অচেনা শিলচর ভ্রমন
অচেনা শিলচর ভ্রমন
দিনটি ছিল শারদীয় দুর্গাপূজার সপ্তমী তিথি । ঠাম্মা তার কুটিল প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন আমাদের ঘরের চৌকাঠে । তিনি বলেন " চলো যাই সবাই মিলে একটি গাড়ি (car) ভাড়া (reserve) করে উদারবন্দ ঘুরে আসি " । (উদারবন্দ হলো শিলচর শহরের নিকটবর্তী একটি স্থান । উদারবন্দ - এ ছিল আমাদের বরাক উপত্যকার সবচাইতে প্রসিদ্ধ দুর্গাপূজা মন্ডপ ।যেখানে দূর -দূর থেকে মানুষ দুরপুজা দেখতে আসতেন,সেখানে সেই বছর হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও পুজো দেখতে এসেছিলেন । ) তিনি আরও বলেন " যেতে লাগবে ২৫০০ (আড়াই হাজার টাকা ) সবাই মিলে দিইয়েদেবো " । এভাবে আমরা ভ্রমণের আলোচনায় লিপ্ত ______ ।
তখন প্রবেশ ঘটলো মেনদি - র , তিনি এসেছিলেন রেশন নিতে ;আমাদের আলোচনা শুনে তিনি - ও যোগ দেন আমাদের আলোচনায় ।মা বলেন " পূজা দেখতে উদারবন্দ যেতে, যদি গাড়িতে যাই তাহলে তো বমি হবে এবং বমি হলে সেখানে গিয়ে ভালো করে পুজো - ও দেখতে পারবো না " । তারপর আমি বললাম --- যদি ট্রেনে যাই তাহলে তো কোনো অসুবিধে নেই ।আমার প্রস্তাবে মা ও মেনদি রাজি হয়ে যান, কিন্তু দি ও ঠাম্মা এই সিদ্ধান্তে তেমন রাজি ছিলেন না যদিও আমি তাদেরকে এড়িয়ে (ignore) যাই। সর্ব শেষে আমাদের চূড়ান্ত (Final) সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে অষ্টমীর দিন আমরা শিলচর ভ্রমণে ট্রেনের যাত্রী হয়ে যাব ।
আমরা সবাই সকালে তাড়াতাড়ি উঠে প্রস্তুত হতে লাগলাম কারণ আজ মহাষ্টমী এবং আমরা যেতে চলেছি শিলচর ভ্রমণে l যদিও বাবা ও বাড়ির অন্যান্য ব্যাক্তিরা আমাদের এত সকাল প্রস্তুত (ready) হতে দেখে হাসিঠাটটা করছিলেন , কিন্তু আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে ছিলাম অটল l তখন - এর সময় রাতে পুজোতে যাওয়াই ছিল স্ট্যান্ডার্ড (স্ট্যান্ডার্ড) কিন্তু আমরা যাচ্ছিলাম ভোরের কাকের প্রথম ডাকের সময় প্রস্তুত হয়ে — ।
আমাদের বাড়ির সন্নিকটে - র রেলস্টেশন ছিল আলগাপুর রেলস্টেশন ,সেখানে হেঁটে হেঁটে যেতে লাগত ত্রিশ মিনিট ) । আমরা স্টেশনে পৌঁছি 7.31 তে। তারপর ট্রেনে করে যাই শিলচর । ট্রেন থেকে নেমে আমরা দেখতে পাই মেনদি শাড়ি লাগিয়েছিলেন উল্টো তারপর আমরা এতবড় স্টেশন এর ছোট্ট আজ কোনায় একটি ফাঁকা কক্ষ (room) দেখতে পাই সেখানে মেন্দী উনার শাড়িটি ঠিক করে নিলেন ।
