অস্তিত্বের গোলকধাঁধা
অস্তিত্বের গোলকধাঁধা
শ্রাবণ: (একটু গলা চড়িয়ে) হরি দা, চার কাপ কড়া করে চা করো তো!
হরি: (ভেতর থেকে উত্তর এল) সাথে কিছু স্ন্যাকস দেবো নাকি দাদাবাবু?
শ্রাবণ: ঘরে যা আছে তাই চটজলদি নিয়ে এসো।
হরি: আচ্ছা দাদাবাবু, আনছি।
এরপর শ্রাবণ এসে ডাইনিং রুমে আমাদের পাশে বসল। প্রায় দীর্ঘ সাত-আট বছর পর আমরা চার বন্ধু আবার এভাবে একসঙ্গে বসলাম। সময়ের স্রোতে কখন যে এতগুলো বছর চোখের নিমেষে হারিয়ে গেল, ভেবেই কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না।
ও হ্যাঁ, বলাই হয়নি—আমরা তিনজন অর্থাৎ আমি, নীল আর সুদীপ্ত এখন একটা কোম্পানিতে চাকরি করি। কিন্তু শ্রাবণ আগাগোড়াই ছিল মেধাবী ছাত্র। ও এখনও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে; আরও স্পষ্টভাবে বললে ও এখন 'প্যারানরমাল সায়েন্স' ও 'প্যারাসাইকোলজি' নিয়ে রিসার্চ করছে।
আমার ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান বা মনোবিজ্ঞানের ওপর তেমন একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্তু শব্দ দুটোর আগে যখন 'প্যারা' (Para) উপসর্গটি জুড়ে গেল, তখন থেকেই আমার কৌতূহল যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে।
মনের ভেতরের সেই কৌতূহল আর চেপে রাখতে না পেরে শেষমেশ শ্রাবণকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম—
আমি: আচ্ছা, তুই যে এই প্যারানরমাল সায়েন্স নিয়ে এত রিসার্চ করছিস, তোর সাথে কি কখনো কোনো 'প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটি' বা অলৌকিক কিছু ঘটেছে?
শ্রাবণ: (মুচকি হেসে) মানে? তুই কি সরাসরি ভূত দেখার কথা জিজ্ঞেস করছিস?
আমি: হ্যাঁ, মানে কখনো ওরকম কিছুর মুখোমুখি হয়েছিস কি না...
আমার কথা শুনে সুদীপ্ত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতেই ও বলল—
সুদীপ্ত: যার বিজ্ঞানবইটা ছারপোকা আর পিঁপড়ে ছাড়া কেউ দেখেনি, সে এখন ভূত দেখবে? বাঃ, বেশ ভালো তো!
ওর কথা শুনে আমরা সবাই হেসে উঠলাম। এর মাঝেই শ্রাবণ হঠাৎ প্রস্তাব দিল, "চল, আমার ল্যাবটা একবার ঘুরে দেখবি?"
নীল প্রথমে কিছুটা অমত করলেও, আমাদের সবার জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত ও না বলতে পারল না। ল্যাবরেটরিটা মাটির নিচে; সরু সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাঁ দিকের ঘরটায়।
কিন্তু ল্যাবরেটরিতে পা রাখতেই এক অদ্ভুত ভারী গুমোট বাতাস আমাদের জাপটে ধরল। ল্যাবের ভেতর আরও একটা ছোট খুপরি ঘর ছিল, যেখান থেকে একটানা কোনো বাচ্চার কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। সেই কান্নায় কোনো ক্লান্তি নেই, আছে শুধু এক গভীর হাহাকার—যা কোনো সাধারণ মানুষের গলার স্বর বলে মনে হচ্ছিল না।
শ্রাবণ সেই শব্দের দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করেই আমাদের নিজের ল্যাবের ভেতরে নিয়ে গেল। ও আমাদের বসতে বলে নিজে একটা সাদা ল্যাব-কোট পরে এল। কিন্তু ওর সাথে ঘরে ঢুকল একটা ছোট বাচ্চা ছেলে। ওর গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে সাদা, আর চোখের মণি দুটো যেন একটু বেশিই বড় আর স্থির। ও একটা অদ্ভুত সুরেলা অথচ যান্ত্রিক গলায় কবিতা আবৃত্তি করতে করতে ঠিক আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো—
বাচ্চা: "খেলবে তুমি আমার সাথে?
