Partha Sarathi Paramanik

Inspirational Others


4.2  

Partha Sarathi Paramanik

Inspirational Others


বর্ষার এক রাতে

বর্ষার এক রাতে

6 mins 288 6 mins 288



বর্ষার এক রাতে

পার্থ সারথি পরামানিক


আমি বরাবরই একটু নিরীহ গোছের, ঝগড়া ঝামেলা থেকে সহস্র হস্ত দূরে থাকি । সেই আমি যে এমন কাণ্ড বাঁধাব স্বপ্নে‌ও ভাবি নি । 


পি. এস. সি. পরীক্ষায় সফল হয়ে সদ্য যোগ দিয়েছি সরকারি চাকুরিতে । কলকাতার বিকাশ ভবনে । আমার বাড়ি পুরুলিয়া জেলায় । বাড়িতে মা, বাবা, বোন আছে । আমি কোলকাতায় মেসে থাকি । শুক্রবার অফিস করে ওই পথেই বাড়ি যাই আবার সোমবার বাড়ি থেকে সোজা অফিস । এভাবেই চলছিল ।


তখন বর্ষাকাল । সদ্য মৌসুমি বায়ু পরিপুষ্ট হয়ে এসেছে । জাম পাকার মত কাল মেঘ সকাল থেকেই ঘিরে ধরেছে । মাঝে মাঝেই চলছে অঝোর বর্ষন । দিনটা শুক্রবার । বাড়ি যাওয়ার দিন । প্রকৃতি দেবী অতোটা নিরাশ করলেন না – বিকেলের দিকে বৃষ্টি অনেক কমে এল, ছাতা নিয়ে অনায়াসে যাতায়াত সম্ভব । অফিস ছুটি হতেই বেরিয়ে পড়লাম । উল্টোডাঙার ওখানে একটু জল জমেছিল – কিন্তু দুপুর থেকেই বৃষ্টিটা ধরে আসায় বিশেষ অসুবিধা হয় নি । 


হাওড়া‌য় পৌঁছলাম প্রায় ৬ টায় । ট্রেন ৬:২০ তে । ঘুরে ফিরে নিত্য-যাত্রী‌দের প্রবল করুনায় একটা সিট পেলাম । ট্রেন চলতে আরম্ভ করল । বাইরে গাঢ় অন্ধকার, শুধু নাছোড়বান্দা আলোগুলো ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না । ঠিক বর্ধমান ঢুকবো হঠাৎ আবার কোত্থেকে তেড়েফুড়ে বৃষ্টি নামিয়ে দিল । সঙ্গে সঙ্গে দরজা জানালা বন্ধ করার একটা ধুম পড়ে গেল । তারপর যথারীতি বর্ধমান, দুর্গাপুর, রানিগঞ্জ পার হয়ে ট্রেন আসানসোলে এসে থামল । বৃষ্টির ধারা তখনও অঝোরে ঝরছে । 


বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব । পাশের স্টল থেকে এক পেয়ালা চা নিয়ে একটু এগিয়ে গেলাম । মধুকুণ্ডা যাবার ট্রেন এসে দাঁড়িয়ে আছে । ছাড়বে রাত ১০:৩০ এ । এমনিতেই ট্রেনটা গুটিকতক প্যাসেঞ্জার নিয়ে ঝিমোতে ঝিমোতে যায় । তারপর সেদিন তো বৃষ্টি হচ্ছিল, সেদিন প্রায় জনশূন্য । চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে – ওটা ফেলে দিয়ে একটা কামরায় উঠে পড়লাম । আমি একটু আগের দিকে করে চাপি । ওদিকটা আরও ফাঁকা থাকে কিন্তু মধুকুণ্ডা ষ্টেশনে নেমে যেতে সুবিধা হয় । একটু এগিয়ে থাকা আর কি ! ঘরকুনো বাঙালি – শুক্রবার ঘরে ফেরার জন্য মনটা কেমন কেমন করে ।


ইঞ্জিনের পরের পরের বগিটায় আমি চাপি । শুক্রবার ওই সিটটাও বোধহয় আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকে । যথারীতি ওখানে গিয়ে বসলাম । আমার ডান দিকের সিটে দেখলাম একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক, পরনে সুন্দর কাজ করা পাঞ্জাবি – পাজামা, হাতে দামি ঘড়ি, গলায় সোনালি চেন, পাশে সর্বালঙ্কারভূষিতা স্ত্রী, আর সামনের চেয়ারে, জানালার পাশে একটি উনিশ–কুড়ি বছরের মেয়ে । মেয়েটির পোশাক রুচিসম্মত । হাতে কয়েক গাছি সোনার চুড়ি আর হাতঘড়ি ছাড়া অলংকারের আধিক্য নেই । বুঝতে অসুবিধা হয় না এনারা বেশ ধনী পরিবারের এবং কোনও নেমন্তন্ন বাড়ি থেকে উদর পূর্ণ করে এখানে বসে বসে রোমন্থন করছেন । আর ইন্দ্রদেবকে গালমন্দ করছেন আজকের দিনে এমন বৃষ্টি – বাদল আবহাওয়া করার জন্য । বোধহয় তাঁদের আনন্দে অথবা ভোজনে ইন্দ্রদেব কিছুটা জল ঢেলে দিয়েছেন ।


