কথা দিলাম
কথা দিলাম
কোচিং এ ফিজিক্স ক্লাস চলছে ঐশি পৌলমী ফিসফিস করে কথা বলে চলেছে ওদের পাশে বসে দীপেন।। পৌলমী বললো, "তুই এত সিয়র কিভাবে হতে পারিস যে কথা বলছিস দীপেন এর সঙ্গে তৃনার সম্পর্ক টা দুবছর হতে যাচ্ছে।" দীপেন ওমনি বলে উঠলো , "ওটা তুই ঠিক বললি না ঐশি,"
ঐশি-- "আমি তৃনা কে দেখেছি ওটা ওর বিশেষ কেউ, ও তোকে ঠকাচ্ছে, তুই বোকা বুঝতেই পারছিস না। "
পৌলমী--" এভাবে কি কিছু প্রমাণ হয়? দীপেন তাহলে বুঝতে পারবে না।"
দীপেন--" দেখ ঐশি তোর নিজের জীবনের সমস্যা আছে হয়তো তো তাই আমার ব্যাপারটা নিয়ে উল্টো পাল্টা বলছিস।"
তিনজনের কথা ফিসফিস থেকে জোরেই হলো।
ফিজিক্স স্যার বোর্ড এর দিক থেকে ঘুরে কি হলো এত কথা কেন বলছো? একটা সিরিয়াস টপিক চলছে
দীপেন- "সরি স্যার আপনি বলুন।"
ক্লাস শেষে ঐশি র সাথে রীতিমত ঝগড়া হয়ে গেল দীপেনের ।
পৌলমী ঐশিকে বললো--" শুধু শুধু তুই দীপেনকে এত কথা বললি, ঝগড়া ও করলি।"
ঐশি- "বেস করেছি ও এরকম বোকা বোকা ভাবে থাকবে কেন? ও বুঝতে পারছেনা যে তৃনা নাটক করছে।"
পৌলমী-- "দীপেন কেন আমিও বুঝতেই পারছি না যে তৃনা কে নিয়ে তুই কি বুঝেছিস আর এত রিয়েক্ট করার কি আছে।"
এভাবে সেদিন কথা কাটাকাটি করতে করতে পেরিয়ে গেল।
ঐশির সাথে দীপেন কথা বন্ধ, পৌলমী কথা বলে। মাঝেমধ্যে দুজনের সেতু হিসেবে ও কাজ করে যেমন ক্লাসে পেন্সিল বা স্কেল ইত্যাদী দীপেনের থেকে ঐশি নিলেও কথা হয় না পৌলমী কে উদ্দেশ্য করে বলে নেয়। এদিকে ঐশি এতদিন ফিজিক্স এর অনেক প্রশ্নের উওর সলভ করতো দীপেন এর সাহায্যে নিয়ে। দীপেন সাথে ওর বন্ডিং ভালো ছিল। কিন্তু এখন তো ঝগড়া দুজনের।।
ওরা সবাই উচ্চমাধ্যমিক দেবে এবছর। তৃনা ওই কোচিং এ বাংলা ইংরেজি পড়ে ঐশিদের সাথে । সেখানে থেকে দীপেন সাথে আলাপ তৃনার, রিলেশন, মোটামুটি দু'বছর হতে চলেছে।
কাটলো আরো কতগুলো দিন,
এরকম সময় হঠাৎ দীপেন খেয়াল করলো সত্যি সত্যি তৃনা তাকে মিথ্যে বলছে ইদানিং, দীপেন বুঝতে পারছে তৃনা সত্যি ঠকাচ্ছে।। তৃনা সেভাবে আর সম্পর্কে এর মধ্যে নেই।
একদিন তৃনা ফোনে দীপেন কে বললো, " দ্যাখ আমার প়ক্ষে এই সম্পর্ক টা রাখা সম্ভব নয় , "
দীপেন- " কেন? এভাবে.. কি কারন?"
তৃনা-- "আমার এক্স ফিরে এসে ছে ক্লাস এইটে ওকে ভালোবেসেছি তারপর ব্রেকআপ হয়
আর এখন এমন ভাবে বললো যে আমি ওকে ফেরাতে পারছিনা। ও আমাকে এখন ও ভোলেনি।"
দীপেন-- "আর আমার সাথে এতগুলো দিন এটা তাহলে কি ছিল?"
