"জীবনের খোঁজে"
"জীবনের খোঁজে"
"জীবনের খোঁজে"
শুভাশিস পাল
কিছুতেই কাজে মন বসছিলনা আজ। গতকালের জমানো সেই ক্লান্তি কুয়াশার মতো ঘন হয়ে জড়িয়ে রয়েছে সারা অঙ্গে। মনের গহীন অলিন্দে। চোখের সামনে ল্যাপটপ খোলা বার বারবার ল্যাপটপে ভুল পাসওয়ার্ড টাইপ করছিলো শুভ। ল্যাপটপ আর খোলে না । মন একেবারেই সঙ্গ দিচ্ছিলোনা আজ । স্মৃতির অতলে ডুব দিয়ে কোনো এক অশ্রুসিক্ত স্মৃতি বারবার তাড়া করছিল। এক বুকভরা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। ক্লান্ত হয়ে পড়ে শুভ।
ভীষণ এক অস্থিরতায় আচ্ছন্ন হলো তার চারিপাশ। অফিসের ব্যস্ততা , কোলাহলের মধ্যেও ভীষণ একা লাগছে। এ সত্যিকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। জীবন কি সত্যিই এতো ক্ষণস্থায়ী? তবে কিসের এতো অহেতুক দ্বন্দ্ব, অহংকার আর সম্পর্কের এতো পঙ্কিলতা। কিসের এতো প্রেম, কিসের এতো মনোমালিন্য।
যন্ত্রনায় দুহাতে মুখ ঢাকলো শুভ। বন্ধ চোখের পাতায় মুহূর্তে ভেসে উঠলো দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা এক চিতার লেলিহান শিখা, আর তার পশে দাঁড়িয়ে থাকা এক অসহায় বাবার নির্লিপ্ত বিষাদময় চেহারা।
দিনটা ছিল ২৫সে মার্চ। হোলির ছুটি ছিল অফিস। দোল পূর্ণিমার আনন্দ মুখর দিন। নিজে দোল খেলেনি শুভ। ফ্ল্যাটের ব্যালকনি তে দাঁড়িয়ে উৎসব এ মেতে ওঠা দোলের সে চঞ্চল উন্মাদনা উপভোগ করেছিল। গৃহেও আয়োজনের ত্রুটি ছিলনা। সারাদিন ধরে ছিল ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়ার পর্ব । রাত ১০ টাতে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো শুভ। ঘুমের দেশে বিলীন হতে বেশি দেরি হোলো না।
মোবাইলটা পাশেই রাখা ছিল। হঠাৎ মোবাইলের রিংয়ে ঘুম ভেঙে যায় । হাতবুলিয়ে চশমাটা খুঁজে চোখে পরে নেয় সে। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে 'অলোকে' র ফোন। রাত তখন ১১.৩০। অলোক শুভর অফিসের স্টাফ।
একটু অবাক হয় শুভ, সঙ্গে আশঙ্কাও। এতো রাত্রে ফোন! ফোন টা রিসিভ করে,
' হ্যাঁ অলোক বলো, এতো রাতে ফোন করছো, সব ঠিক আছেতো?' প্রশ্ন করে শুভ।
' স্যার, একটা খুব খারাপ খবর আছে' অলোকের ফ্যাকাসে গলায় উত্তর আসে। শক্ত হয়ে বসে শুভ।
' কি হয়েছে ? তুমি এতো ঘাবড়ে আছো কেন?'
