STORYMIRROR

Rinki Khaddar

Drama Romance

4.0  

Rinki Khaddar

Drama Romance

।। নীল পদ্মের বিরহ।।

।। নীল পদ্মের বিরহ।।

5 mins
43


🥀পর্বঃ – ১


সূচনাঃ     
               
                  অবেলার নীল পদ্ম হয়ে,
        পড়ে আছি বিজন কোনো দীঘির কোণে।
             আকাশের নীল ছোঁয়া আছে এ গায়ে,
          তবুও মন ভাসে এক অজানা মেঘের টানে।

          পাপড়ির ভাঁজে জমে আছে যত অভিমান,
          জলের ছোঁয়ায় ধুয়ে যায় সব মায়ার টান।
            বুকের গভীরে বিরহের এক তীব্র দহন,
 তবুও আমার মৌনতায় মিশেথাকে তোমারইজীবন।

          হয়তো এই নীল রঙ ই ছিল আমার নিয়তি,
          বিরহকে ভালোবেসেই খুঁজে পাওয়া তৃপ্তি।
         শুকিয়ে গেলে ঝরে পড়বো মাটির ধুলোয়,
স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবো নীল পদ্মের কোনো এক গল্পে।




সরকার বাড়ির বসার ঘরে তখন টানটান উত্তেজনা। 

পিনপতন নীরবতা ভেঙে নেহা দেবী তাঁর মমতাময়ী ও কিঞ্চিৎ আহ্লাদি গলায় অভিযোগ তুললেন, "কত কইরা কইলাম টিভিডারে একটু দেখাও! কেমন 'ঘেটর ঘেটর' শব্দ করতাছে। আমাগো পলাডার কথা শুনতে অসুবিধা হইতাছে তো!"


রাজবীর বাবু এতক্ষণ একমনে টেলিভিশনের পর্দায় তাকিয়ে ছিলেন। স্ত্রীর কথায় বিরক্ত হয়ে তৃতীয় দফার আদেশে সুরে বললেন, "নেহা , কথা কইও না! আগে শুনতে দাও নীল কী বলে।"

অন্য সময় হলে স্বামীর এমন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নেহা  দেবী থমথমে কণ্ঠে প্রতিবাদ করতেন, মান-অভিমান চলত অনেকক্ষণ। কিন্তু আজ সময়টা ভিন্ন। 
   তাই তীব্র চোখে একবার স্বামীর দিকে তাকিয়েই তিনি আবার টেলিভিশনের পর্দায় নজর স্থির করলেন। সরকার বাড়ির বসার ঘরের সেই পুরনো সাদা-কালো টেলিভিশনটি যেন আজ একটি ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছে।


টেলিভিশনের পর্দায় তখন এক সুশ্রী উপস্থিকা কথা বলছেন। তাঁর পরিপাটি সাজ, কপালে টিপ আর পরনের খয়েরি শাড়ি—সব মিলিয়ে তাঁকে বেশ গম্ভীর এবং মার্জিত দেখাচ্ছে। বয়স আনুমানিক ছাব্বিশ হবে। টানা টানা চোখ আর পাতলা ঠোঁটে বুদ্ধিমত্তার ছাপ স্পষ্ট। তিনি অতি সুকৌশলে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন বর্তমান চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে আলোচিত ও রহস্যময় পরিচালক হ্রাস সরকারের দিকে।

উপস্থিকা স্মিত হেসে বললেন, "আমাদের কানে কিন্তু ইতিপূর্বেই খবর এসেছে যে, আপনার সিনেমার এই জনপ্রিয় 'বনলতা' চরিত্রটি আপনি নিজে সৃষ্টি করেছেন। উপন্যাসের মূল লেখক জীবনানন্দ দাশের এই চরিত্রটি ব্যবহার করেননি। অথচ এই চরিত্রটিই এখন সবার মুখে মুখে। 

মার্কেটে বনলতার সেই পরিচিত সবুজ শাড়ি, তার হাতে থাকা সেই বিশেষ ঘড়ি, এমনকি তার হাতে বানানো সুতোর সেই ব্যাগটিও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সবাই  'বনলতার' প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমরা কি জানতে পারি, এই চরিত্রটি সৃষ্টির নেপথ্যে কার অনুপ্রেরণা ছিল?'বনলতা' কি কোনো বাস্তব নারীর প্রতিচ্ছবি? কোনোভাবেই কি তার অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে আছে?"
প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন। হ্রাস সরকার তখন নিজের ডান হাতের অনামিকা আঙুলের নীল রঙের পাথরের আংটিটি অন্য হাত দিয়ে ঘোরাচ্ছেন। এই আংটিটি তাঁর মৃত ঠাকুরদার স্মৃতি; মৃত্যুর আগে তিনি এটি হ্রাসকে দিয়ে গিয়েছিলেন। এমনিতে হ্রাসের অলঙ্কার বা সাজসজ্জার প্রতি কোনো টান নেই, শুধু এই আংটি আর বাম হাতের উন্নত মানের চামড়ার ঘড়িটিই তার নিত্যসঙ্গী। যখনই সে গভীর কোনো ভাবনায় নিমগ্ন হয়, তখনই অবচেতন মনে এই আংটিটি ঘোরানো তার এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।


স্টুডিওতে ক্ষণিকের নীরবতা নেমে এল। হ্রাস খুব সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর সুরে জবাব দিল, "সে আমার খুব কাছের একজন।"

জবাবটি অত্যন্ত রহস্যময় এবং সংক্ষিপ্ত হলেও এর অর্থ ছিল পরিষ্কার। হ্রাস যে এর বেশি আর কিছু বলতে চাইছে না, তা বুদ্ধিমতী উপস্থিকা অনায়াসেই বুঝে নিলেন। তিনি হেসে পরবর্তী প্রশ্নে চলে গেলেন।
"আপনার বয়স খুবই কম, সাথে চলচ্চিত্র জগতে এই যাত্রাও খুব দীর্ঘ নয়। এরই মধ্যে পরিচালক হিসেবে আপনি যে অসামান্য সফলতা পেয়েছেন, তা কি কখনো কল্পনা করেছিলেন?"


