STORYMIRROR

Atanu Chatterjee

Drama Tragedy Children

4  

Atanu Chatterjee

Drama Tragedy Children

নিঃশর্ত ভালোবাসা

নিঃশর্ত ভালোবাসা

8 mins
2

নিঃশর্ত ভালোবাসা

                    অতনু চট্টোপাধ্যায়

গ্রীষ্মের অলস দুপুর। সূর্যের আলো যেন পাথরের উপর আগুনের রেখা এঁকে দিয়েছে। শহরের গলিপথে বাতাস নেই বললেই চলে, মাঝে মাঝে হালকা হাওয়া এসে ধুলো উড়িয়ে দেয়। গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি শিশু। বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু তার চোখে আছে অদ্ভুত এক স্বপ্নমগ্নতা। সে এক কাঁধে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি উঁচু কাঠের বেড়ার সঙ্গে। অন্য কাঁধ দুলছে, যেন সে নিজের ছন্দে পৃথিবীকে মাপছে। তার পা আলগোছে পাথরের উপর লাথি মারছে, ছোট ছোট কণা রোদে ঝলমল করে ছিটকে যাচ্ছে। শিশুটির ছায়া পাথরের ওপর লম্বা হয়ে পড়েছে—নীরব, অবিচল। শিশুটি যেন একা নয়—তার চারপাশে শহরের কোলাহল এই সরু গলিতে এসে থেমে যায় না, বরং আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—হর্ন, হাঁকডাক, লোহার শব্দ। তবু সেই সব শব্দের মাঝেও সেই শিশুটি দাঁড়িয়ে থাকে, যেন সে কোনো শব্দই শুনছে না। তার দৃষ্টি দূরে, যেন সে খুঁজছে অজানা কোনো রহস্য।

এই মুহূর্তে শিশুটি প্রতীক হয়ে ওঠে—শহরের নিঃসঙ্গতা, মানুষের অজানা আকাঙ্ক্ষা, আর শৈশবের নির্দোষ স্বপ্নের প্রতীক। তার দাঁড়িয়ে থাকা যেন এক প্রশ্নচিহ্ন—কোথায় যাবে সে, কী খুঁজছে, আর কীভাবে পৃথিবী তাকে গ্রহণ করবে।

গলির ধুলোভরা রোদে হঠাৎঠিক তখনই ছায়ার মতোই এসে দাঁড়াল ছোট বাদামি কুকুরটি। গলায় জড়ানো দড়ি মাটিতে টান খাচ্ছে।আর সে মাঝে মাঝে হোঁচট খাচ্ছে। তবু তার চোখে আছে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা—যেন সে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছে। শরীর রোগা, চোখ দুটো গভীর। সে এগিয়ে এলো ধীরে, ধীরে, যেন ভুল করলেই শাস্তি পেতে হবে— শিশুর সামনে এসে থেমে গেল সে। দুজনের চোখে চোখ পড়ল। মুহূর্তটি যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল—শহরের শব্দ, ধুলো, রোদ সব মিলিয়ে যেন এক অদৃশ্য পর্দা টেনে দিল তাদের চারপাশে।

কুকুরটি লাজুক ভঙ্গিতে লেজ নাড়ল, শিশুটি হাত বাড়াল। প্রথমে বন্ধুত্বের স্পর্শ—ছোট্ট হাতের আদর, কুকুরের আনন্দে লাফিয়ে ওঠা। কিন্তু হঠাৎ শিশুর হাত আঘাত হয়ে নামল কুকুরের মাথায়।

কুকুরটি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখে বিস্ময়, হৃদয়ে গভীর বেদনা। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, তারপর বিনয়ী ভঙ্গিতে হাত-পা ছড়িয়ে ক্ষমা চাইতে লাগল। তার কান ও চোখে যেন প্রার্থনার ভাষা—“আমাকে ক্ষমা করো, আমি তোমারই।”

শিশুটি হাসল, তার কাছে এটি ছিল খেলা। কিন্তু কুকুরের কাছে এটি ছিল অপরাধের শাস্তি। সে বারবার প্রার্থনা করল, বারবার বিনয়ী ভঙ্গিতে ক্ষমা চাইতে লাগল।


