Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো

রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো

10 mins 437 10 mins 437

"আজ শ্রাবনের বাতাস বুকে এ কোন সুরে গায়,

আজ বরষা নামলো সারা আকাশ আমার পায়ে।"


বারান্দার গ্রীলে মাথা ঠেকিয়ে এই গানটাই গুনগুন করছিলো সৌম্য।শ্রাবণ মাস।বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পরে যাচ্ছে।মা চলে গিয়েছে ওকে ছেড়ে আজ ষোলো দিন।বিশ্বাসই হচ্ছেনা।বার বার মনে হচ্ছে মা কি করে এতটা বিশ্বাসঘাতকতা ওর সাথে করতে পারলো।মা যে কথা দিয়েছিল ওকে।ওর পাশে,ওর সাথে আমৃত্যু থাকবে।

অবশ্য.....

কার আমৃত্যু সেটা বলেনি।কত স্মৃতি মাকে নিয়ে।ছোটবেলা থেকে মাকে ঘিরেই ওর জীবন।বাবার সময় কোথায়?বিশাল ব্যবসা।খুব ব্যস্ত।অগাধ সম্পত্তির মাঝে ওর মা আর মায়ের ও।ব্যাস।মনে আছে ছোটবেলা মাকে জড়িয়ে না শুলে, মায়ের শরীরের গন্ধে মুখ না ডুবালে ওর ঘুমই আসতো না।ও মায়ের সব কথা শুনতো।কথা না শুনলে মা যদি আকাশের তারা হয়ে যায়।ও কিছুতেই মাকে তারা হয়ে যেতে দেবেনা।কিছুতেই না।মাকে আটকে,বেঁধে,দুমড়ে মুচড়ে নিজের বুকের ভেতর আটকে রাখবে ও।কিন্তু পারলো কই।মা সেই চলেই গেল।মায়ের তো সব কথা শুনতো ও।সবকথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতো, তাও মা কেন চলে গেল।

নাহ!একবার ও অবাধ্য হয়েছিল বটে।কিন্তু ওই একবারই তারপর আর নয়।অবাধ্য হয়েছিল যখন ওর মনে প্রথম বসন্তের রঙের ছোঁয়া লেগেছিল।যখন ওর জীবনে অরুনিমা এসেছিল।আজ ও মনে পড়ে ওর প্রথম দেখার দিনটা।মফস্বলের বয়েজ স্কুল।ক্লাস টেন অব্দি শুধু ছেলেরা। তারপরে ইলেভেন-টুয়েলভ এ মেয়েদের প্রবেশ হতো স্কুলে।সবাই সেই আশায় বসে থাকতো কবে মাধ্যমিক শেষ হবে আর ওরা ইলেভেনে ভর্তি হবে।কিন্তু কপাল মন্দ।সেই বছরই বেছে বেছে কোনো মেয়ে ভর্তি হলো না কমার্স ডিপার্টমেন্টে।সবার মন খারাপ।স্কুলে যেতেই ইচ্ছে করতোনা।অন্য ডিপার্টমেন্টে অবশ্য অনেক মেয়ে।এলাকায় ভালো স্কুল হিসেবে যথেষ্ট নাম ওদের স্কুলের।তাই ভালো রেজাল্ট করা ছেলে মেয়েরা এসে ওদের স্কুলেই ভর্তি হয়।সাইন্সের মেয়েরা তো এত অহংকারী যে অন্য ডিপার্টমেন্টের ছেলেদের দিকে তাকায়না পর্যন্ত।আর কলা বিভাগের মেয়েরা ওদের গুন্ডা ভাবে।আসলে স্কুলের যেকোনো অনুষ্ঠানে আগে বাড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পরা হোক বা কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ হোক সেটার নেতৃত্ব দেয় কমার্সের ছেলেরাই।উচ্চ মাধ্যমিকে একমাত্র কমার্সেরই চাপ অনেক কম থাকে অন্যান্য বিভাগের তুলনায়।তবে সৌম্যর যদিও সেটা একেবারেই মনে হয় না।যথেষ্ট চাপ আছে কমার্সে।বিশেষ করে বিজনেস ম্যাথ।পুরো সাবজেক্টে বিজনেসের বি ও নেই শুধুই ম্যাথ।বিরক্তিকর।ভেবেছিল অন্তত মাধ্যমিক দিয়ে এই বিশ্রী সাবজেক্টটা থেকে মুক্তি পাবে।কিন্তু তা আর হলো কৈ।এই সাবজেক্টটা ওর পিছু ছাড়বেনা এই জীবনে। ক্লাস ইলেভেন এ হাফইয়ারলিতে ও এই ম্যাথে ডাহা ফেল করেছিল।তাই ওর বাবা ওকে ঘাড় ধরে ম্যাথ কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন।খুব বিরক্তি লেগেছিল প্রথমদিন কোচিংয়ে যেতে।সায়েন্সের ম্যাথ কোচিংয়ে ও একাই কমার্সের স্টুডেন্ট।আবার ওই ট্যাশগুলোর মাঝে ওকে গিয়ে বসতে হবে।কোনো অংক ভুল করলেই নিজেদের মধ্যে মুখ টিপাটিপি করে হাসবে।কারন ওদের কাছে বিজনেস ম্যাথ আবার ম্যাথ নাকি?এগুলো তো জলভাত, ওরা তুড়ি মেরে সলভ করে দিতে পারে।

