STORYMIRROR

Ayan Dutta

Romance Tragedy

4  

Ayan Dutta

Romance Tragedy

এক কাপ চা

এক কাপ চা

6 mins
288

সেদিন সকাল থেকেই আকাশ টা মেঘলা ছিল। খবরে বলছিলো নিম্নচাপ আসতে পারে। তবে আমার মনের নিম্নচাপ তো অনেক আগেই ঘটে গেছিলো - যখন তোমায় দেখেছিলাম চায়ের দোকানে এক কাপ চা নিয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছিলে । খোলা চুল। পরনে salwar, কোলের ওপর রাখা ছোট্ট একটা সাইড ব্যাগ। হঠাৎ ঝড় উঠলো, না এবার মনে নয়, প্রকৃতির ঝর। ঝরের দাপটে তোমার চুল টা খুব উড়ছিল। তুমি চা সিগারেট টা রেখে চুল টা বাঁধলে। আমি ততক্ষণে তোমার পাশে গিয়ে বসেছিলাম এক কাপ চা নিয়ে। কানে আসছিলো তোমার চা - এ চুমুক দেওয়ার শব্দ। সঙ্গে মাঝে মাঝে সিগারেটে টান দিলে সেটা জলার শব্দ।


হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এলো। সবাই দৌড়ে চায়ের দোকানের পাশের ছাউনি টার নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। এবার আমি নিজের সিগারেট টা বার করে ধরাতেই তুমি জিজ্ঞেস করলে "আগুন টা দেবেন একটু?" এই বলে আরেকটা সিগারেট বার করলে।


আমি লাইটার টা তোমার দিকে বাড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তোমাকে দেখছিলাম। কানের লতিতে ঝুলছে ছোট্ট একটা দুল। চোখে চশমা। সিগারেটের ঠোঁট লাল হয়ে গেল তোমার চুম্বনে। লাইটার টা ফেরত দিয়ে, এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললে,"কি বিপদ বলুন তো, যখন তখন বৃষ্টি এসে যাচ্ছে আজকাল."


"খবরে কিন্তু বলেছিল আজকে বৃষ্টি হতে পারে।"


"ও তাই? আমার খবর দেখা হয়না খুব একটা।"


"সে আমারও নয়, এদিক ওদিক থেকে যা শুনতে পাই আর কি। আপনাকে কোথাও এগিয়ে দেবো? আমার কাছে ছাতা আছে।"


"না না Thank you so much বাট আসলে আমার এক বন্ধু আসবে।"


"আরেক কাপ চা খাবেন? দাড়ান বলছি.... ভোলা দা, আরো দু কাপ চা দিয়ো তো।"


"তুমি কি এখানেই থাকো? "


"না..... মানে হ্যাঁ, এই কয়েকটা বাড়ি পরেই একটা PG তে থাকি।"


আমার অবস্থা দেখে তুমি হেসে উঠে বললে,"আচ্ছা বেশ বেশ।"


তারপর প্রায় অনেকক্ষণ কথা হলো।


"হ্যাঁ খানিকটা সেরকমই বলতে..... আরে এইতো ও এসে গেছে", বলতে বলতে তোমার মুখ টা ঝলমলিয়ে উঠলো।


একটা ছেলে ছাতা মাথায় এসে হাজির।


"এই যো আমার বয়ফ্রেন্ড। এর কথাই বলছিলাম। এই বাদল, এর সাথে এক্ষুনি আলাপ হলো।"


"তোকে কতবার ফোন করছি, ফোন টা ধরতে পারিসনা? কোথায় মন থাকে সবসময়। যেই ছেলে দেখেছিস ওমনি না, ওমনি !", চেঁচিয়ে উঠলো ছেলেটা।


সবাই হকচকিয়ে গেলো। লজ্জায় লাল হয়ে গেল তোমার কান।

মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বললে,"তুই please যা, আমি যাবনা।"


"যাবিনা মানে টা কি, এই বৃষ্টির মধ্যে কি এমনি এমনি বেরোলাম আমি। এই ছাতা টা ধর, গাড়ি টা গলির বাইরে রেখে এসেছি। আমি এগোচ্ছি। তুই চুপ চাপ চলে আসবি এক্ষুনি", বলে গট গট করে চলে গেলো ছেলেটা।


তুমি মুখ টা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলে কিছুক্ষণ। তোমার চোখ থেকে এক ফোঁটা জল রাস্তার কাদা জলে পরে মিশে গেলো।


চোখের জল টা মুছে, এবার মাথা টা তুলে হালকা হেসে বললে,"আমি আসি। তোমার নাম টা কি জানা হলোনা। তোমার সঙ্গে আলাপ করে ভালো লাগলো।"


"জানো তো, দুঃখ কারোর একার নয়। আর, আমার নাম....ঈশান।"


মেয়েটা চলে যাওয়ার পর বৃষ্টি টা একটু কমলো। চায়ের দোকানের রেডিও থেকে ভেসে আসছিলো - ".... নিম্নচাপ সৃষ্টির কারণে আগামী ৪৮-৭২ ঘণ্টা তুমুল বৃষ্টির সম্ভাবনা....."


