অবুঝ রাতের রহস্য
অবুঝ রাতের রহস্য
সাহেত একটি স্বনামধন্য টেকনোলজিক্যাল কোম্পানির তরুণ সিইও এবং মালিক। ক্ষুরধার বুদ্ধি আর কঠোর পরিশ্রমে সে আজ এই সাফল্যে পৌঁছেছে। আর তার এই পথচলার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো রীতিকা। রীতিকা শুধু সাহেতের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টই নয়, সে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, অর্থাৎ তার গার্লফ্রেন্ড। তাদের এই সম্পর্কের শুরুটা কিন্তু সহজ ছিল না।
তিন বছর আগে রীতিকা যখন এই কোম্পানিতে সাধারণ ইন্টার্ন হিসেবে জয়েন করেছিল, তখন সাহেত ছিল ভীষণ কড়া বস। কিন্তু রীতিকার সততা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা আর যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা দেখে সাহেত আস্তে আস্তে তার প্রেমে পড়ে যায়।
অফিসের কাজের ব্যস্ততা থেকে শুরু করে সাহেতের জীবনের প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ের খেয়াল রাখত রীতিকা। তাদের সম্পর্কটা ছিল যেমন পেশাদার, তেমনই গভীর ভালোবাসায় মোড়ানো।
কাজের ফাঁকে সাহেত যখনই ক্লান্ত হয়ে পড়ত, রীতিকা নিজের হাতে এক কাপ কফি বানিয়ে তার টেবিলে রেখে আলতো করে বলত,
— “একটু জিরিয়ে নাও সিইও সাহেব, বেশি চাপ নিলে শরীর খারাপ করবে।”
আর সাহেত রীতিকার হাতটা ছুঁয়ে বলত,
— “তুমি পাশে থাকলে আমার কোনো ক্লান্তি থাকে না।”
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই কোম্পানির আকাশে মেঘ ঘনিয়ে এল।
কোম্পানির অত্যন্ত গোপনীয় এবং নিজস্ব কিছু বিজনেস ডাটা ও ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যান বাইরে লিক হতে শুরু করল। বাজারে সাহেতের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো সেই গোপন তথ্যের সুযোগ নিয়ে তাদের প্রজেক্টগুলো ছিনিয়ে নিতে লাগল।
বাজারের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী কোম্পানির মালিক, রাজদীপ রায়, সাহেতকে ব্যবসায়িকভাবে শেষ করে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগল।
এমনকি একটা বড় বিজনেস কনফারেন্সে রাজদীপ সবার সামনে সাহেতকে উপহাস করে বলেছিল,
— “সাহেত সাহেব, সিকিউরিটি যদি সামলাতে না পারেন, তবে কোম্পানিটা আমার কাছে বিক্রি করে দিয়ে শান্তিতে ঘুমান!”
সাহেত লজ্জায় ও রাগে কিছু বলতে পারছিল না, কিন্তু রীতিকা তখনই সবার সামনে দাঁড়িয়ে রাজদীপকে কড়া গলায় জবাব দিয়েছিল,
— “মিডিয়া আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের ফাঁকা আওয়াজে আমাদের কোম্পানির ভিত নড়ে না মিস্টার রায়। খুব তাড়াতাড়ি চোর আর তার পেছনে থাকা আসল মাথা—দুটোকেই আমরা আইনের হাতে তুলে দেব, তৈরি থাকুন।”
রীতিকার এই সাহসিকতা দেখে সাহেত মনে মনে তাকে আরও বেশি ভালোবেসে ফেলেছিল।
তবে রাজদীপ রায় এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিল না।
সাহেতের কম্পিউটার থেকে ডাটা লিক হওয়া যখন হঠাৎ কমে গেল, তখন রাজদীপ মরিয়া হয়ে উঠল। সে গোপনে সাহেতের অফিসের একজন কর্মচারীকে মোটা টাকার লোভ দেখিয়ে হাত করল, যাতে সে সরাসরি সাহেতের কেবিন থেকে ফাইল চুরি করতে পারে।
কিন্তু রীতিকা ছিল রাজদীপের চেয়েও এক কদম এগিয়ে। সে আগে থেকেই অফিসের সিসিটিভি আর সিকিউরিটির ওপর কড়া নজর রাখছিল।
রাজদীপের কেনা সেই কর্মচারী যখনই ফাইল চুরি করতে গেল, রীতিকা তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলল।
শুধু তাই নয়, রীতিকা সেই কর্মচারীকে দিয়ে রাজদীপকে একটা জাল ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যান পাঠাল। রাজদীপ সেটাকে আসল ভেবে কোটি কোটি টাকা ইনভেস্ট করে বসল এবং শেষ পর্যন্ত জালিয়াতির অপরাধে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলো।