নতুন কোনো গল্প শোনার;
নতুন কোনো দেশে যাব—
যাবে? যাবে আমার সাথে?"
ওর গলার স্বরটা ঘরের প্রতিটি কোণ থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। নীল কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল, "তোমার নাম কী?"
বাচ্চাটি একদৃষ্টে নীলের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। ওর ঠোঁটের কোণে একটা অস্বাভাবিক চওড়া হাসি ফুটে উঠল। ফিসফিস করে ও বলল—
বাচ্চা: "আমার নাম... আমার নাম সাদা গোলাপ।"
নীল একটু বিরক্ত হয়ে আর নিজের ভয় ঢাকতে বলে উঠল, "ধুর! সাদা গোলাপ আবার কারোর নাম হয় নাকি?"
বাচ্চাটি মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। ওর গলার স্বর এবার পাল্টে গিয়ে আরও গম্ভীর আর তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, "কেন? হয়... হয়তো তুমি সেটা জানো না! কারণ যারা জানত, তারা কেউ আর ফিরে আসেনি।"
বলেই বাচ্চাটা এক ঝটকায় ঘাড় ঘুরিয়ে শ্রাবণের দিকে তাকাল এবং তড়িৎগতিতে ছুটে পাশের অন্ধকার ঘরটায় অদৃশ্য হয়ে গেল। ঘরের তাপমাত্রা যেন হঠাৎ কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল।
আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "শ্রাবণ, এই বাচ্চাটা এখানে কী করছে? আর ওরকম কথা বলছেই বা কেন?"
শ্রাবণ আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। ওর মুখে এক অদ্ভুত কাঠিন্য। ও ধীর পায়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা কালো কাঠের বাক্স খুলল;
আর সেই বাক্সটা খুলতেই কোনো পুরোনো কবরের ভ্যাপসা, পচা গন্ধ আমাদের নাড়িভুঁড়ি উল্টে দেওয়ার উপক্রম করল। শ্রাবণ সেই পচাগলা বাক্সের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত, রক্তশূন্য ফ্যাকাশে সাদা গোলাপ বের করে আনল। ফুলটার পাপড়িগুলো যেন মানুষের চামড়ার মতো নরম আর ভিজে। ওটা ফুলদানিতে সাজিয়ে রেখে শ্রাবণ আমাদের দিকে ফিরল। ওর চোখের মণি দুটো হঠাৎ করেই যেন অনেকটা বড় হয়ে গেছে।
শ্রাবণ: (ঠাণ্ডা গলায়) তোরা কি জানিস, আসলে প্যারানরমাল ঘটনা বা অ্যাক্টিভিটি বলতে কী বোঝায়?
সবাই: (এক অজানা ভয়ে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে রইলাম, শুধু মাথা নাড়লাম—না।)
শ্রাবণ: যে সত্তার কোনো জাগতিক দেহ নেই, বিজ্ঞান যাকে ছুঁতে পারে না... ঠিক যেখানে যুক্তির আলো নিভে গিয়ে জমাট অন্ধকার শুরু হয়, সেখান থেকেই জন্ম নেয় এই অলৌকিক অভিশাপ।
নীল তখন ভয়ে ঘামছিল, কিন্তু নিজের দুর্বলতা ঢাকতে কর্কশ গলায় বলল—
নীল: ভাই, তোর কাছে থিওরি শুনতে আসিনি। ভূত দেখানোর কথা ছিল, দেখাতে পারবি? নাকি সব ভাঁওতা?
শ্রাবণ তখন এক বিকট, অবজ্ঞাসূচক হাসি হাসল। সেই হাসির শব্দ ল্যাবের দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে হাজারটা প্রতিধ্বনিতে আমাদের কানে বিঁধতে লাগল। ওর গলার স্বর এবার একদম বদলে গেছে—গম্ভীর, খসখসে, যেন কোনো জানোয়ার কথা বলছে।
শ্রাবণ: ভূত দেখছিস না মানে? তবে কি চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যমদূতকে চিনতে পারছিস না?
