নিমগাছ বিক্রি
নিমগাছ বিক্রি
সকাল সাড়ে আটটা বাজে। বাবা সবে সাইকেল নিয়ে রেশনে বেরোলেন। কাকুর স্টুডেন্টগুলো টিউশন পড়া শেষ করে এক এক করে বেরোচ্ছে। এমন সময় ঝকঝকে একদম নতুন একটা সাইকেলে চড়ে বয়স চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের এক গাবদা-গুবদা ভুঁড়িওয়ালা লোক নির্ঝরাদের বাড়িতে ঢুকল। পেছনের ক্যারিয়ারে চোদ্দো-পনেরো বছরের রোগা ফিনফিনে এক ছেলে।
— নিমপাতা বিক্রি করবে?
— নিমপাতা? জিজ্ঞাসামাখা চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে নির্ঝরা বলল, কাকুর সঙ্গে কথা বলুন।
— কাকু? এবার লোকটার চোখে জিজ্ঞাসা।
— হুঁ। ওই তো সাইডের বারান্দায় বসে আছেন।
সাইডের বারান্দাটা কিছুটা গাছপালার আড়ালে। বাইরে থেকে দেখে এক ঝলকে বোঝা যায় না। লোকটারও বুঝতে কিছুটা কষ্ট হলো। বুঝতে পেরে বারান্দার উদ্দেশে হাঁটা লাগাল। লোকটা যেতেই উঠোনে বেরিয়ে নিমগাছটার ওপর চোখ বোলাল নির্ঝরা। প্রতি বছর এই সময়টায় বিভিন্ন লোক ওদের বাড়িতে আসে বিভিন্ন গাছপালা কিনতে—তেজপাতা, আম, নারকেল, সুপারি। কিন্তু কেউ কোনোদিন নিমপাতা কিনতে আসেনি। এই প্রথম। ওই আয়ুর্বেদিক সাবানে-টাবানে লাগবে হয়তো।
— করব। বারান্দার গ্রিল দিয়ে মুখ বার করল কাকু।
— কত নেবেন?
— আপনি বলুন।
— না না, আপনি বলুন।
— না, আপন...
— চল্লিশ টাকা। কাকুর কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকটা বলল।
— চল্লিশ টাকা না, আশি টাকা। কাকু নিজের দর দিল।
— আচ্ছা, আশি টাকাই নিন।
রফা হয়ে গেল? এত তাড়াতাড়ি? অন্যরা তো ....
— দা আছে দাদা?
— দা? আপনি গাছ কাটতে এসেছেন, দা আনেননি? বারান্দা থেকে উঠতে উঠতে বলল কাকু।
কাকু ঘরের ভেতরে গেল দা খুঁজতে। নির্ঝরাও ভেতরে ঢুকল। ভাত বসাতে হবে। বাবা এসে ভাত না পেলে চিল্লামিল্লি করবে। আশি টাকা এই নিমগাছটার জন্য! পুরো গাছটা অবশ্য পাতায় ভর্তি। কে জানে, হতেও পারে।
চাল ধুচ্ছে, এমন সময় বাইরে থেকে লোকটার গলা কানে এল।
— এই দা? এই দা দিয়ে কাটা যায় নাকি? একেবারে ধার নেই।
— যা বাবু, উঠে পড়। ওঠ ওঠ, দেরি করিস না।
— ডান দিক দিয়ে কোপ মার। ডান দিক দিয়ে। উঃ, দাটায় একেবারে ধার নেই। এই দা দিয়ে হবে না।
ভাত বসিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল নির্ঝরা। গাছ কাটা দেখবে।
— ছেলে আপনার একেবারে কাজ পারে না। কাকু বলল।
— আলস, আলস। একেবারে আলস।
ছেলেটাকে দেখে সত্যিই গাছ কাটার ছেলে বলে মনে হয় না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামাকাপড়, ফুলপ্যান্ট, টি-শার্ট। মুখটা নরম তুলতুলে।
— এই দা দিয়ে হবে না আপনার। আমি বাড়ি থেকে দা নিয়ে আসছি।
বলেই লোকটা সাইকেলটা ঘুরিয়ে বাড়ির গেটের দিকে এগোল।
— আপনি যাচ্ছেন? কাকু ডাক দিল পেছন থেকে।
— হ্যাঁ, দা নিয়ে আসি।
— আপনি গেলে ছেলে কাজ করবে?
