Chirasree Bose

Romance Comedy


2.3  

Chirasree Bose

Romance Comedy


মিষ্টি প্রেমের নোনতা গল্প

মিষ্টি প্রেমের নোনতা গল্প

7 mins 10.2K 7 mins 10.2K

বৃষ্টিটা মাঝ রাত থেকেই নেমেছে। সকালে উঠে যেই জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম, কেমন জানি করে উঠল মনটা। বৃষ্টি আমার খুব একটা পছন্দ নয় ঠিকই, কিন্তু আজ একটু অন্যরকম লাগছে। অনেকদিন পর পুরোনো কথাগুলো খুব মনে পড়ছে, পুরোনো স্মৃতিগুলো ফিরে আসতে চাইছে। প্রথম প্রেমে পড়ার দিনগুলো মনটাকে আনচান করছে খুব।

ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে গেলাম। একটু চা বানিয়ে নিয়ে সোজা ব্যালকনিতে চলে এলাম। একটা চেয়ার টেনে বসলাম। ঝোড়ো একটা হাওয়া বয়ে গেলো। চুলগুলো মুখে এসে পড়তেই, ওর একটা কথা মনে পড়লো,''তোকে খোলা চুলে খুব ভালো লাগে জানিসতো?'' নিজের অজান্তেই হেসে ফেললাম। ওর বৃষ্টি খুব ভালো লাগতো। আমি যখন বৃষ্টি দেখলেই নাক কুঁচকাতাম, ও তখন বলত, ''তোর বৃষ্টি ভালোলাগে না?'' আমি মাথা নাড়াতাম। আর ও মুচকি হেসে বলত,'' ভিজবি আমার সাথে?''

হাসলাম মনে মনে। বৃষ্টির কয়েকটা ফোঁটা মুখে এসে পড়লো। মনটা আবার কেমন উদাসীন হয়ে গেলো। সত্যিই বলে লোকে, ছোটবেলার প্রেমগুলো কখনো ভোলা যায়না।ভুলতে নেইও। কারণ অতটা নিষ্পাপ, সরল প্রেম হয়তো আর কখনও হয়ে ওঠেনা।

অনেকগুলো স্মৃতি একসাথে মনের কিনারায় উঁকি দিলো। কিছু ভালো, কিছু ভারী মন্দ। কিছু মিষ্টি, তো কিছু একটু নোনতা। ফিরে চলে গেলাম পনেরো বছর আগের আমি..তে।

তখন আমার বয়েস ষোলো। কলকাতা শহরে নতুন এসেছি। স্কুলে ভর্তি হওয়া নিয়ে ঝামেলা কাটল তো ক্লাস ইলেভেন এর পড়াশুনার চাপ শুরু। ছ বছর গার্লস স্কুলে পড়ার পর কো-এড স্কুলে পড়া নিয়ে একটু চিন্তায় ছিলাম। আমি বরাবরই একটু শান্ত প্রকৃতির মেয়ে। ভাবলেই ভয় লাগছিল কি করে মানিয়ে নেবো নতুন শহরে, নতুন স্কুলে। জীবনটা হঠাৎ ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে গেছিলো যেন। যাই হোক, এবার সোজা গল্পে চলে যাই।

প্রথম দিন স্কুলে ঢুকতেই তো মাথা ঘুরে গেলো। এতো হৈচৈ, এতো ছোটাছুটি আর ছেলেদের এতো হৈ-হট্টগোল, কোনোটাতেই অভ্যস্ত ছিলাম না। বোকার মতো মুখ করে ঢুকে গেলাম ক্লাস ইলেভেন, 'সেকশন-এ'র ক্লাসরুমে। সব মুখ অচেনা। আর সবার মুখে অবাক চাউনি। কোনো বেঞ্চে জায়গা না পেয়ে শেষমেশ লাস্ট বেঞ্চ-ই জুটলো কপালে। গিয়ে বসে পড়লাম। অনন্যা আর সৃজা - ভাব হলো ওই বেঞ্চে ই বসা দুটো মেয়ের সাথে। প্রথম দিনটা অতটাও খারাপ গেলনা যতটা ভেবেছিলাম।

