উত্তম কুমার পুরকাইত

Romance Tragedy Inspirational


4.0  

উত্তম কুমার পুরকাইত

Romance Tragedy Inspirational


বিজয়িনী

বিজয়িনী

3 mins 269 3 mins 269

  গল্পঃ বিজয়িনী 

  লেখকঃ উত্তমকুমার পুরকাইত 



  সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ পড়তেই ভেসে ওঠে মোটা মোটা অক্ষরে লেখা 'খ্রিস্টানদের গির্জায় বিস্ফোরণ'। পত্রিকাটা সোফার উপর ছুঁড়ে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় শুভ। টেবিলে পড়ে থাকা সিগারেট কেস খুলে একটা সিগারেট বার করে ঠোঁটে চেপে ধরে। একটা জ্বলন্ত কাঠি মুখের কাছে এনে পরক্ষণে ছুঁড়ে দেয় জানলার বাইরে। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে পায়চারি করতে থাকে। মনটা যখনই বিষাদে ভরে যায়, তখনই এমন ছটফট করতে থাকে ডক্টর শুভজিৎ ব্যানার্জি। সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাতে চোখ পড়লেই ইদানীং বারেবারে ওই একটা ব্যাপার দু'চোখে ভেসে ওঠে। সংখ্যালঘুদের প্রতি অত্যাচার। খ্রিস্টান মিশনারী ধর্ষিতা, বিস্ফোরণে হত পাঁচ,  বিশ্বের দরবারে ধিক্কার... ইত্যাদি ইত্যাদি।

  এসব কিছুতেই সহ্য করতে পারে না সে। যখনই পড়তে হয় সংখ্যালঘুদের প্রতি নিগ্রহের দায়ে মাথা নিচু হয় দেশবাসীর, কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। একজন ভারতবাসী হয়ে এত বড় কলঙ্ককে গায়ে মাখতে কষ্ট ওর। কেন এমন হয়? জননী ভারতবর্ষকে কারা এমন ছদ্মবেশী সাজাচ্ছে? বিশ্বজনমতের সামনে দেশকে এভাবে অপমান করছে কারা? দু'চোখ ফেটে জল আসে। মাস্টারমশাই মহম্মদ আজিজ চৌধুরির কথা মনে পড়ে। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে যেদিন শুনেছিলেন ভারতবর্ষের এক প্রাচীন মসজিদকে ধ্বংস করছে বিশেষ একটা শ্রেণি, আর তার জবাবে একটা শ্রেণি হিন্দুর মন্দিরে লুটপাট চালাচ্ছে। বৃদ্ধ মাস্টারমশাইয়ের দু'চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমেছিল। শুভর দুটো হাত ধরে উদাস কণ্ঠে বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ভারতবর্ষের আকাশকে মেঘে মেঘে ছয়লাপ করে দিচ্ছে শুভ। কখনো ভাবিনি স্বাধীনতার পরে এমনটা আবার দেখে যেতে হবে। দু'চোখে যে স্বপ্নের জাল বুনে আমার সমস্ত আদর্শ দিয়ে তোমাকে, আয়েশাকে মানুষ করেছি সেটা তুমি মিথ্যে হতে দিও না বাবা। এদেশের উত্তরসূরি তোমরা। তোমাদের অনেক দায়িত্ব, কিন্তু তোমরা কি পারবে? কিন্তু, পারতে তোমাদের হবেই...

  শেষের দিকে মাস্টারমশাই কেমন উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন। শুভ ওঁকে থামিয়ে দিয়েছিল, আপনার শরীর অসুস্থ মাস্টারমশাই, আপনি উত্তেজিত হবেন না।

  তবু শান্ত হননি মাস্টারমশাই। যদিও বুকের অশান্ত যন্ত্রণা একটু মিইয়ে এসেছিল। অতি কষ্টে বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষকে নির্মূল করার দায়িত্ব তোমাদের। এদেশের হিন্দুমুসলমান সম্প্রীতিকে সুদৃঢ় করার দায়িত্ব তোমাদের। মৃত্যুকাল পর্যন্ত মনে রেখো তোমরা ভারতবাসী। ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই।

  মাস্টারমশাইয়ের মেয়ে আয়েশা ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। মাস্টারমশাই এক পলক ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আপন মনে বলেছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজেকে বড় ব্যর্থ মনে হচ্ছে। তোদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না। সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত নর্দমায় তোদেরকে ফেলে রেখে আমি পালিয়ে যাচ্ছি।

  শুভ মাস্টারমশাইয়ের হাতটা চেপে ধরেছিল, আপনার শরীর ভীষণ দুর্বল মাস্টারমশাই। আপনি একটু শান্ত হোন।

