STORYMIRROR

Swarnali Bhattacharjee

Drama Tragedy Crime

4  

Swarnali Bhattacharjee

Drama Tragedy Crime

র‌্যাগিং এর মায়াজাল।

র‌্যাগিং এর মায়াজাল।

6 mins
17

গল্প-  র‌্যাগিং এর মায়াজাল।

মানছি না। মানব না। বিচার চাই বিচার দাও। আমাদের দাবি মানতে হবে!

হোস্টেলের ব্যালকনি থেকে কলেজের গেটের সামনে এই ধর্না দেখছিল অমৃত। 

১৮ বছরের সদ্য মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হওয়া ছাত্র। 

অনেক স্বপ্ন চোখে নিয়ে মাধবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছিল। ইচ্ছে ছিলো একদিন মস্ত বড় বৈজ্ঞানিক হবে। কিন্তু সে ভাবতেও পারেনি তার জন্যে কি অপেক্ষা করছিল ওই পাশবিক হোস্টেলে। তার জীবনটাই যে এভাবে পাল্টে যাবে সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। 


গতকাল সন্ধাবেলা এই ব্যালকনিতে দাড়িয়ে অনেক ভয় করছিল তার। তবে আজ আর সেই ভয় নেই আছে শুধু একরাশ বিষন্নতা আর অপ্রাপ্তি। 


কবি কাজী নজরুলের লেখা "১৮ বছর বয়স দুর্বার,পথে প্রান্তরে ছুটায় তুফান.." কবিতাটি আওড়াতে আওড়াতে দিবা স্বপ্ন দেখছিল অমৃত তার হোস্টেলের রুম এ বসে।


হটাৎ দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ!! রাত তখন ১:৩০ ! একটু ভয়ের গলায় জিজ্ঞেস করে "কে এসেছো এখন?" 

পরক্ষনেই আবার জুড়ে জুড়ে দরজা পেটানো শুরু করে কারা যেনো বাইরে হাসাহাসি করছিল। 


গলা শুকিয়ে যায় অমৃতের। সাহস করে দরজাটা খুলে অমৃত আর তখন ই তার মুখে চেপে ধরে কজন নিয়ে যায় হোস্টেলের সামনে মাঠে। 

কনকোন শীতের ঠান্ডায় কজন দাড়িয়েছিল ওর সাথেই। 

সামনে থেকে একজন বলে তোরা এখন উঠ বস কর। তোদের P T এখন। অমৃত বুঝতে পারে যে ও সিনিয়র দের রাগিং এর খপ্পরে পড়েছে। 

 তার পর ওই ছেলে গুলো বলে তোদের কাপড় খুলে ফেল। অত্যন্ত খারাপ একটা পরিস্থতিতে পরে গেলো সে। সাহস করে বলেছিল ঠান্ডা লাগছে তো দাদা। 

ব্যাস, ছেলে টাকে মাটিতে ফেলে এমন মার মারলো ওই নরপিশাচ গুলো জোর করে তার কাপড় ছিঁড়ে ফেলে মুখ থেকে রক্ত বের করে দেয়। আর বাকি দের উদ্দেশ্যে বলে এই মুরগি টাকে নিয়ে যা। আজ ছেড়ে দিলাম তোদের। বলে হাসতে হাসতে চলে যায়। সবাই যেনো নরক দর্শন করে মর্তে ফিরেছে এমন করছিল। 


সুমিত, অমৃতকে রুমে নিয়ে এসে ওষুধ পত্র দেয়। 

অমৃত কে বলেছিল সে আগেই যে রাত্রি বেলা দরজা খুলিস না কেউ আসলে। অমৃত বেপার টার গভীরতা বুঝতে পারেনি তাই এই ঘটনা হলো তার সাথে।


ওদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় সুমিতের থেকে জানতে পারে যে ওরা এই কলেজের ই ছাত্র ছিল বছর দু এক হলো পাশ করে গেছে কিন্তু এখনও হোস্টেলে থাকে আর নতুন ছাত্র দের ওপর মস্তানি করে। কখনো সবার সামনে আইটেম গানে নাচ করতে বলে, কখনো জোর করে মদ খাইতে দেয় কখনো মেয়েদের কাপড় পরিয়ে হাঁটতে বলে তো কখনো ঠান্ডার মধ্যে বিনে কাপড়ে দাড়িয়ে থাকতে বলে। আমাদের জীবনটা নরক বানিয়ে রেখেছে। কেউ প্রশ্ন করলে তাকে মেরে ফেলার ভয় দেয় কখনো তো মেরে আধমরা করে রেখে দেয়। 


গত শনিবার জানিস একজনকে গলায় ছুরি বসিয়ে বলেছিল যদি কিছু বলিস তাহলে তোর গলা টা থাকবে না আর। 


সুমিত অমৃত কে বলে তুই রাতে দরজা খুলে বেরোবি না। সকাল বেলা ওরা বেশি কিছু করতে পারে না। তবে সতর্ক থাকিস। 