— হ্যাঁ হ্যাঁ, করবে। আমি বলে দিচ্ছি।
— বাবু, মন দিয়ে কাজ করিস।
ওপরের দিকে তাকিয়ে হালকা চিৎকার করে লোকটা বলল।
গলার আওয়াজ গাছ অবধি পৌঁছেছে বলে তো মনে হলো না। ছেলেটা পেছনের দিকে তাকিয়েও দেখল না।
মিনিটখানেকের মধ্যেই লোকটা গলির রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তায় গিয়ে মিশে গেল। কেমন একটা অস্বস্তি হতে লাগল নির্ঝরার। কিছুক্ষণ গাছ কাটা দেখে ঘরে ঢুকল নির্ঝরা। গাছ কাটা প্রায় শেষ। লোকটার দা আনতে আনতে পুরো গাছটাই প্রায় কাটা হয়ে গেল। ওই ভোঁতা দা দিয়েই।
ভাতের মাড় গালছে, এমন সময় পেছন থেকে কেউ কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠল,
— এই দিদি।
চমকে গিয়ে পিঁড়ি থেকে ছিটকে পেছনে পড়ে গেল।
নিত্তু। কাকুর ছেলে। ক্লাস এইটে পড়ে।
গোশ! আজকালকার ছেলেপেলে!
হাতে ফুটন্ত মাড়, গরম ভাত—একটু ছলকে পড়লেই...
— কী চাই?
দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করল নির্ঝরা।
কথারকোনো উত্তর না দিয়ে নিত্তু হামাগুড়ি দিয়ে নির্ঝরার মুখের একেবারে কাছাকাছি এসে গলা আরও নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— পাশের বাড়ির নিমগাছটা ছেড়ে আমাদের গাছটা কিনছে কেন?
সত্যিই তো। পাশের বাড়িটা গলি আর বড়, রাস্তার মোড়ে অবস্থিত। উঠোনসহ বিশাল বড় নিমগাছটা রাস্তা থেকেই দেখা যায়। ওটা কেনার জন্য বায়না দিল না কেন?
সাড়ে দশটা নাগাদ বাবা বাড়ি ঢুকল।
— ছেলেটা কে?
— ওই নিমগাছ কাটতে এসেছে।
বাবার হাত থেকে রেশনের ব্যাগ নিতে নিতে উত্তর দিল নির্ঝরা।
— নিমগাছ?
— হুঁ। আশি টাকা দেবে।
বাবা প্রশ্ন করার আগেই উত্তর দিল নির্ঝরা।
— আশি?
বাইরে বেরিয়ে কেটে রাখা নিমের ডালগুলোর ওপর চোখ বোলাল বাবা। বাবার পেছন পেছন নির্ঝরাও বাইরে বেরিয়ে এল। গেটের সিঁড়ির ওপর বসে আছে ছেলেটা। গাছ কখন কাটা হয়ে গেছে। কখন আসবে লোকটা?
বাবাকে খাইয়ে-দাইয়ে বাসন মাজতে গেল নির্ঝরা। ছেলেটা বসে আছে। স্নান সেরে ঘরে ঢুকল নির্ঝরা। পেছন পেছন নিত্তুও ঢুকল। ছেলেটা এখনও বসে আছে। কখন আসবে লোকটা?
— এই দিদি, একটা কথা জানিস?
— না, জানি না। জানতে চাইও না। ঘরের বাইরে।
— ছেলেটা না...
কথা অগ্রাহ্য করে চৌকির ওপর উঠে উঠতে বলল নিত্তু,
— ছেলেটা না, গত দু'বছর পরপর ফেল করেছে।
— তুই চিনিস?
— হুঁ। আমাদের ক্লাসে পড়ে। একদম লাস্ট বেঞ্চে বসে। কিছুই পড়াশোনা পারে না। স্যার বলেছে ও গাধা।
— উঁহু। ওরকম বলে না।
— আমি বলিনি। স্যার...
গলিটা দু'বার পায়চারি করে এসে বারান্দার গেটের কাছে বসল ছেলেটা। গলির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
নির্ঝরার সেই চাপা অস্বস্তিটা বাড়তে লাগল। কী যেন একটা গোলমাল আছে। ঠিক আঙুল বসাতে পারছে না, কিন্তু আছে।
— এই, তোর বাবা কখন আসবে? পাঁচ ঘণ্টা তো প্রায় হয়ে গেল।
কাকিমা প্রশ্ন করল।
— বাবা না আমার।
— বাবা না কে তাহলে?