  আয়েশা বাবার মাথায় হাত রেখেছিল, এসব কথা বোলো না বাবা।

  মেয়ের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে দুটো চোখ মুছেছিলেন আজিজ চৌধুরি। কিন্তু ভাবনার যে বহ্নিশিখা বুকের ভিতর দাউদাউ করে জ্বলছিল তা ওঁকে নিশ্চিন্ত হতে দিল না। দু'চোখ মেলে আবার তাকিয়েছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র ডক্টর শুভজিৎ ব্যানার্জির বুকে সে দৃষ্টি বোধহয় তীরের মতো বিঁধেছিল। বুঝতে পেরেছিল, জীবনের সমস্ত শিক্ষাকে উজাড় করে দিয়েও আর মাস্টারমশাইকে বাঁচানো যাবে না। সব চিকিৎসার বাইরে চলে যাচ্ছেন মাস্টারমশাই। বিড়বিড় করে অস্পষ্ট স্বরে প্রাণপণে বললেন, আমি আর বাঁচব না শুভ। আমার আয়েশাকে দেখো। জীবনে আমাকে ছাড়া আর কাউকে পায়নি ও। এই পরিবেশে ও যেন একা না হয়ে যায়। ওকে বাঁচিয়ে রেখো। 

  গোঙানির মতো এক নিমেষে কথাগুলো বলে ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়েন। দুটো চোখের পাতা রুদ্ধ করে দেয় দৃষ্টিপথ। 

  শুভর বুকের ভিতর কী যেন দুলে ওঠে। বাবার মুখে মুখ রেখে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে আয়েশা।

  সেইদিন মাস্টারমশাই মারা গেলেন। আয়েশা যেন সমুদ্রের মাঝে একা। জীবনের পরম আশ্রয় হারিয়ে দিশাহীন। বাবা ওর জীবনে বটবৃক্ষের মতো ছিলেন। নিজেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো মনে হলো সেদিন। 

  শুভজিৎ ঘনঘন ওদের বাড়িতে যেত। হাসপাতালের ডিউটি শেষ করেই আয়েশার কাছে ছুটে আসত। ওকে চাঙ্গা করে তোলার জন্য আন্তরিক সঙ্গ দিত। তবুও আয়েশা কেমন যেন হারিয়ে যেতে লাগল। দিনকে দিন শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হতে লাগল। আগে যে মেয়েটা শুভকে দেখতে পেলে খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠত, মুখে ঝলমলে হাসিতে উপচে উঠত, সে মেয়েটাকে ভীষণ অচেনা, অজানা মনে হতে লাগল। শিল্পী মেয়েটি স্কেচপেন্সিল গুটিয়ে রেখে জানলার ধারে বসে বসে কী ভাবে। অথচ জানলার ধারে বসে বিকেলের পড়ন্ত বেলায় ছবি আঁকতে আঁকতে ও হারিয়ে যেত একদিন। আঁকা শেষ হলে পাশে প্রতীক্ষমান শুভকে দেখেই বুঝি চমকে উঠত।

  শুভদা, তুমি কখন এলে, আচ্ছা এমন চোরের মতো কেন ঢোকো বলো তো তুমি? কী এমন করে দেখো? 

  দেখি শিল্পীর স্বাধীনতা। দেখি শিল্পীর হারিয়ে যাওয়া মনের উদাসীনতা। 

  এমনই একদিনে শুভর দিকে একটা স্কেচ এগিয়ে দিয়েছিল আয়েশা। উদাস শিল্পী কখনো কি ভেবেছিল, শুভর সচেতন মনে কী প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে এই চিত্রশৈলী! সৌন্দর্যে মুহ্যমান শুভজিৎ হারিয়ে গিয়েছিল বুঝি অন্যমনস্কতার আবেশে।

  ভালো হয়েছে!

  উচ্ছল জলতরঙ্গের মতো কলকলিয়ে কথাটা কানে আসতেই তন্ময়তার শিখর থেকে ছিটকে পড়েছিল শুভজিৎ। আয়েশার দু'চোখে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। 

  কী হয়েছে বলো তো তোমার! 

  এ ছবি কেন আঁকলে তুমি? 

  ছবির দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে শিল্পী। নিজের অজান্তে কোন ছবি ভেসেছিল ওর মানসপটে। 

  কেন আঁকলে আয়েশা?

  এই যে শুভজিতের দু'চোখে বিস্ময়, এই যে কথা বলার ভঙ্গিমা, এই যে অপূর্ব মোহময় সুরধ্বনি— এসব চঞ্চল করে দিয়েছিল কুমারী আয়েশাকে। লজ্জায়, ভয়ে, শিহরণে ও কাঁপতে কাঁপতে ঘর থেকে পালিয়েছিল।