যে উদ্দেশে আসা সেই উদ্দেশের দিকে আমরা চললাম ; দেখলাম একটি অটো ঠিক স্টেশনের পাশেই l সেই অটোতে হয়ে ছুটলাম আমাদের গন্ত্যব্য স্থানে । সেখানে যাওয়ার পর দেখতে পাই - একটি আলিশান প্রাসাদ যদিও এটি ছিল একটি মন্ডপ যা দেখতে একটি রাজপ্রাসাদ থেকে মোটেই কম ছিলনা । কিন্তু কথায় আছে না -- ' ভালো সময় বেশি দিন থাকে না ' , ঠিক তেমনি আমাদের আনন্দের মধ্যে আসলো ঘুর মেঘ ; সেই মেঘটি ছিল একটি আওয়াজ " দেরি হয়ে যাচ্ছে চলেন ! "--- অটো চালক (ড্রাইভার) বলে উঠলেন । তারপর আমরা গেলাম প্রসিদ্ধ কাচাকান্ডি মন্দিরে । সেখানে এক ব্রাহ্মণের কাছে কাচাকান্ডি মন্দিরের বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারলাম তার মধ্যে কিছু ---- কাচাকান্ড মন্দির হল উদারবন্দ -এর প্রসিদ্ধ মন্দির । সেখানে নাকি দূর - দুরন্ত থেকে ভক্তরা মা কাচাকান্ডি - কে দেখতে আসেন । লোকমুখে শোনা যায় যে সেখানে নাকি মানস করলে মা কাচাকান্ডির আশীর্বাদে মানস ফলে যেত । সেখানে অনেক ভক্তরা রবিবার দিনে মা কাচাকান্ডির উদ্দেশ্যে পাঠা বলি দিতেছয়শ টাকার উদারবন্দ ভ্রমণ পর আমরা চলে আসলাম আমাদের বরাক উপত্যকার সবচেয়ে বড় শহর শিলচরে। সেখানে অটো থেকে নেমেই দেখতে পাই মেট্রো মার্কেট, আমরা চলে গেলাম শপিং করতে । সকালে কিছু ন খেয়ে না আসার ফলে পেটে দৌড়াচ্ছিল ইঁদুর তাই আমরা শপিং মল থেকে বের হয়ে চললাম হোটেলের খোঁজে । চোখে পড়ল একটি দু -তলার হোটেল সঙ্গে সঙ্গে উপরে উঠতে লাগলাম । আবার চোখে পড়লো সেখানে লেখা ছিল ইদ জিতু হোটেল (id-jitu hotel) হোটেলের নাম দেখতেই সাপ সিঁড়ি খেলায় সাপের মুখে পড়ে নামার মতোই আমরা নেমে আসলাম ঈদ জিতু হোটেল থেকে ; এবং চলতে থাকল আমাদের হোটেল সন্ধান মিশন । কিছুক্ষণ খোঁজার পর আমরা একটি ভালো রেস্টুরেন্ট দেখতে পাই । ।সেখানে গিয়ে আমি আর দি রুটি বুগ্নি এবং মা ও বাকিরা শুধু শুধু রুটি খান ।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমরা পাঁচজন পূজা মন্ডপ দেখার জন্য আরম্ভ করলাম যাত্রা । আমাদের মধ্যে কেউই বিশাল শিলচর শহরকে ভালো করে চিনতাম না, তাই আমরা পথিককে জিজ্ঞাসা করে করে এগিয়ে গেলাম এবং পূজা মন্ডপ দেখতে থাকলাম ।
দুপুর হলো সূর্যদেব আমাদের মাথার উপরে এসে বসলেন । কিন্তু আমরা পূজো দেখা থেকে বিরত হয়নি । এবার আমরা গিয়ে পৌঁছলাম ফাটক বাজারে । সেই বাজার যে বাজারের কুটিল গলিগুলো সেখানের স্থানীয় ব্যক্তিরাও চিনতে পারেন না কিন্তু আমরা বাজারের ভিতরে যাই এবং সেখানে স্থিত মা দুর্গার মূর্তির সামনে মাথানত করি । আমরা গেলাম শুটকি হাটিতে যে হাটে -র সামনে থেকে দেখা যাচ্ছিল পুজো মন্ডপ । হাটে- র চারিদিকে শুধু শুটকি আর শুটকি । সেখানের শুটকির গন্ধে মেন্দির মন উল্লাসিত হয়ে মুখ থেকে বেরিয়ে আসল