আমি: (কাঁপা কাঁপা গলায়) মানে? কী বলতে চাইছিস তুই?
শ্রাবণ: মানেটা খুব সহজ। ওই যে বাচ্চাটা কবিতা আবৃত্তি করে পাশের ঘরে গেল—ও কোনো জ্যান্ত শরীরের রক্ত-মাংসের মানুষ ছিল না। ওটা ছিল একটা অতৃপ্ত প্রেতাত্মা, যার মৃত্যু হয়েছিল এই ল্যাব তৈরির আগেই!
আমার মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমেল স্রোত বয়ে গেল। আমি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়ালাম।
আমি: এরকম... এরকম অসম্ভব কথা বলিস না শ্রাবণ! ও তো একদম সামনে ছিল...
শ্রাবণ: (এক পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল) ও শুধু সামনে ছিল না, ও তোর খুব কাছে ছিল। এখনো দেখ, ওর হাতের আঙুলের নীল দাগগুলো তোর জামার ওপর স্পষ্ট হয়ে আছে।
আমি নিজের জামার দিকে তাকাতেই দেখলাম—সাদা জামার ওপর ছোট ছোট কয়েকটা কালচে আঙুলের ছাপ, যেখান থেকে আইসিইউ-এর ওষুধের কটু গন্ধের সাথে রক্তের একটা হালকা আঁশটে গন্ধ ভেসে আসছে।
শ্রাবণ মুখ খোলার আগেই হঠাৎ এক বিকট হাড় মড়মড়ানি শব্দে আমাদের বুক কেঁপে উঠল। তাকিয়ে দেখি, সুদীপ্ত কোনো এক অদৃশ্য শক্তির চাপে কুঁকড়ে গিয়ে মেঝের ওপর আছাড় খেয়ে পড়েছে। ওর মুখ দিয়ে নোনতা ফেনার মতো রক্ত বেরিয়ে আসছে, চোখ দুটো উল্টে গিয়ে শুধু সাদা অংশটা দেখা যাচ্ছে।
ওদিকে ল্যাবের ভারী লোহার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে হরি দা। ওর অবয়বটা যেন অন্ধকারে ঝাপসা হয়ে কুয়াশার মতো দুলছে। আর ঠিক ওর পায়ের কাছে বসে আছে সেই ফ্যাকাশে বাচ্চাটা—তার ঠোঁট থেকে চুইয়ে পড়ছে কালচে কোনো তরল।
আমার নজর গেল সুদীপ্তর মাথার কাছে পড়ে থাকা সেই খোলা বাক্সটার দিকে। শ্রাবণ যেখান থেকে 'সাদা গোলাপ' বের করেছিল, সেখানে এখন কোনো ফুল নেই। পাপড়িগুলো গলে গিয়ে কালচে পিচ্ছিল কাদার মতো হয়ে গেছে। সেই কাদার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে দুটো জ্বলজ্বলে কোটরহীন চোখ। আমি নিজের অজান্তেই এগিয়ে গিয়ে ওই পচাগলা স্তূপটা সরিয়ে দিলাম। আমার হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল—বাক্সের ভেতরে কোনো ফুল ছিল না, ছিল ওই বাচ্চাটারই একটা খণ্ডিত দেহ! নীল হয়ে যাওয়া ছোট্ট একটা মৃতদেহ, যার সারা শরীরে কামড়ের গভীর দাগ!
আমার ধমনীতে তখন রক্ত হিম হয়ে আসছে, পাল্স রেট যেন মাথার ভেতর হাতুড়ি পেটাচ্ছে। ঠিক তখনই হরি দা এক অদ্ভুত যান্ত্রিক পায়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ওর গলার স্বর কোনো মানুষের নয়, যেন পাতাল থেকে উঠে আসা কোনো ক্রুদ্ধ আত্মার গর্জন—
হরি দা: (বিজাতীয় গলায়) "দাদাবাবু, দিদিমণি আপনাদের জন্যে চা এনেছি , গোলাপ ওনাদের বিস্কুট দে। বাচ্চাটা আমার কাছে চা নিয়ে এগিয়ে আসতে আমি ১০ পা পিছিয়ে গেলাম । কাঁদতে কাঁদতে শ্রাবণ কে জিজ্ঞাস করলুম ,, এ এ এসব কি হচ্ছে শ্রাবণ , (তারস্বরে চিৎকার) আর এটা এখানেই বা কেনো ?
