বালিতে প্রেমের খোঁজ
বালিতে প্রেমের খোঁজ
লেখক: প্রসূন কুমার দত্ত
দিল্লি ডিসেম্বর ২০২৪
বালিতে প্রেমের খোঁজ
বছর খানেক আগে গুরগাঁওতে সেক্টর ১০৮ এ এসেছে শুভেন্দু। বহুতল আবাসনের নাম শোভা সিটি। বছর বত্রিশের যুবক। পেশায় অর্থনীতিবিদ। গায়ের রঙ কালোর দিকে হলেও প্রায় ছ ফুট লম্বা মেদহীন চেহারা। শুভেন্দুকে সবাই হ্যান্ডসাম বলে।
শোভা সিটির সি২ টাওয়ারে প্রায় ২৪০০ স্কোয়ার ফুটের আধুনিক ফ্ল্যাটটা কিনেছিলেন শুভেন্দুর বাবা। আইআইটির অধ্যাপক ছিলেন। বিদেশেও অধ্যাপনা করেছেন। অবসর নিয়ে এই ফ্ল্যাটে থাকেন। বাবা মার সঙ্গে যৌথ পরিবারে দাদা বৌদি আর শুভেন্দু এখানেই থাকে। শুভেন্দুর একমাত্র বোন শুভ্রা পুনেতে পড়তে গিয়ে পাঞ্জাবি ছেলে নকুলকে বিয়ে করেছে।
শুভেন্দু বিয়ে করে নি। দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিক্সে পড়ার সময় সহপাঠী সুচরিতার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সম্পর্ক টেকে নি। সুচরিতা এখন বিবাহিতা। থাকে লন্ডনে। আর কোনো মেয়ে শুভেন্দুর জীবনে আসে নি।
শুভেন্দুর সখ দেশ বিদেশে ঘোরা আর ফটোগ্রাফি। গুরগাঁওতে একটা নামকরা বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করে। রোজগার বেশ ভাল তবে ছুটিছাটা কম। তবুও বছরে সপ্তাহ দুয়েক পেয়েই যায়। গতবছর দেওয়ালির ঠিক পরেই ও বালি দ্বীপ ঘুরতে গিয়েছিল। বিদেশে যে খুব একটা যায় তা নয়। গেলেও ইউরোপ আমেরিকা নয়। বন্য জীবনে আগ্রহ আছে তাই কেনিয়ার মাসাই মারা আর তানজানিয়ার সেরেঙ্গাটি দেখেছে। তাছাড়া মিশর আর উজবেকিস্তান গিয়েছিল। ব্যাস ওইটুকুই। বাকি সব ঘোরাঘুরি দেশেই। বালির ব্যাপারে একটা ডকুমেন্টারি দেখে উৎসাহিত হয়েছিল। তাই ভাবল একবার যাওয়া যাক।
বালি দ্বীপ ইন্দোনেশিয়ার অংশ। ভারত মহাসাগরে এর অবস্থান ভূমধ্য রেখার আট ডিগ্রি দক্ষিণে। সারা বছর উষ্ণ ও আদ্র আবহাওয়া। খুব গরম পড়ে না আর ঠান্ডার বালাই নেই। নভেম্বরে চার মাস ব্যাপী বর্ষা কাল শুরু। এই মাসে বৃষ্টির তীব্রতা কম থাকে। মাঝে মাঝে বর্ষণ হলেও লাগাতার নয়। বৃষ্টি হলেই আদ্রতা কমে আবহাওয়া মনোরম হয়ে যায়।
আবহাওয়া বা অবস্থান নয়। শুভেন্দুর আগ্রহ ছিল অন্য ব্যাপারে। ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে মুসলমান বহুল দেশ। কিন্তু ওদের সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র বালির অধিবাসীদের নব্বই শতাংশই হিন্দু। সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থান। বালির হিন্দুরা অবশ্য নিজেদের ভারতীয় হিন্দুদের থেকে স্বতন্ত্র ভাবে। বালির হিন্দুদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির এই অভিনবত্ব শুভেন্দুকে আকৃষ্ট করেছিল। যাবার সমস্ত ব্যবস্থা অর্থাৎ প্লেনের টিকিট, ভিসা, ইন্সিওরেন্স, হোটেল আর গাড়ি ওর এক কলকাতার ট্রাভেল এজেন্ট বন্ধু অমিত করে দিয়েছিল। এমনকি বালিতে কোন দিন কোথায় যাবে তার বিস্তৃত পরিকল্পনা ও অমিত করে দিয়েছিল।
