লিফ্ট
লিফ্ট
রবি চৌধুরী, পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সম্প্রতি কোডক্রাফ্ট ইনোভেশন কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মাত্র একমাস হলো রবি সস্ত্রীক স্থানান্তর হয়ে মুম্বাই এসেছে। এই একমাসের মধ্যে সে নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছে মুম্বাইয়ে। রবির অফিস কোডক্রাফ্ট টাওয়ারের পঁচিশ নম্বর ফ্লোরে। অফিসে সবকিছুই ঠিক আছে তবে বিল্ডিংয়ের লিফ্টটা বেশ গোলমেলে, কখনো হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যায়, আবার কখনো লিফ্টটের ফ্যান বন্ধ হয়ে যায়, কখনো ফ্লোর স্কিপ করে ভুল ফ্লোরে চলে যায়, কখনো আবার বিকট শব্দ করে। কোম্পানির কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেইনি। টাওয়ারে মোট ছটা লিফ্ট রয়েছে, তার মধ্যে এটাই শুধু সমস্যা করে।
একদিন রাতে রবি তার কাজ শেষ করে যখন ল্যাপটপ প্যাক করে উঠল তখন তার হাতঘড়িতে এগারোটা ছুঁই ছুঁই। মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে সে লিফ্টটে প্রবেশ করল। লিফ্টটে ঢুকে গ্রাউন্ড ফ্লোর অপশান টিপে রবি তার স্ত্রীকে ফোন লাগল। কিন্তু সে খেয়াল করল না যে লিফ্ট নীচে নামার বদলে ওপরের দিকে উঠছে।
---- হ্যালো.....
---- হ্যাঁ হ্যালো...বলো
---- হ্যাঁ শুনছো.....আমি বেরচ্ছি...খাবার গরম করে রাখবে
---- তুমি কি বাসে আছো?
---- না আমি এখন লিফ্টে আচ্ছি.....এত রাতে মনে হয় বাস পাব না.... একটা ক্যাব বুক করতে হবে।
----আজ আমি তোমার জন্য পোলাও আর প্রন মালাইকারী করেছি তাড়াতাড়ি চলে এসো।
----হ্যাঁ।
এই পর্যন্ত বলে রবি ফোন কেটে লিফ্টটের ডিসপ্লে স্ক্রিনে একবার তাকাল এবং পরমুহূর্তে সে চমকে গেলো। ডিসপ্লে স্ক্রিনে গন্তব্য ফ্লোর হিসেবে ৫০ লেখা আছে।
রবি বুঝতেই পারছে না একি আদৌ সম্ভব। ফিফটি হবে কি করে এত তিরিশ তলার বিল্ডিং। সে বারবার এর্মাজেনসী বাটনে ক্লিক করতে থাকল কিন্তু লিফ্ট থামল না। অনেকক্ষণ পর লিফ্টটা থামল ২৫ ফ্লোরে। রবি অবাক হলো কারণ লিফ্টটা ঘুরে ফিরে আবার ২৫ ফ্লোরে এসেই দাঁড়িয়েছে। কিন্ত কোনোমতেই দরজা আর খুলছে না। লিফ্টের স্পিকার থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল "মিঃ রবি চৌধুরী, আপনাকে এই খেলায় স্বাগত। এই বিশেষ খেলাটির জন্য আপনাকে বাছা হয়েছে কারণ আপনিই প্রথম ব্যাক্তি যিনি লক্ষ্য করেছেন যে এই লিফ্টটের নর্মাল টিউন সংএর বদলে অন্য গান বাজছে। এই খেলার নিয়মগুলো আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই লিফ্ট প্রত্যেকে ফ্লোরে দাঁড়াবে মাত্র দশ সেকেন্ডের জন্য তার মধ্যে আপনাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আপনি ওই ফ্লোরে নামতে চান বা লিফ্টটে থাকতে চান। যে কোনো সিদ্ধান্তই বিপদজনক হতে পারে তাই ভেবে খেলবেন।" এই পর্যন্ত বলার পর লিফ্টটের দরজা খুলে গেল। রবি দেখল পঁচিশতলা তে তার সমস্ত কলিগদের মৃতদেহ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, কারোর পা কাটা, হাত কাটা বা মাথা কাটা। প্রত্যেকটা মৃতদেহের চোখ সব রবির দিকে তাকিয়ে আছে। রবি সম্মোহিত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু পরক্ষণেই জ্ঞান ফিরে পেয়ে লিফ্টটে থেকে গেল। লিফ্টটের দরজা বন্ধ হল এবং স্পিকার থেকে আবার ওই এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "এতো সবে শুরু এখনো আপনাকে আরা পঁচিশ তলা যেতে হবে।" হঠাৎ করে একটা বিকট শব্দ হলো এবং সঙ্গে সঙ্গে লিফ্টটা ছিঁড়ে নিচের দিকে পড়তে লাগলো। লাইট দপ দপ করছে, রবি বারবার হেল্প হেল্প বলে চিৎকার করছে। ভয়ে সে চোখ বন্ধ করে মেঝেতে শুয়ে পড়েছে। কিন্তু লিফ্টটা শুধু নিচের দিকে পড়েই চলেছে, পড়েই চলেছে, পড়েই চলেছে।
চোখ খুলে বড়ফড় করে উঠে পড়ে রবি দেখে সে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, হাতে চ্যানেল ইত্যাদি ইত্যাদি। তার নাড়াচাড়া দেখে একজন নার্স ছুটে এলেন, রবি যেনো কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু বলতে পারছিল না। নার্স কলবেল টিপে ডাঃ সামন্ত তো কে ডাকলেন। ডাঃ সামন্ত এসে রবির হাত ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, "মিঃ চৌধুরী আর ইউ অলরাইট?" কোনো শব্দ নেই, নড়াচড়াও নেই তবুও পালস রেট, হার্ট বিট ঠিক আছে। ডাঃ সামন্ত নার্সকে উদ্দেশ্য করে বললেন,"আই থিন্ক, উনি আবার কোমায় চলে গেছেন। প্রায় ছমাস আগে উনি উনার অফিসের লিফ্টটে এক্সিডেন্ট করেন। তারপর থেকে উনি কোমাতে।"