বাইরে বৃষ্টির রেশ কিছুটা কমেছে । এটাই এই লাইনের লাস্ট ট্রেন । টি. টি. থেকে আর. পি. এফ. কেউই প্রায় থাকে না । তাই কারও বিশেষ হেলদোল নেই । রেলকর্তৃপক্ষের অশেষ কৃপায় ট্রেন ১০:৪৫ –এ চলতে শুরু করল । ওই কামরাটিতে ওনারা তিনজন, আমি আর শেষ মুহূর্তে এসে চাপল একটা কম বয়েসি ছেলে – রুগ্ন চেহারা, কালো গায়ের রং দেখলে বোঝা যায় অকালে সংসারের বোঝা ঘাড়ে চেপে বসেছে ।


যাই হোক, ট্রেন ছাড়ল । বাইরে বৃষ্টি চলছে । একবার করে বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় বাইরেটা দৃশ্যমান হয়ে আরও কোন অতল গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে । এভাবেই ট্রেন আসানসোল ছেড়ে বার্নপুরে পৌঁছাল । ষ্টেশনে দু–চার জনের বেশি চোখে পড়ল না । আমরা আগের দিকে চেপেছি, এখানে আর কেউ-ই চাপল না । স্টেশন থেকে ট্রেনটা ছাড়তেই শুনতে পেলাম কারা যেন দু’দিকের শাটারগুলো টেনে নামাল । অতটা গ্রাহ্য করলাম না । এরপরই দু’জন লোক দু’দিক থেকে এগিয়ে এল । একজনের বয়স প্রায় ২৩-২৪। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা – যাকে বলে কদম ছাঁট, উচ্চতা মাঝারি, সামনের দাঁত অবিন্যস্ত – হিংস্র প্রকৃতির । আরেকজন ওর থেকে আন্দাজ বছর চারেকের ছোট, মাথার চুল একই রকম, উচ্চতাও । গায়ের রঙ একটু বেশি কালো, চোখ দুটো খুব ধূর্ত । বড়টা আমাদের পাশে এসে বসল, ছোটটা দাঁড়াল একটু পেছনে । 


রাতের ট্রেন, একটু ঝিমুনি তো আসেই । হঠাৎ তন্দ্রা কেটে গেল মেয়েটির গোঙানির আর দেঁতো লোকটার কর্কশ আওয়াজে । মেয়েটির গলায় ধারালো ছুরি ঠেকিয়ে ওদের বলছে সব গয়না-গাঁটি খুলে দিতে । পেছনের কালো ছেলেটার হাতেও একটা ঝকঝকে বড় ছুরি । প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলেন । আমরা লোকটার দিকে তাকাতেই আরও কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠল, তোরা চুপচাপ বসে থাক, তোদের সঙ্গে আমাদের কোনও শত্রুতা নেই । তারপর আবার ওই ভদ্রলোকদের অভদ্র ভাবে শাসাতে লাগল, মেয়েটিকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে লাগল । শেষে নিরুপায় হয়ে তাঁরা সব গয়নাপত্র খুলে ফেলতে লাগলেন, নগদ যা ছিল তাও বের করলেন । আমি জীবনে কখনও এরকম পরিস্থিতিতে পড়িনি । কী করব কিছুই ভেবে পাচ্ছি না, শুধু ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করছি, ঠাকুর রক্ষা করো ! আর তখনই মনে পড়ল আরেক ঠাকুরের কথা – তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা / বিপদে আমি না যেন করি ভয়’ । মনে শক্তি সঞ্চয় করে, পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করলাম – আর ২-৩ মিনিটের মধ্যেই দামোদর স্টেশন চলে আসবে, স্টেশনটা ফাঁকা ফাঁকা, ওরা একবার নেমে গেলে আর কিছুই করার থাকবে না । 


হঠাৎ সুযোগ এসে গেল । কম বয়েসি ছেলেটা আরও কিছুটা পিছিয়ে গেছে, বোধহয় নামবার প্রস্তুতি নিচ্ছে আর বড়োটা গয়না–টাকাগুলো নেবার জন্য ছুরিটা আলগা করেছে । আমার হাতে অস্ত্র বলতে অফিস যাওয়া ওই নিরীহ ব্যাগটা । ওটা পাশে রাখা । আস্তে আস্তে হাতলটা ধরলাম তারপর অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করে ব্যাগটা সজোরে মারলাম ওর মুখে । ট্রেনটা রানিং ছিল, টাল সামলাতে না পেরে ও দুটো চেয়ারের মাঝখানে পড়ে গেল আর হাতের ছুরিটা ছিটকে ঢুকে গেল চেয়ারগুলোর নীচে । প্রৌঢ় লোকটি কাল বিলম্ব না করে ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে আস্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলেন । 