তৃনা- "না মানে তোকে আমার সব সময় মনে হয় , কিন্তু ওকে ভালোবেসে ছিলাম তো তাই এখন ফেরানো যায় না। তুই প্লিস ভুল বুঝিস না। আমি তোকে অনেক দিন ধরেই বলবো ভেবেই কিন্তু ...তোকে ও তো ভালোবাসতাম তাই, বলতে পারছিলাম না।"
এই ছেলে ও ঐতিহ্য ৈৈদিকে তৃনা আরও কিছু বলতে চেয়ে ও পারলো না।।
দীপেন আপসেট , কোচিং এ প্রায় একমাস যায়নি।
সেদিন ঐশি কোচিং এ পৌলমী র সাথে আলোচনা করছে।
ঐশি-- "দীপেন আসছে না কেন? কি হলো ওর , শরীর খারাপ কি মনে হয় বলতো? তৃনা তো দিব্যি আসছে। ওই মেয়েটা কি কিছু করেছে নাকি..!!"
পৌলমী-- "হ্যাঁ অনেক দিন হলো কি জানি বোঝাই যাচ্ছে না।"
ঐশি--" একটা ফোন করবি ?"
পৌলমী-- "তোর ব্যাপারে আমার একটা কথা মনে হয় "।
ঐশি-- "কি রে.."
পৌলমী-- "আমি অনেক দিন ধরে লক্ষ্য করেছি তোর মনে হয় দীপেনকে পছন্দ। একটু বেশি ই ভাবিস, তোর মনে হয় না ...তোদের মধ্যে কোথায় যেন একটা কি তৈরি হয়েছে।"
ফিজিক্স ক্লাসে কিন্তু তোদের দেখে আমার তাই মনে হয়।।
ঐশি- "দীপেন তৃনাকে ভালোবাসে ,
পৌলমী--" দীপেন তোকেও হয়তো পছন্দ করে বুঝতে পারে না, কারন তোরাও তো ফোনে ভালোই কথা বলিস ফিজিক্স এর প্রশ্ন আলোচনা করা।
ঐশি--"আবোল তাবোল বকছিস কেন!! তাছাড়া সেদিন তো ঝগড়াঝাঁটি হয়ে গেল ,তোর সামনেই তো হলো। আর কথাই হয়নি ফোনে।অনেক দিন আসছে না প্রায় একমাস, তাই তোকে বললাম ।"
পৌলমী-- "ঝগড়া হলেও তোরা কথা বলতিস আমাকে মাঝখানে নিয়ে এই ক্লাসে । এটাই ভালোবাসা র একটা স্টেজ.."
ঐশি বিরক্ত হয়ে-- তুই তো পুরো সাইক্রিয়েটিস্ট
হয়ে গেছিস..
এই তোকে না ফোন করতে হবে না যা তো..!!!
পৌলমী--" আরে রাগ করছিস কেন ?করছি দাঁড়া,
ফোন করার পর পৌলমী জিগ্গেস করলো দীপেন কে।
দীপেন বললো-- "তোরা কোথায় এখন , কোচিং এ আছিস ?"
পৌলমী-- হ্যাঁ
দীপেন-- ঐশি আছে?
পৌলমী-- "হ্যাঁ ওই তো বললো ফোনটা করতে"
দীপেন ঐশিকে ফোন দিতে বললো ঐশি ফোনে কথা বললো দীপেন এর সঙ্গে , দীপেন সব কিছু বললো আর ঝগড়ার জন্য সরি বললো ।।
ঐশি দীপেন এ বললো--" সামনে উচ্চমাধ্যমিক ,এভাবে সময় নষ্ট করিস না, যার জন্য করছিস সে কিন্তু দিব্যি আছে, তোকে ভুলেই গেছে। তুই একমাস এই ভাবে কাটালি, আমি জানি তোর মন খারাপ, তুই কথা দে যে তুই সব আবার শুরু করবি...