দেখতে দেখতে এক মাস কেটে গেলো। অচেনা মুখগুলো চেনা হতে শুরু করলো। অচেনা শহরটাও আর অতটা অচেনা রইলনা।

আর সাথে সাথে আরেকটা মুখ ও চেনা হতে শুরু করেছিল - দেবম গুহ। আমার বেঞ্চ থেকে ঠিক কোনাকুনি ফার্স্ট রো'তে সেকেন্ড বেঞ্চে বসত। দু সপ্তাহ আগে হঠাৎ ই বাংলা ক্লাস চলাকালীন বাঁদিকে মাথা ঘোরাতেই দেখলাম ও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে - ফ্যালফ্যাল করে। ভারী অসভ্য তো!মনে মনে বললাম। মুখটাও ঘুরিয়ে নিলাম। কিন্তু ওর চোখ দুটো যে আমার উপরই আটকে আছে তাও বুঝতে পেরেছিলাম। মনে মনে যে ভালো লাগেনি তা বলাটা ভুল হবে। আমি খারাপ দেখতে নই ঠিকই, তবে সুন্দরী বলে কখনই নিজেকে ভাবিনি। অমন মিষ্টি একটা ছেলে যদি তাকায় একটু উথালপাতাল তো হবেই মনে।

যাই হোক নিজেকে বোঝালাম এই সময়টা শুধু মন দিয়ে পড়াশুনা করার জন্য। আর প্রেম জিনিসটা আমার দ্বারা হওয়ার নয়, এটা ছিল আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তবে ভগবান বা ভাগ্য কোনোটাই যে ভাই তোমার বিশ্বাস এ বিশ্বাস করেনা, সেটা কয়েকদিনেই বুঝতে পারলাম।

না, প্রেমে পড়িনি অত তাড়াতাড়ি। তবে ওর আমার দিকে চেয়ে থাকাটা অল্প অল্প ভালো লাগতে লাগল। আর এটাও অদ্ভুত লাগতে লাগলো যে ছেলেটা একবার ও কথা বলতে আসেনা। সামনে আসলেই যেন তার গলা শুকিয়ে যায়। না না, লাজুক তিনি ছিলেননা। উল্টে লজ্জা আমি ই পেতাম। নাহলে হয়তো জিজ্ঞেস করতাম গিয়ে,''এই তুই ওরকম বোকার মতো তাকিয়ে থাকিস কেন রে?''

আমার বান্ধবীদের কাছে শুনলাম ও নাকি আমাকে ভয় পায়। ততটাই আমাকে পছন্দ ও করে। অনন্যা একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেললো ''হ্যাঁ রে তুই ও কি…''

''না না, কি যে বলিস। আমি ওসবে নেই।''

ভাবিনি, ও কথাটা দেবমকে গিয়ে বলে দেবে। যাই হোক, তাতে কি। প্রেম-টেম আমার দ্বারা হওয়ার নয়, সে বিশ্বাস তখনও আমার পুরোপুরি টিঁকে আছে। আর বয়েসের তুলনায় আমি একটু বেশি-ই পাকা ছিলাম। ভাবলাম, এই ভালোলাগা আবার ভালোলাগা নাকি? দুদিনেই উড়ে যাবে।

কিন্তু উড়ে তো গেলোই না, বরং এই পাখি তো এক ডালেই বসে রইলো। পরের মাসে স্কুল থেকে একটা আউটিং প্ল্যান হলো - দীঘায়। আমার মা বাবা তো শুনেই না৷- হ্যাঁ, একটু বেশি ই গোঁড়া ছিলেন। মনে যত ইচ্ছাই থাকুক মেনে নিতে বাধ্য হলাম। বাকি সবাই গেলো।

মনমরা হয়ে পড়ে থাকলাম আমি বাড়িতে। হঠাৎ ই রবিবার বিকেলে মায়ের মোবাইলটা বেজে উঠল। সৃজা ফোন করেছে দীঘা থেকে - ছুটে গেলাম শুনেই । যেই ফোনটা কানে নিলাম, ওপাশ থেকে একটা চেনা-অচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। না সৃজা না, অনন্যা ও নয়। দেবম - দেবম গুহ।

''কেমন আছিস?''