শ্রাবণের গলার স্বর এখন আর কোনো মানুষের মতো শোনাচ্ছে না; যেন কোনো অতৃপ্ত প্রেতাত্মা ওর ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠছে। ওর চোখের মণি দুটো সম্পূর্ণ সাদা হয়ে গেছে, কোনো মণি নেই!
শ্রাবণ: (বীভৎস হাসতে হাসতে) ভয় পেয়েছিস? সামান্য কয়েকটা পাপড়ি দেখে তোর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল? ওরা এখন যেখানে পচে গলছে, আজ তোকেও ঠিক সেই নরকেই টেনে নিয়ে যাব আমি!
বলেই ও আমার কবজিটা সজোরে খপ করে ধরল। ওর হাতটা বরফের মতো ঠাণ্ডা আর হাড়গুলো যেন চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ও আমায় এক হ্যাঁচকা টানে ল্যাবের পেছনের ওই মরচে ধরা দরজা দিয়ে হিড়হিড় করে টেনে বাইরে নিয়ে এল। বাইরের দৃশ্য দেখে আমার হৃৎপিণ্ড যেন গলায় এসে ঠেকল—সামনে এক বিশাল ধূ ধূ প্রান্তর, যেটাকে খেলার মাঠ বলা যায় না, বরং একটা পরিত্যক্ত গোরস্থান বলাই ভালো। আর সেই মাঠের চারপাশ ঘিরে ফুটে আছে হাজার হাজার রক্তশূন্য সাদা গোলাপ। সেই ফুলগুলো থেকে কোনো সুবাস নয়, বরং মানুষের পচা লাশের এক অসহ্য উটকো গন্ধ ভেসে আসছিল।
আমি উন্মত্তের মতো ছটফট করতে লাগলাম, "হাত ছাড় শ্রাবণ! আমার হাড় ভেঙে যাচ্ছে, ছাড় বলছি! নীল! নীল কোথায় তুই? নীল, ওকে থামা!"
নীলের কোনো সাড়াশব্দ নেই। পুরো এলাকাটা এক মৃত্যুপুরীর মতো নিস্তব্ধ। আমি চিৎকার করে উঠলাম, "নীল! নীল, বাঁচা আমায়!"
শ্রাবণ হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে ঘাড়টা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। ওর মুখ দিয়ে কালচে লালা গড়িয়ে পড়ছে।
শ্রাবণ: (ফিসফিস করে) নীলকে ডেকে লাভ নেই রে। নীল তো এখন নীল হয়ে গেছে! নীলবর্ণ শরীরগুলোর মাঝে ও এখন শান্তিতে ঘুমোচ্ছে। দেখতে চাস?
আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। আমি শুধু ফুঁপিয়ে উঠলাম, "মানে? নীল কোথায় শ্রাবণ? নীল কোথায়?"