বালির ডেনপাসার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে আধঘণ্টার দুরত্বে সেমিনিয়াক সমুদ্র সৈকতের কাছে ছিল শুভেন্দুর হোটেল। খুব পরিচ্ছন্ন বালুচর। একদিকে সমুদ্র আর অন্যদিকে রেস্টুরেন্ট। বালুচরে খোলা আকাশের নিচে ছাতার তলায় বসে খাওয়ার ও পান করার ব্যবস্থা আছে। শুভেন্দু রেস্টুরেন্টের ভেতরে সমুদ্র মুখি টেবিলে একটা বিনতাং নিয়ে বসেছিল। বিনতাং ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রিয় বিয়র।এর স্বাদ শুভেন্দুর অসাধারণ লেগেছিল। রেস্টুরেন্টে সবাই প্রায় বিদেশি পর্যটক। অনেকেই বিনতাং নিয়েছে। হঠাৎ একটা কোণের টেবিল থেকে হিন্দি কথাবার্তা শুনল শুভেন্দু। আরে সুচরিতা না? দেখতে অনেকটা সুচরিতার মত হলেও সুচরিতা হতে পারে না। মেয়েটা বেশ লম্বা। তাছাড়া মেয়েটা আর সঙ্গের ছেলেটা দুজনেই সামনে বিনতাং রেখে সিগারেট টানছে। সুচরিতা সিগারেট পছন্দ করত না।
স্লিভলেস ব্লাউজ আর ট্রাউজার পরা মেয়েটা শ্যামাঙ্গিণী। টিকোলো নাক, পুরুষ্ট উপরের ঠোঁট বেশ আকর্ষক। কালো মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে উজ্জ্বল চোখ। সব মিলিয়ে বেশ স্মার্ট আর বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। শুভেন্দুর মনে হল সুচরিতার পর এরকম কাউকে সে খুঁজছে। ছেলেটা হাসব্যান্ড না বয় ফ্রেন্ড? শুভেন্দু নিশ্চিত হতে পারল না। ফর্সা আর একটু ভারিক্কি চেহারার ছেলেটা শুভেন্দুর মত দাড়ি রেখেছে।
পরের দিন বেলা এগারটায় শুভেন্দু গিয়েছিল উবুদ শিল্পকলা বাজারে। এই বাজারটা বিখ্যাত। পর্যটকরা এখানে আসে বালির হস্তশিল্প কিনতে। ভাস্কর্য, আসবাবপত্র, পোশাক আশাক, পারফিউম, হ্যান্ডব্যাগ, আভূষণ ইত্যাদি সবকিছুই পাওয়া যায়। শুভেন্দুর আগ্রহ ছিল বাটিক শিল্পে। ও একটা বড় দোকানে গিয়েছিল। এক তলায় একদিকে কারিগররা বাটিকের কাজ হাতে কলমে প্রদর্শন করছে। অন্যদিকে বিক্রির জন্য থরে থরে সাজানো আছে জামা কাপড়, টুপি, হ্যান্ডব্যাগ আরও অনেক কিছু। দোতলায় আছে বাটিক হ্যান্ড পেইন্টিং গ্যালারি। শুভেন্দুর পেইন্টিংএ খুব আগ্রহ। দোতলায় উঠে ও সেই মেয়েটাকে দেখতে পেল। চুম্বনরত এক জুটির পেইন্টিংএর সামনে ওরা সেলফি তুলছিল। আজ দিনের বেলায় পশ্চিমি পোশাকে ওকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল। শুভেন্দুর একটা পেইন্টিং পছন্দ হল। বোন শুভ্রার জন্য কিনে ফেলল সেটা। দাম দশ লাখ ইন্দোনেশিয়া রুপিয়া। মানে ভারতীয় টাকায় পাঁচ হাজার তিনশ। ইন্দোনেশিয়া রুপিয়ার মূল্য খুব কম। শেষের তিনটে শূন্য মূল্যহীন।