শিশুটি ধীরে ধীরে বাড়ির পথে হাঁটছে। তার পদক্ষেপে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, মাঝে মাঝে থেমে চারপাশের অদ্ভুত জিনিসপত্র লক্ষ্য করছে। এই অভিযাত্রা তার কাছে যেন এক মহার্ঘ অভিযান।

কিন্তু তার পিছনে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে ছোট বাদামি কুকুরটি। কখনো সে শিশুর পেছনে হাঁটে, আবার কখনো আগেই চলে যায়, তারপর প্রতি মুহূর্তে ফিরে তাকায়—শিশুটি আসছে তো? তার চোখে আছে এক অদ্ভুত উদ্বেগ, যেন সে ভয় পাচ্ছে তার একমাত্র প্রভুকে হারিয়ে ফেলতে।

শিশুটি মাঝে মাঝে একটি ছোট কাঠি তুলে নেয়, আর কুকুরটিকে আঘাত করে। কুকুরটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, চার পা ছড়িয়ে প্রার্থনার ভঙ্গি নেয়। তার কান ও চোখে যেন লেখা থাকে—“আমি অপরাধী, আমাকে ক্ষমা করো।”

শিশুটি অবজ্ঞার ভঙ্গিতে হাত নেড়ে জানায়—সে কুকুরটিকে তুচ্ছ মনে করে। তার কাছে কুকুরটির কোনো মূল্য নেই, কেবল মুহূর্তের খেলা। তবু কুকুরটি থামে না। বারবার মার খেয়েও সে আবার উঠে দাঁড়ায়, আবার শিশুর পেছনে হাঁটে।

তার ভঙ্গি ক্রমে আরও অপরাধবোধে ভরে ওঠে। সে যেন এক গুপ্তঘাতকের মতো লুকিয়ে হাঁটে, মাথা নিচু করে, লেজ গুটিয়ে। তবু তার চোখে আছে এক অদ্ভুত আলো—আনুগত্যের আলো।

এই অধ্যায়ে প্রতীকীভাবে ফুটে ওঠে মানুষের সম্পর্কের এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব—ক্ষমতার অবজ্ঞা আর ভালোবাসার নিঃশর্ত আনুগত্য। শিশুটি হলো ক্ষমতার প্রতীক, আর কুকুরটি হলো সেই ভালোবাসা, যা বারবার আঘাত পেয়েও ফিরে আসে।

শিশুটি হঠাৎ কুকুরটির দড়ি শক্ত করে ধরল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত লোভ—যেন সে বুঝে গেছে, এই ছোট্ট প্রাণীটি তার নিজের সম্পদ হতে পারে। সে দ্রুত দড়ি টেনে কুকুরটিকে নিয়ে চলল।

অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল তারা। শিশুর পদক্ষেপে ছিল একগুঁয়ে তাড়াহুড়ো, আর কুকুরটির চোখে ভয়ের ছায়া। ছোট্ট শরীর, নরম পা—সে বারবার হোঁচট খাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কোনো অজানা অন্ধকারের দিকে।

শিশুটি তবু থামল না। তার কাছে এটি ছিল জয়যাত্রা। প্রতিটি ধাপ যেন বিজয়ের সিঁড়ি। কুকুরটি আতঙ্কে মাথা নাড়ছিল, পা শক্ত করে আঁকড়ে ধরছিল সিঁড়ির ধাপ। কিন্তু শিশুর একগুঁয়ে টান তাকে বারবার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

অবশেষে তারা পৌঁছল ঘরের দরজায়। শিশুটি বিজয়ের হাসি নিয়ে কুকুরটিকে টেনে ভেতরে ঢুকল। ঘরটি ছিল অন্ধকার, নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই অন্ধকারেই জন্ম নিল এক নতুন সম্পর্ক।

শিশুটি মেঝেতে বসে কুকুরটির দিকে হাত বাড়াল। কুকুরটি মুহূর্তেই তার ভয় ভুলে গিয়ে শিশুর দিকে তাকাল। তার চোখে তখন নিঃশর্ত ভালোবাসা। সে লেজ নাড়ল, শিশুর হাত চাটল।


