STORYMIRROR

Shyamasree (শ্যামশ্রী)

Romance Classics Thriller

3  

Shyamasree (শ্যামশ্রী)

Romance Classics Thriller

জীবনযাপন ( পর্ব - ছয়)

জীবনযাপন ( পর্ব - ছয়)

6 mins
244

সেদিন সব কাজে সুজিত সাহায্য করলো। আরতি খাবার বেড়ে দিলেও, খাবার এগিয়ে দিলো সুজিতই। ছেলে মেয়েরাও শান্ত ভাবে নিজে হাতে খাবার সারলো মায়ের পাশে বসে। কেবল সুজিত আর বিল্টু বাইরে দালানে খেলো। আরতি তেমন কিছু মুখে দিলো না। তবে সামান্য ভাত খেলো, নইলে ছেলে মেয়েরা ঠিক বাবাকে বলে দিতো। রাতের কাজের সময় ছেলে মেয়েরা মায়ের কাছ ছাড়তেই চাইছিলো না। জোর করে ছেলে মেয়েদের ঘরে পাঠালো। এমন সময় একটা হাতের স্পর্শে পেছন ঘুরে দেখে বিল্টু দাঁড়িয়ে। আরতি কিছু একটা বলতে যাওয়ার আগেই বিল্টু বললো "সংসার তো চুটিয়ে করছ দেখছি। স্বামীকেও দেখি হাতের মুঠোয় রেখেছ। ছেলে-মেয়েগুলোও তাই। "

তারপর একটা দেঁতো হাসি হেসে বললো "সবটা জানে সুজিত, আমার তো মনে হলো না। "

আরতি মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো, বিল্টু আরতির কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে টেনে টেনে বললো "তোমার এই সুখের সংসার এখন আমার হাতে। যদি বাঁচাতে চাও আজ রাতে আমার ঘরে এসে আমার পাওনাটা মিটিয়ে দাও, নইলে..." বলে হাসতে হাসতে ঘর থেকে বের হতে গিয়ে দেখে দরজার কাছে সুজিত দাঁড়িয়ে।

" আরে আপনি এখানে দাঁড়িয়ে? "

" হ্যাঁ, সে আমি আমার বাড়ির সর্বত্র যেতে পারি। আপনি এখানে কি করছেন।"

সুজিতের গলা শুনে আরতির মাটি দুলে উঠল, সে কি শুনেছে কে জানে। তাছাড়া গলার স্বরে রাগের প্রকাশ আরতির দৃষ্টি এড়ালো না।

" আরে দাদা আমি এসেছিলাম আরতির কাছে।"

" কেন? কি প্রয়োজন? "

" প্রয়োজন বলতে, মানে জল"

" জল!!"

" হ্যাঁ রাতে জল খাবার জন্য একটা ঘটি চাইতে এসেছিলাম।"

" সেটা আমাকে বললেই পারতেন, রান্নাঘর পর্যন্ত আসার কি ছিল।"

" আপনি কাজে ব্যস্ত ছিলেন, আর সামনে কাউকে না দেখে... "

" ঠিক আছে ঘরে যান, আপনার বিছানা তৈরি। আমি জল দিয়ে আসব।"

বিল্টু হেঁ হেঁ করে হাসতে হাসতে চলে গেল।

সুজিত রান্নাঘরে এসে দেখলো আরতি চুপ করে বসে রয়েছে।

সুজিত বললো " কাজ সারা হলো? নাকি সারারাত এখানেই বসে থাকবে? "

আরতি তেমন করেই বসে রইলো।

" আমার ঘুম পেয়েছে আমি চললাম,বেশী রাত করো না।"

হঠাৎ আরতির শীত শীত করতে শুরু করলো। কেমন একটা ভয় ওকে ঘিরে ধরলো।

সে বয়স পরিস্থিতি সব ভুলে ছুটে গিয়ে সুজিতকে জড়িয়ে ধরলো আরতি।

সুজিতের রাগ হয়েছিলো বটে। কিন্তু স্ত্রীকে এমন করতে কখনো দেখেনি। বিয়ের প্রথম প্রথমও না। সে নিবিড় করে আরতিকে জড়িয়ে ধরে বললো "কি হয়েছে তোমার? এমন করছো কেন?"

