নক্ষত্রের আলিঙ্গন ~
নক্ষত্রের আলিঙ্গন ~
পর্ব: ০১
-" সবকিছু কি গোছানো হয়েছে তোর?"
-" হ্যাঁ, মা।( একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) মা, আমি হলে থাকলেই তো ভালো হতো। খালি খালি মামা- মামিকে কষ্ট দেয়ার কি দরকার।
-" আমি কি করবো? তোর মামাই তো জোর দিলেন। আর তুই ভালো করেই জানিস তার কথা কেউ ফেলতে পারে না।"
মামার বাড়ি যাওয়ার কথা ভেবে সানজিয়ার গলা শুকিয়ে এসেছে। দুই একদিনের ব্যাপার হলে না হয় বোঝা যেতো। কিন্তু পুরো অনার্স জীবন তাকে মামার বাসায় কাটাতে হবে। ভাবা যায় এগুলো। এমন না যে সেখানের কেউ তাকে ভালোবাসে না। বরং সবাই তাকে মাথায় করে রাখে। বিশেষ করে তার বড় মামা আলতাফ খান। তার মতে সানজিয়া একদম তার নানুভাই আছিয়ার ছায়া। আর তাদের দুই ভাই আর এক বোনের একটাই মেয়ে থাকায় আদরের ভাগ একটু বেশিই তার। তার ভয় তো অন্য কোথাও। ভেবেই তার হাত পা অবশ হয়ে আসছে। ফেলে আসা অতীতের ক্ষত নতুন হওয়ার ভয় তাকে ঘিরে ধরেছে।
ভাবনার ঘরে কলিং বেল বাজিয়ে ঘরে এলো সানজিয়ার বড় ভাই আহনাফ। পুরো নাম আহনাফ সানজামুল হাসান। পেশায় একজন ডাক্তার। বয়স ২৬-২৭ এর কোঠায়। সুঠাম দেহ আর নজর কারা শ্যাম বর্ণের চেহারার গড়ন তাকে অনন্য করেছে। কোঁকড়ানো চুল যেনো সেই সৌন্দর্যের মাঝে দ্বিগুণ আকর্ষণ যোগ করেছে।
-" তুই গেলে আমি আম্মু-আব্বুর আদর বেশি পাব। বরং আমি বলি কি এই সুযোগে তোর বলি চরাই দেই।"
-" ছিঃ ছিঃ! কেমন ভাই তুমি? বোনকে মারার বুদ্ধি করছো।"
কপালে এক হাত চেপে আহনাফ বিছানায় শুয়ে পরে। আর এক হাত দিয়ে সানজিয়ার হাতে গাট্টা মারে।
-"এই জন্যই বলি তোকে আব্বু-আম্মু পাবনা থেকে নিয়ে আসছে । আহামমমম্মক একটা। এই বলি মানে শশুর বাড়ি চালান করে দেয়া।"
-" ওহ!তুমি তা আগে বলবা না। বলির পাঠা হওয়ার জন্য ( দাঁতে জিভ কেটে) থুররি.. পাঠি হওয়ার জন্য কি এতো পড়াশোনা করেছি?"