হ্রাস উপস্থিকার চোখের দিকে না তাকিয়ে সরাসরি ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকাল। বিনয়ের সাথে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, "কল্পনা করিনি, তবে আকাঙ্ক্ষা ছিল।"

উপস্থিকা এবার একটু নড়েচড়ে বসলেন। হাতের কার্ডটি পরিবর্তন করে অত্যন্ত আগ্রহী কণ্ঠে পরবর্তী প্রশ্নটি করলেন, "আমরা লক্ষ্য করেছি আপনার 'নীলাঞ্জনা' ছিল একটি বিরহের গল্প। তার আগের সিনেমা 'সেদিন চন্দ্রিমা'—সেটিও বিরহের। আর এখনকার 'বনলতা'ও একই ধারার। 

দর্শকদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, পরিচালক হ্রাস সরকারের নির্মিত সিনেমাগুলো সবসময় বিরহী কেন হয়? এর পেছনে কি ব্যক্তিগত কোনো কারণ আছে? জীবনের সাথে কি এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে?"


হ্রাস এবার বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ক্যামেরা তখন হ্রাসের মুখের ওপর ক্লোজ-আপ ফ্রেমে স্থির। তাঁর সুদর্শন ও ভাবুক মুখখানায় যেন রাজ্যের দুশ্চিন্তা ভিড় করেছে। কপালে চিন্তার ভাঁজগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। লাইভ প্রোগ্রামটি তখন নানান মানুষ দেখছে। 

সরকার বাড়ির বসার ঘরে উপস্থিত সবাই যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে হ্রাসের উত্তরের অপেক্ষা করছে।


অবশেষে হ্রাস মুখ খুলল। মৃদু স্বরে বলল, "আমার মনের মানুষের বিরহের ছবি পছন্দ।"


উপস্থাপিকা কিছুটা আশ্চর্য হলেন। কিন্তু দর্শকদের কৌতূহল মেটাতে তিনি শেষ প্রশ্নটি করলেন, "দর্শকদের মনে আরও একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। হ্রাস সরকার সব সময় শুধু পাঞ্জাবি কেন পরেন? শার্ট-প্যান্টে তাঁকে কেন দেখা যায় না?"


হ্রাস এবার কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দিল, "আমার মনের মানুষ সব সময় শাড়ি পরেন বলে।"


পরপর তিনটি উত্তর যেন বজ্রপাতের মতো সরকার বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। হ্রাসের প্রতিটি কথা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, আজকের এই বিখ্যাত পরিচালকের জীবনের প্রতিটি সৃষ্টির মূলে একজন নারী আছেন, যাকে তিনি ভালোবাসেন। তাঁর জন্যই এই বিরহের গল্প, তাঁর জন্যই এই পাঞ্জাবি পরিধানের আড়ম্বর।



বসার ঘরে রীতিমতো হইচই পড়ে গেল। রাগিনী তখন আতঙ্কে শিউরে উঠল। সে অনুভব করল তার মামি নেহা দেবীর তীক্ষ্ণ ও সন্দিহান দৃষ্টি তার ওপর স্থির হয়ে আছে। ভয়ে রাগিনীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে পরনের শাড়ির আঁচলটা মুঠো করে ধরল। 

কাকতালীয়ভাবে, রাগিনীর পরনেও তখন সেই 'বনলতা'র প্রিয় রঙ—সবুজ শাড়ি। হ্রাসের বলা কথাগুলো কি তবে তাকেই উদ্দেশ্য করে?


এতক্ষণ সোফার ওপর হাসি-খুশি মুখে বসে থাকা নেহা দেবী হুট করেই উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। 


তিনি তাঁর স্বামীর দিকে তাকিয়ে বিস্ময় ভরা গলায় চিৎকার করে উঠলেন, "কিসের মনের মানুষ? কার কথা কয় এই পলা? কি গো হ্রাসের বাপ, পলা এসব কী বলছে? কোন মানুষের কথা কয় ও?"


রাজবীর বাবু শান্ত প্রকৃতির মানুষ। জলের মতোই স্থির। জীবনের বহু চড়াই-উতরাই তিনি নীরবে পার করেছেন। বাবার মৃত্যু ছাড়া তাঁকে কোনো কিছুতে তেমন অস্থির হতে দেখা যায়নি। তিনি চুপ করেই রইলেন। 

কিন্তু নেহা দেবী দমবার পাত্রী নন। তিনি হ্রাসের সাথে যোগাযোগ করার জন্য পাগলের মতো নিজের মুঠোফোনটি খুঁজতে শুরু করলেন।

ঘরের এক কোণে তখন নীল আলোয় ঢাকা একাকীত্বে দাঁড়িয়ে রাগিনী। তার হাতের মুঠোয় থাকা সবুজ শাড়ির আঁচলটি তখন প্রচণ্ড আশঙ্কায় দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছে 



চলবে...


{ আমার লেখা গল্পটি আপনাদের কাছে আকর্ষণীয় লাগলে অনুগ্রহ করে অনুসরণ করে পাশে থাকবেন}


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Drama