পেইন্টিং কিনে শুভেন্দু গিয়েছিল পরবর্তী গন্তব্য স্থলে। তেগেননানগান জলপ্রপাত। খুব একটা উঁচু নয়। নীলচে সবুজ স্বচ্ছ জল। নয়নাভিরাম দৃশ্য। পার্কিং থেকে প্রায় একশ সত্তর সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামল শুভেন্দু। সঙ্গে সাঁতারের পোশাক এনেছিল। পোশাক পরিবর্তনের সুন্দর ব্যবস্থা আছে। জলে নামল শুভেন্দু। নিজের অজান্তেই হয়ত মেয়েটাকে খুঁজছিল। কিন্তু ওরা ওখানে ছিল না। অনেক্ষণ নির্মল জলে স্নান করে উঠেছিল শুভেন্দু। কয়েক ধাপ ওপরে উঠেই ডান হাতে একটা রেস্টুরেন্ট। পাহাড়ের কোলে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে একটা বিনতাং নিয়ে মেয়েটার কথাই ভাবছিল। ওই রেস্টুরেন্টের ছিল প্রাইভেট লিফট। খরিদ্দাররা ব্যবহার করতে পারে। তাই কষ্ট করে হেঁটে উঠতে হল না।
লাঞ্চ সেরে শুভেন্দু গিয়েছিল একটা কফি বাগান দেখতে। বিশাল বাগানে কফি ছাড়া আছে কাঁঠাল আর আনারস গাছ। এছাড়া আছে বিভিন্ন মশলাপাতির গাছ। এখানে কফি প্রসেসিং ইউনিট আছে। নানা রকম কফি উৎপাদন হয়। মুখ্য আকর্ষণ বালির পৃথিবী বিখ্যাত লুওয়াক কফি। ইন্দোনেশিয়ায় আছে পাম সিভেট বিড়াল। কফির ফল খেয়ে চব্বিশ ঘন্টা বাদে মল ত্যাগ করে এই বিড়াল। সেই বিষ্ঠা থেকে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় লুওয়াক কফি। মহার্ঘ এই কফি। ত্রিশ হাজার টাকায় এক কেজি। শুভেন্দুর বৌদি কফি পছন্দ করে। তাই একশ গ্রাম কিনল। লুওয়াক কফি নয় তবে অন্য অনেক রকম কফির বিনামূল্যে আস্বাদন করার সুবিধা এখানে আছে। একটা কোকোনাট কফির কাপ নিয়ে শুভেন্দু দেখল ওদের। ছেলেটা আর মেয়েটা একটা প্যাকেট হাতে নিয়ে পেমেন্ট কাউন্টার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
বালিতে আগ্নেয়গিরি আছে। কফি বাগান দেখে বালির উত্তরে কিন্তামনি অঞ্চলে সেই বাটুর আগ্নেয় গিরি দেখতে এসেছিল শুভেন্দু। ইউনিসেফ হেরিটেজ সাইটের স্বীকৃতি প্রাপ্ত জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। ২০০০ সালে শেষ অগ্নুৎপাত হয়েছে। এখন দূর থেকে পাহাড়ের ওপরে দুটো ক্রেটারের মুখ দেখা যায়। কয়েকটা হকার শস্তা নিম্নমানের জিনিস বেশি দামে বিক্রি করতে চাইছিল। তাদের এড়িয়ে একটা ডাবের জল খেয়ে খোশমেজাজে আগ্নেয়গিরির পটভূমিতে একটা সেলফি নিল শুভেন্দু। তারপর বাঁদিকে তাকাতে একটু দূরে দেখতে পেল তাকে যাকে ও দেখতে চাইছিল। ঘনিষ্ঠ ভাবে দাঁড়িয়ে মেয়েটা আর ছেলেটা সেলফি তুলছে। উপযাচক হয়ে আলাপ করার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল শুভেন্দুর। উচিত অথবা শোভন কোনোটাই হবে না ভেবে সেই অভিপ্রায় ত্যাগ করলো।