আরতি কিছু না বলে সুজিতকে ওমন করেই জড়িয়ে ধরে রাখলো।

সুজিতও আর কোনো প্রশ্ন করলো না। অলক্ষ্যে একজোড়া চোখ ওদের দেখে একটা ক্রুর হাসি হেসে সেখান থেকে চলে গেল।

বেশ কিছুক্ষন পরে সুজিত বললো "শরীর খারাপ লাগছে তোমার? থাক বাকি কাজ কাল করে নেবে। চলো এখন ঘরে চলো ", বলে সুজিত নিজের হাতে রান্না ঘরের কুপি লন্ঠন নিভিয়ে দরজা আঁটকে আরতিকে ঘরে নিয়ে এলো। আরতি ঘরে এসে অবাক না হয়ে পারলো না,আজ সুজিতও নিজে হাতে রাতের মশারী টাঙিয়েছে। যে মানুষ এই কাজটা হাজার বললেও করেনা, সে নিজে হাতে করেছে।

" কি গো কি দেখছো? দেখেছ তো আমি কেমন তোমার কাজ কমিয়ে রেখেছি।"

আরতি হেসে আর কোনো কথা না বলে ছেলে মেয়েদের ঘুম পারাতে শুরু করলো।

ঘুম পারাতে পারাতে বললো "হঠাৎ করে এই বুদ্ধিটা কার?"

" ছেলে মেয়েরা চুপ করে রইলো। "

"খাট আর চৌকিটা একসাথে লাগানো হয়েছে কার বুদ্ধিতে?"

সবাই একসাথে সুজিতের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখালো।

সুজিত আমতাআমতা করে বললো "আমি কি করবো, ওরাই তো মায়ের কাছে শোবো মায়ের কাছে শোবো করছিলো। সে আমি একা শুবো নাকি?"

আরতি সুজিতের কথা শুনে ফিক করে হেসে ফেললো।

সবাই মিলে একসাথে শুয়ে পড়লো।আরতির আজ নিজেকে রাজরানি মনে হলো। মনে হলো তারমতো কেউ সুখী নেই।

সুজিত হঠাৎ করে উঠে বসে বললো " যা ভুলেই গিয়েছি।"

আরতি স্বামীর কথা শুনে বললো "কি ভুলে গেলে আবার?"

" আরে বিল্টুবাবুকে জল দিয়ে আসা হয়নি।"

বিল্টুর নাম শুনে আরতির শরীর রিরি করে উঠলো। বলতে ইচ্ছে করলো যেতে হবে না তোমায়। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারলো না।

সুজিতকে উঠতে দেখে আরতিও উঠে আসছিলো দেখে সুজিত বললো " আবার তুমি উঠছো কেন? আমি দিয়ে আসছি। "

" হ্যাঁ সে দিয়ে আসো, আমি একটু দেখে নিই অয়নের কোনো ওষুধ বাদ থেকে গেছে নাকি?"

সুজিত "ও আচ্ছা " বলে খাট থেকে নামলো। আরতি মুখ ফুটে বলতে পারলো না যে সে কোনো মতেই স্বস্থি পাচ্ছেনা সুজিতকে বিল্টুর সাথে ছাড়ার। যদি সব বলে দেয়।

বাইরে চলে যাওয়ার জন্য দরজা খুলতেই দেখে উঠোনে বিল্টু দাঁড়িয়ে, "আরে বিল্টু আপনি উঠোনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন?"

"আর বলবেন না, খাবারটা বেশি হয়ে গিয়েছে। তাই হাঁটছিলাম।" আরতি ঘর থেকেই সবটা শুনলো,কিন্তু কেন জানিনা মনে হলো বিল্টু মিথ্যা বলছে, দোরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো সে। কারণ দরজা খোলার সময় বারান্দা থেকে উঠোনে নামার শব্দ শুনেছে ও।সুজিত কি কিছুই লক্ষ্য করেনি, মনে মনে ভাবলো আরতি। একটা ছোট্ট শ্বাস ছেড়ে ভাবলো না বুঝতে পারলেই ভালো।

সুজিত বললো " ভালো খাবার পরে হাঁটা।"

বিল্টু হেসে মাথা দোলালো, "আপনি শোননি কেন?"

