STORYMIRROR

Rinki Khaddar

Drama Romance

4  

Rinki Khaddar

Drama Romance

।। নীল পদ্মের বিরহ ।।

।। নীল পদ্মের বিরহ ।।

5 mins
13

🥀 পর্ব : ৩ 


🚫"এই বিষয়বস্তু বা লেখাটির অনুলিপি তৈরি করা কিংবা অনুমতি ব্যতীত অন্য কোনো মাধ্যমে এর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।"


শিউলি তলায় দাঁড়িয়ে আছে রাগিনী। গায়ে জড়ানো ধূসর রঙের সেই চাদরটা—যা ছিল তার দাদুর। একবার-দুবার ধুলে কি আর মানুষের শরীরের সেই মায়াভরা ঘ্রাণ চলে যায়? চাদরের ভাঁজে ভাঁজে এখনো যেন দাদু দাদু গন্ধ লেগে আছে।


রাগিনীর চোখ গেল সেই আম গাছটার দিকে। সরকার বাড়ির রান্নাশালার সামনে দিয়ে সাত-আট কদম এগোলেই গাছটা সটান দাঁড়িয়ে। ওখানেই তো বসতেন ভোলানাথ সরকার। 


হাঁক পাড়তেন, "কই রে মামণি, শুনে যা! এই বুড়ো দাদুর একটা জরুরি দরকার পড়েছে কিন্তু।"

রাগিনী তখন ঘর থেকে ব্যস্ত গলায় বলত, "ওহো, ডাকাডাকি কোরো না তো! আমি মেলা ব্যস্ত।"

ভোলানাথ বাবু অবশ্য হেরে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি অসুস্থতার অভিনয় করতেন, আর সেই অভিনয়ের কাছে রাগিনী ছিল বড় অসহায়। যে মানুষটা তাকে দুই হাতে আগলে বড় করেছেন, তার প্রতি রাগিনীর ভালোবাসা ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। দাদুর কথা ভাবলে আজও সে কেমন ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। ভোলানাথ বাবু নাতনির দুর্বলতা বুঝতেন; তাই তো মাঝে মাঝে বুকে হাত চেপে খুকখুক করে কাশতেন। রাগিনীও সব কাজ ফেলে ছুটে আসত।

দাদু তখন নাতনির কাঁচুমাচু মুখ দেখে মিটিমিটি হাসতেন।

ভোলানাথ বাবু নতুন কবিতা লিখেছেন—পুরোটাই অপ্রেমের কবিতা। সেই কিশোরী বয়সে রাগিনীর কাছে ওই গূঢ় তত্বের ভারী কবিতাগুলো খুব একটা বোধগম্য হতো না। কিন্তু দাদু কষ্ট পাবেন ভেবে সে মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে পাশে বসে থাকত।




আম গাছটার দিকে তাকালেই দাদুর স্মৃতিগুলো বড্ড বেশি ভিড় করে আসে। দুই বছরে কি আর এত যুগের টান ভোলা যায়? মানুষ দূরে গেলে তার স্মৃতিটুকু তো আমৃত্যু মনের কোণে সযত্নে তোলা থাকে। যেমন আছেন দাদু, আর আছে তার মৃত বাবা-মা।

আর তো কাউকে মনে পড়ে না রাগিনীর। কেন পড়ে না? যাদের হাত ধরে এই পৃথিবী দেখা, তাদের জন্য কেন মনের এক কোণেও কোনো হাহাকার নেই?তাদের চেহারাটুকু কেন মনে নেই?  সেই সম্পর্কের টান থাকলে হয়তো বিরহের বদলে মনে সুখের অসুখ লাগত, সেও আপনজনদের কাছে ছুটে যেতে পারত।

ভাবনার জগতে ছেদ পড়ল  হেলিকপ্টারের শব্দে। শুভ্র মেঘে ঢাকা পরিষ্কার নীল আকাশের নিচ দিয়ে হেলিকপ্টারটি ৩০ ডিগ্রি কোণে  ঘুরিয়ে অনেকটা বাঁক নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। একদম অ্যাকশন ফিল্মের মতো দৃশ্য! 

রাগিনী অবাক হয়ে সেদিকে চেয়ে রইল। পরক্ষণেই নজর গেল নিচে; শিউলি ফুলগুলো ঘাসের ওপর ঝরে আছে। চটপট ঝুড়িতে না তুললে বাড়ির লোক উঠে সবার পায়ের তলায় এগুলো পিষে দেবে। রাগিনী দুই পা ভাঁজ করে বসে দ্রুত ফুল কুড়াতে লাগল। পাখির কিচিরমিচির আর ভোরের হিমেল হাওয়ায় ভেসে আসা শিউলির গন্ধে তার মনটা নিমেষেই ভালো হয়ে গেল। সে আপন মনে গান ধরল। ঠিক তখনই পাতার ওপর কারো হাঁটার ‘খসখস’ শব্দ কানে এল।

