিস না সব ঠিক ই আছে।

আমি যখন ওকে এসব বোঝাচ্ছি ওর মা কেমন ভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, কারন গত এক সপ্তাহে পুরো গ্রামটা ওদের যেন একঘরে করে দিয়েছে,কেও আর ওদের বাড়িতে আসে না ভালো মন্দ কিছু বলেও না।আচ্ছা,যা হয়েছে তার জন্যে মেয়েটা বা তার বাড়ির লোকের এমন মানসিক শাস্তি কেন ভোগ করতে হবে,তা বুঝি না।আজব সমাজের আজব নিয়ম কানুন।ওর মা আমাকে বললো মেয়ে তো কথাই ঠিক করে বলছে না,পড়াশোনা আর কি করাবো।

আমি বললাম,ওর এখন মেন্টাল সাপোর্ট এর দরকার, আর সেটা আপনারা চাইলেই যোগান দিতে পারেন, আর আপনি যদি কিছু মনে না করেন,তাহলে এই মাধ্যমিকের আগে ওর পড়াশোনার ব্যাপারে হেল্প করতে চাই কারন এখন যা অবস্থা এই অবস্থাতে যেখানেই যাবে লোকে এটাওটা বলাবলি করবে,তার চেয়ে ভালো কয়দিন বাড়িতেই থেকে পড়াশুনা করুক।শুনে ওর মা সম্মতি দিল,কিন্তু এখানে চারপাশে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখছে লোকজন, কি বলবো দিনরাত শুধু ফিস ফিস শব্দে গেল গেল ভাব।

আমি ওকে বললাম ,কীরে সারাদিন খালি ঘরে বসে আছিস,বল কি খেলবি ?

বলে মোবাইল এর গেম বের করে দিলাম।প্রথমে খেলতে না চাইলেও পরে খেলতে শুরু করলো,ইউটউব এর এটাওটা ভিডিও দেখছিল মনটা হালকা করার চেষ্টা করছিল।


রুপার মা দরজার ওপর থেকে মেয়ের এই একটু হাসতে দেখে কি যেন কাজ করছিল হঠাৎ দাঁড়িয়ে মেয়েকে দেখতেই থাকলো,যে মেয়ে ঘরে বাইরে খোলামেলায় থাকতে পছন্দ করে,তাকে কি আর এই বদ্ধ ঘরে মানায়।

যাইহোক এর পর ওকে ইউটউব থেকে মোটিভেট করার জন্যে কিছু ভিডিও দেখাতে শুরু করলাম,যাতে সে মনে শক্তি পায় মনটা হালকা হয়।

এইভাবে ধীরে ধীরে রুপাকে আবার আগের ছন্দে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলাম, কিন্তু সে এখন আর পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় না,সরকারদের বাড়িতে যায় না,শুধু বলে কিভাবে লোকের মুখ বন্ধ করতে হবে,কিভাবে তার বাবা মা সবার কাছে মুখ উচু করে দাঁড়াবে এসব নিয়েই ভাবতে থাকে আর প্রশ্ন করে আমাকে।

আমি জবাবে বললাম,পরীক্ষায় গ্রামের সবার থেকে ভালো ফল করে দেখা,দেখবি গ্রামের সবাই ঠিক আগের মতো তোকে ভালোবাসবে।আর আমার বিশ্বাস যে তুই এটা অবশ্যই করে দেখাবি, এটা তোর জীবনের সবচেয়ে বড়ো যুদ্ধ।

রুপা এখন দিনরাত জেগে মনে প্রাণে একটাই টার্গেট নিয়েছে, আমিও সবসময়ই ওর পাশে আছি।

আগামী কাল রুপার মাধ্যমিক পরীক্ষা আমি ওকে বললাম আজ থেকে আর কিছুই পড়তে হবে না গান শোন, রিলাক্স হয়ে থাক,এক্সামের আগে হাতে বই নিয়ে ওসব কিছু করতে হবে না তুই পারবি এটা ভরসা রাখ।আর হ্যা, লোকে দশ কথা বলে তোকে হারানোর চেষ্টা করবে, কিন্তু ওদের সব বাধা চুরমার করে ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার মতো শক্তি তোর মনে আছে।

তাই "সদা আপনি মন কি শুনো, বো লো All izz well "

রুপা বললো All izz well, যো হোগা দিখা জায়গা। বলেই সে একটা হাসি দিলো যেটা দেখে মনে মনে খুব শান্তি পেলাম।

এভাবে ঘুরে দাঁড়ানোই হল আসল যুদ্ধ জয়,যেটা আমাদের পরিবেশ আর সমাজ ঠিকঠাক ভাবে মেনে নিতে পারে না,তারা শুধু পরনিন্দা আর দোষারোপ করতেই ব্যাস্ত থাকে। দেশে নারীদের নিয়ে যতই প্রকল্প আনুক সরকার, মানুষ যতদিন নিজের চিন্তাধারার পরিবর্তন না করবে ততদিন এই মেয়েদের অত্যাচার সয়ে যাওয়ার মহামারীর পথ থেকে মুক্তি পাবে না।


Rate this content
Log in

More bengali story from biswadip karmakar

Similar bengali story from Drama