শ্রাবণ আমার কোনো কথার উত্তর না দিয়ে আমাকে টেনে নিয়ে গেল মাঠের এক কোণে থাকা একটা পানাভর্তি কুচকুচে কালো জলের দীঘির পাড়ে।
নরকের আসল রূপ যে দেখা তখনও বাকি ছিল, তা আমার এই নিথর মস্তিস্ক ভাবতেও পারেনি। শ্রাবণের হাতের আঙুলগুলো এখন মানুষের হাড়ের মতো শক্ত নয়, যেন লোহার সাঁড়াশি হয়ে আমার কবজিটা পিষে দিচ্ছে। ও আমায় হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে নামাতে লাগল সেই পানাভর্তি কুচকুচে কালো দীঘির জলে। কিন্তু দীঘির পাড়ে পা রাখতেই আমার বুক ফেটে আর্তনাদ বেরিয়ে এল—পুকুরের কালচে জলটা চোখের সামনে টগবগ করে ফুটে উঠে রক্তের মতো টকটকে লাল হয়ে গেল! সেই রক্তের নদী থেকে ভেসে আসছে নাড়িভুঁড়ি পচা এক অসহ্য পৈশাচিক গন্ধ।
শ্রাবণ এক বীভৎস পৈশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ল। ওর চোখের কোটর থেকে এখন জল নয়, ঘন কালচে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। ও এক যান্ত্রিক, খসখসে গলায় সুর করে বলতে লাগল—
শ্রাবণ: "দুজনে মোরা হারিয়ে যাব
লাল নদীর ওই দেশে,
ফুলের বাগান দিয়ে ঘেরা
গন্ধ আসে ভেসে।"
আমি পাগলের মতো ছটফট করতে লাগলাম, "শ্রাবণ! দোহাই তোর, ছেড়ে দে আমায়! আমি তোর বন্ধু... কেন করছিস এমন? নীল কোথায়? সুদীপ্ত কোথায়?"
শ্রাবণ হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে ওর মাথাটা অস্বাভাবিকভাবে মটমট করে পেছন দিকে ঘুরিয়ে আমার মুখের ওপর ঝুঁকে এল। ওর গলার ভেতর থেকে যেন শত শত পোকার নড়াচড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
শ্রাবণ: "ছাড়ব? পাগল হয়েছিস পাপড়ি? তোকে ছেড়ে দিলে এই লাল রক্তের সাগরে তুই যে একা একা পচে যাবি! তার চেয়ে বরং তোকে এই জলের নিচে ওই হাজার হাজার কঙ্কালের সাথে গেঁথে রাখি। হাজার হোক, তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু... তোকে কি আর একা মরতে দিতে পারি?" (বিকট হাসি)
ঠিক তখনই আকাশ চিরে এক রক্তবর্ণের বৃষ্টি নামল। কিন্তু সেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যখন আমার গায়ের ওপর পড়ল, আমি ব্যথায় চিৎকার করে উঠলাম—ওগুলো বৃষ্টির জল নয়, ওগুলো ছিল ফুটন্ত অ্যাসিডের মতো গরম রক্ত!
পাপড়ি: (চরম আতঙ্কে গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে) এ... এ কী হচ্ছে!
শ্রাবণ: (এক পৈশাচিক শান্ত গলায়) ও! তুই ওই সাদা গোলাপগুলোর কথা বলছিস?
পাপড়ি: (চরম আতঙ্কে কুঁকড়ে গিয়ে) হ্যাঁ... ওগুলো সাদা ছিল শ্রাবণ! কিন্তু কেন ওগুলো থেকে টাটকা গরম রক্ত চুইয়ে পড়ছে? কেন ওগুলো মানুষের কাঁচা মাংসের মতো লাল হয়ে যাচ্ছে?