' স্যার, 'চন্দ্রমনি' মারা গেছে' অলোকের উত্তর আসে। চন্দ্রমনি শুভর আর একজন স্টাফ।
অলোকের কথা শুনে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল সারা শরীরে । স্তব্ধ হয়ে গেল সবকিছু এক মুহূর্তের জন্যে। কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলোনা। অলোকের কথাগুলো আত্মীকরণ করার চেষ্টা করছিলো সে।
' স্যার' অপর প্রান্তে অলোকের কথা শুনে সম্বিৎ ফিরে পায়।
' কি হয়েছিল? কি করে হলো? কখন হলো? তুমি নিজে দেখে এসেছো?' এক নিঃশ্বাসে এতগুলো প্রশ্ন করে শুভ। ঘটনার সত্যতা নিয়ে এখনো সন্দিহান। মনে মনে প্রার্থনা করলো, এটা যেন মিথ্যে হয়।
' স্যার, আজ রাত ৯ টার সময়ের ঘটনা । আমি নিজে দেখিনি তবে ফোন এসেছিলো আমার কাছে। শুনেছি, বমি করতে করতে পড়ে যায়। ‘হেডগাওয়ার হাসপাতাল’ নিয়ে গেলে মৃত বলে ঘোষণা করে। ' অলোক সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়।
' অনুপ হাসপাতালের কাছে থাকে, অনুপ দেখে এসেছে' সংযোজন করে অলোক।
' কি হয়েছিল সঠিক জানো?' শুভ প্রশ্ন করে।
' না স্যার ,সম্পূর্ণ জানিনা। এটুকু শুনেছি , দিনে একটু ড্রিঙ্ক করেছিলো। খাওয়াদাওয়া একটু বেশি করেছিলো। সন্ধ্যেবেলা স্বপ্নিল এর সাথে অনেক্ষন কথা বলেছে। তারপর উপরে নিজের ঘরে চলে যায়। গা বমি করে। ওয়াশরুম এ খানিকটা বমি ও করে। গলায় কিছু আটকে যায়। কিছু বলার চেষ্টা করে, বলতে পারেনি। স্ত্রী ধরে বসাতে চেষ্টা করে, আচমকা পড়ে যায় মেঝেতে। পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। কিন্তু ১ মিনিটেই সব শেষ হয়ে যায় । '
চুপ করে শুনছিলো শুভ। জীবন এতো ভঙ্গুর। কাল বিকেলে যে মানুষটার সাথে হাসি মুখে কথা বলেছিলো, এখন সে আর বেঁচে নেই। দু মিনিট আগেও যে বন্ধুর সাথে গল্প করছিলো, দু মিনিট পরে তাকে এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয় ! মাত্র ৩৫ বছর বয়সে।
' অনূপের নম্বরটা আমাকে পাঠিয়ে দাও। আজ রাত এ কাউকে ফোন করার দরকার নেই , কাল কথা বলবো। তুমি শুয়ে যাও।' শুভ ফোন টা রেখে দেয়।
ঘটনার আকস্মিতায় সব কেমন এলোমেলো লাগছিলো। অনুপের নম্বর এলো। অনুপকে ফোন করলো শুভ।
' অনুপ বলছো ? আমি পল স্যার বলছি।'
' হ্যাঁ স্যার বলুন, আমি অনুপ বলছি। '
' তুমি নিজে হাসপাতাল এ গিয়েছিলে ? স্বচক্ষে দেখে এসেছো চন্দ্রমনিকে?' মনের মধ্যে কোথায় একটু ক্ষীণ আশা ছিল, যদি খবরটা মিথ্যে হয়। "
' হ্যাঁ স্যার, আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি। সারা শরীরে কাপড় ঢাকা দিয়ে একটা ট্রেচার এ রাখা ছিল বডি। একটু পরে পোস্টমর্টেম এর জন্য পাঠাবে।'
' আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি শুয়ে পড়ো।' ফোন টা রেখে দেয় শুভ। খবরের সত্যতা নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। প্রত্যক্ষদর্শীর মুখ থেকে শোনা কথা।