ঘরের অন্ধকারে যখন শিশুটি তার নতুন বন্ধুকে নিয়ে বসে আছে, তখন পরিবারের অন্য সদস্যরা ঘরে প্রবেশ করল। তাদের চোখে প্রথমেই ধরা পড়ল ছোট বাদামি কুকুরটি।

কুকুরটির দিকে তারা তাকাল অবজ্ঞার দৃষ্টিতে। কেউ তাকে “অযাচিত”, কেউ “অপদার্থ”, কেউ আবার “অশোভন” বলে ডাকল। তাদের কণ্ঠে ছিল তাচ্ছিল্য, চোখে ছিল ঘৃণা। কুকুরটি লজ্জায় মাথা নিচু করল, যেন সে সত্যিই অপরাধী। তার শরীর কুঁকড়ে গেল, লেজ গুটিয়ে নিল, আর চোখে ফুটে উঠল গভীর সংকোচ।

কিন্তু শিশুটি চুপ করে থাকল না। সে হঠাৎ ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উঠল। তার ছোট্ট বুক ফুলে উঠল প্রতিবাদের শক্তিতে। সে জোরে চিৎকার করে বলল—“এ আমার বন্ধু! আমি তাকে ছাড়ব না!”

পরিবারের সদস্যরা বিস্মিত হয়ে তাকাল। শিশুর কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত দৃঢ়তা। তার চোখে ছিল অশ্রু, কিন্তু সেই অশ্রু ছিল ভালোবাসার প্রতীক।

ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করল বাবা। দিনের পরিশ্রম শেষে তার মুখে ছিল ক্লান্তি, আর চোখে ছিল রাগ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন—“কীসের এত হট্টগোল?”

পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বলল—“এই ছেলে একটা অপদার্থ কুকুরকে ঘরে ঢুকিয়েছে।”

বাবার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। তিনি গর্জে উঠলেন—“এটা কোনো ঘরের প্রাণী নয়। এ ঘরে থাকবে না।”

শিশুটি কুকুরটিকে জড়িয়ে ধরল। তার ছোট্ট হাত শক্ত করে কুকুরের গলায় বাঁধা দড়ি আঁকড়ে ধরল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত সাহস—যেন সে এক যোদ্ধা, তার বন্ধুকে রক্ষা করতে প্রস্তুত।

বাবার রাগ আরও বাড়ল। তিনি হাত তুললেন, কিন্তু পরিবারের ভেতরে হঠাৎ এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। শিশুর কান্না, তার প্রতিবাদ, আর কুকুরের নিঃশর্ত ভালোবাসা যেন সেই নীরবতাকে পূর্ণ করল।

অবশেষে পরিবারের মধ্যে এক অদ্ভুত সমঝোতা তৈরি হলো। তারা ঝল—শিশুটির কান্না, ছোট বন্ধুর উপর তার ভালোবাসা অটল। তাই কুকুরটিকে ঘরে থাকতে দেওয়া হলো।

কুকুরটি তখনও লজ্জায় মাথা নিচু করে ছিল। কিন্তু শিশুর চোখে সে হয়ে উঠল পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান বন্ধু।

দিনগুলো গড়িয়ে যেতে লাগল। শিশুটি আর ছোট বাদামি কুকুরটি যেন একে অপরের ছায়া হয়ে উঠল। তারা সবসময় একসঙ্গে থাকত—শিশুর খেলায়, তার আনন্দে এমনকি তার কান্নাতেও ।

কুকুরটির জীবন ছিল সংগ্রামের। পরিবারের বড়রা তাকে অবজ্ঞা করত, কখনো লাথি মারত, কখনো জিনিসপত্র ছুঁড়ে দিত। কিন্তু শিশুটি যখন ঘরে থাকত, তখন কুকুরটির জন্য এক অদৃশ্য ঢাল তৈরি হতো। শিশুর কান্না ছিল তার রক্ষাকবচ। পরিবারের সবাই জানত—যদি কুকুরটিকে আঘাত করা হয়, শিশুটি অদম্য কান্নায় ঘর ভরিয়ে তুলবে।

তবু শিশুটি সবসময় পাশে থাকতে পারত না। রাতে যখন সে ঘুমাত, তখন কুকুরটি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ত। অন্ধকারে তার কান্না ভেসে আসত—এক দীর্ঘ, শোকগাথার মতো হাহাকার। সেই কান্না গলির দেয়াল ছুঁয়ে দূরে ছড়িয়ে পড়ত। মানুষ বিরক্ত হয়ে গালাগাল করত, কিন্তু কুকুরটির কাছে সেটি ছিল নিঃসঙ্গতার আর্তি।