শ্রাবণ: "গোলাপ হেথা ঘুমিয়ে আছে
শত শত পাঁপড়ি,
রক্ত হয়ে ঝড়ে পড়ে
নামলে বৃষ্টি ভারী।"
আমি আমার হাতটা শ্রাবণের হাত থেকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে লাগলাম।
ছুটতে ছুটতে আমি আবার সেই অভিশপ্ত ল্যাবরেটরির ভেতরে ঢুকে পড়লাম। অন্ধকার করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় আমার পা হড়কে গেল। আমি নিজের অজান্তেই ছিটকে পড়লাম সেই খুপরি ঘরটার ভেতরে—যেখান থেকে সেই বাচ্চার হাড়হিম করা কান্নার আওয়াজ আসছিল।
ভেতরে ঢোকামাত্রই ঘরের দরজাটা এক বিকট শব্দে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের রক্তবৃষ্টির শব্দ থেমে গিয়ে এক গভীর, নিথর নিস্তব্ধতা নেমে এল। ঘরের কোণ থেকে ভেসে এল এক ভ্যাপসা পচা লাশের গন্ধ। আমি মেঝেতে হাত রাখতেই অনুভব করলাম—পুরো মেঝেটা ভিজে আর পিচ্ছিল। পকেটের ভাঙা মোবাইলটার আলো জ্বালতেই আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো।
আমার চারপাশের দেয়ালগুলো যেন জ্যান্ত মানুষের চামড়ার মতো কুঁচকে ছোট হয়ে আসছিল। ল্যাবের সেই পচা গুমোট অন্ধকারের ভেতর আমি যা দেখলাম, তা দেখার পর মানুষের মস্তিস্ক ঠিক থাকতে পারে না।
হরি দা আর সেই ফ্যাকাশে শয়তান বাচ্চাটা দুজনে মিলে জং ধরা, রক্তমাখা দা দিয়ে নীলকে কোপাচ্ছে। প্রতিটি কোপে মাংস ছিঁড়ে ছিটকে আসছে আমার মুখে। নীলের পেটটা চিরে ফেলা হয়েছে, আর সেখান থেকে তার নাড়িভুঁড়িগুলো বের করে নিয়ে ওই বাচ্চাটা দড়ির মতো খেলছে। নীলের কাটা মুণ্ডুটা তখনও জ্যান্ত, চোখ দুটো উল্টে গিয়ে যেন আমার দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো করুণা ভিক্ষা করছে।
হরি দা হঠাৎ কোপানো থামিয়ে ঘাড়টা ১৮০ ডিগ্রি মটমট করে ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। আমার সারা মুখে নীলের মগজ লেপ্টে আছে। হরি দা এক বীভৎস পৈশাচিক হাসি হেসে বলল—"Snacks-এর জন্য Nuggets বানাচ্ছি দিদিমণি, খাবেন তো?"
আমি নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোলো না। আমি শুধু ডুকরে কেঁদে উঠলাম— "ছেড়ে দাও আমায়! দোহাই তোমাদের! আমি বাড়ি যেতে চাই... আমাকে আমার চেনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে দাও! ক্ষমা করো আমায়, আমায় ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও, Please, আমি বাড়ি যাব, বাড়ি যাব, ছেড়ে দাও, Please!"
হঠাৎ সব কিছু ঝাপসা হয়ে এল। একটা তীব্র সাদা আলো আমার চোখের ওপর এসে পড়ল। অন্ধকারের সেই পৈশাচিক দৃশ্যগুলো মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। কানে এল একটা যান্ত্রিক স্থির শব্দ।
Doctor: Mrs. Ganguly, Mrs. Ganguly, উঠুন। কিচ্ছু হবে না। আমি তো বলেছি আপনি সুস্থ হলে বাড়ি যেতে পারবেন। এখন দেখুন কে এসেছে।
পাপড়ি: (ভয়ের সাথে) কে? কে এসেছে?
Doctor: আপনার Husband, Mr. Shrabon Ganguly.
পাপড়ি: চিনি না, আমি কাউকে চিনি না, কাউকে না।
শ্রাবণ দেখলো তার স্ত্রী, পাপড়ি হাসপাতালের বিছানায় হাত-পা ছুঁড়ে উন্মত্তের মতো চিৎকার করছিল। ওর গলার স্বর চিরে এক অমানুষিক আর্তনাদ বেরিয়ে আসছিল।
পাপড়ি: (হিস্টেরিয়াগ্রস্তের মতো) দোহাই তোমাদের, আমায় এখান থেকে নিয়ে চলো! ওই লাল নদীটা আমায় গিলে খাচ্ছে! হরি দা আর ওই বাচ্চাটা... ওরা নীলকে এখনো কোপাচ্ছে! আমি বাড়ি যাব! আমায় বাড়ি নিয়ে চলো!
ডাক্তার: (বরফশীতল গলায়) নার্স, আর দেরি করবেন না। মিসেস গাঙ্গুলিকে ইমিডিয়েট একটা হাই-ডোজ ইনজেকশন দিন। ওঁর এই উন্মাদনা থামানো দরকার।
শ্রাবণ: (ধীর গলায়) ডাক্তারবাবু, কী দেখছেন? ওর এই নরকযন্ত্রণা কি কোনোদিন শেষ হবে? কতদিন লাগবে ওকে আবার স্বাভাবিক হতে?