রাত তখন ১২ টা। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো শুভ। কি করবে বুঝে উঠতে পারছিলোনা। অনেকটা জল পান করল সে। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে ঘরের মেঝেতে পায়চারি করল। দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন। দরজাটা খুলে ব্যালকনি তে এসে দাঁড়াল। চারিদিক নিস্তব্ধ। এখনো রং, আবির ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নিচে। বসন্তের হিমেল বাতাস শীতল করে দিচ্ছে সারা শরীর। পূর্ণিমার রুপালি আলোর চাদর বিছিয়ে দিয়েছে সামনের গাছগুলোর মাথার উপর। কোনো এক রাত জাগা পাখি মন্থর গতিতে উড়ে গেল দূরে। প্রকৃতির মায়াময় রূপ কিছুটা হলেও যেন স্বস্তি দিলো শুভকে। দুঃখ , বিচ্ছেদ, বিষণ্ণতা সব যেন এক নিমেষে স্তিমিত হয়ে গেলো।
' স্যার আপনার চা ' শুনেই চিন্তার তার ছিন্ন হল। ভুলেই গেছিলো সে অফিস এ বসে আছে।
' হ্যাঁ দাও, খুব দরকার ছিল এখন। থ্যাংক ইউ ' হাত বাড়িয়ে চা টা নিলো শুভ অফিস বয়ের থেকে।
পরপর দু বার গরম চায়ে চুমুক দিতে শরীর, মন যেন একটু চাঙ্গা হয়ে উঠলো। মন কে বোঝাতে লাগলো, এবার কাজ শুরু করতেই হবে। দেড় ঘন্টা হয়ে গেল অফিস আসা, এখনো কাজ শুরু করতে পারেনি। অনেক কাজ পেন্ডিং পড়ে আছে । বিকেলে 'সি এফ ও' স্যার কে একটা রিপোর্ট দিতে হবে ,
ল্যান্ডলাইন টা বেজে উঠলো। নম্বর টা দেখলো শুভ। রিসেপ্শন থেকে। রিসিভ করলো।
' হ্যালো'
' শুভাশিস স্যার বলছেন ?'
' হ্যাঁ বলছি '
' স্যার , চন্দ্রমনির বাবা এসেছেন , আপনার সাথে দেখা করতে চান।'
' পাঠিয়ে দিন, সেকেন্ড ফ্লোর, ডি ব্লক।'
চায়ের কাপ টা রেখে দ্রুত এগিয়ে গেল লিফ্ট এর দিকে। খবরটা ডিপার্টমেন্ট এর বাকি সবার কাছে পৌঁছলো। লিফ্ট এর দরজাটা খুলে গেল। ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন চন্দ্রমনির বাবা। মুখে একটা স্মিত হাসির রেখা ফোটানোর অবান্তর চেষ্টা।
'আসুন আমার সঙ্গে ' পথ দেখিয়ে কাছের সভাঘরে নিয়ে গেল শুভ। বাকিরাও এসে পৌঁচেছে ততক্ষনে।
একটা চেয়ার দেখিয়ে শুভ বললো ' বসুন'।
ভদ্রলোক বসলেন, সামনের চেয়ার এ বসলো শুভ। বাকিরা অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকলো আশেপাসে ।
সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন উনি। গলার থেকে স্বর বের হলো না।
'জাল খান'। জালের বোতল টা এগিয়ে দিলো শুভ। ঢাকনা খুলে বেশ খানিকটা জাল পান করলেন উনি। বোতলটা টেবিলের উপর রেখে শুন্য দৃষ্টি তে তাকালো শুভর দিকে। কেউ কথা বলতে পারছে না। কি দিয়ে কথা শুরু করবে বুঝে উঠতে পারছেনা কেউ । এক সদ্য সন্তানহারা পিতা আর অনেকটা শুন্যতা চারিপাশে।
মাথা নিচু করে নিলেন উনি। শুভ ও বাকরুদ্ধ।
কথা শুরু করলো শুভ ' কাল কখন কাজ মিটলো? কখন বাড়ি ফিরলেন?'
