STORYMIRROR

Rinki Khaddar

Drama Romance

3  

Rinki Khaddar

Drama Romance

।। নীল পদ্মের বিরহ ।।

।। নীল পদ্মের বিরহ ।।

6 mins
5

🥀পর্বঃ–২



🚫গল্পটি কোনভাবেই কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।



হ্রাসের উত্তরের রেশ কাটতে না কাটতে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে হয়তো আরও একটি কৌতূহল দানা বাঁধল। সেই কৌতূহল থেকেই একজন সাবলীলভাবে প্রশ্ন করে বসলেন, "আমার আরেকটি বিষয় জানার ছিল। আপনার পরবর্তী চলচ্চিত্র সম্পর্কে কি আমাদের কিছু জানানো যাবে? সেটিও কি বিরহ বা বিচ্ছেদের কোনো গল্প হতে চলেছে?"


হ্রাস কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর ধীর অথচ গভীর স্বরে উত্তর দিল, "ভারতীয় সাহিত্যে বিরহ বা বিচ্ছেদের এক বিশাল ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষ করে বাংলা ও হিন্দি সাহিত্যে এমন কিছু কালজয়ী সৃষ্টি রয়েছে, যা আজও পাঠকদের চোখে জল আনে। এর মধ্যে অন্যতম হলো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৯১৭ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘দেবদাস’।"


সে বলতে লাগল, "দেবদাস, পার্বতী আর চন্দ্রমুখীর সেই চিরন্তন আখ্যান... শৈশবের প্রেম পারুর বিয়ে অন্যত্র হয়ে যাওয়ায় দেবদাসের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা সে মদের নেশায় ডুবিয়ে দিতে চায়। সামাজিক আভিজাত্য আর অহমিকার দেওয়াল কীভাবে দুটি হৃদয়কে আজীবন বিচ্ছেদের দহনে পুড়িয়ে মারে, তা দেবদাস না পড়লে বোঝা যায় না। বিশেষ করে শেষ মুহূর্তে পারুর বন্ধ দরজার সামনে দেবদাসের সেই নিঃশব্দ মৃত্যু—বিরহের এক চরম নিদর্শন। আমি এই উপন্যাসটিকেই সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করতে চাই। আমার পরবর্তী চলচ্চিত্র হবে এই অমর বিরহগাথা।"


এদিকে বসার ঘরে নেহা দেবী কিছুটা উসখুস করছিলেন। 

রাজবীর বাবু বিরক্ত হয়ে চাপা গলায় শাসন করলেন, "দেখতে পাচ্ছ না ইন্টারভিউটা লাইভ হচ্ছে? এখন ফোন ধরা সম্ভব নয়। চুপচাপ বসে  দেখতে দাও তো!"


সেই ঘরেই উপস্থিত ছিলেন পঞ্চায়েত সাহেব। ভদ্রলোকের লক্ষ্য অবশ্য আগামীকালের ভোট। তিনি মনে মনে বিড়বিড় করলেন, "ছেলেটা তো  অন্য পথে হাঁটা ধরল। কাড়ি কাড়ি টাকা কামিয়েও কি ছেলেটা শান্তিতে আছে? পাগল সব! আমার নাতনিটা লাখে একটা। কিন্তু হারলে তো কান্না ছাড়া আর পথ থাকবে না।"


হ্রাসের এই এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউটি দেখতে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ভিড় জমিয়েছে। বসার ঘরে তিল ধারণের জায়গা নেই। 


রাগিনী এতক্ষণ পর্দার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিল। টেলিভিশনের পর্দায় হ্রাস তখনো একের পর এক প্রশ্নের সাবলীল উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাগিনীর সেই কথাগুলো শোনার মতো মানসিক শক্তি আর অবশিষ্ট ছিল না। সে দ্রুত পায়ে তার জন্য বরাদ্দ ঘরটির দিকে এগিয়ে গেল। তার শাড়ির আঁচল অবিন্যস্তভাবে মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছে।


রাগিনী কাঠের দরজাটি দ্রুত বন্ধ করতে চাইল, কিন্তু পারল না। হঠাৎ কোথা থেকে উড়ো খইয়ের মতো এসে হাজির হলো তিথি। মেয়েটা যেন ছায়ার মতো রাগিনীর পিছু ছাড়ে না। 

তিথি ঘরে ঢুকে তার ডাগর ডাগর চোখে গভীর এক রহস্যভেদের দৃষ্টি নিয়ে রাগিনী ওরফে পদ্মাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। মনের ভেতর জমে থাকা প্রশ্নটি সে আর চেপে রাখতে পারল না।


তিথি: "দিভাই, বিরহের ছবি তো আপনার খুব পছন্দের। আপনি তো বিষাদময় সিনেমা দেখতে বড্ড ভালোবাসেন। দাভাই কি কোনোভাবে আপনার কথাই বলছে?"