আরো এরকম কত কি ঐশি বুঝিয়ে গেলো দীপেন কে।
দীপেন ঐশির সাথে কথা বলার পর অনেক টা ক্লান্তি কাটাতে পারলো , দীপেন ভরসা রূখেবললো-- "কথা দিলাম।।"
আর দীপেন এর সময়টা র অনেক বদল হলো।।
ধীরে ধীরে অনেক দিন অনেক বছর পেরিয়ে গেছে।
দীপেন ঐশি অনেক গুলো বসন্ত পার করেছে বেশ একটা গভীর অনুভূতি নিয়ে।। দীপেন এর মনে তৃনা অবশিষ্ট ছিল কিনা তা ঐশি তা বুঝতে পারতো না। তবে ঐশি কখনো দীপেন কে বলেছিল, আমার তোকে অনেক আগে থেকেই ভালো লেগেছিল। দীপেন উওর না দিলেও ঐশির উপর এই কয়েক বছরে নির্ভরশীল ছিল দীপেন তা জানতো।
ঘটনাচক্রে একি অফিসে চাকরি করে এখন ওরা
আর অফিস এর দরকারে এ ঐশি দীপেন এবং ওদের তিন জন কলিগ সমুদ্রে র কাছাকাছি একটা জায়গায় এসেছে।। কাজের শেষে ঐশি দীপেন বালুকাবেলায় ঘুরছিল।।
আচমকাই দেখা তৃনার সঙ্গে ,তৃনার এখন বিয়ে হয়ে গেছে ওর সেই পুরনো বয়ফ্রেন্ড এর সাথে।
তৃনা বেশ উত্তেজিত হয়ে সব কিছু জিগ্গেস করলো ঐশি দীপেন কি কাজে এখানে, কেন ওরা এখানে, কি চাকরি ইত্যাদী। ঐশির সাথে দীপেন র সম্পর্ক দেখে তৃনা র একটু হিংসে হলো। তাই ঐশিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
দীপেন নাকি এখনো ওর স্ট্যাটাশ দেখে, ফেসবুকে র একটা পুরনো ফ্রেন্ডের গ্রুপে দীপেন কোনো কিছু লিঙ্ক পাঠালে আজোও তৃনা দেখে আর তৃনা পাঠালে দীপেন ও নাকি দেখে। এসব আরো ও কত কি বলে গেলো।
দীপেন কোনো কিছুই উওর দিলো না আর ঐশি আবার জিজ্ঞেস তৃনার বর কোথায়, কতদিন থাকবে ওরা এইসব।
সন্ধ্যেবেলা দীপেন বুঝতে পারলো ঐশির ওসব শুনে খারাপ লেগেছে, দীপেন বোঝাতে গেলে একটা ঠান্ডা ঝাগড়া হয়ে গেলো।
ঐশি-- "এখনোও তৃনার ব্যপারে তোর এত ইন্টারেস্ট ওর সব কিছু চেক করিস স্ট্যাটাস, রোজ। "
দীপেন-- "তোর ফোনে থাকা পুরোনো লোক জনের স্ট্যাটাস আপডেট এলে দেখিসনা তুই ? এতে ইন্টারেস্ট এর কোনও ব্যাপার নেই সামনে ছিল তাই হয়তো দেখেছি। আমার ফোনে তো পাড়ার ইলেকট্রিক মিস্ত্রী র , সবজি ওলা সবার স্ট্যাটাস আসে একন ,দেখি ..তো কি এমন বড় ব্যাপার হলো এটা ।"
ঐশি তাও রাগ দেখালো ..
দীপেন আবার বললো, " তুই প্লিজ এটা নিয়ে ঝগড়া করিস না , তোর মনে আছে ফিজিক্স ক্লাস এ সেই ঝগড়া হয়েছিল মৃধাকে নিয়েই
তখন কিন্তু পৌলমী ছিল এখন কেউ নেই তুই যদি ঝগড়া করিস আর মিটবে না। পুরো টা ঘেঁটে যাবে।
তুই ভীষণ ঝগড়া টাইপের
দীপেন কথাটা যেভাবে বললো তাতে ঐশি হেসে ফেললো।।
পরেরদিন সকালে সানরাইজ দেখবে বলে দীপেন ও তার বাকি কলিগরা সমুদ্রের কাছে দাঁড়িয়ে আছে ।। এর পর কলিগরা একটু দূরে হেঁটে গেলো , দীপেন দাঁড়িয়ে রইলো।
ওদিক থেকে তৃনা ও তার বর ছিল।। দীপেনকে দেখতে পেয়ে তৃনা এগিয়ে এলো ,
তৃনা--" কিরে সকালে?ঐশি কোথায়?
দীপেন -- "হ্যাঁ, ভালো লাগছিল না বলে ও আসলো না ।"
তৃনা-- "তোরা আর কত দিন থাকবি?"
দীপেন -"এই তো- আজকের বিকেলে ফিরে যাব!"
তৃনা দীপেন এর হাতটা ধরে ইচ্ছে করে,তোর মনে আছে সেই প্রথম প্রথম যখন তোর সাথে আমি কোচিং এর ক্লাসে র পর ঘুরতে যেতাম সেই যে পুকুর টার পাশে, তখন আমরা ভেবেছিলাম সমুদ্রে ঘুরতে আসবো আর আজ দ্যাখ সেই সমুদ্রের কাছে।
দীপেন বললো আমার হাতটা ছাড় , দীপেন এর বিরক্ত প্রকাশ।
তৃনা-- "তুই কি আমার ওপর রাগ করে আছিস ? সেইদিন তো তারপর দুম করে ফোনটা ছেড়ে দিয়েছিলিস, তারপর কোচিং এ আর কথাই বলতিস না তারপর পরীক্ষার পর এই এত বছর বাদে দেখা হলো।।
আমার মনে কিন্তু আজোও তুই আছিস।। তোকে আমি আমার জন্য বিশেষ মনে করি
দীপেন -- "কেন !! আমাকে এত মনে রাখার কি আছে? তুই যাকে ভালোবেসেছিলিস তাকেই বিয়ে করেছিস তাহলে .."..