ভদ্রলোক ও যেন কথা খুঁজে পেলেন শুরু করার মতো ' সব শেষ করে বাড়ি ফিরেছি রাত ৯ টার পর। আমার ছেলেটা চলে গেল এভাবে ' বলেই আবার ফুঁপিয়ে উঠলেন উনি। রুমাল দিয়ে মুখ ঢাকলেন।
কালকের ঘটনা আবার শুভর মনকে আছন্ন করে দিলো।
রাতটা প্রায় না ঘুমিয়েই কাটিয়েছিলো শুভ। ব্যালকনি থেকে ফিরে বিছানায় শুয়ে যতবার চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করেছে , চোখের সামনে চন্দ্রমনির মুখটা ভেসে উঠছিল। আগের দিন চন্দ্রমনির সাথে শেষ দেখা অফিসের পর গাড়িতে উঠার সময়। অফিস এ একপ্রস্থ আবির খেলার পর একেএকে সবাই বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছিল। তখন সময় প্রায় বিকেল ৪ টা।
শুভ ও সবাইকে 'হ্যাপি হোলি' জানিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে পার্কিং এ এসে দাঁড়িয়েছে। পেছন থেকে চন্দ্রমনির গলা
' স্যার, আপনি মোবাইলটা ফেলে এসেছেন।'
মনে পড়লো আবির মোছার সময় মোবাইল টা টেবিলের শেষ প্রান্তে রেখেছিলো রং থেকে বাঁচাতে। আনতে ভুলে গেছিলো শুভ।
' থ্যাংক ইউ ভাই, হোলির শুভেচ্ছা রইলো , এনজয় ইওর ডে।' এই শেষ কথা, শেষবারের মতো দেখা। পরের দিন রাত এ দুঃসংবাদ।
চন্দ্রমনিকে ‘হেডগাওয়ার হাসপাতাল’ থেকে অন্য একটি সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেছিল পোস্টমর্টেম করার জন্য। সকাল হতেই ডিপার্টমেন্টর বাকি সবাইকে মেসেজ পাঠালো শুভ। 'সি এফ ও' স্যার কেও জানানো হলো। একপ্রস্থ কথা হলে ফোনে। সবার কাছেই এক অপ্রত্যাশিত দুঃসংবাদ।
হাসপাতালের ঠিকানা জেনে নিয়ে রওনা হলো সেই উদেশ্যে। আরো ক’জনকে হাসপাতাল এ পৌঁছতে বললো। পৌঁছে দেখলো অ্যাডমিনিস্ট্রেশন তরফ থেকে দুজন কে পাঠিয়েছে হাসপাতালে ব্যাবস্থাপনা তদ্বির করবার জন্য।
চন্দ্রমনির বাবা মা থাকেন অসম এ , দিল্লিতে নিজের ও ভাই এর পরিবার নিয়ে একসাথে থাকতো চন্দ্রমনি। স্ত্রী এবং দু বছরের দুটি যমজ কন্যা সন্তান রয়েছে চন্দ্রমনির। হাসপাতালে চন্দ্রমনির ভাই র সাথে আলাপ হলো , বাবা-মা কে কাল রাতেই খবর দেয়া হয়েছিল। ওনারা সকালেই ফ্লাইটে রওনা দিয়ে দিয়েছেন। ১০টা নাগাদ দিল্লিতে এসে পৌঁছবেন।
তখনও পোস্টমর্টেম হয়নি। কোনো এক কাগজের জন্য আটকে আছে যেটা লোকাল থানার পুলিশ অফিসার জমা করবেন। খানিকটা তদ্বির করে কাজটা ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করলো শুভ। সবাই অপেক্ষা করছিলো হাসপাতালে। সবার মন ভারাক্রান্ত। ঘুম আর ক্লান্তিতে শরীর অবসন্ন হয়ে আসছিলো। । হাসপাতালে রোগী আর তার আত্মীয়দের ব্যাস্ততা, ছোটাছুটি, কলরব সবকিছুকে ছাপিয়ে মনে পড়ছিলো সেই প্রথম পরিচয়ের দিনটা।
একটা গাছতলার বেঞ্চে বসলো শুভ। চোখ বন্ধ করে একটা জোরে নিঃস্বাস নিলো।
বেশিদিন আসেনি শুভ দিল্লিতে। বছর দেড়েক আগে মুম্বাই থেকে ট্রান্সফার হয়ে এসেছে। 'কন্ট্রাক্ট পেমেন্ট' সেকশন এর ইনচার্জ সে। মোট ৮ জন রয়েছে এই ডিপার্টমেন্টে। চন্দ্রমনি ছিল রেকর্ডকিপার। প্রথমদিন পরিচয় পর্ব থেকেই বেশ ভালো লেগেছিলো চন্দ্রমনিকে। হাসিখুশি স্বভাবের এবং অত্যন্ত পজিটিভ মাইন্ডের ছেলে ।
নিজের পরিচয় জানানোর পর শুভ কে বলেছিলো ' স্যার, আমিতো অফিসের রেকর্ডকিপার , কিন্তু এর বাইরেও যখন যা কিছু লাগবে, যেকোনো সময়, দিনে-রাতে আমায় বলবেন, আমি সদা
হাজির । আপনি তো দিল্লী তে নতুন। কিছু চিন্তা করবেন না। '
' তোমার বাড়ি কোথায় ?'