রাগিনী নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। শান্ত চোখে ঘরের ভেতর পাইচারি করে নিজেকে ব্যস্ত দেখানোর অভিনয় করে সে বলল—

রাগিনী: "পাগল মেয়ে! কী সব আজেবাজে কথা বলছিস? বড়দের সাথে কখন কী বলতে হয়, সেই কাণ্ডজ্ঞানটুকুও কি নেই?"

তিথি বিছানায় বসে তার নূপুর পরা পা জোড়া দোলাতে লাগল। ঝিনঝিন শব্দে ঘর ভরে উঠল। সতেরো বছর বয়সের এই কিশোরী কল্পনার জগতে বাস করে। প্রেমের উপন্যাস পড়তে পড়তে সে নিজেই যেন এক বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছে। গ্রামের যুবক-যুবতীরাও তার কাছে প্রেমের পরামর্শ নিতে আসে।


তিথি: "দিভাই, আমি একদম আজেবাজে বলছি না। দাভাই টেলিভিশনে যা যা বললেন, আপনি কি মন দিয়ে শোনেননি? হ্রাসদার পরিচালিত ‘বনলতা’ ছবিটি আমি বারবার দেখেছি। আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি, বনলতা চরিত্রটি হুবহু আপনার মতোই!"


তিথি এক নিশ্বাসে বলে চলল—

তিথি: "আপনার এই সবুজ শাড়ি পছন্দ, নিজের হাতে বানানো জুতো, কাঁধের ব্যাগ—যেখানে আপনি নিজেই নকশা করেছেন, সব তো বনলতার মধ্যেও ছিল! বনলতার হাতের সেই চামড়ার ঘড়ি, নীল রঙের চায়ের মগ যা আপনি নিজে রঙ করেছেন, নীল ডায়েরি, এমনকি সোনালী মাথার সেই কালো মোটা বল পেনটা পর্যন্ত বনলতার ঠিক আপনার মতো। আপনার উদারতা, সাহস,  পাখি ভালোবাসেন, পাখিদের খাঁচায় সইতে না পারা—সবই তো মিলে যাচ্ছে। 
     এমনকি বনলতাকে যে ভালোবাসত, সেই ‘সাগর’ চরিত্রটাও তো একজনের সাথে হুবহু মেলে। আপনি এখন ধমকালেও আমি বলব—আপনার চালচলন, শাড়ি পরার ধরন, আত্মবিশ্বাস আর ধৈর্য—সবই বনলতার মধ্যে ছিল। আমি ছবিটা দেখছিলাম আর শুধু আপনার কথাই ভাবছিলাম।"


রাগিনী ভাঁজ করা শাড়ি নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পরক্ষণেই আবার নিজেকে সামলে নিয়ে প্রসঙ্গ বদলানোর চেষ্টা করল।

রাগিনী: "সারাদিন পড়াশোনা বাদ দিয়ে ওই সব প্রেমের গল্পই তো গিলিস! ঘুমের মধ্যে একা একা হাসিস, নিত্যনতুন ছেলেদের নাম বিড়বিড় করিস। কাল তো ঘুমের ঘোরে কাকে যেন চুমু খাচ্ছিলি, মনে আছে?"

লজ্জায় রাঙা হয়ে তিথি দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলল।

তিথি: "ওরা আমার মনের মানুষ দিভাই! ওরা সবাই আমার মনের কোণে বাস করে। আপনি বরং ওদের সবার চরিত্রের নির্যাস দিয়ে তৈরি একজনকে খুঁজে এনে আমার সাথে বিয়ে দিয়ে দিন। ওই যে ‘অল-ইন-ওয়ান’ গাইড বুকের মতো! তাহলে আমি আপনার কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।"


রাগিনী অবাক হয়ে বলল, "তার মানে?"

তিথি গদোগদো স্বরে বুঝিয়ে বলল—

তিথি: "আমার গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্রই খুব প্রিয়। আমি এমন একজনকে চাই, যার মধ্যে সবার গুণ থাকবে। তেমন কাউকে এনে দিন না দিভাই!"

রাগিনী মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়িয়ে আদেশ 
দিল—

রাগিনী: "অনেক হয়েছে, এবার পড়তে বস গে যা!"


তিথি বাধ্য মেয়ের মতো দরজার দিকে এগিয়ে গেল, কিন্তু মাঝপথে আবার ফিরে তাকাল। রাগিনী কিছু বলার আগেই তিথি বলে উঠল—


তিথি: "সাগর চরিত্রটা কিন্তু একদম নীলদার মতো। কোন কোন দিকে মিল আছে সেটা বললে তো আপনি মানবেন না, তাই আর কিছু বললাম না। আর হ্যাঁ, নীলদা কিন্তু কালই বাড়ি ফিরছেন।"



কথাটা বলেই তিথি তড়িৎবেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাগিনী সেই ভাঁজ করা শাড়িটা কোলের ওপর নিয়ে বিছানায় স্থবির হয়ে বসে রইল। অনেকক্ষণ সে অচেতনের মতো তাকিয়ে রইল শূন্যতায়। তার শাড়ির আঁচল এখন আর মাটি স্পর্শ করছে না, কিন্তু তার নগ্ন পা জোড়া কি মেঝের সেই কনকনে ঠান্ডা অনুভব করতে পারছে?