কিন্তু গিয়েই যখন দেখেছিল অরুনিমাকে,মনটা ভালো হয়েগেছিল।কি মিষ্টি হেসে বলেছিল তোমার নাম কি?কোন স্কুল? আরো কত প্রশ্ন।ওর বকবক একবার শুরু হলে আর শেষই হতে চাইতনা।খুব হাসি খুশি একটা মেয়ে।স্যারের দূর ছাই করে ওকে করানো অংকগুলো নিয়ে যখন ও বুঝতে নাকানি চোবানি খেত তখন ক্লাসের পর স্যারের বাড়ির বাইরে বারান্দায় বসে বসে জলের মত ওকে অংক গুলো শিখিয়ে দিত অরুনিমা।ধীরে কবে যেন অরুনিমার মতোও অংক গুলোও ওর বন্ধু হয়ে উঠলো।অংক বইটাকে এখন আর বাবার মত ভয় করেনা।অরুনিমাকে কেমন যেন আশ্রয় মনে হয়। ঘরের বাইরে ওকে মায়ের মতই আগলে রাখে মেয়েটা।এইভাবে বেশ চলছিল।ক্লাস টুয়েলভের সেদিন কোচিংয়ের শেষ দিন।মার্চ মাস।আর কয়েকদিন পর থেকেই উচ্চমাধ্যমিক শুরু।এখন নিজে নিজে পড়ার সময়।পরদিন আবার দোল।তাই সবাই একটু একটু করে আবীর নিয়ে এসেছিল।আনেনি শুধু সৌম্য।অরুনিমা তার বড় বড় চোখ গুলো মেলে জিজ্ঞেস করেছিল,"তোর রং ভালো লাগেনা সৌম্য?"

সৌম্য শুধু হেসে বলেছিল, "তুই খেল তোর বন্ধুদের সাথে আমি বাড়ি যাই রে।তাড়া আছে।"

ডাগর ডাগর চোখ গুলোতে পদ্ম পাতায় শিশিরকনার মতো টলটলে জল নিয়ে একবার শুধু বলেছিল,"রোজই তো আমরা একসাথে যেতাম। আজ শেষদিনে আমায় ফেলে চলে যাচ্ছিস?"