' স্যার, আমার অরিজিনাল বাড়ি আসামে , গৌহাটি শহর থেকে একটু দূরে । '
শুভর বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে। সে জানে উত্তর পূর্ব ভারতের মানুষজন সহজ সরল ও পরোপকারী হয়।
' দিল্লীতে কতদিন আছো ? শুভ জিগ্যেস করলো।
' স্যার , অনেক বছর হয়ে গেল ' হাসি মুখে উত্তর দিয়েছিলো চন্দ্রমনি।
পরবর্তী কালে শুভ বুঝেছিলো চন্দ্রমনির 'সদা হাজির' কথাটা শুধু কথার কথা ছিলোনা। সকল সময় সবার জন্য সে সত্যি সদা হাজির থাকতো, শুভ শুধু তার বস বলে নয়। 'সি এফ ও' স্যার ও অত্যন্ত স্নেহের সাথে দেখতেন চন্দ্রমনিকে। কিছু মানুষ থাকে যারা সহজেই অন্যদের মন জয় করে নিতে পারে তার সরলতার মাধ্যমে। চন্দ্রমনি ছিল সেই ধাতের মানুষ। এতো বছর শহরে থেকেও নিজের সরলতা, স্নিগ্ধতা বিসর্জন দেয়নি। অফিসের কোনো কাজের জন্য কোনোদিন তাগাদা দিতে হয়নি। ঠিক জানতো কোন কাজটা কখন করে নিতে হবে। কোনোদিন সময়ের হিসেবে করেনি।
চোখ ভিজে এলো শুভর। এরকম একটা মানুষ কে কেন যে ভগবান এতো তাড়াতাড়ি নিজের কাছে ডেকে নিলেন ! দু দুটো এতো ছোট বাচ্চা রয়েছে, স্ত্রী কি করবে এখন। সবকিছু ফেলে কোন সে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছে সে।
কেউ গায়ে হাত দিয়ে ডাকছে, চিন্তা ছিন্ন হল। চমক ভেঙে মুখ তুলে তাকালো শুভ
' স্যার, চন্দ্রমনির বাবা-মা এসে গেছেন।' কেউ বললো তাকে । ঘড়ি দেখলো শুভ। সকাল ১০.৪০,
দ্রুত পায়ে হাসপাতলের গেটের দিকে এগুলো সবাই।
মহিলা কন্ঠের কান্নার শব্দ ভেসে এলো কানে। চন্দ্রমনির মা । উথাল পাতাল সেই কান্না সবার চোখ ভিজিয়ে দিলো। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে চলেছে শুভ। সন্তানহারা মায়ের আকুল আর্তি ' ফিরিয়ে দাও আমার ছেলেটাকে' আকাশে বাতাসে মর্মরিত হয়ে বিলীন হয়ে গেল মহাশুন্যে । এ তোমার কেমন লীলা বুঝিনা। এটা কার শাস্তি। মায়ের নাকি সন্তানের। ভীষণ জটিল মনস্তত্ব।
ভাবনার ঘোর কাটতে না কাটতেই আর এক অপার বিস্ময় অপেক্ষা করছিলো শুভর জন্য । নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলোনা। ভূত দেখছেনাতো ? এও সম্ভব ! এতো মিল সম্ভব ? কল্পনার ও অতীত। চন্দ্রমনি বাবা সামনে এসে দাঁড়ালো। বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শুভ। শুধু চুলগুলো সাদা না হলে চন্দ্রমনির সাথে আলাদা করা যেত না কিছুতেই। সেই মুখ, চোখ, গায়ের রং, হাঁটা, তাকানো সবকিছু হুবহু এক।
সঙ্গে নিয়ে এসে বসালো এক বেঞ্চে। মা ও বোনকে গাড়ি করে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। চন্দ্রমনির কাকু ও এসেছিলেন , উনি থেকে গেলেন হাসপাতালে।