অদ্ভুত এক অস্থিরতায় তার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। চারপাশের সবকিছু হঠাৎ বড্ড অসহনীয় মনে হতে লাগল। কেন তার অতীতটা এত নিঃস্ব? কেন তার আপনজনেরা একে একে তাকে এই পৃথিবীর ভিড়ে একা ফেলে চলে গেল? রাগিনী নিজেকে সাহসী বলে দাবি করলেও, ভেতরে ভেতরে সে বড্ড একা, বড্ড ভীত। আপন মানুষের সান্নিধ্য ছাড়া সে যেন এক অচল সত্তা। মাথার ওপর থেকে ছায়ার মতো হাতগুলো একে একে হারিয়ে গেছে। বর্তমান সময়টা তার কাছে কেন জানি বড় জটিল, বড় বিষাক্ত মনে হতে লাগল।


সরকার বাড়িটি এক বিশাল দোতলা বাড়ি, যার প্রতিটি ইটে জড়িয়ে আছে সেকেলে আভিজাত্য। বাড়িটি দেখলে এক অদ্ভুত রাজকীয় অনুভূতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিনের পুরোনো সেই প্রাচীরের পলেস্টের খসে পড়েছে বহু আগে, আর সেই দেওয়ালের খাঁজে খাঁজে জন্ম নিয়েছে নাম না জানা অসংখ্য গাছপালা।

বাড়ির পেছনের পুকুরটির জল এখনো টলটলে পরিষ্কার; মাঝেমধ্যে সেখানে স্নান করার ধুম পড়ে যায়। এক সময় এই পুকুরটি ছিল প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। বাহারি রঙের মাছ, বিশেষ করে বড় বড় পাঙ্গাস মাছের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। পুকুরপাড়ে জবা, নয়নতারা আর গন্ধরাজের ঝোপ। সময়ের আবর্তে কিছু গাছ শুকিয়ে গেলেও, অনেক গাছ এখনো বেশ তেজি; সেগুলোতে ডালপালা ভরে ফুল ফুটে থাকে। পুকুরপাড়ে এলেই এখন গন্ধরাজের মাদকতাময় সুবাসে চারপাশ ম-ম করে ওঠে।


বাড়ির উঠানের এক কোণে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে এক সুপ্রাচীন ও দীর্ঘকায় শিউলি গাছ। গাছের মগডাল থেকে ঝরে পড়া অগণিত শিউলি ফুল নিচের মেঝেতে এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, দেখে মনে হয় যেন এটি শিউলি ফুলেরই কোনো এক স্বতন্ত্র রাজ্য।


ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়—বাংলায় যা শরতের আগমনের বার্তা বয়ে আনে। বাঙালির হৃদয়ে এই সময়ের এক বিশেষ আবেদন রয়েছে। এই সময় আকাশ থেকে বর্ষার মেঘ বিদায় নেয়, আর বাতাসে খেলা করে এক হালকা হিমের ছোঁয়া বা শিরশিরানি অনুভূতি। ভোরের ঘাসের ওপর জমতে শুরু করে স্নিগ্ধ শিশিরবিন্দু। শরতের সেই প্রাতঃকালে আকাশ হয়ে ওঠে গাঢ় নীল; সেখানে ভেসে বেড়ায় পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা। নদীর ধারে কাশফুলের দোলা আর ভোরের বাতাসে শিউলির মিষ্টি সুবাস জানান দেয়—উৎসবের সময় চলে এসেছে। সূর্য ওঠার আগেই শিউলি ফুল গাছ থেকে ঝরে পড়ে; আর ভোরে ঘুম থেকে উঠে সেই ঝরা শিউলি কুড়ানো বাঙালির এক চিরন্তন ও চিরায়ত অভ্যাস।



চলবে...


( লেখা গল্পটির মাঝে যদি আপনারা পড়ার সময় কোন ভুল ত্রুটি বা বানান ভুল  দেখে থাকেন তো অনুগ্রহ করে নতুন লেখিকা হিসাবে ক্ষমার চোখে দেখবেন সাথে আপনাদের কাছে এই গল্পটি মোহনীয় বা সামান্য তম মনে ছোঁয়ার মত যদি লেগে থাকে অনুগ্রহ করে অনুসরণ করে আমার পাশে থাকবেন)



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Drama