আমি ঢোঁক গিলে, চারদিক তাকিয়ে, ছুট্টে নিজের ঘরে ঢুকে বললাম, 'দেবম'?

ও হালকা হাসল। ''হ্যাঁ, চিনতে পেরেছিস আমার গলা?''

লজ্জা পেয়ে হাসলাম । যে সে লজ্জা না, একেবারে গাল টম্যাটোর মতো লাল। বললাম,''হঠাৎ ফোন করলি?''

''মিস করছিলাম তোকে। সবাই আছে, কিন্তু তুই তো নেই। তুই মিস করছিস না আমায়?''

বুকটা কেমন ধড়াস্ করে উঠল। কেন জানিনা,বা হয়তো জানতাম। কিছু বলার আগেই মা এসে ঢুকলো ঘরে। ভয়ে ফোনটা কেটেই দিলাম।

দেখা হল আবার স্কুলে। দেবম টিফিন এ আমার বেঞ্চের সামনে এসে দাঁড়াল। আমার বান্ধবীরা উঠে চলে যেতেই ও বসল আমার পাশে, একটু দূরে। সত্যি বলছি, আগে কখনো, হৃৎপিণ্ড টা যে ভিতরে লাফাচ্ছে সেটা এত স্পষ্ট করে বুঝিনি।

''তোকে একটা জিনিস দিতে চাই।''

আমি তাকালাম ওর দিকে। 'কি?'

''একটা চিঠি''।

পকেট থেকে একটা ছোট কাগজের খাম বার করে আমার সামনে বেঞ্চে রেখে ও চুপচাপ উঠে চলে গেলো। কাউকে না দেখিয়ে আমিও ওটা ব্যাগে রেখে দিলাম। ফেরার পথে অটো তে পড়ব, ঠিক করলাম।

ইতিমধ্যে স্কুলে একটা গুঞ্জন রটে গেলো - আমাদের মধ্যে প্রেমটা নাকি হবে হবে করছে। ভয় লাগল, মা বাবা জানলে কি হবে? কিন্তু চিঠিটা অটোতে বসে খুলতেই মনটা কেমন গলে গেলো। বেশি বড় নয়, শুধু একটা লাইন - আমি তোকে ভালোবাসি। ভালো লাগল, হাসলাম চোখ দুটো বন্ধ করে, অজান্তেই এক ফোঁটা জল বেরিয়ে এলো - অদ্ভুত একটা ভালোলাগা মনটাকে ঘিরে নিয়েছিল। আবার রাগ ও হলো একটু - এটা কেউ চিঠিতে লিখে বলে?

পরের দিন স্কুলে চোখটা ওর বেঞ্চেই আটকে রইলো। কেন জানিনা ও তখনো পৌঁছায়নি এসে। বারবার ইচ্ছা করছিল জিজ্ঞেস করি কাউকে, ও কোথায়? আসছে তো আজ স্কুলে? আমার যে কিছু বলার আছে, কিছু জানার আছে, আর অনেক কিছু শোনার আছে।

না, আসেনি ও সেদিন, জানি না কেন। খারাপ লাগল খুব। এতটা মিস আগে কখনও কাউকে করিনি। ভাবলাম, কাল তো নিশ্চয়ই আসবে, কাল কথা হবে। ওর যে জানা দরকার, আমিও ওকে …

কিন্তু ওই যে বলেছিলাম, ভগবান বা ভাগ্য কেউ ই আমাদের কথা মেনে চলেনা। বাড়িতে পৌঁছতেই সে এক তুমুল কান্ড। মা নাকি দেবম এর লেখা প্রেমের পত্র খুঁজে পেয়েছে আমার পড়ার টেবিলের ড্রয়ার এ। আর কে দেখে! কুরুক্ষেত্র শুরু। দুদিন আমি ঘরবন্দী রইলাম৷ স্কুল, টিউশন , গানের ক্লাস, নাচের ক্লাস সব বন্ধ। মা এর রক্তচক্ষু দেখে বুকটা বারবার ঢিপঢিপ করে উঠছিল। বাবা নিরুত্তাপ। বুঝলাম কিছু না বললেও মাকেই সাপোর্ট করছে।