খানিকটা জল খেয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন উনি। কিযে সান্তনা দেবে বুঝে উঠতে পারছেনা শুভ। কোনো শব্দই যথেষ্ট নয় । তাই ওনার হাত চেপে বসে রইলো শুভ। একটা অনুচ্চারিত আশ্বাস , আমরা আছি সাথে , আপনি একা নন।
এর মধ্যে সমস্ত কাগজ এসে পৌঁছে গেছিলো হাসপাতালে। পোস্টমর্টেম জন্য 'বডি' রেডি করা হয়েছে।
' একবার আমি দেখতে চাই , আমাকে একবার দেখানোর ব্যবস্থা করে দিন' কেঁদে উঠলেন চন্দ্রমনির বাবা। পুলিশ অফিসের এর সাথে কথা বলে সে ব্যবস্থাও করা হলো।
শুভ সঙ্গে করে নিয়ে গেল। দুটো বডি রাখা ছিল লাশকাটা ঘরের মেঝের উপর। নাম বলতে একজন আমাদের নিয়ে গেল কাছে। শুভ শক্ত করে ধরে আছে চন্দ্রমনির বাবাকে। মুখের থেকে সাদা কাপড়ের আবরণ টা সরিয়ে দিল। বললো ' দেখে নিন'।
উন্মোচিত মুখমন্ডলে তখনও রঙের দাগ মেটেনি। যেন চুপটি করে ঘুমিয়ে আছে। অদ্ভূৎ এক প্রশান্তি চোখ মুখ জুড়ে। না জানলে বোঝার উপায় নেই যে চন্দ্রমনির দেহে প্রাণ নেই। সকলের ধরা ছোঁয়ার বাইরে অন্য কোনো প্রশান্তির দেশে এ পাড়ি দিয়েছে তার আত্মা। পার্থিব শরীরটা পড়ে আছে। আগুনে বিলীন হবার জন্য।
প্রথম অনুভূতির ঘোরটা কাটতেই , ডুকরে কেঁদে উঠলেন উনি। শুভ জড়িয়ে ধরলেন ওনাকে। ধীরে ধীরে সাদা কাপড়টা আবার ঢেকে দিলো চন্দ্রমনির অপার্থিব শরীরটাক।
লাশকাটা ঘরে থেকে ওনাকে বেরকরে এনে একটা বেঞ্চে বসালো শুভ। জল দিয়ে চোখ মুখ ধুইয়ে দিলো। বললো ' শান্ত হন , সত্যিটাকে আমাদের মানতে হবে। ভগবানের বিধান আমরা কেউ খন্ডাতে পারব না। '
কাঁদতে কাঁদতে উনি বললেন ' ছেলেটা রং খেলতে খেলতে চলে গেল। আমার তো আগে যাবার কথা ছিলো। লাইন ব্রেক করে আগে চলে গেল , আমাকে একরাশ দুঃখ, বেদনা উপহার দিয়ে।
আমিতো কোনো দিন কারো ক্ষতি করিনি , তাহলে আমাকে কেন এতো শাস্তি দিচ্ছেন ভগবান।'
কোনোমতে নিজেকে সামলে ছিল শুভ। সত্যিই তো ভগবানর লীলা অদ্ভুৎ। কাকে কিভাবে শাস্তি দেন তা বোঝার উপায় নেই। আর এই পৃথিবীতে কার কতদিন আয়ু সেটা নিজে কেউ জানেনা। সবার যাবার দিন ঠিক করা আছে, সময় এলেই সব মায়া, মমতার , বাঁধন ছিন্ন করে চলে যেতে হবে। কারো আহ্বানে থেমে থাকা যাবে না।
শুভ মনে মনে ভেবেছিলো পৃথিবীতে যেমন ভালো মানুষ, মন্দ মানুষ, সজ্জন, দুর্জন , ভন্ড , কপট, সাধু সব ধরণের মানুষ ই মানব ধারার ভারসাম্য বজায় রাখে, হয়তো তেমনি মৃত্যুর পরের জগতেও সব ধরণের আত্মার প্রয়োজন আছে। চন্দ্রমনির মতো ভালো মানুষকেই ভগবানের বেশি প্রয়োজন, আমাদের থেকেও। তাই তিনি ওনাকে নিজের কাছে ডেকে নিয়েছেন, নিজের প্রয়োজনে।
'শুভাশিস বাবু ' চন্দ্রমনির বাবার গলার আওয়াজ। চিন্তার ঘোর কাটলো শুভর।