  মুগ্ধ শুভজিৎ দু'চোখ ভরে দেখেছিল গোধূলি লগ্নের সে ক্যানভাস। অস্তায়মান সূর্যের রক্তরাঙা রশ্মি পশ্চিমের জানলাপথে আয়েশাদের ঘরে ঢুকেছে। আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘের পাহাড়। জানলার ধারে বসেছিল আয়েশা। ঝড় উঠল হঠাৎ। গাছগাছালি দুমড়ে-মুচড়ে দুলছে। পাখিরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে। মাস্টারমশাইয়ের বারান্দার সোফায় বসে কথা বলছিল শুভ। আয়েশার চিৎকার, কোকিলের ডাক নাকি ময়নার মতো সুর ভেসে এল কানে। আনন্দে উত্তেজিত ও। 

  শুভদা, শুভদা দেখবে এসো, দেখবে এসো প্লিজ।

  মাস্টারমশাই হাসলেন। তড়িৎপদে ছুটে এসেছিল শুভ। 

  দেখো দেখো, দূর আকাশের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিয়েছিল আয়েশা।

  পশ্চিম আকাশে অপরূপ স্থাপত্য তখন অদৃশ্য জাদুকরের স্পর্শে। দুধে আলতা আকাশের মাঝে রামধনু রং। খণ্ড খণ্ড মেঘ। এমন অপূর্ব পটভূমি একমাত্র শিল্পীর চোখে ভাসে বোধহয়। ঝুঁকে পড়ে দেখেছিল শুভ। আয়েশার শরীরের সঙ্গে ওর শরীরটা ছুঁয়ে গিয়েছিল নিজের অজান্তে।

  সেদিন থেকে বোধহয় শুভজিতের মনে ঝড়। তাই শুভজিৎ বারে-বারে আজ আয়েশার কাছে ছুটে যায়। ওর কিছু হলে শুভজিৎ বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এটা ও বোঝে না কেন? কেন বোঝে না, যারা বেঁচে আছে, তাদেরকে বাঁচানোর নাম জীবন। 

  কোনো কিছু মানতে চাইত না আয়েশা। বারে-বারে বলত, বাবা নেই, আমার তো আর কেউ রইল না শুভদা।

  কী যে হয়েছিল শুভর! ক্ষুধার্ত, তৃষিতের মতো হাহাকার করে উঠেছিল, কে বলেছে নেই? আমি তো আছি। আমি মাস্টারমশাইকে কথা দিয়েছি আয়েশা। 

  বিবর্ণ আয়েশার মুখটা যেন হঠাৎ রক্তাভ হয়েছিল। দুদিন প্রচণ্ড জোরে বিছানায় আশ্রয় নিল আয়েশা। শুভজিতের অক্লান্ত পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে বলল, তুমি আমার কে?

  এমন অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি কখনো হয়নি শুভ। মাথা হেঁট করেছিল। তারপর থেকে দুদিন যায়নি শুভ। একটা লজ্জা এসে বুকে ভিড় করেছিল।

  একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে জ্বলন্ত সিগারেটের শেষাংশ জানলা দিয়ে ছুঁড়ে দেয় শুভজিৎ। চেয়ারে এসে বসে। সত্যি তো আয়েশা ওর কে? আয়েশা তো ওর কেউ নয়। আয়েশা কি কেউ হতে পারে না কোনোদিন? তবে কেন ও বলল, তুমি আমার কে?

  কেউ নয় আয়েশা। আমরা কেউ কারো নই। তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না।

  কেন উঠতে পারে না, কেন? 

  সমাজ যে মানবে না সে সম্পর্ক। তাছাড়া ট্রাডিশনকে অগ্রাহ্য করার কোনো অধিকার আমাদের নেই আয়েশা। 

  আছে। ওটা ট্রাডিশন নয়। ওটা মিথ্যা। আমরা ভারতবাসী, আমরা ধর্মনিরপেক্ষ। একই দেশের একই জল-হাওয়ায় মানুষ আমরা। তবে কেন আমাদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক থাকবে না?

  জানি না আয়েশা, শুধু জানি কেউ সে সম্পর্ক স্বীকার করবে না। দেখছ না চারদিকে মন্দির, মসজিদ, গির্জা কেমন ধ্বংস হচ্ছে উগ্রপন্থী মৌলবাদীদের নির্মমতায়। আমার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে নিজের জীবনে ঝুঁকি আনতে চাও কেন? 

  ভালোবাসার কাছে কোনো ঝুঁকি তো ঝুঁকি নয়। ভালোবাসা তো মানুষের জীবনে দেবতা। দেবতা কি কোনোদিন ধ্বংস হয়? সবার মঙ্গলের জন্য, সবার কল্যাণের জন্যই তো দেবতা। আমি তোমাকে ভালোবাসি শুভদা। একমাত্র তুমিই আমার সারা জীবনের নিরাপত্তা। 

  ভুল আয়েশা, ভুল। কেউ কাউকে নিরাপত্তা দিতে পারে না।

  পারে শুভদা। সারা জীবনের আনন্দ, শান্তির নিরাপত্তা দিতে পারে ভালোবাসা। সেখানে কোনো দৈহিক কষ্ট তো কষ্ট নয় শুভদা। আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে বিয়ে করব।

  তা হয় না আয়েশা। 

  কেন হয় না? আমরা ভালোবাসি, অথচ আমরা বিয়ে করতে পারি না? তাহলে তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?