" আরে শুয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু আপনাকে খাবার জলটা দেওয়া হয়নি তাই.. "

" এমা ছিঃ ছিঃ, তাতে কি? কলঘরে গিয়ে জল খেয়ে নিতাম। আমার অভ্যাস আছে তো। "

" তাই কি হয়? আপনি আমাদের অতিথি। " বলে রান্না ঘরে গিয়ে একঘটি জল এনে দিলো।

আরতি ঘর থেকে সবকিছুই নিরীক্ষণ করছিলো। মিনিট দুই কথা বলার আগেই আরতি ঘর থেকে স্বামীকে ডেকে বললো "তুমি কি নিজেও শোবে না কিংবা উনাকে শুতে দেবে না? এসো ঘরে এসো।"

সুজিত " যাচ্ছি এখুনি সবুর করো।" বলে বিল্টুকে বললো "দাদা এখন আসি, ছেলে মেয়ে সবাই আমরা একসাথে শুয়েছি। আমার অয়নটার আবার ঘুম পাতলা।বেশি উঠা নামা করলে ওর ঘুম ভেঙে যাবে। ওর আবার শরীরটাও ভালো নেই।"

বিল্টু বললো "ঠিকই ঠিকই, যান যান আপনি ঘরে যান। তাছাড়া আরতিরও মনে হয় শরীরটা ভালো নেই। ওরও ঘুম প্রয়োজন। "

সুজিত লজ্জিত হয়ে বলল " কিছু মনে করবেন না, আজকে যা হলো। ও তো সুস্থই ছিল। কিন্তু কিভাবে.."

" আরে আরে আমাকে এতো কিছু বিশ্লেষণ করতে হবে না, জানি আপনি আরতিকে ভালোই রেখেছেন, আর শরীর থাকলে রোগ হতেই পারে। আর সত্যি বলতে কি মেয়েরা কখনো নিজেদের কোনো কথাই স্বামীকে খুলে বলতে পারে না,অনেক কিছুই গোপন করে রাখে।"

সুজিত বললো " আরতি সরল সাধাসিধা স্বভাবের, ওর কোনো কথা গোপন করতেই জানেনা।"

" আহ্ আমাকে ভুল বুঝেছেন, আমি ওই কথা বলতে চাইনি, আমি বলতে চেয়েছি মেয়েরা নিজেদের অসুস্থতা ও কষ্টের কথা গোপন রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।"

এবারে সুজিত মাথা দুলিয়ে বললো " সেটা ঠিকই বলেছেন।"

" সে ঠিক ভুল অনেক হয়েছে, আপনি ঘরে যান। আমিও শুতে যাই।"

" আচ্ছা, আসি তবে। কোনো অসুবিধা হলে ডাকতে দ্বিধা করবেন না কিন্তু। "

" অবশ্যই, আর এতো ভাববেন না। তাছাড়া কোনো অসুবিধা হবে বলে আমার মনে হয় না।আমি নিশ্চিন্ত হয়ে শুতে যান"

" আচ্ছা, আচ্ছা।" বলে সুজিত ঘরে এসে দেখলো স্ত্রী দোরের কাছেই দাঁড়িয়ে।

" তুমি শোও নি।"

" না শোবো তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। "

" আর বলো না একটু দেরী..."

" ঠিক আছে শুয়ে পড়ো, আমি দোর লাগিয়ে দিচ্ছি।"

সুজিত বুঝতে পারলো আরতি বিরক্ত হয়েছে, তাই চুপচাপ বিছানায় উঠে গেল।

আরতি দরজা লাগাতে লাগাতে দেখলো বিল্টু তখনও ওর ঘরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আরতি একটা কষ্টের হাসি হেসে মুখের উপর দরজাখানা বন্ধ করে দিলো। বিল্টুর মুখেও ক্রুর হাসিটা ফুটে উঠলো..


চলবে..



এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Romance