সকাল হলে দ্বিতীয় দিনের ক্লাসে যাওয়ার জন্যে তৈরী হয় অমৃত। শরীরটা এখনো ব্যাথা করছে। রুম থেকে বেরিয়েই দেখে ওই মস্তান গুলো দাড়িয়ে ওর দিকে দেখে বিভৎস ভাবে হাসছে। "কি রে! ব্যাথার মলহম দেবো নিকি। হাহা হাহা.." এগুলোকে এড়িয়ে বেরিয়ে যায় অমৃত। আজ মন টা ভালো নেই। 


ভেবছিল না এটা মানা যায় না একটা কমপ্লেইন করতেই হবে। তবে কলেজে ভর্তি হয়েই কমপ্লেইন করা কি ঠিক হবে, না করলে তো ওরা আরো ভয়ানক রূপ নেবে। সবাইকে নিয়ে এসে কমপ্লেইন করবে ভাবলো।

এই সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই খাবার টা শেষ করে উঠলো অমৃত হটাৎ ওর ঘাড়ে কে একটা হাত রাখলো। শিউরে ওঠে বললো কে। তার পর পেছন ফিরে সুমিত কে দেখে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো। 


কি রে গতকাল খুব ভয় পেয়েছিস না! Haunted House থেকে কম নয় হোস্টেল! মনটা ভার করে বলেছিল সুমিত। 


কথা বলতে বলতেই হোস্টেল এ ঢুকে পড়ে দুজন। বিকেলে যখন বন্ধুরা মিলে হোস্টেলের ফিল্ড এ ক্রিকেট খেলছিল তখন চলে আসে ওই মস্তান গুলো। বলে আমরাও খেলবো। না করার সাহস ছিল না করার মধ্যে। তবে সবাই জানতো কি হতে চলেছে, এক অমৃত ছাড়া কারণ ও নতুন। 

ইচ্ছে করে অন্য ছাত্র দের নিশানা করে বল মারছিলো ওরা। 

অমৃতের চোখের পাশ দিয়ে চলে যায় বলটা, পরের বলটি ঠিক ওর ডান হাতে এসে লাগে এবং ব্যাথায় ওখানেই বসে পড়ে অমৃত। প্রায় সবাইকেই খেলার নামে জখম করে চলে যায় ওই পাষণ্ডের দল। 

রক্তচক্ষু করে দেখছিল ওদের অমৃত। 

ওইদিন সন্ধাবেলা সবাইকে একটা হল রুমে নিয়ে আসে আর অমৃত আর সুমিত কে মেয়েদের ছোট কাপড় আর লিপস্টিক পরিয়ে নাচ করায় আর পৈশাচিক হাসি হেসে হেসে ওদের এই করুন অবস্থার ভিডিও করে আর বলে যদি কোনো কমপ্লেইন করেছিস তো এই ভিডিও ভাইরাল করে দিবো। আরো অনেক অসন্মান জনক রাগগিং করে ওদের ওই ঘরেই অন্ধকারে অভাবে আটকে রেখে চলে যায়। 


এই ঘটনার পর কান্নায় দুঃখে রাগে ভেঙে পড়ে অমৃত। ওকে সবার থেকে বেশি টার্গেট করছিল ওই নরপিশাচের দল। 


ভোর রাতে দরজা খুলে দেয় কেউ একজন। 

অমৃত আর সুমিত ফিরে যায় তাদের রুমে। 

ঘরে ফোন করে এই রাগিঙ এর কথা জানায় অমৃত। বাবা বলেছিল আসবে সত্তর একটু ধর্যো ধরতে। 

তবে নিয়তি অন্য কিছুই ছিলো। 


ওর সাথে হওয়া এমন অশ্লীল আচরণ অমৃত কে ডিপ্রেসনএ ফেলে দিয়েছিল। কমপ্লেইন করতে পারবে না নাহলে ওরা ভিডিও ভাইরাল করে দেবে। 


সকাল হতেই তৈরি হয়ে ক্লাসের জন্যে বেরোয় কিন্তু তখন ওই ছেলে গুলো আবার এসে বিরক্ত করতে শুরু করে অমৃতকে। আর বলে আজ রাত তৈরি থাকিস বলে অট্টহাসি হেসে অশ্লীল ইঙ্গিত দিয়ে বেরিয়ে যায় ওরা। অমৃত বুঝতে পেরেছিল ওর সাথে খারাপ কিছু হতে চলেছে। হাত পা শুকিয়ে যায় অমৃতের। আজ ও প্রার্থনা করছিল যেনো সন্ধ্যা না নামে। 