  না আয়েশা, না। আমিও তোমাকে ভালোবাসি, ভীষণ, ভীষণ... 

  তবে কেন মনের অন্ধত্বকে ছিঁড়ে তছনছ করে দিতে পারো না? কেন বলতে পারো না চিৎকার করে, আমি তোমাকে ভালোবাসি আয়েশা, আমি তোমাকে বিয়ে করব। কেন পারো না তুমি? আমি যে পারি, আমি সব পারি। তোমাকে নিয়ে যে কত স্বপ্ন দেখেছি, কত কল্পনা করেছি! তুমি এত পাষাণ কেন শুভদা?

  চমকে ওঠে শুভজিৎ। এ কী আবোল-তাবোল ভাবছে ও! আয়েশা কি সত্যি ওকে ভালোবাসে? সত্যি ওকে বিয়ের কথা বলতে পারে? এ কি মনের দুর্বলতা, উদ্ভট কল্পনা! আজ যে আয়েশার কাছে যাওয়া দরকার। দুদিন যায়নি, কী জানি কেমন আছে মেয়েটা? কী ভাবছে কী জানি! হয়তো বা অভিমানে ফুলে ফুলে কাঁদছে। ভাবতে গিয়ে মনটা পাণ্ডুর হয়ে যায়। 

  চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে সহসা একটা সুগন্ধ নাকে এসে ঠেকে। পিছন ফিরতে গিয়ে চমকে উঠে শুভজিৎ। দু'চোখের তারা দরজার ফ্রেমে নিবদ্ধ। চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে আছে আয়েশা। কোনো অনুমতি না নিয়ে হাসতে হাসতে ঘরে ঢোকে। কাঁধের ব্যাগটা খাটের উপর নামিয়ে রেখে শুভজিতের একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায়, যাওনি কেন দুদিন? তোমার কি শরীর খারাপ ছিল?

  না, না, তুমি ভালো আছো তো? 

  অস্বস্তিতে লাল হয়ে যায় শুভজিৎ।

  সেটা জানা কি একান্ত জরুরি তোমার কাছে?

  ছি, এ কী বলছ আয়েশা!

  তাহলে তুমি নিশ্চয়ই যেতে। 

  শুভজিতের মুখখানা কেমন কুঁকড়ে যায়। ওকে বেদনাহত দেখায়।

  আয়েশা হাসে, রাগ করলে শুভদা! আমি কি ভুলতে পারি তোমাকে, তুমি আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছ, সে কি ভুলতে পারি!

  কথাটা শেষ করে ডিভানের উপর নিজেকে এলিয়ে দেয়। ঘরটার চারদিকে তাকিয়ে বলে, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ এঁদেরকে তুমি খুব শ্রদ্ধা করো তাই না?

  ম্লান হাসে শুভ, ওঁদেরকে শ্রদ্ধা করার কতটুকু ক্ষমতা আমাদের আছে আয়েশা?  ওঁরা কি কোনোদিন কারো কাছে কিছু প্রত্যাশা করেছিলেন? আমি ওঁদের ভীষণ শ্রদ্ধা করার চেষ্টা করি আয়েশা। ওঁদের আদর্শকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি।

  আয়েশার দুটো চোখ মুগ্ধতার আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। সমাহিত নেত্রে দেওয়ালে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের পটের দিকে তাকিয়ে থাকে।

  শুভজিৎ ওর কাঁধে টোকা মারে, তুমি এসেছ যখন, তখন আজকের রান্নাটা তুমিই করো। হরিহরের শরীরটা ভালো নয়। জ্বরে শুয়ে আছে।

  আয়েশার কানে কোনো কথা ঢোকে না। ভাববিহ্বল মুখ ফিরিয়ে বলে, আচ্ছা আমি ওঁদের পূজা করতে পারি না? 

  কেন পারবে না? 

  আমি তো...! 

  শুভজিৎ হো হো করে হেসে ওঠে, দেবতাকে পূজা করবে, এতে আবার জাত-ধর্ম কিসের? মানুষের ধর্ম তো মঙ্গলময়কে পূজা করা। সবার কল্যাণের জন্যই তো মহাপুরুষরা আসেন। এঁরাই তো ঈশ্বর।

  ক্ষণে ক্ষণে যেন শিহরিত হয় আয়েশা। ওর মানসপটে যেন কোন অনির্বচনীয় দুর্লভ আগ্রহের অভিষেক ঘটতে চলেছে।

  কী এত ভাবছ?