পরের দিন সকালে কোথাও যাবার ছিল না। সকালে দেরিতে উঠে হোটেলের জিমে কসরৎ করে ব্রেকফাস্ট সেরে একটু হাঁটতে বেরোলো শুভেন্দু। ভ্যাপসা গরম। ভাগ্যিস ছাতা নিয়ে বেরিয়েছিল। বাতাসে আর্দ্রতা একটু বাড়লেই এখানে বৃষ্টি নামে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। হোটেলে ফিরে সুইমিং পুলে কিছুটা সময় কাটিয়ে একটু টিভি দেখে লাঞ্চ করল। হিন্দু প্রধান যায়গা হলেও এখানে বিফ মানে গোমাংসে নিষেধাজ্ঞা নেই। খাওয়ার ব্যাপারে শুভেন্দুরও কোনো গোঁড়ামি নেই। ভাতের সঙ্গে বিফের একটা সুস্বাদু প্রিপারেশন খেয়ে খুশিই হল সে।
লাঞ্চের পর গন্তব্য ছিল উলুওয়াতু মন্দির। সমুদ্রের ধারে একটা ছোটো টিলার ওপর অনেক খানি জায়গা নিয়ে এই মন্দির। একাদশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির বালির প্রসিদ্ধ মন্দির গুলোর অন্যতম। বালির হিন্দুরা ট্রিনিটি অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বর কে সংযুক্ত ভাবে পুজো করে। বলা হয় উলুওয়াতু মন্দিরে এই তিন দেবতার শক্তি সম্মিলিত হয়ে বালিকে সুরক্ষিত রাখে। দর্শনার্থীদের জন্য ড্রেস কোড আছে। হাঁটুর নিচে কিছু না পরে থাকলে একটা লুঙ্গির মতো কাপড় জড়াতে দেয়। নাহলে কোমরে একটা কাপড়ের বেল্ট বাঁধাই যথেষ্ট। দর্শনার্থী বলা হয়ত ভুল কেননা বালির সব প্রাচীন মন্দিরের মত এখানেও মন্দিরে ঢুকে বিগ্রহ দর্শন সম্ভব নয়। শুধু মাত্র স্থানীয় অধিবাসীরা অনুমতি নিয়ে ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে।
উলুওয়াতু মন্দিরের আর একটা আকর্ষণ হল কেচাক নাচ। সূর্যাস্তের ঠিক পরেই গেরুয়া সমুদ্রের পটভূমিতে প্রায় সত্তর জন পরিবেশন করে এই নাচ। মুক্ত মঞ্চের একদিকে সমুদ্র আর বাকি তিন দিকে দর্শকদের বসার জন্য গ্যালারি। মধ্যের উন্মুক্ত স্থানে ঘন্টা খানেক নাচের পরিবেশনা রামায়নের কাহিনী অবলম্বনে। ভাল কিন্তু অতিরিক্ত বিনোদন বিতরণের চেষ্টায় হনুমান চরিত্রে ভাঁড়ামির রং দেওয়া শুভেন্দুর পছন্দ হয় নি। তবে দর্শক গ্যালারি ভর্তি ছিল বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকদের ভিড়ে। কিছু দর্শকের হয়ত খুব একটা ভাল লাগে নি। তারা পরিবেশনা শেষ হওয়ার আগেই উঠে চলে গিয়েছিল। এদের মধ্যে শুভেন্দু দেখেছিল সেই ছেলেটা আর মেয়েটাকে।
পরের দিন শুভেন্দু গিয়েছিল নুসা পেনিডা। এটা বালি দ্বীপের খুব কাছে একটা ছোট দ্বীপ। বালির বোট জেটি থেকে মাত্র চল্লিশ মিনিটের মোটর বোট যাত্রা। ডেকে বসে সমুদ্রের হাওয়া খেয়ে পৌঁছে গিয়েছিল শুভেন্দু। তখন সকাল প্রায় সাড়ে নটা। ফেরার বোট বিকেল চারটে। পাথুরে জমির এই দ্বীপে দেখার ছিল অনেক কিছু। পক্ষী অভয়ারণ্য, ছোট কিন্তু সুন্দর জলপ্রপাত, জঙ্গল আর প্রাকৃতিক সুইমিং পুল। এছাড়া আছে বেশ কয়েকটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সমুদ্র সৈকত। সময়ের অভাবে শুভেন্দু মাত্র তিনটে সৈকত ছাড়া আর কিছু দেখে নি। কেলিংকিং বিচ, ব্রোকেন বিচ আর ক্রিস্টাল বে বিচ। প্রথমটায় ডলফিন দেখা