কিন্তু, সন্ধ্যা আজ ওর জীবনেই নেমে এলো। 

আজ শুধু অমৃত কেই টেনে আনে ওর ঘর থেকে। 

ঝাঁপ দিতে বলে ব্যালকনি থেকে। যদি ঝাঁপ দিয়ে দেয় তাহলে আর ওরা ওকে রগিং করবে না।

তখনও হালকা আলো ছিল আকাশে, একজন পথচারী দুর থেকে ব্যাপার টা দেখতে পেয়ে কলেজ কর্তিপক্ষকে খবর দেয়। 

অনেক ভয় করছিল অমৃতের। আকুতি করছিল ওকে ছেড়ে দেওয়ার। কিন্তু আজ ওই নরপিশচদের দল কোন মারণ খেলায় মেতে উঠেছিল। 


হটাৎ ই এক সজোড় চিৎকারে চমকে ওঠে পুরো হোস্টেল। 

সবাই নিচে এসে দেখে রক্তে লাল হয়ে আছে চারিদিক আর মাটিতে পড়ে আছে অমৃত।

অমৃতের আধ খোলা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল তার মা বাবার চেহারা। তার অপূর্ণ স্বপ্ন গুলো। ব্যাথায় আর্তনাদ করতে করতে মৃত্যুর কুলে ঢলে পড়ে অমৃত।

সবাই স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

একরাশ নিরবতা যেনো চিৎকার করে বলছে কি দোষ ছিলো অমৃতের।

কিছু পরেই অমৃতের নিথর দেহ নিয়ে যায় অ্যাম্বুলেন্স করে। 

বাবা মা ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে আকাশ ভেঙে পড়ে তাদের মাথায়। 

এ কি পরিহাস নিয়তির। 

ছুটে আসে ছেলের কাছে এখনো কিছু আশা নিয়ে, মা বাবা তো!অনেক কষ্ট ঝর ঝাপটা সহ্য করে সন্তান কে বড় করে। এই দিন দেখার জন্যে তো নয়।


ছেলের প্রাণহীন দেহের মাথায় হাত বুলিয়ে কান্নায় ভেংগে পরে বাবা বলছিল "আর একটু অপেক্ষা করতে বলেছিলাম রে বাবা আমি তো আসছিলাম, কেনো আমি আসার আগেই চলে গেলি। 

মা পাথর হয়ে বসে ছিলেন এক কোণে। ওরা আজ বেচে থেকেও মৃত। মা বলেছিল অনেক সাধ ছিলো ছেলের বৈজ্ঞানিক হবে, ভরসা করে পাঠিয়ে ছিলাম এই কলেজে। ওকে মেরে ফেলার জন্যে? কেন এই কম বয়সে চলে যেতে হলো আমার ছেলেকে? কেন কেউ বাঁচাতে পারলো না? এত দায়িত্বহীনতা কেন?


ময়না তদন্তে পুরনো ইন্টারনাল ইনজুরি ধরা পড়ে। কলেজে আন্দোলনের ঝর ওঠে। একে একে সব ঘটনা গুলো সামনে আসে। সুমিত জানায় ও দেখেছিল অমৃত কে ওই সিনিয়র গুলো জোর করছিল ঝাঁপ দিতে। আর বাকি রাগ্গিং এর ব্যাপারে ও বলে। দোষী দের শাস্তি চেয়ে শুরু হয় মিছিল। রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে ঘটনাটি। তিরষ্কার ধেয়ে আসে কর্তিপক্ষের দিকে। 

খবরের কাগজ, নিউজ চ্যানেল সব জাগায় এই অমানবিক ঘটনা নিয়ে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক।

ছাত্র ছাত্রীরা প্লে কার্ড নিয়ে অমৃতের ফটো নিয়ে ধর্না দিচ্ছিল কলেজ গেটের সামনে। 

সব দেখছিল অমৃত! অমৃতের আত্মা। 

বিচারের আশায় এখনও ঘুরছে এই হোস্টেল এই। 

ও জানে এই মিছিল শেষ হয়ে যাবে। এই দেশ বিতর্ক ও ঠান্ডা হয়ে যাবে। একদিন ওর নাম ও ভুলে যাবে সবাই কিন্তু দোষী দের কি আদৌ শাস্তি হবে? কর্তিপক্ষ কি কঠিন পদক্ষেপ নেবে এই রগগিং প্রথা রুখতে? 

যে বিষে অমৃত কে মৃত্যু দিয়েছিল , সেই বিষ আর কত অমৃতের বলি নেবে!? আমরা কি করছি এই বিষ রুখতে? 


আজ অমৃতের সাথে আর কজন দাড়িয়ে আছে ওই ব্যালকনিতে ওদের মৃত্যুর বিচারের আশায়।।


না জানি কত এমন ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক, ডাক্তার, উকিল,পুলিশ এই রাগিঙ্গ এর বেরা জালে ফেঁসে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এটা কি দেশর ও ক্ষতি নয়? বিচার কি প্রশ্ন করুন! আজও বিচার পায়নি অমৃত। 


Rate this content
Log in

More bengali story from Swarnali Bhattacharjee

Similar bengali story from Drama