দিনের বেলায় কুকুরটি হয়ে উঠত এক কৌশলী যোদ্ধা। ছোট্ট ঘরে, আসবাবের আড়ালে, সে লুকিয়ে থাকত। পরিবারের সদস্যরা যখন তাকে আঘাত করতে চাইত, তখন সে দৌড়ে পালাত, এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াত। তার ছোট্ট শরীরের মধ্যে যেন জন্ম নিয়েছিল এক অদ্ভুত বুদ্ধি—কৌশল, এড়ানো, বেঁচে থাকা।

তবু শিশুটি যখন পাশে থাকত, তখন সবকিছু বদলে যেত। শিশুর হাতের স্পর্শে কুকুরটির চোখে ফুটে উঠত আনন্দ। তার লেজ নড়ত, তার ছোট্ট জিহ্বা শিশুর হাত চাটত। সে যেন বলত—“তুমি আছো, তাই আমি বেঁচে আছি।”

দিনের পর দিন শিশুটি আর ছোট বাদামি কুকুরটি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকল। তাদের সম্পর্ক যেন ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত গভীরতায় পৌঁছল।

শিশুটি যখন দুঃখে ভেঙে পড়ত, তখন সে টেবিলের নিচে গিয়ে বসত। তার ছোট্ট মাথা কুকুরটির পিঠে রেখে কান্না করত। কুকুরটি তখন নিঃশব্দে তার পাশে থাকত—কোনো অভিযোগ নয়, কোনো প্রতিশোধ নয়, শুধু নিঃশর্ত সান্ত্বনা। তার চোখে ফুটে উঠত এক অদ্ভুত মমতা, যেন সে বলছে—“আমি আছি, তুমি একা নও।”

কখনো শিশুটি রাগে কুকুরটিকে মারত। কিন্তু কুকুরটি সেই আঘাতকে অপরাধের শাস্তি হিসেবে গ্রহণ করত। তার চোখে কোনো বিদ্বেষ থাকত না। বরং আঘাত শেষ হলে সে শিশুর হাত চাটত, লেজ নাড়ত। তার ভালোবাসা ছিল এতটাই নিঃশর্ত যে শিশুর নিষ্ঠুরতাও তাকে দূরে সরাতে পারত না।

পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কুকুরটির সম্পর্ক কখনোই গড়ে ওঠেনি। তাদের কাছে সে ছিল অবাঞ্ছিত, আর তার চোখে তারা ছিল ভয়ঙ্কর। কিন্তু শিশুর কাছে সে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু।

একদিন সন্ধ্যায় ঘরে প্রবেশ করল বাবা। তার চোখে ছিল মদ্যপানের ঝাঁঝ, মুখে ছিল হিংস্র হাসি। রান্নার হাঁড়ি, আসবাব, স্ত্রী—সবকিছুতে তার রাগের ঝড় বয়ে গেল। ঘর ভরে উঠল বিশৃঙ্খলায়।

শিশুটি অভিজ্ঞতায় জানত—এই সময় আশ্রয় খুঁজতে হয়। সে দ্রুত টেবিলের নিচে ঢুকে পড়ল। অন্ধকার কোণে তার ছোট্ট শরীর কুঁকড়ে গেল।

কিন্তু ছোট বাদামি কুকুরটি কিছুই জানত না। সে শিশুর হঠাৎ লুকিয়ে পড়াকে খেলাচ্ছলে দেখল। তার চোখে আনন্দের ঝিলিক, লেজ নাড়তে নাড়তে সে এগিয়ে এল। যেন বলছে—“আমিও খেলায় যোগ দিই।”

ঠিক তখনই বাবার চোখে পড়ল কুকুরটি। তার মুখে ফুটে উঠল হিংস্র আনন্দ। তিনি ভারী কফি-পট দিয়ে কুকুরটিকে আঘাত করলেন। কুকুরটি বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল, তারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আবার উঠে দাঁড়াতে চাইলে দ্বিতীয় আঘাত তাকে নিস্তেজ করে দিল।

