Subhash Kar

Inspirational Others


3  

Subhash Kar

Inspirational Others


হেডমাষ্টার মশাইয়ের সেই মহতী দৃষ্টান্ত !

হেডমাষ্টার মশাইয়ের সেই মহতী দৃষ্টান্ত !

5 mins 259 5 mins 259


আমার কৈশোরের গহন স্মৃতির আধার আমার প্রিয় স্কুল ‘উমাকান্ত একাডেমী’, যেখানে আমার ষাটের দশকের বেশীরভাগটা কেটেছে। আজ থেকে প্রায় দেড় শতাব্দী আগে ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আগরতলার এই ঐতিহ্যমণ্ডিত একাডেমী। দেশ স্বাধীন হবার দু’বছর পরে স্বাধীন ত্রিপুরার মহারাণীর উদ্যোগে রাজ্যটি ভারতীয় যুক্তরাজ্যের অঙ্গীভূত হ’লে একসময় এই একাডেমী সরকারী স্কুল হিসেবে অধিগৃহীত হয়। দেশবিদেশের বহু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব এই বিদ্যালয় থেকে বেরিয়েছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তিন তিন বার আমাদের এই বিদ্যালয়ে অতিথি হয়ে পদার্পণ করেছিলেন। অতীতে সময়ে সময়ে যারা এখানে শিক্ষকতা করে গেছেন, জ্ঞানে ও ছাত্রদরদে তাদের জুড়ি মেলা ভার। আর প্রধান শিক্ষকেরা ছিলেন এক একজন উজ্জ্বল দৃষ্টান্তস্থাপনকারী। আজ আমি বিস্তৃত তথ্যাদিতে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি না ঘটিয়ে এই স্কুলের সাথেই জড়িত এক প্রধান শিক্ষকের মহতী আদর্শের একটি দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা তাদের কাছে তুলে ধরতে চাইছি।


কাহিনীটা একাডেমীতে আমাদের পড়ার সময়টার বহু আগের তো বটেই, বস্তুত: আমার জন্মেরও বহু আগের। এই স্কুলের তৃতীয় প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধেয় শীতল চক্রবর্তী মহাশয় যিনি ১৮৯৯ সাল থেকে ১৯২৫ সাল অর্থাৎ একটানা পঁচিশ বছরেরও বেশী সময় সে পদে আসীন ছিলেন। স্বয়ং মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য নাকি উনাকে বহু বাছ-বিচারের পর প্রিয় এই স্কুলটির মাথায় বসিয়েছিলেন। অথচ কর্মজীবনের শেষের দিকে একটা সময় সেই প্রথিতযশা প্রধান শিক্ষক নিজে রাজ্যের পরবর্তী এক মহারাজার কাছেই ইস্তফাপত্র জমা দিয়ে রেহাই পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেন? ঠিক কি ঘটেছিল সেদিন? সেই নিয়েই আজকের কাহিনী। বলে নেয়া দরকার ঘটনাটা ক্লাশে গল্পচ্ছলে বলেছিলেন আমাদের সময়ের একাডেমীর বহুজনশ্রদ্ধেয় এক শিক্ষক, যার প্রয়াত পিতৃদেবও ছিলেন এই একাডেমীরই শিক্ষক এবং শ্রদ্ধেয় শীতল চক্রবর্তীর সহকর্মী।


ঘটনার দিন স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। রাজবাড়ীর কিছু ছেলেও এই স্কুলে পড়ত। এদের মধ্যে তৎকালীন মহারাজার অত্যন্ত ঘনিষ্ট আত্মীয় (পরিচয়গুলি ইচ্ছে করেই নির্দিষ্ট করছি না) একটি ছেলে ছিল অত্যন্ত দুষ্টু প্রকৃতির এবং বেশ উচ্ছৃংখল। প্রায়ই বিভিন্ন শিক্ষকেরা তার ব্যবহারে রুষ্ট হতেন। তবে রাজবাড়ীর ছেলে বলে তেমন কড়াভাবে তাকে শাসন করতে সকলেই কিছুটা ভয় পেতেন। এমনকি পরিণাম ভেবে উনারা সব কথা হেডমাষ্টারমশাইকেও জানাতেন না। 

