সার্টিফায়েড গুড গার্ল
সার্টিফায়েড গুড গার্ল
দুপুর দেড়টা। ক্লাস নাইনের বায়োলজি ক্লাস চলছে—reproductive system। এর পরেই টিফিন ব্রেক, তাই বেশিরভাগ স্টুডেন্টেরই ক্লাসে মন নেই। নির্ঝরারও নেই, তবে তার কারণটা ব্রেক নয়। ম্যাডামের গলার স্বরটা ঠিক বোঝা যায় না। কেমন একটা জড়ানো, নিচু গলায় কথা বলেন। গলায় যেন কফ জমে আছে—কথা বলতে বলতে মাঝেমাঝেই কাশেন। তার ওপর এই চ্যাপ্টারটা নির্ঝরা আগেই পড়ে ফেলেছে। ফলে ক্লাস করার তেমন আগ্রহও নেই। ম্যাডাম বোর্ডের দিকে মুখ করে কিছু লিখছেন, আর মুখে মুখে পড়া বুঝিয়ে যাচ্ছেন। স্টুডেন্টরা বোর্ড দেখে দেখে টুকে নিচ্ছে—অথবা টোকা দেওয়ার ভান করছে। টেবিলের সামনে খাতা খুলে রেখে যে যার মতো কাজ করছে। নির্ঝরা পড়ছে একটা literature—child marriage নিয়ে গল্প। আগের ক্লাসের বাংলা ম্যাডামের কথাগুলো এখনও মাথায় ঘুরছে। ম্যাডাম বলছিলেন, “আজকালকার মেয়েগুলো হাবড়া-কাবড়া। আগেকার দিনের মেয়েরা নাকি বেশি smart ছিল—অল্প বয়সেই কত শান্ত, শিষ্ট, মার্জিত।” নির্ঝরার মনে হয়, কথাটা ঠিক না। তার মনে হয়, আগেকার দিনের মেয়েরা বাধ্য হয়ে তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যেত। এই যেমন সে নিজেই—সংসারের সব কাজ সামলাতে পারে একদম পাকাগিন্নির মতো, পরিস্থিতির জন্য। কিন্তু এটা কি ঠিক হয়েছে? বাসন মাজতে মাজতে তার হাত শক্ত হয়ে গেছে। ফুচকা খাওয়া, টুকটাক ক্লিপ কেনা—বন্ধুদের মতো ছোট ছোট ইচ্ছে—সেগুলো আর নেই। নিজেকে অনেক বয়স্ক মনে হয়। যাই হোক, একসময় তো বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এই ইচ্ছেগুলো চলে যাবেই। তাহলে এখনই না হয় ইচ্ছেগুলো পূরণ করা ভালো। যে বয়সে যা মানায়, সেটা খোলা মনে উপভোগ করা উচিত। “এই, এটা কী করছো?” বকুনির শব্দে পেছন ফিরে তাকাল নির্ঝরা। পঞ্চম বেঞ্চের ধারে বসা একটা মেয়ে—ঝর্ণা। “কিছু না, ম্যাডাম,” উত্তর এল। নিশ্চয়ই কোনো fashion বা filmy magazine। এই পেছনের বেঞ্চের মেয়েগুলো একদম পড়াশোনা করে না—উল্টে ক্লাসের পরিবেশ নষ্ট করে। হঠাৎ নির্ঝরার মাথার ভেতর থেকে একটা গলা উঠল— “তুইও তো ক্লাস করছিস না, literature পড়ছিলি।” চমকে গেল সে। সে তো ফার্স্ট বেঞ্চে বসে। পঞ্চম বেঞ্চ পর্যন্ত যেতে হলে তার বেঞ্চ পেরিয়েই যেতে হয়। ম্যাডাম কখন পাশ দিয়ে চুপচাপ হেঁটে গেছেন—খেয়ালই করেনি সে। ম্যাডাম কি তার বেঞ্চের তলায় রাখা খোলা বইটা দেখেছেন? ধড়ফড় করতে লাগল বুক। তাড়াতাড়ি বইটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। এদিকে বকুনি অনেকটা এগিয়ে গেছে। ম্যাডাম ঝর্ণার টেবিলে রাখা কাগজটা টানতে লাগলেন। ঝর্ণাও শক্ত করে ধরে আছে। এদিক-ওদিক টানাটানি—শেষমেশ ম্যাডাম জিতলেন। ভাঁজ করা কাগজটা খুলে সামনে-পেছনে ঘুরিয়ে দেখে বললেন— “Greetings card! তা কাকে লেখা হচ্ছে দেখি… প্রমিতা? প্রমিতা—ওই ক্লাস টুয়েলভের পালানো মেয়েটা না?” “হ্যাঁ ম্যাডাম,” পুরো ক্লাস একসঙ্গে বলে উঠল। নির্ঝরা একবার পুরো ক্লাসটার দিকে তাকাল। এই তারাই—কয়েকদিন আগেই Gurmeet বেশি romantic না Vivian—তা নিয়ে গলা ফাটাচ্ছিল। “প্রমিতা… প্রমিতার মতো মেয়েরা তোমার বন্ধু?” “বন্ধু তোমাদের প্রমিতা?”