লালা , বলে উঠলেন " শুটকির গন্ধে মনে হচ্ছে গরম গরম ভাতের সঙ্গে শুটকি দিয়া খাব “ । আমরা উনার কথা শুনে হাসতে 😄লাগলাম , কিন্তু হাসিঠাট্টার মধ্যে আমরা বুঝতে পেলাম আমাদের পেট পুজো করার সময় হয়েছে , তাই আমরা টুকটুকিতে উঠে ইসকন টেম্পুলের (ISKON Temple ) দিকে রওনা হই । কথায় আছে না 'সময়ের কাজ সময়ে না করলে পরে আফসোস করতে হয় ' ঠিক তেমনি আমরা ইসকনে যেতে দেরি হওয়ায় আমরা সেখানে কি শুনতে পাই "আজ প্রসাদ বিতরণ সমাপ্ত হয়েছে "। তাই আমরা প্রসাদ না পাওয়ার আফসোস ভুলে শ্রী বিবেকানন্দর স্থাপিত রামকৃষ্ণ মিশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি । মিশনে ছিল বিশ হাজার ভক্তের খাওয়ার প্রবন্ধ । আমরা মিশনে গিয়ে দেখতে পাই সেখানে ছিল দুটি লাইন একটি পুরুষের এবং অন্যটি মহিলাদের । কিন্তু আমি ছিলাম একমাত্র পুরুষ আমার সঙ্গী সাথীদের মধ্যে তাই আমি বাকিদেরথেকে আলাদা হয়ে গেলাম । ভিতরে গিয়ে দেখি সেখানে খিচুড়ি ,আলু ভাজা ও আচার বিতরণ করা হচ্ছে, আমি সেই মহা প্রসাদ গুলো গ্রহণ করি । গ্রহণের পর আমি বাকিদের খোঁজ করতে লাগলাম । আধুনিক যুগের সর্বোচ্চ মূল্যবান বস্তু হলো মোবাইল ফোন । যেহেতু আমার কাছে ছিল মোবাইল তাই আমি প্রথমে ঠাম্মাকে ফোন করি কিন্তু কোথায় আছে না ' বিপদের সময় ভাগ্য সাথ ছেড়ে দেয় ' কিন্তু এখানে ভাগ্য সাধ ছাড়েনি ছেড়েছিল নেটওয়ার্ক । তারপর আমি মেহেন্দির সাথে মোবাইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করি এবং রামকৃষ্ণ মিশন প্রদর্শন করি । মিশন প্রদর্শন করে মুখ্য দুয়ারের দিকে রওনা করি যা ছিল রাস্তার ঠিক পাশেই , সেখানে দেখতে পাই মা , দি ও ঠাম্মা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন ।
সকাল থেকে ভ্রমণ করতে করতে আমরা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম , তাই সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম আর পুজো না দেখে স্টেশনের দিকে প্রস্তান করব । যে সিদ্ধান্ত সেই কাজ আমার ফোনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম , কিন্তু আমরা জানতাম না মিশন থেকে স্টেশন ছিল অনেক দূর কিন্তু আমরা না জেনেও শুধু হাঁটতে হাঁটতে এবং হাঁটতেই থাকলাম , সর্বশেষে আমরা কিছুদূর থেকে দেখতে পেলাম বড় একটি সাইন বোর্ড লিখা ছিল ' তারাপুর জংশন ' তারপর আমরা খুবই খুশি হলাম , এবং পরে স্টেশন পৌঁছে ট্রেনে উঠলাম । এবং ট্রেনে বসে আমরা আগামী বছর দুর্গাপূজায় আগরতলায় পুজোতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি--------।।ন
।
Yogi Purnangsu Nath Mazumder