যায়। শেষেরটায় অবশ্য পর্যটকদের ভিড় বেশি। সারি সারি ছাতা। আর প্রতিটা ছাতার নিচে রিক্লাইনার মানে হেলান দেওয়া সৈকত চেয়ার। ছাতা সমেত দুটো চেয়ার ভাড়া নেওয়ার মাশুল এক লক্ষ ইন্দোনেশিয়া রুপিয়া অর্থাৎ পাঁচশ ত্রিশ টাকা। সুইমিং কস্টিউম পরে কিছু ক্ষণ জলের মধ্যে কাটিয়ে বালুচরে কিছুটা হেঁটে পাঁচশ ত্রিশ টাকা খরচ করে এই রকম একটা চেয়ারে বসল শুভেন্দু। একটা ডাব ওয়ালার থেকে ঢাউস একটা ডাব কিনে আলতো চুমুক দিয়ে চারিদিকে চোখ বোলাচ্ছিল। ভাবছিল মেয়েটার কথা। চোখ তাকেই খুঁজছিল। অবশ্য বেশি ক্ষণ প্রতিক্ষা করতে হল না। শুভেন্দু দেখতে পেল ছেলেটাকে। বাঁদিকে বেশ কয়েকটা ছাতার পরে হেলান চেয়ারে আধশোয়া। হাতে বিনতাংএর বোতল। একটু পরে মেয়েটাও দেখা দিল। বিকিনি পরে সমুদ্র থেকে উঠে আসছে। নিরপেক্ষ বিচারে মেয়েটাকে অসাধারণ সুন্দরী বলা যায় না। তবে শুভেন্দুর মনে হল ওর চেয়ে সুন্দর মেয়ে কখনো সে দেখে নি। বিবেক দংশন উপেক্ষা করে চুপিসারে বিকিনি পরিহিত মেয়েটার একটা ফটো ফোন বন্দি করে ফেলেছিল।
ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব ছাড়া জলের দেবতা বরুণ এই দ্বীপ বাসীদের পরম পূজনীয়। চৌরাস্তার কেন্দ্রে কিংবা সমুদ্র সৈকতে বরুণ দেবতার বিশাল মূর্তি দেখেছে শুভেন্দু। বিভিন্ন রাস্তায়, পার্কে, বাজারে বা গুরুত্বপূর্ণ ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিষ্ণু, রাম, হনুমান, গনেশ, লক্ষী, সরস্বতী ইত্যাদি বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। বালিতে লোকে দেবী লক্ষ্মীর এক রূপ শ্রী দেবীর পুজো করে। ইনি জমির উর্বরতা আর ধান শস্যের দেবী। এছাড়া গরুড় দেবতারও পুজো হয়।
ফেরার আগের দিন আরও কয়েকটা পুরনো আর বিখ্যাত মন্দির দেখা হয়েছিল। সমুদ্রের ধারে তানহা লট মন্দির মূলত বরুণ দেবতার মন্দির। জলের ওপর অস্তগামী সূর্যের রঙের খেলা দেখতে বহু পর্যটক এখানে আসে। কাছেই বাটু বোলং মন্দির। এই মন্দিরটাও পুরনো আর এরও ভাস্কর্য অসাধারণ। এরও প্রধান আরাধ্য দেবতা জলাধিপতি বরুণ।
আর একটা অপূর্ব পুরনো মন্দির কমপ্লেক্স উলুনদানু। পাহাড় ঘেরা একটা বড় হ্রদের ধারে। এই মন্দিরের ভাস্কর্যে বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাব আছে। একটা বৌদ্ধ স্তূপও আছে। তবে মূলত শিব পার্বতী আর নদীর দেবী দানুর মন্দির। শুভেন্দু লক্ষ্য করেছে মুখ্য দেব দেবী ছাড়াও বালির সব বড় বড় মন্দিরেই আছে একাধিক অধিষ্ঠাত্রী দেব দেবী।
উলুনদানু মন্দিরের খুব কাছে আছে প্রসিদ্ধ হান্ডারা গেট। এই গেট বা ফটকের দুপাশে কারুকার্যখচিত দুটো স্তম্ভ। পর্যটকরা বিশেষত তরুণ তরুণীদের জুটি এখানে ফটো তোলায়। শুভেন্দুর নজরে পড়ল সেই ছেলে মেয়ে দুটোকে। বিভিন্ন পোজে ফটো তোলাচ্ছে।