' হ্যাঁ বলুন, একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম। ' লজ্জিত মুখে বললো শুভ।
' আমার ছেলেটা চলে গেল , আপনাদের সকলের কথা খুব বলতো , অনেক খুশি ছিল আপনাদের সাথে কাজ করে। কিকরে যে এরকম হয়ে গেল ' মুখ নিছু করলেন উনি।
' চন্দ্রমনি কে আমাদের টীম এ পেয়ে আমরাও গর্বিত। এমন একজন নিঃস্বার্থপর , পরোপকারী , নির্লোভ মানুষ আমার জীবনে খুব কম দেখেছি। ভগবানের এক ব্যাতিক্রমী সৃষ্টি। আমাদের জন্যও এটা ভীষণ ভীষণ ক্ষতি, যা কোনোদিন পূরণ হবার নয়।' শুভ সান্তনা দিলো।
একটু চা বিস্কুট আনিয়েছিল। শুভ ওনাকে চা খাবার জন্য অনুরধ করলো। একটু চা মুখে তুললেন। দৃষ্টিহীন চোখ আমাদের সকলের দিকে ঘুরে ঘুরে তাকালেন। মনে হলে উনি কাউকে খুঁজছেন আমাদের মধ্যে।
প্রসঙ্গ একটু চেঞ্জ করলো শুভ। বললো ' আপনি চিন্তা করবেন না , কোম্পানির তরফ থেকে আমরা যথা সাধ্য চেষ্টা করবো সমস্ত বীমার টাকা উদ্ধার করে আপনার বৌমার হাতে তুলে দিতে, আপনার নাতনিদের যাতে কোনো অসুবিধা না হয়। আমার দেখছি আর কিছু করতে পারি কিনা।'
' আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ' হাত জড়ো করে বললেন উনি। ' আমি তাহলে এবার উঠি। আপনাদের ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। ভালো থাকবেন। ক্রিয়া কর্মে আপনাদের আসতে হবে সবাইকে। আমি নিমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়ে দেব।'
উনার হাতদুটি ধরে শুভ বললো ' চন্দ্রমনিকে আমরা ফেরাতে পারবোনা। কিন্তু কখনো কিছু প্রয়োজন হলে বলবেন , আমরা সবসময় পাশে থাকবো ' শুভ আশ্বস্ত করলো।
উনি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। সবাই অনুরোধ করলো লাঞ্চ করে যেতে। উনি শুনলেন না। বললেন ' বাড়িতে রান্না হচ্ছে, গিয়ে খাবো '
শুভ আর জোর করেনি। বুঝতে পারছে, বাড়ির সবাই কে ছেড়ে খেতে চাইছিলেন না।
শুভ জিজ্ঞেস করলো ' ক্রিয়া কর্ম কি অসম এ করবেন না দিল্লিতে।'
' অসম এ করব। যতই হোক বাপের ভিটে। টিকিট চেষ্টা করছি, পেয়ে গেলেই চলে যাবো। নমস্কার সবাইকে। ' বলেই উঠে হাঁটতে শুরু করলেন।
সবাই অফিসের গেট অব্দি এগিয়ে দিতে গেল। গেটের বাইরে থেকে একটা অটোরিকশা তে বসে হাত নেড়ে চলে গেলেন। যতদূর দেখা যায় চেয়ে দেখলো শুভ। দূরের মোড়ের আড়ালে অটোটা অদৃশ্য হতেই , কেমন যেন সব আবার শুন্য মনে হতে লাগল। কাল বিকেলে এমনি করেই আমাদের বিদায় দিয়েছিলেন উনি , শ্মশানঘাট থেকে।
মাথাটা ভীষণ ভারী হয়ে আছে। একটা সিগারেট ধরালো শুভ। একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে শুন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকালো। ছায়াছবির মতো কালকের দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