  কিছু না, কিছু না। হঠাৎ আনন্দে ভরে ওঠে আয়েশার বুক। উঠে দাঁড়ায়। 

  আজকের রান্নাটা তুমি করে খাওয়াবে। হরিহরটা কাহিল আজ। প্রচণ্ড জ্বরে বেচারি বেহুঁশ। তোমাকে বলতাম না, অথচ দেখো তোমাকে পেয়েই কেমন কুঁড়েমি পেয়ে বসেছে। নইলে নিজেই রান্না করে নিতাম।

  বামুনের ছেলে হয়ে আমার হাতের রান্না খেলে তোমার জাত যাবে না?

  জাত? বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছি, তবু এসব বিশ্বাস করব? ডাক্তারের কোনো জাত থাকে? কোনো ধর্ম? সমস্ত জাতের মানুষকে সেবা করাই তো ডাক্তারের ধর্ম। ডাক্তারের একটাই জাত— সে মানুষ। 

  একটু থেমে বিরক্তি প্রকাশ করে শুভজিৎ, আমার আবার ডিউটি আছে। তুমি কি রান্না করবে?

  করব। এবার থেকে প্রত্যেকদিনের রান্নাটা আমিই করব ডাক্তার সাহেব।

  তাহলে তো আমি বর্তে যেতাম আয়েশা। 

  হাসি থামিয়ে এবার একটু সিরিয়াসলি কথা বলে আয়েশা, সত্যি বলছি এবার থেকে প্রত্যেকদিন আমার হাতের রান্না তুমি খেতে পাবে।

  উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে শুভজিৎ, আমাকে পাগল বানাতে চাইছ? তুমি প্রতিদিন অতদূর থেকে এখানে রান্না করতে ছুটবে?

  পাগল! ছুটতে যেন কষ্ট নেই! এখান থেকে আমি আর যাচ্ছি না। তাইতো ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে নিয়ে এসেছি।

  বিস্ময়ে হতবাক শুভজিৎ অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে আয়েশার দিকে। এ যে ওর ভাবনার বাইরে।

  সত্যি বলছি, আমি আর যাচ্ছি না। এই তোমার গা ছুঁয়ে বললাম। 

  কিন্তু কেন?

  উত্তরটা আমি দেব না। তুমি ভেবে দেখলে পেয়ে যাবে। তবে শুনে রাখো, যে উত্তরটা দুদিন আগে দিতে না পেরে তুমি পালিয়ে এসেছিলে, সে উত্তরটা আমি পেয়েছি বলেই সব ছেড়ে এখানে চলে এসেছি। তোমার কাছে।

  শুভজিতের কণ্ঠস্বর জড়িয়ে যায়। কোনো রকমে অস্ফুটে বলে, আয়েশা...

  আমি তোমার কাছে এসেছি। তুমি কি আমাকে তাড়িয়ে দিতে পারবে বলো!

  অসম্ভব, এ হয় না।

  কেন হয় না বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসতে পারো, অথচ আশ্রয় দিতে ভয় পাও কেন বলো!

  আমি সমাজকে ভয় পাই আয়েশা। ওরা যদি তোমার-আমার জীবনটা শেষ করে দেয়... 

  তাতে আমি মরতে পারলে তুমি পারবে না কেন? মিথ্যে সমাজের ভণ্ডামিকে কেন মেনে নিতে চাও? কেন বলতে পারো না —'জাতের নামে বজ্জাতি সব, জাত জালিয়াৎ খেলছে জুয়া'?

  কেন বুঝতে চাইছ না এটা নিয়ে কবিতা চলে না?

  তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না শুভদা, কেন তুমি আমাকে বাঁচালে?

  আয়েশা!

  আমি তোমাকে ভালোবাসি, ভীষণ ভালোবাসি।

  কী যেন একটা আলোড়ন বয়ে যায় শুভজিতের মধ্যে। মুহূর্তে আয়েশাকে বুকের মধ্যে টেনে নেয়। ওর মুখটাকে রক্তরাঙা করে দেয়। দুজনের দুটো শরীর পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে প্রাণপণে। কানে কানে ওরা সুধাবর্ষণ করে, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি। 

  ওদের দুজনের শরীর এখন একটাই। পৃথিবীর বুকে ওরা আশ্রয় খুঁজছে। ভালোবাসার আশ্রয়।

  না না না, এ অসম্ভব। চরম পাওয়ার মুহূর্ত থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে শুভজিৎ। অকস্মাৎ অবলম্বন হারিয়ে থর থর করে কাঁপছে আয়েশা। দুটো চোখে অসহায় আর্তি।

  কেন, কেন অসম্ভব! অস্ফুট অসহায় জিজ্ঞাসা আর্তনাদ করে ওঠে ছোট্ট ঘরে। শুভজিতের দু'চোখের তারায় মুহূর্তে আগুন জ্বলে ওঠে। চিৎকার করে বলে, যা সম্ভব নয় তাই অসম্ভব। 

