কিছু চেনা দূরত্বের গল্প
কিছু চেনা দূরত্বের গল্প
আজ মহালয়া। কাজের চাপে এখনও নতুন জামাকাপড় কেনা হয়নি। তাই সকাল সকাল স্নান করে আমি আর বোন কলকাতার নিউ মার্কেটে জামা কিনতে চলে এলাম।
চারদিকে পুজোর গান বাজছে, আলোর রোশনাই আর মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সবার মুখে নতুন জামার আনন্দ, অথচ আমার মনের ভেতর কেমন যেন একটা চেনা শূন্যতা দানা বাঁধছিল।
নতুন জামাকাপড় দেখছিলাম। তখন দেখলাম সঙ্গীতা এসেছে। আমি সঙ্গীতাকে দেখলাম, ও হয়তো আমাকেও দেখেছিল। কিন্তু না দেখার ভান করে আমার পাশ দিয়ে চলে গেল।
চোখের সামনে দিয়ে ও চলে গেল, অথচ একটা চেনা চাউনিও ছুড়ে দিল না। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। উৎসবের সব আলো যেন এক মুহূর্তে ফিকে হয়ে গেল।
বোন সঙ্গীতাকে দেখে আমাকে বলল,
— “দিদি, সঙ্গীতা দিদি ওই দেখ!”
আমি বললাম,
— “দেখেছি।”
বোন আবার বলল,
— “তাহলে কথা বললি না কেন? সঙ্গীতা দিদি তো তোর ভালো বন্ধু, মানে বেস্ট ফ্রেন্ড!”
আমি ওর দিকে না দেখেই বললাম,
— “ছিল, এখন নেই হয়তো।”
বোন বলল,
— “মানে কী বলছিস?”
আমি একটু জোরে বললাম,
— “তুই জামাকাপড় কিনতে এসেছিস তো, সেটা কেন। ওর কথা পরে বলব।”
জামাকাপড় কিনতে কিনতে দুপুর হয়ে গেল। তখন বোন বলল,
— “দিদি, চল না কিছু খেয়ে নিই। তারপর আবার কিনব।”
আমি বললাম,
— “ঠিক আছে, চল পাশের রেস্টুরেন্টে।”
আমি আর বোন রেস্টুরেন্টে এলাম। খাবার অর্ডার দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়েটার খাবার দিয়ে গেল।
বোন আমায় খেতে খেতে বলল,
— “দিদি, সঙ্গীতা দিদির সঙ্গে তোর কী হয়েছে? তুই কেন কথা বললি না?”
আমি মাথা হেঁট করে বললাম,
— “ওর এখন অন্য ভালো বন্ধু আছে। আমি ওর কেউ নই।”
বোন বলল,
— “তোদের মধ্যে কী এমন হয়েছে যে কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল? বল না দিদি, কী হয়েছে?”
আমি বললাম,
— “তাহলে শোন, বলছি।”
আমরা ছোট থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছি। একসঙ্গে স্কুলে যেতাম, টিফিন ভাগ করে খেতাম। বৃষ্টির দিনে ছাতা না নিয়ে একসঙ্গে ভিজে ভিজে বাড়ি আসতাম। পরীক্ষার আগে একজন আরেকজনকে পড়া বুঝিয়ে দিতাম। তখন মনে হতো, এই বন্ধুত্ব কোনোদিন ভাঙবে না।
একটু জ্বর হলেই যে মেয়েটা সারাদিন খোঁজ নিত, যার সঙ্গে স্কুলের টিফিন ভাগ না করলে পেটের ভাত হজম হতো না, আজ সে এতটা পর হয়ে গেল?
বোন আবার বলল,
— “তাহলে তোদের মধ্যে এমন কী হলো যে আর দেখা হলেও কথা বলিস না?”
আস্তে আস্তে পরিস্থিতি বদলে গেল। উচ্চশিক্ষার জন্য আমরা দুজনে দুই দিকে চলে গেলাম। নতুন বন্ধুমহল ও জীবনের নতুন বাস্তবতা এলো।
আমি একটু থেমে আবার বললাম,
— “ধীরে ধীরে রোজকার ফোন করাটাও সপ্তাহে একবার হলো। তারপর মেসেজের উত্তর দেরি হতে শুরু করল।”
আমি দূরত্বটা কমাতে চাইলেও ওপাশ থেকে কেমন যেন একটা অবহেলা বা উদাসীনতা আসতে লাগল। এইভাবেই দূরত্ব বাড়তে থাকল।
বোন বলল,
— “তারপর? দিদি, বল থামলি কেন?”
আমি বললাম,
— “২৪ মে ওর জন্মদিন। আমি ওকে শুভেচ্ছা জানাতে গেলাম ওদের বাড়িতে। গিয়ে দেখলাম, এখন ও তার নতুন বন্ধুদের নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত এবং খুশি। আমার জন্য তার জীবনে সেই জায়গাটা বা সময়টা আর নেই।”
ওর ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল। দেখলাম, নতুন বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড় করছে, হাসছে। আমি দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই ওর হাসিমুখটা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল, যেন আমি কোনো অনাহূত অতিথি।
আমি বুঝতে পারলাম, সে আগে আমার ছিল, কিন্তু এখন সে আর আমার নেই।
বোন বলল,
— “দিদি, তুই তারপর কী করলি?”
আমি বললাম,
— “কোনো রাগ-অভিমান ছাড়াই, এক বুক কষ্ট নিয়ে আমি তাকে তার মতো ভালো থাকতে দিলাম। দূর থেকে তার সাফল্য দেখে খুশি হলাম, কিন্তু মনে মনে সেই পুরোনো সোনালি দিনগুলোকে আগলে রাখলাম।”
বোন খুব ধীরে বলল,
— “কষ্ট দিলে, কষ্ট পেতে হয়।”
আমি বললাম,
— “ও কষ্ট পাক, আমি চাই না রে। ও ভালো থাকুক, আমি সেটাই চাই। ও আমার থাকুক কি না থাকুক।”
আমি একটু হেসে বললাম,
— “থাক, এসব কথা বাদ দে। চল, আমরা জামাকাপড় কেনা শেষ করি।”
বোনের হাত ধরে আবার ভিড়ের মাঝে মিশে গেলাম।
চারপাশের কোলাহলের মাঝেও মনে মনে বললাম—
“ভালো থাকিস, সঙ্গীতা। অন্তত তোর নতুন বন্ধুদের ভিড়ে তুই ভালো থাকিস।”
— সমাপ্ত —
