Tirtha For You

Drama Classics Thriller


4.8  

Tirtha For You

Drama Classics Thriller


রজঃস্বলা (শারদ সংখ্যা ১৪২৭)

রজঃস্বলা (শারদ সংখ্যা ১৪২৭)

4 mins 196 4 mins 196

কালের মহাসমুদ্রের উজান স্রোতে যদি আপনি আপনার মনন তরণী বাহিয়া লইয়া যাইতে পারেন, তাহলে ইতিহাসের যে বিভীষিকা আপনার সম্মুখীন হইবে উহাকে অগ্রাহ্য করিবার ক্ষমতা আপনার থাকিবে না। অতীতের সেইরূপ এক ঘটনাই আজ আমি লিখিতে চলিয়াছি। আমি যাহা লিখবো এবং আপনি যাহা পড়িবেন তাহা ইতিপূর্বে কোনও লেখক, কবি, বা ঐতিহাসিক কেহই বর্ণনা করেন নাই -- এই বার্তার স্বঘোষণা করিতে আমার দ্বিধা নাই । আপনার সন্দেহের অবকাশ বিদ্যমান থাকিলে আপনি তথ্য যাঁচাই করিতে পারেন। 


বৈদিক যুগে অাসমের নাম ছিলো প্রাগজ্যোতিষপুর। ঐ স্থানে একাধিক জ্ঞানী তান্ত্রিক সাধকদের নিবাস ছিলো। তাহারা সকলেই তন্ত্রবিদ্যা ও জ্যোতিষ শাস্ত্রে সুপাণ্ডিত্য অর্জন করিয়াছিলেন বলিয়াই ঐ স্থানের তদ্রূপ নামপ্রাপ্তি ঘটে। কিন্তু সে সময় অতিক্রান্ত হইবার বহুকাল পরেও সেই স্থানে তান্ত্রিকদের বসবাস কমে নাই। 


অদ্য হইতে ঠিক পাঁচ শত বৎসর পূর্বে অাসমের দিশপুরের কালীবাড়ির সিংহদ্বার হইতে বেড়িয়ে আসলেন ষাটোর্ধ্ব তরকনাথ। দরিদ্র ব্রাহ্মণ, বিবাহ করেন নাই। ব্রহ্মচর্য, তন্ত্র সাধনা, ও মন্দিরের মায়ের বিগ্রহ সেবা করেই জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু আজ তাহার মনের কুঠুরিতে এক অদ্ভুত বেদনা আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। আজ অপর এক ব্রাহ্মণ আসিয়া তাহার স্থান দখল করিয়াছে। তাই জমিদার মহাশয় ওনাকে মন্দিরের সেবা হইতে অব্যাহতি দিয়েছেন। জন্মের পর মায়ের বদন দর্শনের সৌভাগ্য হয় নাই তাহার। তিনি সন্তান প্রসব করিয়াই পরলোক গমন করিয়াছিলেন তাহার স্বর্গীয় স্বামীর উদ্দেশ্যে। অনাথ তারকনাথকে মানুষ করিয়াছিলেন মন্দিরের তৎকালীন পুরোহিত। তিনিও মহাকালীর ক্রোরে চলিয়া যান কিছুদিন পরেই। তারপর থেকেই বালক তারকনাথকে নিযুক্ত করা হয় পৌরহিত্যের কর্মে। মা মহাকালী হয়ে ওঠেন তরকনাথের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু আজ সেই মন্দির থেকেই তিনি অপসারিত।


বাহিরে আসিতেই তাহার নেত্রগোচর হইলো যে এক বছর দশেকের বালিকা একাকী বসিয়া ফুপাইয়া ফুপাইয়া কাঁদিতেছে। তাহার পরনে একটি লাল-সাদা পাড়ের মলিন ও জীর্ণ কাপড়। তৎকালীন সময়ে বালিকারা বক্ষ বস্ত্র পরিধান করতেন না, কাপড় দিয়াই আবরণ করিতেন। বালিকার মুখময় দৈন্যের ছাপ পরিব্যাপ্ত হইলেও তাহার মুখাবয়ব কোমলতাপূর্ণ। ভ্রূ যুগলকে মাঝে রক্তিম বিন্দু বর্তমান। তিনি তাহার সম্মুখে যাইয়া উহাকে প্রশ্ন করিলেন, "কে তুই, মা? কাঁদছিস কেনো? কি হয়েছে?"