ডাক্তারবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলটার দিকে তাকালেন। ল্যাবের সেই বীভৎস স্মৃতিগুলো যেন ঘরের দেওয়ালে ছায়ার মতো নাচছে।
ডাক্তার: দেখুন মিস্টার গাঙ্গুলি, আপনার স্ত্রীর অবস্থা অত্যন্ত জটিল। ওঁর ভেতরে এক ভয়াবহ 'পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার' বাসা বেঁধেছে। যখন উনি 'ম্যানিক স্টেজ'-এ থাকেন, তখন ওঁর মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত রক্তাক্ত জগত তৈরি করে। সেই হ্যালুসিনেশনের ভেতরে উনি নিজেই ওঁর তৈরি করা চরিত্রগুলোকে পরম তৃপ্তিতে নৃশংসভাবে খুন করেন! আর ঠিক তার পরের মুহূর্তেই ওঁর দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব জেগে ওঠে—এক অসহায় নারী, যে নিজের হাতে করা সেই বীভৎস খুনের দৃশ্যগুলো দেখে ট্রমার শিকার হয়। ও এখন সেই খুনের সাক্ষী হয়ে বাঁচার জন্য ছটফট করছে, অথচ ও নিজেই যে সেই খুনি—সেটা ওঁর মস্তিষ্ক মেনে নিতে পারছে না।
শ্রাবণ একদৃষ্টিতে পাপড়ির নিথর হয়ে আসা শরীরের দিকে তাকিয়ে রইল। ইনজেকশনের প্রভাবে পাপড়ির চোখ দুটো তখন আধবোজা, কিন্তু ও তখনও বিড়বিড় করে বলছে— "সাদা গোলাপ... লাল নদী...।"
শ্রাবণ: ও কি কোনোদিন এই অন্ধকার থেকে ফিরতে পারবে?
হাসপাতালের কেবিনটা মড়াসফেদ আলোর নিচে এক বিভীষিকাময় নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ডাক্তারবাবু চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে শ্রাবণের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।
ডাক্তার: মিস্টার গাঙ্গুলি, একটা জরুরি কথা। নীল বা সুদীপ্ত—এই নামে আপনাদের পরিচিত কোনো বন্ধু কি কখনো ছিল?
শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপ করে জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল—
শ্রাবণ: না ডাক্তারবাবু। এই নামে আমাদের কোনো বন্ধু কোনোকালেই ছিল না। মাসখানেক আগে ও যখন প্যারাসাইকোলজি নিয়ে ওর রিসার্চ শুরু করল, তখন থেকেই ওর অবসেসন বাড়ে। একদিন ও হঠাৎ এসে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা আর প্ল্যানচেট নিয়ে অদ্ভুত সব দাবি করতে শুরু করে। আর ঠিক তারপর থেকেই শুরু হয় ওর সেই বীভৎস 'অডিটরি' আর 'ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন'। ও এমন কিছু শুনতে পায় যা আমাদের কানে পৌঁছায় না, এমন কিছু দেখে যা বাস্তবে নেই।
ডাক্তারবাবু খসখস করে ওঁর ডায়েরিতে কিছু একটা লিখলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন—
ডাক্তার: হুম... বুঝলাম। আমি ওঁর চিন্তাভাবনাগুলো বিশ্লেষণ করে যা দেখলাম, তা অত্যন্ত জটিল। ওঁর অবচেতন মন আপনাকে একজন 'প্যারাসাইকোলজিস্ট' হিসেবে কল্পনা করে নিয়েছে। ওঁর মাথায় এখন কাজ করছে 'Flight of Ideas'। সহজ কথায় বলতে গেলে, ওঁর চিন্তারা ওঁর মস্তিষ্কের ভেতর এক উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ওঁর সেই এলোমেলো ভাবনাগুলোই কখনো 'রক্তবৃষ্টি' হয়ে ঝরছে, কখনো 'সাদা গোলাপ' হয়ে ফুটে উঠছে, আবার কখনো সেই শান্ত দিঘির জল ওঁর চোখে 'লাল নদী' হয়ে যাচ্ছে। নীল বা সুদীপ্ত—যাদের আপনি চিনছেন না—ওরা আসলে ওঁর মস্তিষ্কের তৈরি হ্যালুসিনেশনের একেকটা বলি। ওঁর তৈরি এই চরিত্রগুলো যখন ওঁর কল্পনাতেই মরে যাচ্ছে বা আক্রান্ত হচ্ছে, তখনই ওঁর ট্রমা এক চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
হাসপাতালের সেই করিডোরে শ্রাবণের কান্নায় এক ভারী বিষণ্ণতা নেমে এল। যে মানুষটাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, আজ সেই মানুষটাই তাকে দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছে।
শ্রাবণ: (ভেঙে পড়া গলায়) ও কি কোনোদিন আর সুস্থ হবে না ডাক্তারবাবু? আমি যখনই ওর চোখের সামনে যাচ্ছি, ও এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন আমি ওর পরম শত্রু। ও আমায় চিনতে পারছে না... কেন ও আমায় দেখে এভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছে?