  তবুও যে ঢেউ উঠেছে আয়েশার মাতাল মনে, তার দুরন্ত প্রবাহে ও আছড়ে পড়ে শুভজিতের বুকে। ঝড়ে ছিন্নভিন্ন সর্বস্বান্ত এক রমণী জাপ্টে ধরে শুভজিৎকে। প্রাণপণে জড়িয়ে ধরে বলে, আমি বাঁচব না, তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। 

  শক্ত দুই হাতে বুকের কাছ থেকে সরিয়ে দেয় শুভজিৎ। দুটো কাঁধ বলিষ্ঠ করতলে চেপে ধরে বলে, বোঝো না কেন এ অবৈধ, এখানে সামাজিক স্বীকৃতি নেই। 

  ফুলে ফুলে কাঁদছে অবোধ মেয়েটা। ওকে কেমন করে সান্ত্বনা জানাবে শুভজিৎ! নিজেকে কেমন দিশেহারা, রিক্ত, শূন্য মনে হয়।

  গ্রামের বাড়িতে আমার মা আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে আয়েশা। আমার মায়ের অনুমতি না নিয়ে আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারি না। আমার এ মন, এ জীবন, ভালোবাসা সব আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। এই যে পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব, এই যে তোমাকে ভালোবাসা, তোমার ভালোবাসা পাওয়া —সব আমার মায়ের জন্য। আমার প্রতি আমার মায়ের অগাধ স্নেহ, বিশ্বাস, ভালোবাসা, ভরসাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি চিরকৃতজ্ঞ আমার গর্ভধারিণীর কাছে। মাস্টারমশাই যেমন আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন মানুষ হওয়ার, তিনিও তো তেমন। তাঁকে আমি ভীষণ ভালোবাসি আয়েশা।

  এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে যায় আয়েশার মধ্যে। দু'চোখের বিবর্ণ দৃষ্টি হঠাৎ রক্তাভ দেখায়। অসহায়তার পরিবর্তে হিংসার বীভৎস চাহনি। প্রতিশোধস্পৃহা যেন ওর কণ্ঠে, তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসো না!

  উত্তেজিত আয়েশাকে শান্ত করতে গিয়ে শুভজিৎ টের পায় মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। কণ্ঠস্বর স্তব্ধ।

  ওর দুটো কলার ধরে ঝাঁকায় আয়েশা, বলো বলো, আমি তোমাকে ছাড়ব না। কিছুতেই ছাড়ব না।

  বাঁচার তাগিদে নিজেকে প্রাণপণে সজাগ করে শুভজিৎ, মাকে যেমন আশ্রয় মনে করি, তোমাকেও তেমনই ভালোবাসি। তবে এই দুইয়ের অনুভূতি আলাদা আয়েশা। এই দুটো জায়গা যদি বিপন্ন হয়ে যায়...

  কেন হবে? মাকে বোঝাও। কেন বুঝতে পারছ না তোমার সঙ্গে আমার জীবনটা জড়িয়ে গেছে! তোমার কাছ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করলে আমি মারা যাব।

  জীবন এত সহজ নয় আয়েশা, মৃত্যু এত সহজ নয়। তুমি নিজেকে শক্ত করো। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করো, যেটা অসম্ভব তাকে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়ে দেওয়াই শ্রেয়, তাতে কোনো দুঃখ থাকে না।

  ভেঙে পড়ে আয়েশা, আমি পারব না...

  কেন পারবে না সারা জীবনের বন্ধু হয়ে বাঁচতে? কেন পারবে না ভালোবাসার ক্ষমতাকে অসীমের সীমানায় পৌঁছে দিতে? বিশাল ব্যাপক সত্যের আলোকে নিজেকে পরিপূর্ণ করে পেতে? সমস্ত সীমাবদ্ধতাকে তছনছ করে দিয়ে মুক্তির স্বাদ পেতে? 

এক নাগাড়ে বলে হাঁপায় শুভ, প্রয়োজনে যেমন কাছে আসতে পারি, তেমনই দূরে চলে যেতে পারি না কেন?

  চিৎকার করে উঠে আয়েশা, না পারব না। তোমার মতো কেতাবি জ্ঞানে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে পারব না। আমি তোমাকে চাই। তোমার মতো অদ্ভুত নন-প্র্যাকটিক্যাল মন নিয়ে কেউ বাঁচতে পারে না। আমি বাস্তব, ভীষণ বাস্তব। তোমার মতো ভাবতে আমি পারব না।

  বিষণ্ণ ম্লান হাসি ফুটে ওঠে শুভজিতের চোখে, আমি মোটেই নন-প্র্যাকটিক্যাল নই। আমি ফিলজফি মেনে চলি। যেটা সম্ভব আমি তার সঙ্গে বোঝাপড়া করি।

  আমি জানতে চাই, আমাকে নিয়ে সম্ভব-অসম্ভবের প্রশ্ন আসছে কেন? 