রাজদীপের নিজের তৈরি ফাঁদেই সে নিজে ধ্বংস হয়ে গেল।
অফিসের পার্সোনাল কেবিনে বসে সাহেত কপালে হাত দিয়ে ভাবছিল। সে রীতিকাকে ডেকে বলল,
— “রীতিকা, এই ডাটাগুলো শুধু আমার পার্সোনাল কম্পিউটারে ছিল। এর পাসওয়ার্ডও অত্যন্ত জটিল। আমার মনে হয় কোনো প্রফেশনাল হ্যাকার আমার কম্পিউটার হ্যাক করেছে।”
রীতিকা সাহেতের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
— “তুমি শান্ত হও সাহেত। আমি আমাদের আইটি টিমকে অলরেডি ইনভেস্টিগেশনে লাগিয়েছি। আমরা খুব দ্রুত সেই হ্যাকারকে খুঁজে বের করব।”
এরপরের দিনগুলো ছিল চরম উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার।
সাহেত তার কম্পিউটারের সিকিউরিটি সিস্টেম আরও কড়া করল। সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্টদের ডেকে পুরো নেটওয়ার্ক চেক করানো হলো।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কোনো হ্যাকিংয়ের প্রমাণ বা ম্যালওয়্যার পাওয়া গেল না।
অথচ, প্রতি রাতে ঠিক একটা নির্দিষ্ট সময়ে সাহেতের কম্পিউটার থেকে ডাটা মেইল হয়ে চলে যাচ্ছিল অন্য জায়গায়।
সন্দেহ এবার অফিসের কর্মচারীদের ওপর গিয়ে পড়ল।
সাহেত অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করল, কিন্তু রাতে অফিসের ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেখা গেল না।
ক্রমশ লোকসান বাড়তে থাকায় সাহেত মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল এবং তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেল।
কিন্তু রীতিকা হাল ছাড়ল না। সে ছায়ার মতো সাহেতের পাশে রইল।
একদিন রাতে রীতিকা সিদ্ধান্ত নিল, সে নিজেই সাহেতের ফ্ল্যাটে থাকবে এবং গভীর রাত পর্যন্ত নজর রাখবে যে আসলে কী ঘটছে।
রাত তখন আনুমানিক দুটো।
সারা বাড়ি নিস্তব্ধ।
হঠাৎ রীতিকা দেখল সাহেত বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে খোলা, যেন সে জেগেও ঘুমিয়ে আছে।
রীতিকা তাকে ডাকতে গেল, কিন্তু কিছু একটা ভেবে থেমে গেল।
সে দেখল সাহেত ধীরে ধীরে হেঁটে তার স্টাডি রুমে গেল। ল্যাপটপটি অন করল এবং খুব স্বাভাবিকভাবে পাসওয়ার্ড টাইপ করে লগ-ইন করল।
এরপর সে নিজেই কোম্পানির কিছু গোপন ফাইল সিলেক্ট করে ড্রাফটে রাখল এবং কিছু ফাইল ডিলিট করে দিল।
রীতিকা পুরো বিষয়টির পেছনে আসল সত্যটা বুঝতে পেরে স্তব্ধ হয়ে গেল!
ভয়ে আর ডরে রীতিকার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। সে নিজের মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরল, যাতে চিৎকার বেরিয়ে না আসে।
সে বুঝতে পারল, আসল চোর বাইরে কেউ নয়—সাহেত নিজেই নিজের শত্রু হয়ে উঠেছে!
ঠিক তখনই সাহেত আচমকা ল্যাপটপ বন্ধ করে রীতিকার দিকে ধেয়ে এল।
রীতিকা ভয়ে জমে গিয়েছিল, কিন্তু সে জানত ঘুমের ঘোরে থাকা মানুষকে হুট করে জাগাতে নেই।
সে খুব আলতো করে সাহেতের হাত ধরল এবং ফিসফিস করে বলল,
— “সাহেত, রাত হয়েছে, এবার বিছানায় চলো।”
অদ্ভুতভাবে, সাহেত কোনো কথা না বলে বাধ্য ছেলের মতো আবার নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
সাহেতের আসলে ‘সোমনাম্বুলিজম’ বা ঘুমের মধ্যে হাঁটার রোগ রয়েছে। দিনের পর দিন কোম্পানির অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তার কারণে তার এই রোগটি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
সে নিজেই ঘুমের ঘোরে অবচেতন মনে এই সব গণ্ডগোল করে ফেলছিল, অথচ সকালে উঠে তার কিছুই মনে থাকত না!