—ম্যাডাম পুরো ক্লাসকে জিজ্ঞেস করলেন। “না ম্যাডাম,” একসঙ্গে উত্তর এল। সিরিয়াসলি? নিজের পছন্দ মতো বিয়ে করেছে বলে আজ সে অস্পৃশ্য? ঝর্ণার বাবা ভ্যান চালায়। ওদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারে মেয়েদের বেশিদিন পড়াশোনা হয় না। হয়তো ঝর্ণার বিয়ের কথাও ইতিমধ্যেই উঠেছে। “কি লিখেছো দেখি প্রমিতাকে?” ম্যাডামের গলার আওয়াজ প্রায় নব্বই ডেসিবেল ছাড়িয়ে গেছে। “Happy married life? Happy married life??” কান ফেটে যাওয়ার জোগাড়। Happy married life লিখেছে—happy murder life তো নয়! এত react করার কী আছে? “তুমি বোঝো married life কী জিনিস?” For damn sake—এটা reproduction এর ক্লাস। “ক্লাসে মানায় এসব কার্ড লেখা?” না, তা ঠিক মানায় না। তবে biology ক্লাসে literature পড়াও মানায় না। গাল কামড়াল নির্ঝরা। “না, এসব কিছুতেই মানা হবে না। এমন শাস্তি দেব—সারা জীবন মনে থাকবে। বায়োলজিতে highest number কার?” “রামা!” “অপর্ণা!” “না না, নির্ঝরার!” Excellent. অন্যদের স্মৃতিশক্তি নিজের চেয়ে বেশি ভালো। “নির্ঝরা, বেরিয়ে আয়।” হাই বেঞ্চটা ঠেলে সামনে এগিয়ে এল সে। ম্যাডামের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। “এই, কান ধর ওর। কান ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাও।” সিরিয়াসলি? নিজের শাস্তি নিজে দেন না? “ম্যাডাম, আমি—” “না, কোনো কথা না। কান ধর।” হালকা করে ঝর্ণার কান ধরল নির্ঝরা। তর্ক করে লাভ নেই। “টান—এবার টানতে টানতে বাইরে নিয়ে যা।” ক্লাসের প্রথম বেঞ্চ থেকে শেষ বেঞ্চ—সব জায়গাতেই নির্ঝরার মোটামুটি ভালো সম্পর্ক। বন্ধুস্থানীয় কারোর কান ধরা—একদমই ভালো লাগছে না। বিশেষ করে যখন সে নিজেও প্রায় একই দোষ করেছে। হালকা করে টানতেই ঝর্ণা নিজেই এগিয়ে আসতে লাগল। আরও খারাপ লাগতে লাগল নির্ঝরার। পুরো ক্লাস মুখ বাড়িয়ে মজা দেখছে। পাঁচ নম্বর বেঞ্চ থেকে আট নম্বর বেঞ্চ পেরিয়ে দরজার বাইরে বেরোতেই— ঢং ঢং ঢং—ঘণ্টা বেজে উঠল। পুরো ক্লাসটাই আজ বকুনিতে কেটে গেল। পাশের ক্লাসগুলো থেকে মেয়েরা দৌড়ে বেরিয়ে আসছে। নির্ঝরা আর ঝর্ণাকে দেখে একটু থেমে যাচ্ছে, তারপর মুচকি হেসে চলে যাচ্ছে। হয়তো ভাবছে—নির্ঝরা নিজেই শাস্তি পেয়েছে। খুবই অস্বস্তি লাগছে তার। সে স্কুলের অন্যতম top ranker—“certified good girl”। এই ধরনের শাস্তি সে কখনও পায়নি। হয়তো সেই কারণেই অন্যরা বেশি মজা পাচ্ছে। সবাই বেরিয়ে গেলে নির্ঝরা আর ঝর্ণা ক্লাসে ঢুকল। ব্যাগ গুছাতে হবে। বাইরে থেকে দুই ম্যাডামের কথোপকথন ভেসে এল— “এই, তোর বাবা-মা মেনে নিয়েছে?” “না… মানে…” “তাহলে কী করবি এবার?” “কি আর করব… পালাব।” “হ্যাঁ, সেটাই ভালো। ক’দিন আর অপেক্ষা করবি?” “আজ স্কুল শেষ করেই…” “আহা! কাল সকালের আগেই সব হয়ে যাবে!” "হি হি উ উ হি হি হি"