  এতদিন সবকিছু দেখছ, বুঝতে পারছ না, বুঝতে পারছ না কী মারাত্মক খেলায় তুমি মেতেছ? বুঝতে পারছ না আমার বিধবা মায়ের কাছ থেকে আমাকে তুমি ছিনিয়ে নিতে চাইছ?

  অবাক চোখে চেয়ে থাকে আয়েশা, আমি তোমাকে ছিনিয়ে নিতে চাই! ওর কণ্ঠস্বর ভূমিকম্পের ভাঙনে খানখান।

  ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে শুভজিৎ, ইয়েস, নিজের স্বার্থে তুমি নিজেকে ছাড়া সব কিছু অবাস্তব, মিথ্যা মনে করছ।

  নিজের স্বার্থে! 

  ইয়েস, মনে রেখো আমাদের সম্প্রদায় এক নয়। আমরা বন্ধু হতে পারি, স্বামী-স্ত্রী হতে পারি না। নিজেদের সুখের জন্য আমরা অন্যের দুঃখের কারণ হতে পারি না। 

  মেঝের উপর হাঁটু ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আয়েশা। সর্বাঙ্গ ফুলে ফুলে কাঁপছে। এত বড় সত্যটা ওর সামনে উন্মোচন নাই করলে হত। ও কি পারবে নিজেকে সামলে নিতে? পারবে কি সুস্থ, স্বাভাবিক হতে? 

  সংযত হয়ে যায় শুভজিৎ। মনটা সহানুভূতি, করুণায় দ্রব হয়। ওর পিঠে হাত রাখে, আমারও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আয়েশা। তোমাকে ছেড়ে আমার বাঁচাটাও মরুভূমির মতো। তবু আমি পারব না আমার মায়ের কষ্টের কারণ হতে। আমি চেষ্টা করব আয়েশা, ভীষণভাবে চেষ্টা করব মাকে বোঝাতে। ভীষণভাবে অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করব, ভীষণভাবে জানাতে চেষ্টা করব— তোমাকে না পেলে আমি জীবনে কোনোদিন পূর্ণতা পাব না।

  কথাগুলো ধীর কণ্ঠে শেষ করে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায় শুভজিৎ। নিজেকে কেমন মেরুদণ্ডহীন মনে হয়। দেওয়াল ঘড়িটার দিকে এক পলক তাকিয়ে আলনা থেকে জামাটা টেনে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। হাসপাতালের সময় হয়ে গেছে।

  হাউ হাউ করে কাঁদে আয়েশা। কী করবে এখন! ও টের পেল শুভদাও দুর্বল। ওর সবলতা ক্ষনিকের। নইলে যে মানুষটা একটু আগে নিরুপায় হয়ে কেতাবি ঢঙে কথা বলল, সে মানুষটা মুহূর্তে এত বড় সেন্টিমেন্টাল, ইমোশনাল হয়ে পড়ল কেমন করে! শুভদা মোটেই শক্ত নয়, কেউ শক্ত হতে পারে না, কেউ নিঃস্বার্থ হতে পারে না, সবাই ভালোবাসার ভিখারি।

  শুভদার নিঃশব্দ প্রস্থান অনেক কিছু জানান দিয়ে গেল। শুভদা যেন বলে গেল, তোমার কাছে কোনো দাবি জোর করে করতে পারি না, তাই বিদায়ের কথা না জানিয়ে নীরবে বিদায় নিতে হয় আমাকে। বন্ধু হতে পারিনি আমরা, প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে গেছি, তাই স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে নিঃসম্পর্কের মতো চলে যেতে হচ্ছে। আমরা বড় হতভাগ্য আয়েশা, সমাজের নিষ্ঠুর যুপকাষ্ঠে বন্দী হয়ে পরস্পরের কাছে মৃত। ভালোবেসে আমরা কাছে আসতে পারব না কোনোদিন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পরস্পরের থেকে দূরে বহুদূরে চলে যেতে হবে। তুমি আমাকে ক্ষমা করো। তোমাকে না জানিয়ে আমি বহুদূরে হারিয়ে গেলাম।

  হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে আয়েশা। উদভ্রান্ত, উন্মাদিনীর মতো শুভজিতের শয্যাপ্রান্তে আছড়ে পড়ে। শুভদা জানান দিয়ে গেল, সম্ভব নয় এ মিলন। শুভদার মা কোনোদিন এমন অসামাজিক দুঃসাহসিকতাকে মেনে নিতে পারবেন না। হিন্দু শ্রেষ্ঠ বর্ণ ওঁরা। গ্রামে থাকেন। সমাজ ওঁদেরকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে, ছুঁড়ে দেবে। পতিত হবেন ওঁরা।