কিন্তু একদিন বার্ষিক পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ছেলেটি হেডমাষ্টার মশাইয়ের আচমকা ভিজিটের সময় খোদ উনার হাতেই ধরা পড়ে গেল। ব্যস্‌ আর যায় কোথায়। পরীক্ষা হল থেকে বের করে দিয়েই শাস্তির শেষ হল না, বলা হ'ল বাকী পরীক্ষাগুলিতে আর বসা যাবে না, এবং পরের বছরটিতে আবার পুরনো ক্লাশেই পড়তে হবে। তাও চালচলনে ভাল রেকর্ড না পাওয়া গেলে স্কুল থেকে ‘Rusticate’ করে দেয়া হবে। অভিভাবককেও সেদিনই দূত মারফত সেভাবে জানিয়ে দেয়া হল।


এদিকে হয়েছে কি সেদিন সন্ধ্যেবেলা মোসাহেব-পরিবৃত মহারাজ খুশমেজাজে কিঞ্চিতধিক পানের আসরে বসেছিলেন। কোন কারণে সেদিন পানের মাত্রাটা একটু বেশী হয়ে পড়েছিল। এমন সময় এক ধূর্ত মোসাহেব সরল-সহজ মনের মহারাজকে খুশী করবার উদ্দেশ্যে বলে বসল, “মহারাজ, আপ্‌নেরার ইস্কুল ত বুধহয় আর আপ্‌নেরার হাতে রইল না”।

মহারাজ (নেশার ঘোরে)- কি কইতি চাস তুই?


-- না, মানে আপ্‌নেরার ইস্কুল থিক্যা আপ্‌নেরারই বাড়ীর পুলারে বাইর কইরা দিব কইছে। আসলে এই রাজবাড়ীরই পুলা, আম্‌রার অমুক কুমারসাহেব (নামটা উহ্য রইল) বুলে আইজ পরীক্ষাহলে সামান্য একটু কথা কইছিল, তার লাইগ্যা হেরে হল থিক্যা বাইর কইরা দিছে; কইছে বাকী পরীক্ষাডিত বইতেই দিত না; আবার হেইদিকে সব পরীক্ষা শেষ হওনের আগেই বাবুডারে ফেইল কইয়া ঘোষণা অ দিয়া দিছে।


 -- কস্‌ কি তুই, কার এত সাহস?

 -- আর কার? আপ্‌নেরা যারে আইন্যা এত বছর ধইরা স্কুলের মাথাত বওয়াইছেন- ঐ বাওনের পুত (হয়তো ক্ষত্রিয় তেজ উস্কে দিতেই এহেন জাতের উল্লেখ)।

-- আরে তাইন কি জানে না কুন্‌ বাড়ীর পুলার লগে কি করতাছে? 

-- জাননের ত কথা, কিন্তু মন্‌ডা কয় স্মরণ নাই। নইলে কুমারসাহেবরে বাইর কইরা দিব কয়? আরে মহারাজ তো ইচ্ছা করলে কাইল খুদ হেরেই বাইর কইরা দিতে পারেন।

-- তইলে তুই অখন কি চাইতাছস্‌? তাইনরে একটু সমঝাইয়া আর মনে করাইয়া দিতে লাগে? ইডাই ত?

-- আইজ্ঞা, আমি ত ইডাই কইতে আছ্‌লাম।

-- তইলে আর ইখান বইয়া রইছস ক্যান্‌? যা, ব্যাডারে মহলে আইতে খবর পাডা- অক্ষনই।


মহারাজের জরুরী তলব পেয়ে হেডমাষ্টার মশাই রাজবাড়ীর মহলে এলেন, পূর্ববর্ণিত দুঃসাহসের জন্যে মহারাজের প্রচুর ধমক খেলেন, আর সবশেষে রাজ-আদেশ (মৌখিক) পেলেন- রাজবাড়ীর ছেলেটি যাতে বাকী পরীক্ষাগুলিতে বসতে পারে সেইমত এক্ষুনি উনাকে লিখিত আদেশ রেডি করে রাজার হাতেই জমা দিয়ে যেতে হবে। সাথেসাথেই মোসাহেবটি উনাকে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে কাগজ-কলমের ব্যবস্থা করে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে হেডমাষ্টারের হাতেলেখা কাগজ যখন মহারাজের কাছে আনা হল, ঘুমে ঢুলুঢুলু মহারাজ শোবার ঘরের দিকে যেতে যেতে মোসাহেবকে বললেন, “আইজ বাদ থাক, কাগজ জমা রাখ্‌, কাইল সকালে দেখুম নে”। হেডমাষ্টার মশাই কাগজ জমা করে চলে গেলেন।

পরদিন ভোরে সেই বিশেষ মোসাহেবটি দারুণ উৎসাহ নিয়ে মহারাজার কাছে দু’টো কাগজ জমা দিতে গেলেন। প্রথমটা এগিয়ে দিতেই মহারাজ কাগছ না দেখেই বললেন, “ঠিক আছে, কুনুখানে রাইখ্যা দে”। এরপর দ্বিতীয় কাগজটা ধরাতেই অবাক হলেন। জানতে চাইলেন, “এইডা আবার কি?” 