কিন্তু কোনো প্রত্যুত্তর পাইলেন না। কন্যাটি পূর্বেকার ন্যায় ক্রমাগত ক্রন্দন করিতে থাকিলো। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করিলেন, "কি হয়েছে, মা? তোর বাবা মা কোথায়? এখানে একা একা বসে কাঁদছিস কেনো?"

কোনো প্রত্যুত্তর আসিলো না, তবে তারকনাথ খেয়াল করিলেন যে বালিকাটির কাপড়ের নিম্নাঙ্গে রক্তের দাগ। তারকনাথ পুনরায় তাহাকে প্রশ্ন করিবে এমনাবস্থায় পাশ হইতে একজন কহিয়া উঠিলো, "আরে পণ্ডিত মশাই যে, এই মেয়েটা কি আপনাকে বিরক্ত করছে?"

"না, না। বিরক্ত করেনি। কিন্তু এ কে? এর বাবা মা কে?" ঐ ব্যক্তিকে প্রশ্ন করেন তারকনাথ।

"ও বোবা। কথা বলতে পারেনা। কোথা থেকে এসেছে আমাদের গ্রামে কেউ জানেনা। বোধ হয় অনাথ। এই মন্দিরেই দরজার সামনে বসে থাকে, যে যা দেয় তাই খায়", উত্তর করেন ব্যক্তিটি।

"এভাবে এখানে আছে কেউ নিয়ে যায়নি এইটুকু একটা নিষ্পাপ মেয়েটাকে?" তারকনাথ বলে।

"কে নিয়ে যাবে বলুন? বোবা মেয়ে মানুষ। তার ওপর আবার বিয়ের বয়স হতে চলেছে। নিয়ে গেলেই তো হলো না, অনেক হ্যাপা আছে", উত্তর করিয়া বিদায় গ্রহণ করিলেন উনি।


দুঃখ হইলো তারকনাথের। নিজেও অনাথ ছিলেন, তাই মেয়েটির প্রতি করুণা হলো তাহার। ইচ্ছা হইলো উহাকে গৃহে হইয়া গিয়া লালন করিবার। কিন্তু দ্বন্দ্বে পড়িলেন দারিদ্র বশত। একার সংসারে নিজেরই উদর পূরণ করিতে হিমশিম খাইতে হয়। এরূপাবস্থায় একটি কুমারী মেয়ে হইয়া তিনি কিভাবে মানুষ করিবেন? কিছুক্ষন ভাবিয়া তারকনাথ ঠিক করিলেন যে যাহাই হউক না কেন একটি অনাথা কন্যাকে এরূপ রাস্তায় ধুলাইয়া যাইতে দেওয়া অমানবিক। তাই গৃহে লইয়া আসিলেন তাহাকে।


কন্যা রজঃস্বলা। কিন্তু তাহার গৃহে কোনো রমণী নাই যাহাকে তিনি কন্যার পরিচর্যার ভার দিবেন। তাই অগত্যা নিজেকেই লজ্জা পরিত্যাগ করিতে হইলো। পূজার সময় কিছু অঞ্জলী প্রদত্ত কিছু শাড়ি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। কন্যাকে স্নান করাইয়া একটি শাড়ি পরাইয়া দিলেন ও শুভ্র বস্ত্র দ্বারা তাহার লজ্জা নিবারণের ব্যাবস্থা করিয়া বলিলেন, "আর কাঁদিস না, মা। তুই তো মা। এটা সব মায়েরই হয় রে। এতে কাঁদার কিছু নেই"।


