নক্ষত্রের আলিঙ্গন~~~
নক্ষত্রের আলিঙ্গন~~~
পর্ব: ০৩
“আসতে বেশি সমস্যা হয়নি তো, মাম্মা?”
“না বড় মনি। তবে একটু ক্লান্ত লাগছে।”
“আচ্ছা মা। এখন তুমি তোমার রুমে যাও। আমাদের পাশের রুমটাই তোমার জন্য ঠিক করেছি।”
“আচ্ছা মামু।”
“হ্যাঁ, গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম করো। আমি নাদিয়াকে দিয়ে নাস্তা পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
“হ্যাঁ সুখ, তুমি যাও। আমি নাস্তা নিয়ে আসছি। অনেক দিন দুই বোন জমিয়ে আড্ডা দেইনি। অনেক কথা জমে আছে তোকে বলার।”
“আপুনি, তোমার দুই কারান–আর্জুন কোথায়? আসার পর দেখলাম না তো।”
“ওরা ইহান চাচুর কাছে। চারজন সারাদিন ল্যাপটপে গেমস খেলে—আর কোনো কাজ নেই! এসে পড়বে। এখন তুমি রুমে যাও।”
---
“নিচে যাবি না? এবার তো সিগারেট খাওয়াটা ছাড়, ভাই। তুই ভালো করেই জানিস—এটা তোকে শেষ করে দেবে।”
“এমন বেঁচে থাকার চেয়ে শেষ হয়ে যাওয়াই ভালো। এই বোঝা আমি আর বইতে পারছি না, দাদাভাই।”
“দেখ, তুই একা না। আমরা সবাই হাঁপিয়ে উঠেছি। কেউই জানি না এই খেলার শেষ কোথায়। ধৈর্য ধরে চলতে হবে।”
“ধৈর্য?”
ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসে সে।
“আর কত ধৈর্য ধরব বলতে পারো? তোমাদের কেউই নিজের শখের জিনিস ত্যাগ করোনি—তাই আমার কষ্ট বুঝবে না। কাছে থেকেও যাকে আপন করা যায় না, সেই নিদারুণ ব্যথা দাদাভাই… আমি বোঝাতে পারব না।”
“সব ঠিক হয়ে যাবে ভাই। একদিন সত্যের জয় হবেই। এখন চল নিচে—সবাই অপেক্ষা করছে। আর ওকে কি সব বুঝিয়ে বলেছিস?”
“হ্যাঁ। সব রকম ব্যবস্থা শেষ। এখন শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা। একে একে… সবগুলোর শেষ দেখে ছাড়ব।”
কথা শেষ করে আধখাওয়া সিগারেটটা মাটিতে ফেলে ঘরের দিকে রওনা হয় নাওবি আর শাফাত।
---
“পিপি, চকলেট এনেছো আমাদের জন্য?”
“হ্যাঁ আমার কারান–আর্জুন, এনেছি তোমাদের জন্য চকলেট। আর অনেক খেলনাও এনেছি।”
“আর আমার জন্য?”
আধো গলায় বলা এক শিশুর অভিমানী প্রশ্নে সানজিয়ার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। চোখের কোণে জল জমে আসে। তাকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করছে, অথচ পুরোনো পোড়া দাগগুলো আবার তাজা হয়ে ওঠার ভয়ে মনটা পেছনে টেনে ধরে।
“আরে কে এসেছে? সাক্ষাৎ শয়তানের খালাজি যে! তা আপনি নরক থেকে এখানে আসার ফুরসত পেলেন কীভাবে?”
ইহানের কথায় দাঁত কটমট করে পেছনে তাকায় সানজিয়া। ইহান বয়সে তিন বছরের বড় হলেও তাদের সম্পর্ক সাপে–নেউলে। একে অপরের পেছনে লেগে থাকাই যেন তাদের প্রধান কাজ।
ঘুরে তাকাতেই ইহানের কোলে তিন বছরের এক ফুটফুটে শিশুকে দেখে সে। মুখে অযত্নের মলিন ছাপ। দেখলেই বোঝা যায়—ভালোবাসার অভাব কতটা গভীর।
সানজিয়া নিশানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। কোথাও বাবার ছায়া নেই—হয়তো পুরোপুরি মায়ের মতো। সানজিয়ার দৃষ্টিটা টের পেয়ে বড় মামি নিশানকে কোলে তুলে নেন।
“এটা আমাদের নিশান সাহেব। খুব বুদ্ধিমান ছেলেটা। তোর নাওবি ভাইয়ের ছেলে।”
“মাশাআল্লাহ! কিন্তু ওকে এত মলিন লাগছে কেন?”
“আর বলিস না মা। রোগ লেগেই থাকে। আমারও বয়স হয়েছে, নিজের শরীর সামলাতেই কষ্ট। তোর পাপাই অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকে। ও যখন পাঁচ মাসের, তখন ওর মা নিখোঁজ হয়ে যায়। তারপর থেকে নাওবিও তেমন দেখাশোনা করে না। ইহান পড়াশোনায় ডুবে থাকে। কাজের মেয়ে আছে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসার শূন্যতা কি কেউ পূরণ করতে পারে?”
নিশানের মুখের দিকে তাকিয়ে সানজিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। এত মানুষের ভিড়েও শিশুটি কতটা একা। অথচ তার কোনো দোষ নেই।
চুপিচুপি চোখের জল মুছে নেয় সে।
“চিন্তা কোরো না বড় মনি… আজ থেকে নিশানের খেয়াল আমি রাখব। বাবার ভালোবাসা না পেলেও—ছেলের ভালোবাসা সে পাবে।”
শেষ কথাটা এতটাই নিচু স্বরে বলা যে কারো কান পর্যন্ত পৌঁছায় না।
“তাহলে তো নিশ্চিত হওয়া গেল,”
বড় মামি হালকা হাসেন।
“আমার একটা চিন্তা কমল রে মা।”
কিন্তু কেউ খেয়াল করল না—
সানজিয়ার চোখে তখন শুধু মায়া নয়,
একটা নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞাও জ্বলছে।
এই শিশুটাকে আগলে রাখার প্রতিজ্ঞা…
যার মূল্য দিতে হলে তাকে আবার অতীতের মুখোমুখি দাঁড়াতেও পিছপা হবে না।
---