-- আমি অ ঠিক বুঝতে পারছি না। আগেরটার লগে ইডা অ আমার হাতে দিয়া কইল, মহারাজের হাতে দুইডা কাগজই কিন্তু অবশ্যই দিবেন। ইডা কি তা জিগাইতেই কইল- হিডা মহারাজ ঠিক বুইঝা নিবেন।


মহারাজ বিশেষ কৌতূহল নিয়ে কাগজ দু'টো খুলে পড়ে দেখলেন। প্রথমটা তো মহারাজের আদেশমতো রাজকুমারসাহেবের বাকী পরীক্ষাগুলিতে বসার অনুমতিপত্র; কিন্তু দ্বিতীয়টি ছিল আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগা হেডমাষ্টার মশাইয়ের নিজের ইস্তফাপত্র। তখন মহারাজের গতসন্ধ্যের নেশা পুরোপুরি কেটে গেছে। আগের রাতে ঠিক কি ঘটেছিল মনে করতে চেষ্টা করলেন। নতুন করে আবার সব জানতে চাইলেন। মোসাহেবটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে নিজের বাড়ীর ছেলেটির আসল কাণ্ডকীর্তিও পুরো জেনে গেলেন। মহারাজের জেরার মুখে বদমতলবী লোকটার পক্ষে রাজবাড়ীর ছেলেটির আসল কীর্তিকলাপ মহারাজের কাছ থেকে আড়াল করা আর সম্ভব হল না।


এবার মহারাজ গত রাতে প্রধান শিক্ষক স্যারের সাথে নিজের দুর্ব্যবহারের কথা মনে করে লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন। মোহাসেবটিকে প্রচণ্ডভাবে ধমকে তাকে দিয়ে হেডমাষ্টার মশাইকে আবারো ডেকে পাঠালেন। হেডমাষ্টার মশাই এসে পৌঁছলে মহারাজ বারবার তার কাছে দু:খপ্রকাশ করে বলতে লাগলেন, “আমি ভাবতাম আমার পূর্বপুরুষ খুঁইজ্যা পাইত্যা খালি একজন মহাবিদ্বানরেই বুঝি আম্‌রার এই ইস্কুলডাতে আইন্যা বওয়াইছিল, যার মেনেজমেন্টের কুনু অভিজ্ঞতাই নাই। কিন্তু অখন বুঝতাছি একজন অনেক উঁচামাপের, বড় মনের মানুষ আইয়া এই ইস্কুলের হাল ধরছে। আপ্‌নের সততা আর সাহসী নিষ্পক্ষতা দেইখ্যা আমি সত্যই ধইন্য। আমি কইতাছি, অখন থিক্যা আপ্‌নে যেইভাবে ভাল মনে করবেন হেইভাবেই ইস্কুল চালাইবেন– যতদিন খুশী– যতদিন আপ্‌নের শরীরে দেয়। আর একটা কথা। আমার বাড়ীর হেই স্কাউণ্ড্রেল ছাত্রডারে আইজই ইস্কুল তিক্যা তাড়াইয়া দ্যান্‌”।


হেডমাষ্টার মশাই শান্তভাবে হেসে বললেন, “মহারাজের নিজের কথার কিন্তু মহারাজের হাতেই খেলাপ হইতাছে। ইস্কুলের বিষয়ে আমার সিদ্ধান্তই যদি চূড়ান্ত হয়, তবে আমি ত মনে করতাছি পোলাডারে ইস্কুলে রাইখ্যাই একটা বছর ভাল হওনের সুযোগ দেওন উচিৎ ...”। মহারাজ অবাক হয়ে সংযত, চাপা স্বরে বললেন, “হ, হ, আমার আবারও ভুল হইয়া গেছে। ইস্কুলের সব সিদ্ধান্ত অহন থিক্যা পুরাপুরি আপ্‌নের মতেই হইব। (নিজেকে দেখিয়ে) এই অপরাধী মানুষটার লজ্জা আর নতুন কইরা বাড়তে দিয়েন না”।


ততক্ষণে ইস্তফাপত্রটা মহারাজের সুদৃঢ় আঙুলের বলিষ্ঠ পেষণে ছিন্নভিন্ন হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লে মোসাহেবের ডাক পড়ল নিজের হাতে মেঝেটা সাফাই করে দিতে।



Rate this content
Log in

More bengali story from Subhash Kar

Similar bengali story from Inspirational