সৌম্য আর দাঁড়ায়নি।বেরিয়ে গেছিল স্যারের বাড়ি থেকে।সৌম্য বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় আধ ঘন্টা পরে অরুনিমা বেরিয়ে ছিল স্যারের বাড়ি থেকে।মুখে এক ফোটা সাদা অংশ বাকি নেই।রং মেখে ভুত পুরো।বাইরে বেরিয়ে দেখলে সন্ধ্যা হয়ে গেছে।বাঁশ বাগানটা স্পিডে সাইকেল ছাড়িয়ে পেরোতে হবে।সৌম্যটা যে এত স্বার্থপর কে জানতো।ও ভালোমতো জানে এই রাস্তাটা কি ভীষন ভয় পায় অরুনিমা সন্ধ্যেবেলা যেতে, আর ওকে ফেলে ও চলে গেল।সৌম্যর কথা মনে আসতেই মুখটা থমথমে হয়ে গেল অরুনিমার।রাগে দাঁতে দাঁত চেপে জোরে প্যাডেলে চাপ দিয়ে ঢুকে গেল বাঁশ বনে।কিছুদূর যেতেই সাইকেলের চেন গেলো পরে।হে ঈশ্বর অরুনিমা এখন কি করবে?এই বাঁশ বনে,ভর সন্ধ্যেবেলায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে ও সম্পূর্ণ একা।গলা ছেড়ে কাঁদলেও কেউ শুনতে পাবেনা।ভূতেরা যদি ওকে ঘাড় মটকে মেরে ফেলে তবে?কি হবে?মা যে আজ ওর জন্য ক্ষীরের পাটিসাপটা বানিয়ে রাখবে বলেছিল।হে ভগবান ওর আর খাওয়া হলোনা।কি হবে।আচ্ছা ও কি ভুত হয়ে পাটিসাপটাগুলো খেতে পারবে?এসব আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে যখন ও সাইকেলের চেন তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে আর নিরন্তর রামনাম জপ করছে তখনি ও অনুভব করল ওর পিঠে একটা হাতের স্পর্শ।প্রচন্ড ভয় পেয়ে সাইকেল ঠেলে ফেলে দিয়ে, মাটিতে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ে,চোখ বুজে তারস্বরে রাম রাম রাম বলে চেঁচাতে লাগলো।এইভাবে কিছুক্ষন কোনোকিছু না শুনে চেঁচিয়ে যাওয়ার পর চুপ করল কাঁধের ঝাঁকুনিতে।কি হলো কেসটা?ভূত ওর ঘাড় না মটকে ওকে ঝাঁকাচ্ছে কেন?আস্তে আস্তে চোখ খুলে অরুনিমা দেখল সামনে সৌম্য।ওকে দেখে ধড়পড় করে জামার ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ালো অরুনিমা।রেগে গিয়ে বললো,"তুই?তুই তো বাড়ি চলে গেছিলি ।এখানে কি মতলবে।আমায় ভয় দেখাতে তাই না?এত বছর নিঃস্বার্থ ভাবে উপকার করার আজ এই প্রতিদান দিলি?এই তোর বন্ধুত্ব?ছিঃ।"

"হয়েছে তোর?তুই ভুতে ভয় পাবি কিরে?মুখের যা অবস্থা করেছিস তাতে ভূত তোকে দেখলে ভয় পাবে।পেত্নী একটা।এতক্ষন ধরে তোর জন্য অপেক্ষা করতে মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হওয়ার পরিস্থিতি।আর তুই ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছিস।সর দেখি চেনটা তুলে দিই।একটা চেন ও তুলতে পারেনা।ঢেঁড়শ একটা।"সৌম্য আরো জোরে কথাগুলো বলে ওকে সরিয়ে সাইকেলের চেন তুলে দিতে গেল।অরুনিমা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।চেন ঠিক হয়ে গেলে দুজনে মিলে চুপচাপ সাইকেল পাশে নিয়ে হাঁটতে লাগলো।কিছদুর যেতেই সৌম্য সাইকেলটা থামিয়ে দিয়ে বললো,"দাঁড়া।কথা আছে তোর সাথে।"

"কি কথা?"মুখ ফুলিয়ে জিগ্যেস করলো অরুনিমা।

পকেট থেকে হাত বের করে মুঠি খুলে অরুনিমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সৌম্য বললো,"বিয়ে করবি আমাকে?যদি উত্তর হ্যাঁ হয় তবে এই আবীর আমায় লাগিয়ে দে আর উত্তর না হলে কোনো কথা না বলে চুপচাপ যেমন যাচ্ছিলি তেমন চল।"

ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুক্ষন কেমন যেন ভেবলে যায় অরুনিমা।কিন্তু কিছুক্ষন পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,"বিয়ে?এখুনি কিসের।দাঁড়া আগে পড়াশোনা শেষ করি,তারপর নিজের পায়ে দাঁড়াই, তারপর তো বিয়ে।"

"হ্যাঁ কিন্ত নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিয়েটা কিন্ত আমাকেই করবি।"ব্যস্ত হয়ে সৌম্য বললো।

"ততদিন আগে সম্পর্কটা টিকুক।দেখিসনা আশেপাশে কেমন সব মুড়ি-মুরকির মত সম্পর্ক ভাঙছে আবার গড়ছে।আমার বাবা বিশ্বাস নেই।"বড় বড় চোখ গুলো আরো বড় বড় করে বললো অরুনিমা।

এবার সৌম্য বেশ বিরক্ত হয়েই বললো,"আরে টিকলে বিয়ে করবি তো?"

"আচ্ছা বাবা করবো।এখন চল পচাঁদার দোকানের আলুরচপ খাওয়া।"সাইকেলের ওপর উঠে বসে বললো অরুনিমা।

সৌম্য অরুনিমার হাত চেপে বললো ,"তাহলে তোর হ্যাঁ?তাহলে আবীর লাগিয়ে দে আমায়।দেখ শুধু তোর হাতে আবীর মাখবো বলে পুরো মুখ সাদা রেখেছি।"

"আমি এখনো শিওর না বুঝলি।আগে নার্সিং এ চান্স পেয়ে,পাশ করে নার্স হই তারপর তোর উত্তর দেবো।জানিস আমায় বড় হয়ে নার্স হতেই হবে।একজন ভালো ওয়েল ট্রেইনড নার্স।সবাই ভাবে আমি ডাক্তার হবো।কিন্তু আমি নার্সই হবো।একজন ভালো নার্সের সঠিক পরিচর্যা ও সহমর্মিতায় একটা রোগী অনেক বেশি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে।সেটা আমি আমার ঠাকুমাকে দেখে শিখেছি।তাই আমায় নার্স হতেই হবে।"অরুনিমা বিজ্ঞের মত বললো।

"তোর সব ডিসিশনে সবসময় আমায় পাশে পাবি অরু। কিন্তু প্লিজ আমায় তোর সাথে থাকতে দে। "

"আছিস তো। বন্ধু হয়ে সারাজীবন আমরা থাকবো। "

এবার সৌম্য খুব রেগে যায়, বলে ,"শুধু বন্ধু ?আমি বলছি আজীবন একসাথে পাশাপাশি চলার কথা আর তুই শুধু বন্ধু হয়ে থাকার কথা বলছিস?"

অরুনিমা শান্ত মুখে বলে, "বন্ধু হয়ে না থাকলে আজীবন হাতে হাত রেখে চলা যায় বল ?" 

"তার মানে তুই আমায় আবীর মাখাবিনা তাই তো?"রেগে ফর্সা মুখটা লাল টকটকে করে বললো সৌম্য।

"কে বলেছে?এই নে।"বলে এক প্যাকেট আবীর সৌম্যর মাথায় ঢেলে দিয়ে হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়লো অরুনিমা।

হটাৎ আবীর এট্যাকে হকচকিয়ে গিয়ে ভুউউ করে মুখ থেকে থুথু ছেটাতে লাগলো।এই ভাবেই শুরু হয়েছিল ওদের দুষ্টু মিষ্টি প্রেমটা।এরপর স্কুল পাশ করে কলেজ,তারপর দুজন দুজনের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ছুটেছিল।একসময় অক্লান্ত পরিশ্রমে দুজন পৌঁছে যায় দুজনের লক্ষ্যে।প্রতিষ্ঠিত হয়।আর অরুনিমা একদিন কলকাতায় মেডিক্যাল কলেজের নিজের এপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে দেখা করতে যায় সৌম্যর সাথে।সৌম্য অরুনিমার হাতের চিঠিটা পড়েই ওকে আনন্দে জড়িয়ে ধরতে যায়।ঠিক সেই মূহর্তে একমুঠো আবীর সৌম্যর দুই গালে মাখিয়ে দিয়ে অরুনিমা বলে,"ভালোবাসি তোকে।খুব খুব খুব ভালোবাসি।"