না ফিরেও রাগিনী জানে ওটা কে। 

তিথি ঘুম-চোখে বিরক্তি নিয়ে এগিয়ে আসছে। "দিভাই, এত সকালে উঠলে কেন? কেমন ঠান্ডা দেখছ না? দাভাই জানলে কিন্তু খুব রাগ করবেন।"

রাগিনীর উজ্জ্বল চোখ দুটো মুহূর্তেই মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল। সে আবার নিজের ভেতর গুটিয়ে গেল। তার এই হঠাৎ চুপসে যাওয়া দেখে তিথি বৃদ্ধদের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 

রাগিনী স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল, "তুই কেন উঠে এলি? যা, গিয়ে আর একটু ঘুমা।"


তিথি নাছোড়বান্দা, "আমি তুলে দিচ্ছি, আপনি উঠুন। দাভাই আমাকে আচ্ছা বকুনি দেবে। আপনি তো খালি খালি আমাকে কথা শোনান, একদম ভালোবাসেন না!"






রাগিনীর ভুরু কুঁচকে গেল। বিরক্তির স্বরে বলল, "কেন? তোর দাভাইয়ের কথা মতো কি আমাকে চলতে হবে? আর তোকেই বা চলতে বলেছে কে?"


তিথি ওসব কথায় কান না দিয়ে দ্রুত ফুল কুড়াতে লাগল। রাগিনী উদাস হয়ে চেয়ে রইল সরকার বাড়ির লোহার গেটটার দিকে। দরজার একপাশে বুনো লতা জড়িয়ে আছে। তার মস্তিষ্কে হুট করেই একটা দৃশ্যের উদয় হলো—একটি কালো গাড়ি তীব্র গতিতে খোলা লোহার দরজা দিয়ে বাড়ির সামনে এসে থামল।

গাড়ির পেছনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন একজন। সুদীর্ঘ দেহ, ফরসা গায়ের রং, আর ব্যক্তিত্বে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। লোকটিকে রাগিনী খুব ভালো করেই চেনে। তার সেই বুদ্ধিদীপ্ত চোখে গভীরতা আর অহংকারের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। সেই দৃষ্টি যেন অতল সমুদ্রের মতো। রাগিনীর মনে হলো, ওই চোখ জোড়া যেন তাকে স্পর্শ করছে।

সে ঝটপট চোখ সরিয়ে নিল। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। কেন বারবার ওই লোকটার কথাই মনে পড়ে? কেন তার চালচলন, কণ্ঠস্বর, এমনকি ধমক দেওয়ার ভঙ্গিটাও রাগিনীকে এত তীব্রভাবে আকর্ষণ করে?




কেন সে তাকালে রাগিনীর সাজানো পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যায়?কেন কেন  কেন?
এই হাজারো ‘কেন’র জবাব তার জানা নেই, আর সে জানতেও চায় না। কারণ সে জানে, এই সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গেলে সে আর কখনোই ফিরে আসতে পারবে না।


রাগিনীর ঘরটা দোতলার এক কোণে। পাশেই বড় কাঠের জানালা। ভোলানাথ বাবু তার মেয়ের পছন্দে ঘরটা বানিয়েছিলেন, এখন সেটা রাগিনীর মনের মতো সাজানো। রোদের সোনালি আভা এসে পড়েছে তার রক্তবর্ণ চোখের ওপর। রাগিনী জানালার ওপর গাল ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। অদূরে আম গাছের মগডালে এক জোড়া পায়রা বসে আছে। কালো সাদা মিশ্রিত পায়রাটি সাদা পায়রাটির চারপাশে ঘুরঘুর করছে—হয়তো অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা।

দৃশ্যটি দেখতে দেখতে রাগিনীর মনের গহিনে এক সুপ্ত বাসনা জেগে উঠল। অলক্ষ্যে কখন যে তিথি পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, সে খেয়ালই করেনি। রাগিনী গুনগুন করে গেয়ে উঠল সেই বিখ্যাত গানের কলি —




                "তুমি আমার কত চেনা
                  সে কি তুমি জানো না?
                 আজ এই কথাটি আমার
                 তোমায় শুধু বলবো না।।

               কেন আমায় একলা ফেলে
              কোথায় তুমি হারিয়ে গেলে,
                ফিরে তুমি আসবে কিনা
               তাও তো আমি জানি না।।

                 এই হৃদয়ে ছিল যে গান
              তোমায় দিলাম সেই সে গান,
                  সুরে তুমি নাইবা আসো
                  গানে আমায় ভুলো না।।

                   যদি আমায় মনেই পড়ে
                থাকবো আমি তোমার পাশে,
                     দুঃখের এই দীর্ঘশ্বাসে
                   আমায় খুঁজে নিও না।।

                    তুমি আমার কত চেনা
                     সে কি তুমি জানো না।।


চলবে ...


(গল্পটি আপনাদের কাছে সামান্যতম ভালো লেগে থাকলে অনুগ্রহ করে অনুসরণ করি পাশে থাকবেন।)


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Drama