রীতিকা পরদিন সকালে সাহেতকে পুরো ঘটনাটি খুলে বলল এবং রাতে মোবাইলে তুলে রাখা ভিডিওটি দেখাল।
নিজের কাণ্ড দেখে সাহেত নিজেই অবাক ও লজ্জিত হয়ে পড়ল।
সে বুঝতে পারল যে কোনো হ্যাকার নয়, তার নিজের অসুস্থতাই এই সমস্যার মূল কারণ।
সমস্যা যখন জানা গেল, তখন রীতিকা ও সাহেত মিলে দ্রুত এর সমাধানের পথ খুঁজতে শুরু করল।
তবে রীতিকা ওকে ভেঙে পড়তে দিল না। দুজনে মিলে এবার এই সমস্যার সমাধানের জন্য উঠেপড়ে লাগল।
রীতিকা প্রথমেই একজন ভালো ডাক্তার দেখিয়ে সাহেতের চিকিৎসার ব্যবস্থা করল।
আর টেকনিক্যাল গণ্ডগোলটা মেটাতে সে সাহেতের ল্যাপটপে এমন একটা বিশেষ ফেস-লক সিস্টেম চালু করে দিল, যা ঘুমের ঘোরে সাহেতের চোখের মণি আর মুখের ভাব স্বাভাবিক না থাকলে কোনোভাবেই খুলবে না।
এর পাশাপাশি রাতে সাহেতের ঘরের দরজায় একটা অ্যালার্ম লক বসানো হলো, যাতে সে ঘুমের ঘোরে ঘর থেকে বের হতে গেলেই একটা আওয়াজ হয় এবং বাড়ির লোকজন জানতে পারে।
ডাক্তারের ওষুধ, নিয়মমতো চলা আর রীতিকার ভালোবাসায় সাহেত খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠল।
তার ঘুমের মধ্যে হাঁটার রোগটা একবারে বন্ধ হয়ে গেল।
আর ডাটা লিক হওয়া বন্ধ হতেই কোম্পানি আবার চাঙ্গা হয়ে উঠল।
সাহেত তার নতুন প্রজেক্ট বাজারে লঞ্চ করল এবং রাজদীপ রায়ের কোম্পানিকে পেছনে ফেলে এক বিশাল বড় কনট্রাক্ট জিতে নিল।
সমস্ত লোকসান সামলে নিয়ে সাহেতের কোম্পানি আগের চেয়েও অনেক বেশি লাভ করতে শুরু করল।
সব ঝড়ঝাপটা কেটে যাওয়ার পর, একদিন সাহেত রীতিকার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল,
— “তুমি না থাকলে আমি হয়তো নিজেকে আর আমার এই কোম্পানি, দুটোকেই হারিয়ে ফেলতাম।”
রীতিকা হেসে জড়িয়ে ধরে বলল,
— “পাগল নাকি! আমি থাকতে তোমার কিচ্ছু হতে পারে!”
সাহেত তখন পকেট থেকে একটা চকচকে হীরের আংটি বের করে রীতিকার আঙুলে পরিয়ে দিয়ে বলল,
— “তাহলে পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টের চাকরিটা এবার ছেড়ে দাও, সারা জীবনের জন্য আমার ঘরের রানি হয়ে এসো।”
রীতিকা লজ্জায় লাল হয়ে সাহেতের বুকে মাথা রাখল।
এর কিছুদিন পরেই, দুই পরিবারের ধুমধাম আয়োজনে সাহেত আর রীতিকার বিয়ে হয়ে গেল।
বিয়ের মণ্ডপে সাহেতের বন্ধুরা যখন সাহেতকে ক্ষেপিয়ে বলছিল,
— “কী রে সাহেত, বিয়ের পরেও কি রীতিকার তুই বস থাকবি?”
তখন রীতিকা ঘোমটার আড়াল থেকে হেসে বলল,
— “অফিসে ও বস হতে পারে, কিন্তু সংসারে রিমোট কন্ট্রোলটা তো আমার হাতেই থাকবে!”
এই শুনে সবাই হেসে উঠল।
সমস্ত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে, একে অপরের হাত ধরে তারা এক সুখী ও সুন্দর জীবনের দিকে এগিয়ে চলল।
— সমাপ্ত —