সৌম্য আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়।পাগলের মত ছুটে যায় বাড়িতে।মাকে জানাতে হবে।মা নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে।বাড়ি ঢুকে দেখে মা ঠাকুর ঘর ছেড়ে বেরোচ্ছে।আনন্দে মাকে জড়িয়ে ধরে সৌম্য।মা চেঁচিয়ে বলেন,"ওরে ছাড় ছাড়।এই অবেলায় বাইরের কাপড়ে ছুঁয়ে দিলি,এখন আবার স্নান করতে হবে।কি এমন কথা শুনি।"

মা তুমি কি জানো তোমার ছেলে একজনকে ভালোবাসে।তাকে জীবনসঙ্গিনী করতে চায়।"মায়ের কোলে মাথা রেখে বলে সৌম্য।

"সেকিরে?কি জাত,কোথাকার মেয়ে,বাড়িতে কে কে আছে?কোন বংশ?"মা আঁতকে উঠে প্রশ্ন করেছিল সেদিন।সৌম্যর বুকটা হটাৎ কেঁপে উঠলেও নিজের ভালোবাসার ওপর অদম্য বিশ্বাস ছিল।মানিব্যাগ থেকে অরুনিমার ছবিটা বের করে দেখিয়ে বললো,"মা।ও অরুনিমা।অরুনিমা মুখার্জি।আমার খুব ভালো বন্ধু।ও নার্স মেডিকেল কলেজে।আমি ওকেই বিয়ে করতে চাই।"

কপাল কুঁচকে চোখ ছোট ছোট করে গীতা দেবী বললেন,"ওমা কি কালো রে।কয়লার খনি মনে হচ্ছে।চোখ গুলো বেশ।তা বামুন বাড়ির মেয়ে হয়ে এসব অন্যের গু মুত ঘাটা কেন বাপু?এই বাড়ির বউ হতে গেলে কিন্তু ওসব মেথরের চাকরি ছাড়তে হবে।"

"কি বলছো মা।নার্সের কাজ কত বড় মহান কাজ।তাকে তুমি এসব কি বলছো।আর এই প্রফেশনটা ওর কাছে একটা স্বপ্ন মা।আমি নিজে হাতে নিজের ভালোবাসার স্বপ্ন গলা টিপে মারবো।সেটা আমার দ্বারা হবে না মা।"সৌম্যর গলাটা একটু কেঁপে গেল।

"তবে আর কি মায়ের গলাটাই টিপে দাও।তুমিও শান্তি পাও আর আমিও শান্তি পাই।কারন আমি বেঁচে থাকতে হাসপাতালের রুগী ঘাটা কোনো মেয়েকে আমার ঘরের বউ করে তুলতে পারবোনা বাবা।ঘরে গোপাল আছেন।"বলে অদৃশ্য কারোর উদ্দেশ্যে দুইহাত জোড় করে কপালে ঠেকান।

সৌম্য মায়ের জেদ জানে।তাই উঠে পাশের ঘরে যায়।ফোন করে সমস্ত কথা অরুনিমাকে জানায়।অরুনিমা অভয় দিয়ে বললো,"তুই চিন্তা করিসনা আমার ঠাকুরমার তোর মায়ের সাথে কথা বলবে।"

সেইদিনই সন্ধ্যেবেলা অরুনিমার ঠাকুমা করুণা দেবী এলেন সৌম্যদের বাড়ি।একাই এসেছিলেন।সৌম্য ডেকে ঘরে বসিয়ে গেল মাকে ডাকতে।সৌম্যর মা এসে বসলেন সোফায়।এ কথা সে কথার পর যখন অরুনিমার নার্সিং জব নিয়ে কথা উঠলো তখন করুণা দেবী বললেন,"আমিও নার্স ছিলাম।ভীষন নোবেল প্রফেশন এটি।দয়া করে অরুকে এই কাজ ছাড়তে বলবেন না।"