এইভাবেই এক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হইলো। পিতা কন্যা মিলিয়া আনন্দেই দিন কাটাচ্ছিলেন। তারকনাথ নিজে রাঁধিয়া ভোগ লাগাইয়া পূর্বে কন্যাকে খওয়াইয়া দিতেন এবং তাহার পর নিজে অন্ন গ্রহণ করিতেন। কিন্তু দারিদ্র আসিয়া দর্শন দিলো অন্নের হাড়িতে। মন্দির হইতে যা অর্থ পাইতেন সবই পুনরায় মায়ের সেবায় উৎসর্গ করিতেন। নিজের জন্যে সঞ্চয় করিতেন না। দারিদ্রতাকে বরাবর উপহাস করিয়েছিলেন, তাই আজ দারিদ্রতা তাহাকে উপহাস করিলো।


সেদিন সকালে গৃহ হইতে বহিরাগমন করিলেন তারকনাথ। ব্রাহ্মণ কে সবাই সন্মান করিলেও বিনা অর্থে নিত্য খাদ্য প্রদান করিবে এরূপ ব্যক্তি জগতে চিরকালই দুর্লভ ছিলো। এতদ্ব্যতীত, কারোর হইতে দান গ্রহণ করিবার পাত্রও তারকনাথ ছিলেন না। তাই অগত্যা শূন্য হস্তেই গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতে হইলো তারকনাথকে। 


কিন্তু এবার যাহা ঘটলো তাহা তারকনাথকে দুশ্চিন্তায় ফেলিয়া দিলো। গৃহে আসিয়া তিনি আর তাহার কন্যাকে দেখিতে পাইলেন না। আশপাশের এলাকায় ও সকলের গৃহে যাইয়া অন্বেষণ করিলেও খুঁজিয়া পাইলেন না উহাকে। ব্যর্থ হইয়া উদাস বদনে গৃহের চৌকাঠে বসিয়া মনে মনে ভাবিতেছিলেন, মেয়েটা কি তাহাকে ছাড়িয়া পুনরায় কোথাও চলিয়া গিয়াছে? নাকি কেউ তাহাকে লইয়া গিয়াছে?


হঠাতই তাহার চিন্তা ভঙ্গ করিয়া স্বয়ং জমিদার মহাশয় উপস্থিত হইলেন।

 "বাবা, আমাদের ভুল হয়ে গেছে। আমাদের ক্ষমা করুন", এই কহিয়াই তিনি লুটাইয়া পড়িলেন তারকনাথের চরণে।

"আরে, আরে, জমিদার মশাই। কি হয়েছে? আপনি এরকম করছেন কেনো?"

"তারকনাথ বাবা, কামাখ্যা থেকে চিঠি এসেছে। সেখানে প্রধান পুরোহিত স্বপ্নাদেশ পাইয়াছেন যে মা কামাখ্যা স্বয়ং আপনাকে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিয়োগ করতে বলেছেন। আপনাকে ওখানে পাঠাবার সমস্ত ব্যাবস্থা আমি করে দিয়েছি। ওখানে আপনার থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থাও আমি করে দিয়েছি। আপনি আমায় অনুগ্রহ করে ক্ষমা করুন। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি..." ইত্যাদি বলিয়া জমিদার তারকনাথকে পুনঃপুনঃ প্রণাম করিয়া বিদায় লইলেন। 


তারকনাথ যেদিন কামাখ্যা পৌঁছলেন তার পরের দিনই অম্বুবাচীর তিথি। তিনিই সেদিন কামাখ্যা মন্দিরে পুজো করিয়া দেবী কামাখ্যার যোনি পিঠে শুভ্র বস্ত্র প্রদান করিয়া মন্দিরের দ্বার বন্ধ করিলেন।


Rate this content
Log in