পোস্টমর্টেম হয়ে যাবার পর একটা শববাহী গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছিল লাশকাটা ঘরের কাছে। ততক্ষনে অফিস থেকে আরো অনেক জন এসে পৌঁচেছে সেখানে । সমস্ত ফর্মালিটিসির পর নিথর দেহ গাড়িতে উঠে, রওনা দিলো চন্দ্রমনির বাড়ির উদ্দেশ্যে । পিছু পিছু আমরা সবাই।
দেহ রাখা হলো বাড়ির উঠানে। পাড়া প্রতিবেশীদের গুঞ্জন , হাহুতাশ সবকিছু ছাপিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠলো ওর স্ত্রীর আকুল কান্না। ছোট মেয়ে দুটো কি হয়েছে বুঝতে না পেরে অবাক দৃষ্টিতে ফেলফেলিয়ে দেখছে চারিদিকে।
সেখান থেকে সোজা শ্মশানঘাট। ধীরে ধীরে নিথর দেহ নামিয়ে রাখা হলো চুল্লির পাশে। ফিনান্স ডিপার্মেন্টের প্রায় সবাই তখন উপস্থিত হয়েছে সেখানে। গঙ্গা জল দিয়ে স্নান করানো হলো । পরনে পরানো হলো নতুন বস্ত্র। মালা চন্দনে ভূষিত করে মহা প্রস্থানের পথ প্রসস্থ করা হচ্ছিলো।
শ্মশানের কর্মীরা কাঠের উপর কাঠ সাজিয়ে তৈরী করছে চিতা। চন্দ্রমনিকে শোয়ানো হল চিতার উপর। তার উপর আবার কাঠের আস্তরণ বিছানো হলো। মুখাগ্নি করলেন ওর বাবা। অবিরাম চোখের জলের ধারা নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। জীবনের সব থেকে কষ্টদায়ক মুহূর্ত। যাকে একদিন এই হাত দিয়ে খায়িয়েছিলেন, আঙ্গুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন , সেই হাত দিয়ে তার মুখাগ্নি করে শেষ বিদায় জানাতে হবে।
চিতা প্রজ্জ্বলিত হতেই সেখান থেকে সবাই চলে এলো। রয়ে গেল শুধু চন্দ্রমনির বাবা আর পরিবারের কিছু লোকজন। জ্বলন্ত চিতার সামনে দাঁড়িয়ে কাল শুভদের উনি বিদায় জানিয়েছিলেন, আজ যেমন শুভরা বিদায় জানালো ওনাকে। চিতার আগুন নিভে যায়। মনের মাঝ্যে বেঁচে থাকে সেই লেলিহান শিখা, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক অসহায় বাপ যিনি নিজের সন্তানের অন্তোষ্টি ক্রিয়া করছেন।
সিগারেটটা ফেলে নিজের সিটে এসে বসলো শুভ। মনের মাঝে ভেসে উঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত ' আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে। তবুও শান্তি, তবুও আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।' মনকে বোঝাতে লাগলো, মিলন এবং বিচ্ছেদ দুটোই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুটোই সহজ ভাবে মেনে নিতে হয়। জীবন গতিশীল , থেমে থাকেনা কারো জন্যই।
ল্যাপটপ টা টেনে নিয়ে পাসওয়ার্ড টাইপ করলো শুভ। একেবারে সঠিক। খুলে গেল উইন্ডোস। এবার আবার জীবনে ফেরা, কাজের সূত্র ধরে।
….…………………………………………………………………………সমাপ্ত……………………………………………………………