এই কথা শুনে গীতাদেবী চড়াঙ্গ করে লাফিয়ে উঠলেন।বললেন,"হায় হায় আপনিও সেই গুমুত ঘাটা মহিলা।আমার বাড়ি অপবিত্র হয়ে গেল।যান বেরোন আমার বাড়ি থেকে।ইশ কি বিচ্ছিরি ব্যাপার।"

একবার বোঝানোর চেষ্টা করেও কোনো লাভ হলোনা দেখে করুণা দেবী বেরিয়ে গেলেন বাড়ি ছেড়ে।গীতাদেবী বললেন,"সৌম্য একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ ওই মেয়ে এই বাড়ির বউ হয়ে এলে আমি কিন্তু গলায় দড়ি দেব।তুই যদি ঐ মেয়ের সাথে আর কোনোদিন দেখা করিস বা সম্পর্ক রাখিস তো সেইদিনই যেন আমার মৃত্যু হয়।"

সৌম্য হাল্কা হেসে বললো,"চিন্তা নেই মা।তুমি রাজী না হলে আমি এই বিয়ে করবোনা।"

গীতাদেবী যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।বললেন,"সেই ভালো বাবা।আমি তোর জন্য একটা সুন্দর টুকটুকে বউ আনবো।"

সৌম্য যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়লো।তারপর পেছন ঘুরে বললো,"মা এই বাড়িতে কোনোদিন আমার বিয়ের বিষয় নিয়ে কথা হবেনা।আমার দিব্যি রইল তোমায়,এরপর আরেকটা দিন যদি আমার বিয়ে নিয়ে কথা তলো তবে আমার মরা মুখ দেখবে।"সেই প্রথম আর সেই শেষবার অবাধ্য হয়েছিল মায়ের সৌম্য।

এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে।সৌম্য একটা চাকরি নিয়ে শিলিগুড়ি চলে গিয়েছিল।অরুনিমার সাথে আর কোনোদিনই সে সম্পর্ক রাখেনি।শুধু মায়ের অনুমতি নিয়ে শেষ একবার অরুণিমার সাথে দেখা করেছিল সৌম্য। অরুণিমার সেদিন ছুটি ছিল। গাড়ি করে অরুণিমাকে নিয়ে চলে গেল অনেক দূর। কাঁসাই নদীর পারে। তারপর পড়ন্ত বিকেলে নদীর পারে দুজনে পাশাপাশি বসেছিল। অরুণিমার হাত নিজের কোলে টেনে নিয়েছিল সেদিন সৌম্য। পরম নিশ্চিন্তে অরুনিমা মাথা রাখলো সৌম্যর কাঁধে। কিছুক্ষন থেমে বলতে শুরু করলো সৌম্য।


-" অরু মা আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিচ্ছে নারে। আর বোধহয় একসাথে থাকা হলো না আমাদের। "

-"কেন কাকিমা কি বলছেন ?"

-"মা বলছেন তোকে নার্সের চাকরটা ছাড়তে। উনি রোগীদের ঘাটাঘাটি পছন্দ করছিনা। "

-"আমি ছেড়ে দেব সৌম্য চাকরি ? তোর জন্য আমি সব পারি। "

-"আজ বলছিস এই কথা অরু। পরে সারাজীবন এই নিয়ে নিজেকে দোষারোপ করবি। সেই ছোটবেলা থেকে সযত্নে লালিত স্বপ্নের গলা টিপে মারার যে কি কস্ট তা এখন তুই বুঝতে পারছিসনা। পরে পারবি। তখন আমাদের জীবনটা বিষিয়ে উঠবে। এই ভালোবাসা তখন আর থাকবে না রে."