কাকুর গলায় প্রশ্ন।
— ওই। রাস্তায় দেখা হলো। কাটতে বলল।
— তোকে কাটতে বলল আর তুই চলে এলি? অচেনা একটা লোকের সঙ্গে?
এবার প্রশ্ন কাকিমার।
— না। বলল কিছু টাকা দেবে তাই।
মুখটা কাচুমাচু করে উত্তর দিল ছেলেটা।
— টাকা দেবে তাই!
খিলখিলিয়ে হেসে উঠল কাকু-কাকিমা একসঙ্গে।
উত্তর শুনে sympathy লাগল নির্ঝরার। ছেলেটার mentality ও সম্পূর্ণ বুঝতে পারছে। এই সতেরো বছর বয়সেও বাবা ওকে মাত্র চার টাকা দেয় সপ্তাহে। একটা কুরকুরে কিনতেও দু'সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। অতএব ওই বাচ্চা ছেলেটার টাকার প্রতি লোভ হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে হাত ধুচ্ছে, এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকল কাকু।
— এই, বড়ো! শুনেছিস? সাইকেলটা নাকি ওর!
— গাধা! লোকটা চোর। ঠগবাজ। তোমার নতুন সাইকেল ঠকিয়ে নিয়ে গেছে। হায় হায় হায়!
ছেলেটার উদ্দেশে চেঁচাতে লাগল কাকু।
বাবা কাকু একসাথে ছুটে বেরিয়ে গেল।
বাইরে সকলে একসাথে অনেক কথা বলতে লাগল।
পুলিশ ডাকা।ফোন নাম্বার দে বাবার।নিট্টু ফোন অন। বাবা কি করে?ভ্যান টান,ফোন।
কোনো কথাই নির্ঝরার কানে ঢুকল না।
বাবার গলা, কাকুর গলা,কাকির গলা, নিট্টুর গলা,ছেলেটার কান্না,জড়ো হওয়া প্রতিবেশীদের ফিসফাস সব মিলে সৃষ্টি হওয়া তীব্র কোলাহল সৃষ্টি হল।
চোর। ঠগবাজ।
সকাল থেকে হওয়া ঘটনাগুলো মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল নির্ঝরার।
লোকটার আশি টাকায় রাজি হয়ে যাওয়া। দা নিয়ে ভাঁটারামি করা। ছেলেটাকে গাছকাটার ছেলে বলে না মনে হওয়া। সকালের সেই অস্বস্তি ভাবটা ধীরে ধীরে কেটে যেতে লাগল। গাছকাটাওয়ালারা এরকম গাবদা-গুবদা, প্যান্ট-শার্ট পরা হয় না। রোগা-পাতলা, লুঙ্গি পরা হয়। তারা এরকম ভদ্র, মার্জিত ভাষায় কথা বলে না। তাদের কথা রুক্ষ। প্রতি দুটো কথায় একটা খিস্তি ঝরে পড়ে। এই লোকটা গাছকাটাওয়ালা নয়।
পুরো ঘটনাটা বুঝতে পেরে নির্ঝরার কেমন যেন একটা ঘোর লেগে গেল। সেই ঘোর লাগা অবস্থাতেই নির্ঝরা বাকি ঘটনার সমাপতন দেখল। কাকুর ফোন করে ছেলেটার বাবা-মাকে বাড়িতে আনা। ছেলেটার বাবার ছেলেটাকে পেটানো। মায়ের কান্নাকাটি করা। পুলিশ ডাকা।সমস্ত কিছু চোখের সামনে হলেও কেমন একটা ছবির মতো মনে হতে লাগল। কথাবার্তা কানে ভাসতে লাগল। বারবার মনের মধ্যে প্রশ্ন হতে লাগল—ঘটনাটা সত্যিই হয়েছে?
সাত দিন পরেও সেই ঘোর কাটেনি। নিমগাছের শুকিয়ে যাওয়া পাতাগুলো কুড়োতে কুড়োতে মনে হতে লাগল—ঘটনাটা সত্যিই হয়েছে?