  শুভদার প্রতি তার মায়ের যেমন আশা-ভরসা-বিশ্বাস আছে, আয়েশারও আছে। সে জানে শুভদা তাকে ভালোবাসে, তাইতো গগনচুম্বী প্রত্যাশা নিয়ে প্রতীক্ষায় ছিল। বিশ্বের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে শুভদা আসবে ওর কাছে। সব গ্লানিকে ধুয়ে-মুছে দিয়ে ওর বুকে মুখ রেখে বলবে, আমরা পেয়েছি বাঁচার আশ্রয়। জাত, ধর্ম, সংস্কার সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমরা। আমাদেরকে কেউ বিচ্ছিন্ন রাখতে পারবে না। 

  চোখের জল মোছে আয়েশা। জানলার বাইরে দেখে। নির্মম বাস্তব দুনিয়াকে। ওদের স্বপ্ন, কল্পনাকে তছনছ করে দিয়ে চিরকাল যার আধিপত্য। নিজেকে শক্ত করে উঠে দাঁড়ায় আয়েশা। কান্না জীবনের কোনো সমাধান নয়। শুভদা বলেছে, যেটা সম্ভব তাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়াই শ্রেয়। মনকে শক্ত করে। মেরুদন্ড সোজা করে। নিজেদের সুখের জন্য অপরের দুঃখের কারণ হয়ে কী লাভ! জগতের মঙ্গলের জন্য জীবন। ওদের সমাজ, ওদের ব্রহ্মজ্ঞান তাই বলে। মানুষ আনন্দে থাক, শান্তিতে থাক। শুভদার কথাই হয়তো ঠিক। একটা পরম্পরাকে হঠাৎ করে  ধ্বংস করার মধ্যে জন্ম নেয় লক্ষ জীবাণু, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা। জাতের নামে বজ্জাতি। জাত-ধর্মের মৌলিকতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে ঘটে বিস্ফোরণ, সংঘর্ষ, হত্যা। জাত-ধর্ম-সংস্কারের গায়ে জমা হয় অজস্র গ্লানি।

  শুভদার টেবিলের কাছে এগিয়ে আসে আয়েশা। রাইটিং প্যাড ও কলম টেনে নেয়।

  শুভদা,

  তোমার কথাই ঠিক। তোমাকে সত্যি করে নিলাম। মানুষ চিরকাল যেটাকে অসম্ভবের স্বীকৃতি দিয়ে এসেছে, তাকে সম্ভব করতে গিয়ে হয়তো একদিন স্বেচ্ছাচারী হতে হয়। সেই স্বেচ্ছাচারিতাকে বিশ্বজনমত যেদিন মহত্ত্বের মহিমায় স্বীকৃতি জানাবে, সেদিনের প্রতীক্ষায় আমি রইলাম। জাত-ধর্মের অহমিকা ও মিথ্যাচার ভুলে বিশ্বমানবত্মা যেদিন সদর্পে ঘোষণা করবে, 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই' সেদিন আমরা হিন্দু-মুসলমানের অস্তিত্ব ভুলে পরস্পর কাছাকাছি আসব। তুমি পারবে তো? আমি আশাবাদী শুভদা, চিরকাল আশায় পথ চেয়ে থাকব। যেদিন বিশ্ববিধাতা আমাদের নিষ্ঠায় তুষ্ট হয়ে পরস্পরের কাছে আসার আহ্বান জানাবে, সেদিন সব বাধা পেরিয়ে আমরা দুজন দুজনকে দু'চোখ ভরে দেখব। তুমি অপেক্ষায় থেকো সেদিনের। তোমার অন্তরের প্রিয়া করে নিও আমাকে। 

  তোমাকে তো কোনোদিন প্রণাম করিনি। আজ করলাম। 

                                                                  তোমার

                                                            শুধু তোমার আয়েশা। 

  ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আয়েশা। ও জানে না, কোনোদিন ওর আশা পূর্ণ হবে কিনা, ও জানে না আবেগে ভেসে এত কথা লিখল কিনা! তবু ও আশাবাদী। ওর অন্তরে অজস্র উদ্যম। ও বিচ্ছিন্ন নয়— শুভদা দূর বহুদূরে, তবু ওদের মধ্যে কী তীব্র আকর্ষণ! যেকোনো মুহূর্তে ওরা এক হতে পারে। ওদের মন যে একটা। ওদের কামনা, বাসনা, প্রার্থনা যে একটাই। বিশ্বের কোনো শক্তি কি ওদের রুখতে পারবে? সে অসীম ক্ষমতা কার? দুজন দুজনকে কাছে পাওয়ার জন্য ওরা অনন্তকাল অপেক্ষা করে থাকবে। 

  আয়েশা হাঁটছে একাকিনী। বিজয়িনীর আভিজাত্যে দৃপ্ত মহিমায় বিকশিত হয়ে হেঁটে চলেছে সত্যের পথে। এই ভাবে হাঁটতে হাঁটতে ও একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে। 


Rate this content
Log in

More bengali story from উত্তম কুমার পুরকাইত

Similar bengali story from Romance