ডাক্তারবাবু শ্রাবণের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। শ্রাবণের চোখের জল দেখে তিনি বুঝতে পারলেন, এই মানুষটা কতটা অসহায়।
ডাক্তার: শান্ত হোন মিস্টার গাঙ্গুলি। আসলে ওঁর মধ্যে Paranoid Schizophrenia বাসা বেঁধেছে। 'প্যারানোয়া'র মূল অর্থই হলো চরম অবিশ্বাস। ওঁর মস্তিষ্ক এখন এমন এক জটিল অবস্থায় আছে যে উনি কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না—এমনকি আপনাকেও না। আপনি ওঁকে কতটা ভালোবাসেন সেটা ওঁর অবচেতন মন জানে, কিন্তু বর্তমান অসুস্থতা ওঁর চোখের ওপর একটা সন্দেহের পর্দা টেনে দিয়েছে। প্লিজ ভেঙে পড়বেন না।
শ্রাবণ দুহাতে মুখ ঢেকে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। তারপর নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল—
শ্রাবণ: ডাক্তারবাবু, ওর অবস্থা যেভাবে খারাপ হচ্ছে, আমার ভয় লাগছে কদিন পর হয়তো ও আর ওষুধ খাওয়ার মতো অবস্থাতেও থাকবে না। ও তো খাওয়া-দাওয়া সব ছেড়ে দিয়েছে। এখন আমরা ঠিক কী করতে পারি? ওকে সুস্থ করার কি আর কোনো পথ নেই?
ডাক্তারবাবু এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালেন।
ডাক্তার: দেখুন মিস্টার গাঙ্গুলি, বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সহজ, কিন্তু নিজের মনের ভেতরে যখন নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়, সেখান থেকে ফিরে আসাটা খুব কঠিন। ওঁর অবস্থা সত্যিই প্রতিদিন অবনতি করছে। তবে আপনার মতো এমন একজন ধৈর্যশীল এবং যত্নশীল জীবনসঙ্গী পাশে থাকলে অনেক অসাধ্যই সাধন করা যায়। আমাদের সাধ্যমতো আমরা সব চেষ্টা করছি। আপনি হাল ছাড়বেন না।
শ্রাবণ জানলার ওপারে দাঁড়িয়ে দেখল, পাপড়ি এখন এক অন্য জগতের বাসিন্দা। ওঁর চোখের মণি দুটো স্থির, যেন কোনো এক অদৃশ্য শিকারকে লক্ষ্য করছে। শ্রাবণকে দেখা মাত্রই পাপড়ির ঠোঁটে এক পৈশাচিক কিন্তু বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। ও দেয়ালে হেলান দিয়ে শূন্যে হাত বাড়িয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল—
(পাপড়ি): "খুঁজে তোমায় পাবে না কেউ,
সবাই সে ভীষণ বোকা,
পিছন ফিরে তাকাবে যেই
সবই হবে ধোকা"…
(অট্টহাসি)
স্নেহা মণ্ডল