নিজে থেকেই মা কে গিয়ে, অশ্রুভরা চোখে বললাম,''পড়াশুনা টা করতে দাও মা...প্রেম টা আমি করব না, কথা দিলাম।''

বলেছিলাম না? বড্ড পাকা ছিলাম আমি। আর তার চেয়েও বড় বোকা। লড়তে আমি শিখিনি তখনও, ভয় পেয়ে যাওয়াটা সহজ লাগতো। চলে গেলাম স্কুলে পরের দিন, চোখ ভর্তি জল আর একটা ভাঙা মন নিয়ে।

এসেছিল সেদিন দেবম। ছুটে এলো আমাকে দেখে।

''সরি, কাল জ্বর হয়েছিল। আমি জানি চিঠিতে না লিখে মুখে বললে তোর ভালো লাগতো তাই..''.

''প্রেম জিনিস টা আমার দ্বারা হবে না রে। সরি।''

ও শেষ করার আগেই বলে উঠলাম। ওর হাতে ওর চিঠিটা ধরিয়ে দিয়ে, আমি ক্লাসরুমে ঢুকে গেলাম। ওর আর জানা হলোনা, আমিও যে ...

ওকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম ৷ ফিরে এলাম আবার বর্তমানে। মনটা খারাপ হয়ে গেলো, তাই না? আমারও। দুটো সরল মনের নিষ্পাপ ভালোবাসা আমাদের গতানুগতিক চিন্তায় মোড়া গোঁড়া সমাজ বুঝে উঠতে পারেনি।

চেয়ার থেকে উঠে রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। বৃষ্টিটা একটু কমেছে। চা'এ একটা লম্বা চুমুক দিলাম। পুরোনো কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মনটাও কেমন যেন ১৫ বছর আগের ছোট্ট মেয়েটার মনের সাথে মিশে গেছে । দুঃখগুলো, ঘাগুলো আবার নাড়া দিয়ে উঠেছে যেন।

''তুমি এখানে ?''

আওয়াজটা পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম।

''তুমি উঠে পড়েছ? চা বানিয়েছি, ঢেলে নাও ফ্লাস্ক থেকে।''

বলে আমি আবার ঘুরে দাঁড়ালাম। কত গুলো বছর কেটে গেছে। কত কিছু বদলে গেছে। আমি বদলে গেছি। সময়, পরিস্থিতি সব বদলে গেছে। আর ...

''ভিজে যাবে তো! এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? অফিস যাবে না?''

আমার চিন্তায় বাধা পড়ল, পাশ ফিরে তাকালাম। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে ও আমার পাশে। হাসলাম - আমরাও বদলে গেছি। তুই আর আমি থেকে কখন যে ‘আমরা’ হয়ে গেছি তা আর খেয়াল নেই। পনেরো বছর আগের তুই টাও আস্তে আস্তে তুমি তে পরিণত হয়েছে অজান্তেই। এক সময়ের মন-ভাঙা দুই প্রেমী এখন এক সুখী দম্পতি।

বিশ্বাস হয় না এই মানুষটার হাত ধরে কতগুলো বছর একসাথে কাটিয়ে দিলাম। ও কি ভাবে কখনো পুরোনো দিনের কথাগুলো? আমাদের দেখা হওয়া, বিচ্ছেদ, আবার ফিরে পাওয়া দুজনকে আর শেষমেষ শত বাধা পেরিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া?

''যদি না যাই কেমন হয়?'' মুচকি হেসে বললাম।

দেবম অবাক ভাবেই তাকিয়ে রইল আমার দিকে।

''তোর বৃষ্টি ভালোলাগেনা?''

''লাগে, কিন্তু ...কি ব্যাপার বলো তো। হঠাৎ হলোটা কি?''

আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম - এখনো টানে আমায় নেশার মত। আর হাসি - সে যে আমাকে পাগল করে দেয়।

একটু লজ্জা পেয়ে হেসে বললাম - ''ভিজবি আমার সাথে?''

                                        ***এখানেই ইতি টানলাম***


Rate this content
Log in

More bengali story from Chirasree Bose

Similar bengali story from Romance