শুভেন্দু খাদ্য রসিক। সিফুড অর্থাৎ সমুদ্র উৎপন্ন খাবার খেতে খুব ভালবাসে। আর বালিকে সিফুডের স্বর্গ বললেও কম বলা হবে। চিংড়ি, লবস্টার, ঝিনুক, কালামারি, রেড স্ন্যাপার, অক্টোপাস কী না নেই। ওর হোটেলের কাছেই সেমিনিয়াক স্কোয়ারে একটা দারুণ রেস্টুরেন্টের সিফুড প্ল্যাটার পরম তৃপ্তি করে খেয়েছে দুদিন। কেউ একজন জিম্বারান সৈকতের কথা বলেছিল। হোটেল থেকে অবশ্য কিছুটা দূরে। ফেরার আগের দিনে রাতের খাবার খেতে সেখানেই গিয়েছিল শুভেন্দু। লবস্টার খেতে খেতে ছেলেটা আর মেয়েটাকে শেষ বারের মত দেখেছিল সে। উন্মুক্ত বালুচরে ছাতার নিচে সাজানো সারি সারি টেবিল। শুভেন্দুর টেবিলের একটা টেবিল পরেই বসেছিল তারা। ছেলেটা নিয়েছিল মেই গোরাং আর মেয়েটা নাসি গোরাং। এই দুটো খাবার বালিতে খুবই জনপ্রিয়। প্রথমটা ফ্রায়েড নুডল আর পরেরটা ফ্রায়েড রাইস। দুটোতে সবজি, চিংড়ি, চিকেন, বিফ, পর্ক অর্ডার অনুযায়ী দেয়। দুটোই শুভেন্দু খেয়েছে। দারুণ খেতে।
আর একটা ব্যাপার বালিতে লক্ষ্য করেছিল শুভেন্দু। সেটা হল মেয়েদের নিরাপত্তা। রাত দশটার পরও মেয়েরা একা স্বাধীন ভাবে ঘোরাফেরা করছে। বাইক ট্যাক্সিতে পুরুষ ড্রাইভারের সঙ্গে একাএকা যাতায়াত করছে। পুরুষ সওয়ারি নিয়ে বাইক ট্যাক্সি মেয়েরাও চালায়। বালিতে ওলা উবার না থাকলেও অন্য এ্যাপ ট্যাক্সি আছে। অনেক মেয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভারও আছে। বালিতে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বিশেষ নেই। সাধারণ মানুষ সাইকেল বা স্কুটার ব্যবহার করে। তবে ইন্দোনেশিয়া তেল উৎপাদক দেশ। পেট্রোল শস্তা।
দেশে ফিরে মেয়েটাকে ভুলতে পারছিল না শুভেন্দু। নিজের ফোনে বন্দী তার বিকিনি পরা ফটোটা সে বারবার দেখত। অবশ্য এটাও সে জানত আর কোনদিন তার সঙ্গে দেখাও হবে না।
দেখতে দেখতে এল নতুন বছর। মকর সংক্রান্তির দিন শোভা সিটির শপিং সেন্টারে শুভ্রা তার বেকারি খুলেছিল। ঐদিন সন্ধ্যায় শুভেন্দুর বাবা ওনার ফ্ল্যাটে একটা পারিবারিক পার্টির আয়োজন করেছিলেন। পরিবারের বাইরে একজনই ছিলেন। শুভেন্দুর বাবার বন্ধু অরুণ বাবু। খুব জমাটি আর মিশুকে লোক। শোভা সিটির রেসিডেন্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের এক সক্রিয় সদস্য। দিনটা ছিল বুধবার। কাজের দিন। সন্ধ্যে সাড়ে আটটায় বাড়ি ফিরে শুভেন্দু দেখল মা রান্নাঘরে। আইনজীবী দাদা বৌদি ফেরে নি। নটার আগে শুভ্রা আসতে পারবে না জানাই ছিল। অরুণ বাবু আর শুভেন্দুর বাবা গল্প করছিলেন। কিছুক্ষণ বাদে একে একে সবাই এল কিন্তু নকুলের পাত্তা নেই। শুভ্রা বললো ওর পিসতুতো বোন হায়দ্রাবাদ থেকে আসছে। তাকে নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে আসবে। প্রায় দশটা নাগাদ নকুল এল। সঙ্গের মেয়েটাকে দেখে আচম্বিত শুভেন্দুর একটা কথাই মনে হল। পৃথিবীটা সত্যিই খুব ছোট। এই মেয়েকেই শুভেন্দু বালিতে দেখে তার প্রেমে পড়েছিল।