আমি আরেকটা ছেলের দিকে এগুলাম । সঙ্গে সঙ্গে রুগ্ন অল্পবয়েসি ছেলেটাও এল । আমি প্রায় ওকে ধরে ফেলেছিলাম কিন্তু ছুরিটা চালাতেই আমার হাতের অনেকটা কেটে গেল, ফলে ছেড়ে ফেললাম । এদিকে ট্রেনও তখন স্টেশনে ঢুকে গেছে । ওই অবস্থায় সাধারণ যাত্রীর পক্ষে নামা অসম্ভব কিন্তু ওদের পক্ষে নয়, ও অনায়াসেই নেমে গেল ।


তাড়াতাড়ি পকেট থেকে রুমালটা বের করে ক্ষতস্থানটা চাপা দিলাম কিন্তু রক্ত বাগ মানছে না । এদিকে দেখি লিকলিকে ছেলেটা ওই প্রৌঢ় লোকটির সঙ্গে আটকে পড়া আসামীটির হাত-দুটো পেছনে করে ওরই পরনের গেঞ্জিটা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলেছে ; তারপর ওর মুখ নীচের দিকে করে পিঠের উপর বসে আছে ।


আমার হাতের রক্ত দেখে ওরা বিচলিত হল । বললাম, উপর উপর গেছে, বিশেষ চিন্তার কারণ নেই । এর ফাঁকে কখন বৃষ্টি থেমে গেছে টেরই পাই নি । ট্রেন স্টেশনে দাঁড়াল । আমরা সবাই মিলে ওকে স্টেশন ম্যানেজারের কাছে নিয়ে এলাম ।


ঘরটি ফাঁকা ফাঁকা, একা উনি কাজ করছেন আর টিকিট কাউন্টারে একজন শুধু শুধু পসার খুলে বসে আছেন । আমরা ভেতরে ঢুকতেই একটা হুলুস্থুল কাণ্ড বেধে গেল । ডাকাডাকিতে দুজন আর. পি. এফ. এলেন । ওঁদের হাতেই আপাতত শ্রীমানকে গচ্ছিত করলাম । আর. পি. এফ. দু’জন কথা কম বলেন, কাজ বেশি করেন । হাতে এমন বাঁধা চোর পেতেই প্রথমে আগাপাশতলা ঠেঙিয়ে নিলেন, তারপর মোটা দড়িতে ভালো ভাবে বাঁধতে লাগলেন ।


ম্যানেজারবাবু অতি সজ্জন লোক, তাঁর ডিউটির সময় এমন ঘটনা ঘটে যাওয়ায় তিনি অত্যন্ত লজ্জিত । আমার হাতের অবস্থা দেখে তিনি নিজে ফার্স্ট এড বক্স আনিয়ে আমার শুশ্রূষা করলেন । চোট খুব একটা গভীর নয় তবে অনেকটা জায়গা কেটে গেছে । কাল একটা (অ্যান্টি) টিটেনাস ইঞ্জেকশন নিয়ে নিতে বললেন । ব্যাথাও হচ্ছিল কিন্তু একটা কিসের আনন্দে সব ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল । ওই আক্রান্ত সহ-যাত্রীরাও বারবার সমবেদনা জানাচ্ছিলেন ।


সই-সাবুদ করে যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম, দেখলাম স্টেশন চত্বরে জনা-ত্রিশেক লোক মহা কৌতূহলে আমাদের দিকে চেয়ে আছে । আস্তে আস্তে ট্রেনে গিয়ে উঠলাম । ভদ্রলোকটি আমার ব্যাগটা কুড়িয়ে এনে দিলেন । দেখলাম হাতলটা ছিঁড়ে গেছে । ব্যাগটায় কয়েকটা জামা-প্যান্ট ছাড়াও একটা মাঝারি সাইজের স্টিলের টিফিন-বক্স আছে – এতক্ষণ মনে ছিল না । মা সোমবার ওটা ভর্তি করে দিয়ে দেন আর আমি শুক্রবার সেটা খালি করে নিয়ে যাই । তাই আঘাতটা এতোটা জোরালো হয়েছিল ।


ট্রেন ছাড়ল । প্রায় সবাই এই কামরাটিতেই উঠে পড়ল । ঘড়িতে ১১:৩০ । বৃষ্টি থেমে গেছে । ব্যাঙেদের সোৎসাহ উল্লাস দূর থেকে ভেসে আসছে । কামরায় মৃদু গুঞ্জন চলছে । সবাই আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছিল আর আমি ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে । হে ঠাকুর, আমি সর্বদাই বিপদে যেন না করি ভয় ।  



Rate this content
Log in

More bengali story from Partha Sarathi Paramanik

Similar bengali story from Inspirational