শিশুটি কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার ছোট্ট বুক থেকে বেরিয়ে এল প্রতিবাদের চিৎকার। সে যেন এক ক্ষুদ্র যোদ্ধা, তার বন্ধুকে রক্ষা করতে প্রস্তুত। কিন্তু বাবার চোখে তখন কোনো দয়া ছিল না।

তিনি কুকুরটিকে পা দিয়ে লাথি মারলেন, তারপর এক পা দিয়ে ধরে তুলে নিলেন। কুকুরটি আতঙ্কে ছটফট করতে লাগল। বাবার চোখে তখন এক অদ্ভুত উল্লাস—যেন তিনি কোনো খেলায় মেতে উঠেছেন।

তিনি কুকুরটিকে মাথার উপর ঘুরিয়ে কয়েকবার দোলালেন, তারপর জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেললেন।

কুকুরটির দেহ বাতাসে ভেসে উঠল। গলির মানুষ বিস্ময়ে তাকাল। কেউ চিৎকার করল, কেউ হাত থেকে জিনিস ফেলে দিল। শিশুটি ঘরের ভেতর থেকে দীর্ঘ শোকগাথার মতো কান্না করে উঠল।

কুকুরটির দেহ ছাদের উপর আছড়ে পড়ল, তারপর গড়িয়ে গলির পাথরে এসে থামল।

শিশুটি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। তার ছোট্ট শরীরের জন্য প্রতিটি ধাপ ছিল একেকটি পাহাড়। সে দুই হাতে ধাপ আঁকড়ে ধরে নামছিল, চোখে অশ্রু, মুখে কান্না।

অবশেষে সে পৌঁছল গলির পাথরে। সেখানে পড়ে আছে তার একমাত্র বন্ধু—নিঃশব্দ, নিস্তেজ। শিশুটি বসে পড়ল তার পাশে। তার ছোট্ট হাত দিয়ে কুকুরটির মাথা স্পর্শ করল, যেন শেষবারের মতো তাকে আশ্বস্ত করছে।

গলির অন্ধকারে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য। ছোট্ট শিশুটি বসে আছে তার মৃত বন্ধুর পাশে। চারপাশে মানুষের কোলাহল, জানালা থেকে বিস্মিত দৃষ্টি, কারও উপহাস, কারও চিৎকার—কিন্তু শিশুর কাছে পৃথিবী নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

তার চোখে অশ্রু জমে আছে, মুখে নিঃশব্দ শোক। সে ছোট্ট হাত দিয়ে কুকুরটির মাথা স্পর্শ করছে, যেন শেষবারের মতো তাকে আশ্বস্ত করছে—“আমি আছি, তুমি একা নও।”

কুকুরটির দেহ নিস্তেজ, কিন্তু তার আত্মা যেন ভেসে আছে শিশুর কান্নায়। শহরের ধুলো, রোদ, আর মানুষের নিষ্ঠুরতার মধ্যে সে হয়ে উঠেছে এক প্রতীক।

শিশুটি জানে না মৃত্যু কী, জানে না বিদায় কী। সে শুধু অনুভব করছে—তার রাজ্যের একমাত্র প্রজা আর নেই। তার ছোট্ট সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছে। 

এই সমাপ্তি প্রতীক হয়ে ওঠে মানুষের জীবনের এক চিরন্তন সত্যের—ক্ষমতার নিষ্ঠুরতা আর ভালোবাসার নিঃশর্ততা। শিশুটি হলো সেই ক্ষমতার প্রতীক, আর ছোট বাদামি কুকুরটি হলো নিঃশর্ত ভালোবাসা, যা আঘাতের মধ্যেও ক্ষমা করে, কান্নার মধ্যেও সান্ত্বনা দেয়।

গলির অন্ধকারে শিশুর কান্না যেন এক দীর্ঘ শোকগাথা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই কান্নায় চিরকাল বেঁচে থাকে ছোট বাদামি কুকুরটির আত্মা—ভালোবাসার প্রতীক হয়ে, আনুগত্যের প্রতীক হয়ে, মানুষের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদ হয়ে।

..........................................……..……………………………………………………..সমাপ্তি…………………………………………………..….......................................……………


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Drama