শেষ পদচিহ্ন
শেষ পদচিহ্ন
সমুদ্রের ধারে প্রতিদিন ভোরে হাঁটতে আসতেন অনিরুদ্ধবাবু। বালির ওপর নিজের পায়ের ছাপ রেখে এগিয়ে যেতেন, আর পিছন ফিরে দেখতেন—কতটা পথ পেরিয়ে এসেছেন।
একদিন দেখলেন, তাঁর পায়ের ছাপের পাশে ছোট ছোট কয়েকটি পদচিহ্ন। বুঝতে অসুবিধা হলো না, কোনো শিশু তাঁর আগেই এই পথে হেঁটেছে।
পরদিনও একই দৃশ্য। তার পরদিনও।
কৌতূহল সামলাতে না পেরে এক সকালে তিনি অপেক্ষা করলেন। কিছুক্ষণ পর একটি ছোট ছেলে এসে হাজির। হাতে একটা লাল বেলুন, চোখে অদ্ভুত উচ্ছ্বাস।
অনিরুদ্ধবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি রোজ এখানে আসো?”
ছেলেটি মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। বাবা বলেছে, মানুষ চলে গেলেও তার ভালো কাজগুলো থেকে যায়। তাই আমি রোজ এখানে একটা করে শামুক তুলে জলে ফিরিয়ে দিই।”
অনিরুদ্ধবাবু অবাক হয়ে বললেন, “এত ছোট্ট কাজ করে কী হবে?”
ছেলেটি একটি শামুককে আলতো করে জলে ছেড়ে দিয়ে বলল, “ওর কাছে তো পুরো পৃথিবীটাই বদলে গেল!”
কথাটা অনিরুদ্ধবাবুর মনে গেঁথে গেল।
বহু বছর ধরে তিনি বড় বড় কাজ করেছেন, অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। অথচ কত ছোট ছোট ভালো কাজ যে অবহেলায় এড়িয়ে গেছেন, তার হিসাব রাখেননি কখনও।
পরদিন থেকে তিনিও ছেলেটির সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলেন।
তারপর একদিন ছেলেটি আর এল না। শুনলেন, তার পরিবার অন্য শহরে চলে গেছে।
অনিরুদ্ধবাবু একা হাঁটলেন সেদিনও। বালির ওপর তাঁর পদচিহ্নের পাশে আর কোনো ছোট্ট ছাপ ছিল না।
কিন্তু জলের ধারে পৌঁছে তিনি দেখলেন, কেউ কয়েকটি শামুক তুলে রেখেছে—ফিরিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায়।
তিনি মৃদু হাসলেন।
মানুষের পদচিহ্ন সবসময় বালিতে থাকে না। কখনও তা থেকে যায় অন্য কারও অভ্যাসে, অন্য কারও বিবেকের মধ্যে।
