STORYMIRROR

Ontu Ghosh

Abstract Tragedy Others

3  

Ontu Ghosh

Abstract Tragedy Others

সরোবরে আড়ম্বর

সরোবরে আড়ম্বর

3 mins
197


জানুয়ারি মাসের শুরু। রাজধানীতে বারো ডিগ্রি তাপমাত্রা, প্রচন্ড শীত। দু-তিন দিন হয়ে গেলো বেকার আমি বাসার বাইরে বের হয়ে দুপা হাটিনি। হঠাৎ সন্ধ্যারাতে মোটামুটি শীতের প্রস্তুতি নিয়ে বের হওয়ার পর মনে হলো নিজের সাথে অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি, ঢাকায় এতো শীত এলো কোত্থেকে? মাফলার নিইনি, জ্যাকেটের নিচে আরো মোটা কিছু একটা পরে নেওয়া উচিত ছিল। হাঁটতে হাঁটতে ধানমন্ডি লেকে ঢুকলাম, যেখানে কিছুটা অন্তত অক্সিজেন আর বিশুদ্ধ শীতল বাতাস পাওয়া যেতে পারে। রবীন্দ্র সরোবরের বামে ব্রিজটা উপরের দিকে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে উঠে গেছে। সেই ব্রিজ দিয়ে উঠতে গিয়ে দেখি বারো তেরো বছরের একটি মেয়ে পা দুটি ছড়িয়ে বসে কাঁদছে, পরনে তার ময়লা হয়ে যাওয়া পাতলা জামা-পায়জামা মাত্র, চুলগুলো এলোমেলো। সামনে তার পড়ে আছে গোটা পাঁচেক পাইপ লাগানো লাল, নীল, সবুজ বেলুন। প্রচন্ড শীতের নিষ্ঠুর করুণ মৃদু বাতাসে সেগুলো উড়ে যেতে চাইলেও পারছে না। নিজের অজান্তেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি। তাকে জিজ্ঞেস করলাম-

– কানতেসো ক্যান আম্মা? কি হইসে তোমার?

– কিছু অয়নাই, শীতে কানতাছি।

আমি কেন জানিনা এই স্বাভাবিক উত্তরে সন্তুষ্ট ছিলাম না। কেন জানিনা তার চোখমুখ, জল, কান্না, নিদারুণ নীরব আর্তনাদ অন্য কথা বলছিল। আমি আবার চেষ্টা করলাম-

– দ্যাখো আম্মা তুমি যদি আমারে কউ, আমি তোমার সবগুলান বেলুন কিনমু। এই ঠান্ডায় বইসা থাকোন লাগবো না তোমার। কি? কইবা না আম্মা?

– না কমু না। লইলে লন, নাইলে যান গিয়া।

আমি পাঁচটা টা বেলুনের দাম পঞ্চাশ টাকা তার হাতে দিয়ে বেলুনগুলো কুড়িয়ে নিলাম। তাকে বললাম-

– আম্মা এই ঠান্ডায় বইয়া থাইকো না।

তারপর তার অভিযোগ, অসহ্য বেদনাতুর ভাষায়, কান্নাভরা কন্ঠে নিষ্পাপ এক প্রতিবাদ-

– বইয়া না থাইকা কই যামু? এই দুনিয়ার সব জানোয়ারের বাচ্চা। আমারে চিপায় লয়া গেছে কাম করবার লাইগগা। একশো ডি ট্যাকা দিবো কইছে। কাম সাইরা গলাডা চিপপা ধইররা ফালায়া দিসে। নানির কাছে গিয়া কইলাম, হ্যায় আমারে দুম দুম কইররা দুইডা কিল দিয়া বেলুন ধরায়া দিয়া কইলো, “এডি বেইচ্চা আয়, রাইতে খাবি কি হারামজাদী?”

– হায়রে, মানুষ এতো খারাপ হইবের পারে? অ্যাটটুক চেংরির গায়ে হাত দেয়? আল্লাহ্‌!

আমি চমকে উঠলাম। আমার ঠিক পিছনে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক আমাদের কথোপকথন শুনছিলেন আমি খেয়ালই করিনি। আমি ওনার সাথে কোন কথা বলতে পারলাম না। আমার চেতনা যেন কেমন আড়ষ্ট হয়ে এলো। আমি বাচ্চা মেয়েটাকে শুধু বললাম-

– এতো শীতে এইহানে বইয়া থাইকো না আম্মা।

যন্ত্রের মতো আমি সেখান থেকে প্রস্থান করলাম। পা দুটো যেন চলছে না, মাথা ঝিম ধরে গেছে। আমার হাতে রঙ বেরঙের পাঁচটা টা বেলুন। অসহ্য অস্থিরতা, ঘৃণা, আত্মদ্বন্দ্ব সবকিছু মিলিয়ে প্রচন্ড শীতেও ঘেমে উঠলাম। বাসায় ফিরে বেলুনগুলো একসাথে বেঁধে রেখে দিলাম সযত্নে। দুএকদিন বাদে দেখি সেগুলো চুপসে আসছে, তাদের আকৃতি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। ঠিক যেন লেকের ঐ কিশোরীর নানা রঙের স্বপ্ন, আনন্দ, ভালোবাসা, জীবনের আস্বাদের মতো। সরোবরের আড়ম্বর তার শরীরের উষ্ণতা শুষে নিচ্ছে, ভুলিয়ে ভালিয়ে যন্ত্রণায় আবিষ্ট করে নিঙরে নিচ্ছে তার জীবনের শেষ সৌন্দর্যটুকু। কিশোরী মার খাচ্ছে, গালমন্দ খাচ্ছে, পচাবাসি খাবার খাচ্ছে, জীবিকার তাগিদে এটাসেটা বিক্রি করছে। কখনো ফুল, কখনো বেলুন, কখনো দেহ। মিটিয়ে চলেছে কিছু মানুষের যৌনচাহিদা, কখনো মূল্যে, কখনো বিনামূল্যে।


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Abstract