-"( দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে) না না। সরকারি চাকরিজীবী বুইড়া , বাইটা, টাকলা , কালা , ভুঁড়ি মোটা কাক্কু... না থুক্কু দাদুরে বিয়ে করতে।"
কথাটা বলে আহনাফ আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে হন হন করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। সে জানে তার বোনের মাথার ছেঁড়া তারে কারেন্ট প্রবাহিত করতে তার এই কথাগুলো যথেষ্ট।
-" বলো বলো। আমি আর এসব কথায় রাগ দেখাই না হু। আমি জানি আমার জন্য সুন্দর, টাকাওয়ালা, লম্বা, হ্যান্ডসাম কোনো কম বয়সী পুরুষ আসবে।"
-" তুই মিলিয়ে নিস এক বাচ্চার বাপের সাথেই তোর বিয়ে হবে। মিলিয়ে নিস আমার কথা।"
-"আম্মু তোমার ছেলেকে কিছু বলো। দেখো আমি চলে যাব তাও আমার সাথে কেমন করছে। ওর আমার জন্য একটুও কষ্ট হচ্ছে না।"
-" কষ্ট হবে কোন দুঃখে? তুই গেলে আর আনব না বাসায়। ওখান থেকেই আপদ বিদায় করব।"
-" আম্মুইইইইইইইই.......।"
-" কি হয়েছেটা কি? তোদের জ্বালায় শান্তিতে রান্না টুকু করতে পারি না যে। আহনাফ আজকের দিনে অন্তত মেয়েটার সাথে দুষ্টুমি না করলে পারিস না? বেশি করলে তোর আজকের খাবার বন্ধ করে দিব।"
-" ভালোই হয়েছে যাওয়ার আগে শয়তানটাকে বকা খাইয়ে যেতে পারছি। শান্তি শান্তি।"
বলে হাসতে লাগলো সানজিয়া। কি একটা ভেবে তার মুখটা মলিন হয়ে গেলো। জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ধীর পায়ে বারান্দায় গিয়ে গোলাপ গাছগুলোর গায়ে হাত বুলাতে লাগলো। দীর্ঘ সময় ধরে তাদের আর যত্ন নেয়া হবে না। কতক্ষন ভাবনা শেষে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াল সে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলল। মনের ভিতর যে ঝড় চলছে সে কেউ টের পায়না। না, সে ভালো নেই। তার মনে পড়ে যায় ৫ বছর আগের সেই বসন্ত সন্ধ্যার কথা। এক অলিক পুরুষকে দেখে তার হৃদয়ে কম্পন ধরেছিল। থমকে গিয়েছিল তার নিঃশ্বাস। চোখের সামনে আজও ভেসে ওঠে সেই যুবকের প্রতিচ্ছবি। ষোড়শীর জীবনের প্রথম প্রেম। কিন্তু শুরু হবার আগেই এক দমকা হাওয়া সব শেষ করে দিলো। তছনছ করে দিলো ষোড়শীর জীবন। তবুও এত বছরে সে ভুলতে পারে নি সেই দিন আর না ভোলা সম্ভব হয়েছে সেই অলিক পুরুষকে। ভোলা কি যায়? প্রথম যৌবনের সেই প্রথম প্রেমের অনুভূতি? সেই মানুষটাকে? সে জবাব তার আজও অজানা। যদি ভোলা যায় তবে সে কেনো পারল না? কেনো আজো সেই স্মৃতি ক্ষতবিক্ষত করে তার কোমল হৃদয়কে?
( প্রথম ও যৌবনের কালে, যেদিন তোমায় দেখেছি । এই দেহ পিঞ্জিরার মাঝে আপন করে রেখেছি,,আরে আপন করে রেখেছি। আগে যদি জানতাম পাখি দিয়া যাবা ফাঁকি।।।।)
ভাবনার ছেদ ঘটায় দরজা খোলার শব্দ। ভিজিয়ে রাখা দরজা ঠেলে মাহমুদ হাসান তার ঘরে প্রবেশ করেছে।
-" মা সানজি। এদিকে আয় তো মা।"
-"জ্বি বাবা। কিছু বলবে?"
-"হ্যাঁ রে মা। বস এখানে। শোন মা তুই খুব ভালো করে জানিস তোকে আর আহনাফকে ভালো রাখতে আমরা সব রকম চেষ্টা করি। আল্লাহর অশেষ রহমতে তোরা কখনো আমাকে নিরাশ করিস নি। এতো বছর আমার গর্ব ধরে রেখেছিস। নতুন শহরে যাবি নতুন মানুষ, পরিবেশ এসব দেখে নিজের শিক্ষা ভুলে যাস না মা। এখানে যেমন ছিলি তেমনই থাকবি। নিজেকে গুলিয়ে ফেলিস না মা। তীরে এসে তরী যেনো না ডোবে।"
-"চিন্তা করো না আব্বু। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।"
-"আমার তোর প্রতি ভরসা আছে মা। ( একটু থামলেন) ব্যাগ গোছানো হলে নিচে আসো।"
-"জ্বি আব্বু আসছি।"
দ্রুত গতিতে মাহমুদ মেয়ের রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। হয়তো বেশিক্ষণ থাকলে তার চোখের পানিরা বাঁধ মানতো না। মেয়েরা বরাবরই বাবার আদরের হয়। তারা দূরে কোথাও গেলে কষ্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