তৃনা-- "আচ্ছা তোর আমার কথা মনে পড়ে না সত্যি কথা বল ?তুই ভুলতে পেরেছিস? আমি কিন্তু বুঝেছি ঐশির সাথে তুই সে ভাবে জড়াতে পারিস নি ,কি ??
ঐশিও তোকে... সেভাবে ভালোবাসে না দেখেই বোঝা যায় !!"
সঙ্গে সঙ্গে দীপেন তৃনা কে থামিয়ে আমি না জাস্ট শুনতেই চাই না তুই তোর জীবন নিয়ে থাক আমাকে প্লিজ বিরক্ত করিস না।।
তৃনা -- "না আমার মনে হলো তুই এখনো আমাকে ই ... " তুই স্বীকার করছিস না, ঐশি র আগে আমি ছিলাম তোর জীবনে।।
দীপেন --- "এইসব অবান্তর ভাবা বন্ধ কর , মূহুর্ত অনেক বেশি দামী , আগে পরে র থেকেও।
দীপেনের কলিগ রা গিয়ে ঐশি কে বললো, "আজই তো ফেরা আমাদের সব কিছু গুছিয়ে নিয়েছো? তুমি তো সকালে গেলেই না। "
ঐশি বলল," হ্যাঁ আর ভোরে উঠতেই ইচ্ছে করছিল না।। দীপেন কোথায় ?
ওরা বললো, কার সাথে কথা বলছে।। আর ওরা ফিরে এসেছে ।।
কিছু সময় পর দীপেন এলো।। ঐশি হোটেল র করিডরে দাঁড়িয়ে আছে। দীপেন ঐশি র কাছে গেল।
দীপেন বললো -- "তুই তো গেলি না!! কি সুন্দর সানরাইজ!!!"
ঐশি -- "আর তোর প্রাক্তন প্রেমিকা ও তো ছিল কেমন কাটলো সেটা বল.."
দীপেন -- " তৃনা র কথা বলেছে সেটা নিশ্চিত ওরা বলেছে!!! উফ তো সামনে এসে গেলে কথা বললে কি করতাম।
আর শোন কাল থেকে যে রাগ দেখাচ্ছিস, ও কিন্তু বলেছে ও আজ ও আমায় মনে করে আর এখন ও আমার জন্য ওর মনে একটা বিশেষ জায়গা আছে আর তুই কোনো দিন ভালোবাসিস কথাটাও বললি না আমাকে শুধু ভালো লাগে একবার ... সেই কবে..
ঐশি থামিয়ে বলে উঠলো, "শোন ভালোতো মানুষ বাবা মা ভাই বোন ফুল পাখি সবাইকেই বাসতে পারে এটা আর নতুন কি? বল বল .. ?ভালো লাগা টা না গভীর একটা অনুভুতি তোর মতো বুদ্ধিকম রা এসব বুঝবে না ... ঐশি আরো কত কিছু বলেই চলেছে। দীপেন হাত দিয়ে ঐশির মুখ চেপে ধরলো আর বললো বাকি জীবন টা আমার সঙ্গে কাটাতে পারবি ? তৃনার স্ট্যাটাস যদি আমি দেখি ও বা ওর সাথে কথা বললেও , তুই ঝগড়া করবি, কিন্তু আমায় ছেড়ে যাবি না , কথা দে..
ঐশি মুখ চাপা অবস্থায় উ উ... শব্দ করছিল , দীপেন ঐশি র মুখ টা ছাড়লো , ঐশি একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে... সব কথা আমিই দেবো আর তুই কি করবি.. ??সেতো তুই ও আমাকে ছেড়ে যেতে পারিস যখন তখন..!!!"
দীপেন -- ""তোর মনে আছে প্রথম যখন আমি সেই আপসেট হয়ে কোচিং এ যাচ্ছিলাম না , সব কিছু ফেলে বসেছিল আর পৌলমীর ফোন এলো তুই কথা বললি, তখন তুই ওতো বলেছিলিস যে আমি যেন আপসেট না হয়ে আবার সব শুরু করি সময় নষ্ট না করি,.. "কথা দে.." বলেছিলিস..
আমি কিন্তু সেইদিন থেকেই কথা দিয়েছিলাম আর নতুন করে সব শুরু ও করেছিলাম।। তাহলে তুই ও কথা দে.... বলে ই দীপেন হাত টা বাড়ালো, ঐশির চোখে চোখ রেখে।।
ঐশি ও হেসে দীপেন এর চোখে চোখ রেখে বললো.. কথা দিলাম..