-"না বিশ্বাস কর। আমি পারবো তোর জন্য।" সৌম্যর কাঁধ থেকে মাথা উঠিয়ে অরুনিমা বলে। 

-"জানি হয়তো তুই পারবি। কিন্তু আমি পারবোনা রে। আমার্ জন্য কেন তুই নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিবি বল? আমি কি আমার মাকে ছেড়ে তোর কাছে যেতে পারছি ? তবে তুই কেন আসবি বল ?আর তোর এই চাকরিটা তোকে অনেক খেতে আর লড়াই করে পেতে হয়েছে। আমি বা আমার মা কেউই তোকে সাহায্য করিনি। তুই নিজের যোগত্যায় এ টা পেয়েছিস।তবে এটা ছাড়ার প্রশ্নই আসেনা। "

-"তুই কেন তোর মাকে ছাড়তে জাবি সৌম্য ? মা আর চাকরি কি এক হলো ? আমি তো সব ছাড়তে চাইছে তোকে ভালোবেসে। তুই ভালো থাকলেই আমার ভালো। "

-" এই কথা গুলো সিনেমাতেই ভালো লাগে অরু। নিজের জীবনে নয়। আগে নিজে ভালো থাকে , আগে নিজেকে ভালো রাখ, তারপর দেখবি সব ভালো। সবাই ভালো। স্যাক্রিফাইস করে দেখবি শেষে তুই নিজে তো ভালো নেই ই। তোর আসে পাশের লোকেরাও কেউ ভালো নেই। "

-"তা বলে তোকে ছেড়ে দেব। "

-"আমি তোর জন্য আজীবন অপেক্ষা করবো অরু। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।"

-" তোকে কি বন্ধু হিসেবেও পশে পাবনা সৌম্য। "

-" আমি যে মাকে কথা দিয়েছি অরু। তোর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবোনা."

-"এক শহরে থেকে অনেকবার আমাদের দেখা হবে তখন কি করবি? মুখ ফিরিয়ে চলে যাবি ?"  

-" আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি অরু। "

-"আমায় এক ফেলে চলে যাবি ?" কাঁদো কাঁদো মুখে বললো অরুনিমা। 

-"তুই আমার মনে সারাজীবন থাকবি। "

-"এসব ভাট না বকে চল পালিয়ে যাই। বিয়ে করে ফেলি। কাকিমা তো আর ফেলতে পারবেন না বল ?"

-"অরু জীবনে এমন কোনো কাজ করিসনা বা আমায় করতে বলিসনা যাতে আমি নিজেই আয়নায় নিজের মুখ না দেখতে পারি।আমি মায়ের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তোকে যেমন বিয়ে করবোনা তেমন আমি কাউকেই বিয়ে করবোনা।"

-" কাকিমা রাজি হলেন ?"

-"মায়ের কাছে আর কোনো অপশন আমি রাখিনি রে। মায়ের কাছে যদি তার ঠুনকো আচার বিচার বড় হয় তো আমার কাছে আমার ভালোবাসা সবচেয়ে বড়। "

-"তাহলে আমরা আলাদা হয়ে যাচ্ছি ?" একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে অরুনিমা। 

-"মনের দিক থেকে আলাদা হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠেনা। শোন আজ আমি তোকে এই লাল আবির দিলাম। তুই এটা নিজের কাছে রাখিস। জীবনের কোনো বাঁকে যদি কোনোদিন আবার আমরা মিলিত হই। তখন এই আবির দিয়েই শুরু হবে আমাদের আবার নতুন পথ চলা একসাথে। "

পশ্চিমের আকাশ তখন অস্তমিত সূর্য্যের প্রেমের লালে লাল। সেই লালিমাকে সাক্ষী রেখে, লাল আবিরের প্যাকেটটা অরুণিমার হাতে দিয়ে ,সৌম্য বললো ," এটা রাখ। আমার স্থির বিশ্বাস , এটা এক না একদিন আমাদের দুজনের একসাথে পথ চলাকে রাঙিয়ে দিতে ব্যবহৃত হবে।"

সজল চোখে প্যাকেটটা হাতে নিয়ে সৌম্যকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো অরুনিমা। 



Rate this content
Log in

More bengali story from সঞ্চারী চ্যাটার্জী

Similar bengali story from Romance