মেয়েটার নাম নেহা। ওর মা মানে শুভেন্দুর পিসি ওনার তেলেগু ভাষী অধ্যাপক স্বামীর সঙ্গে থাকেন হায়দ্রাবাদে। নেহা ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটিতে বায়োটেকনোলজি পড়েছে। ব্যাঙ্গালোরে একটা বড় কোম্পানিতে কয়েক বছর কাজ করে সিঙ্গাপুরে পিএইচডি করতে গিয়েছিল। নকুল শুভেন্দুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল বলল শুভেন্দু ঘুরে বেড়াতে ভালবাসে। এই তো গত বছর দেওয়ালির পর বালি ঘুরে এল। শুনে মেয়েটা বলেছিল তাই নাকি ? আমিও তো আমার এক্সের সাথে ওই সময় বালিতে গিয়েছিলাম। এক্স মানে প্রাক্তনী কথাটা শুনে শুভেন্দু খুশি হল। তবে এক্স বয়ফ্রেন্ড না হাসব্যান্ড?
জানা গেল পিএইচডি শেষ করে দুজনে চাকরি করত সিঙ্গাপুরে। বিয়ে হয় নি তবে লিভ ইন করেছে। বালি থেকে আসার পর কোনো কারণে ওদের ব্রেক আপ হয়ে যায়। নেহা গুরগাঁওতে একটা স্টার্টআপ জয়েন করতে এসেছে। যতদিন না নিজের ফ্ল্যাট নিচ্ছে নকুল আর শুভ্রার সঙ্গে থাকবে। সেদিন আলাপের পর কফির প্রস্তাব দিয়ে টেক্সট করেছিল শুভেন্দু। নেহা সম্মতি জানিয়েছিল। সেই প্রথম কফি মিটিং থেকেই শুরু হল নিয়মিত মেলামেশা। প্রতি রবিবারের সন্ধ্যেটা পরষ্পরের সান্নিধ্যে কাটানো আর কথা বলা। পরস্পরকে জেনে বুঝে নেওয়া।
নেহা কাছাকাছি একটা সোসাইটিতে ফ্ল্যাট নিয়েছিল। শুভেন্দুর বন্ধু স্থানীয় বাঙালিদের ক্লাব সৃজনী সঙ্ঘের তরুণ সভাপতি। ও সোসাইটিতে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য। ওর সুপারিশেই নেহা ফ্ল্যাটটা ভাড়া পেয়েছিল। অবিবাহিতা মেয়েদের ভাড়া দিতে ইচ্ছুক বাড়িওয়ালা পাওয়া বেশ কষ্ট সাপেক্ষ।
কয়েক মাস কেটে গেল। দুর্গা পুজো এসে গেল। শোভা সিটির সংলগ্ন বাবুপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের খালি জমিতে বছর দুয়েক ধরে দুর্গা পুজো হচ্ছে। উদ্যোক্তা সৃজনী সঙ্ঘ। প্রধান পৃষ্ঠপোষক শোভা সিটির বাঙালিরা। কর্ণধার অরুণ বাবু আর প্রবীর বাবুর উৎসাহে শোভা সিটির বাঙালিরা পুজোর আয়োজনে সক্রিয় সহযোগিতা করে। অকুন্ঠ অর্থ সাহায্য ছাড়াও, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিজ্ঞাপন নিয়ে আসা, শোভা সিটির অবাঙালিদের অনুপ্রাণিত করে আর্থিক অনুদান নেওয়া, স্থানীয় প্রশাসন আর রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ যোগাযোগ রাখা এমনকি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা সব কাজেই এদের উৎসাহ থাকে। নেহা কুচিপুড়ি নাচ জানে। অষ্টমীর দিন সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশন করে প্রচুর হাততালি পেয়েছিল।
সেদিনটা ছিল কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর ঠিক পরের রবিবার। শোভা বেঙ্গল মানে শোভা সিটির বাঙালিদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অনেক আলোচনার পর ঠিক হয়েছিল ওই দিন শোভা সিটির বাঙালি বাসিন্দাদের বিজয়া সম্মেলন হবে। উদ্যোগ নিয়েছিল সুরজিত আর তার বউ উমা। রবিবার মানে পরের দিন অফিস। শনিবার হলে খুব সুবিধে হত। শুভেন্দুর এই যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব নাকচ হয়েছিল কেননা অনেকেই শনিবার আমিষ খায় না। আর আমিষ না হলে বাঙালিদের পার্টির মজাটাই মাটি। তাই অগত্যা রবিবার। এলাহি বাঙালি খাবারের আয়োজন।মদ ছিল না। শোভার ওভাল ক্লাবের ব্যাঙ্কওয়েট হলে পার্টির আয়োজন ছিল। সেখানে মদ খাওয়ার অনুমতি নেই। তবে বিনোদনের জন্য গান বাজনা ছিল। অপরাজিতা গাইব না গাইব না করেও শেষে রাজি হয়ে খুব সুন্দর গজল গাইল। সন্দীপ ভরাট গলায় গাইল কিশোর কুমার। নেহাও সবাইকার অনুরোধে একটু কুচিপুড়ি নাচল।
খাওয়া দাওয়ার পর পার্টি শেষ হলে নকুল শুভেন্দুকে বলল আমার ফ্ল্যাটে চল, তুই আমি শুভ্রা আর নেহা একটু গলা ভিজিয়ে নি। বেলুগা আছে। শুভেন্দু জানে বেলুগা খুব দামি রাশিয়ান ভদকা। নকুল ভদকা ভালবাসে। শুভেন্দুর প্রিয় পানীয় হুইস্কি। তবে বেলুগার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব নয়। নেহারও ভদকা অপছন্দ নয়। রাত হয়েছে বলে চিন্তাও নেই। শুভেন্দু ওকে পৌঁছে দেবে বলেছে।
সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। নেহা তাড়া দিচ্ছে। শুভেন্দু ওকে নিয়ে উঠে পড়ল। নকুলের ফ্ল্যাট পনেরো তলায়। লিফটে ওরা দুজন। নামতে নামতে লিফটা আটকে গেল সাত আর আট তলার মাঝে। এই টাওয়ারে লিফট বিভ্রাট আগেও একবার হয়েছে। লিফট কোম্পানি ইউরোপের। এদের ভারতীয় ইউনিটের ম্যানেজাররা কোট টাই পরে এসে ল্যাপটপে পাওয়ার পয়েন্ট চালিয়ে বুঝিয়েছিল ওদের লিফট খুব উন্নত প্রযুক্তির। এরকম গোলমাল অত্যন্ত বিষ্ময়কর। ওরা তদন্ত করে মূল কারণ জানাবে বলেছিল। জানায় নি। এবার আবার সেই যান্ত্রিক গোলযোগ। আবার হয়ত তারা এসে নতুন কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে পাওয়ার পয়েন্ট দেখাবে। যাই হোক নেহার সাথে পনেরো মিনিট একান্তে লিফটে আটকে থাকা শুভেন্দুর ভালই লেগেছিল।
নেহার সোসাইটি খুব কাছে। রাতে রাস্তা ফাঁকা। মিনিট তিনেকে পৌঁছে গেল শুভেন্দু। তারপর যা ঘটল তা চিন্তাও করে নি সে। গাড়িটা পার্ক হতেই ওকে কাছে টেনে ঠোঁটে চুমু খেয়েছিল নেহা। মুহূর্তের হতচকিতা সামলে নিয়ে শুভেন্দুও আবেগঘন প্রত্যুত্তর দিয়েছিল। আসলে লিফটেই শুভেন্দুর খুব ইচ্ছে করছিল। সম্ভব হয় নি। কেননা লিফটে ক্যামেরা লাগানো ছিল।
একটা নতুন সম্পর্কের শুরু হল। শুভেন্দুর অপছন্দের কারণে নেহা সিগারেট ছেড়ে দিয়েছিল।
লেখক : প্রসূন কুমার দত্ত
দিল্লি ডিসেম্বর ২০২৪