ঈশান মনে মনে ভাবতে লাগলো,"ইসস্ ওর নাম টাই তো জানা হলোনা. নম্বর ও নেওয়া হলোনা।" আফসোস করতে করতে হাঠা লাগালো। গলি দিয়ে বেরোনোর সময় ঈশান দেখতে পেলো একটা কালো Honda তে করে বেরিয়ে গেলো বাদল আর মেয়েটা। ওর দেখে মনে হলো ওদের মধ্যে ভীষণ ঝামেলা হচ্ছিল গাড়ি তে।


PG তে ফিরে ঈশান নিজের কাজ নিয়ে বসলো। তিন দিন পরে প্রজেক্ট এর ডেডলাইন। এবারেও ডেডলাইন মিট না করতে পারলে client আর Boss কেউ ছেড়ে কথা বলবেনা। এইসব আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে কাজের মধ্যে ডুবে গেলো। কাজের মধ্যে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে মেয়েটার কথা ঈশান এর মাথা থেকেই বেরিয়ে গেছিলো।


টানা তিন দিন বৃষ্টি হয়ে আকাশ পরিষ্কার হলো। এদিকে ঈশানের প্রজেক্ট ও শেষ করে ফাইনালি সময় এর মধ্যেই জমা দিতে পেরেছে। ল্যাপটপ টা বন্ধ করে তিন দিন পর PGr বাইরে পা রাখলো। "যাই এবার একটু শান্তি তে চা খেয়ে আসি", এই ভেবে ঈশান ভোলা দার দোকানের দিকে এগোলো।


"ভোলা দা, দাও দেখি একটা ১০ এর দাও", এই বলে একটা সিগারেট ধরালো ঈশান।


"সেই মেয়েটা তো রোজ এসে তোমার খোঁজ করছিল গত দুদিন ধরে ", ভোলা দা বললো।


"কোন মেয়েট.....",ঈশান এর মনে পরে গেলো সেদিনের ঘটনা। "মেয়েটা এসেছিল? কি বলছিলো?"


"গতকাল ও পরশু, দুদিনই এসেছিল। এই সময়েই রোজ এসে তোমার বর্ণনা দিয়ে জিজ্ঞেস করতো এসেছিলে কিনা। দিয়ে তারপর বসে থাকতো অনেকক্ষণ। চা সিগারেট খেয়ে তারপর চলে যেত।"


ঈশান পাশের একটা বেঞ্চে বসে নিচের দিকে তাকিয়ে এটা সেটা ভাবতে লাগলো। দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। বাক্সের শেষ সিগারেট টা প্রায় শেষের দিকে হঠাৎ দেখলো ওর সামনে এসে কেউ দাড়ালো। আসতে আসতে চোখ তুললো ঈশান। পরনে jeans, ওপরে salwar, কাঁধে সেই সাইড ব্যাগ। চুল টা আজকে বাঁধা। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। কপালে একটা টিপ।


"কি ব্যাপারটা কি? আপনার দেখা পাওয়া তো মুখ্যমন্ত্রীর দেখা পাওয়ার থেকেও কঠিন ব্যাপার।"


"না মানে অফিস এর কাজের চাপে আর কি একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। Very Sorry." সিগারেটের টুকরো টা ফেলে দিয়ে উঠে দাড়ালো ঈশান।


"তুমি ঠিক আছো? সব ঠিক আছে তো? তুমি শুনলাম দুদিন এসে আমার খোঁজ করছিলে।"


"হ্যাঁ এখন সব ঠিক আছে।", অদ্ভুত একটা হাসি দেখা দিল ওর ঠোঁটের কোণায়।


"ঠিক তো? আমার তো অন্য কিছু মনে হচ্ছে।"


"আচ্ছা বেশ মনে হচ্ছে যখন থালে শুনেই ফেলো", এই বলে মেয়েটি সব বলতে লাগলো।


"আমাদের সম্পর্ক ৫ বছরের। ৩ বছর পর থেকেই আস্তে আস্তে ঝামেলা বাড়তে লাগলো। Genuine কারণ কোনোদিনই থাকতোনা। ঝগড়া করার অজুহাত চাই শুধু ওর। একদিন হঠাৎ আমি ওকে একটা মেয়ের সাথে ঢলা ঢলি করে যেতে দেখেছিলাম গরিয়াহাটে। আমি তখনই ওকে ফোন করতে ও বলে মায়ের সাথে শপিং করতে গেছে। এরম আরো যে কত মিথ্যে বলতো। আমি এর ওর মুখে শুনতে পেতাম। আর ওকে বললেই উল্টে আমার সাথে ঝামেলা করতো যে আমি ওর ওপর নজর দারি করছি, আমি ওকে ট্রাস্ট করিনা।"


ঈশান এর দিকে সিগারেট এগিয়ে দিয়ে নিজেও ধরালো।

"সম্পর্ক টা তিক্ত হয়ে গেছিলো। তবু একটা টান ছিল ওর প্রতি। ওইদিন তোমার সাথে আলাপ করেছিলাম বলে ঝামেলা করেছিল। দুদিন অনেক ভাবলাম। শেষ মেষ সির্ধান্ত নিলাম যে সম্পর্কটার ইতি টানবো এবার। ব্রেক আপ টা করবই এবার।"


এই বলে একটু থামলো মেয়েটা। সিগারেটে টান দিয়ে আবার বলতে লাগলো," গতকাল সন্ধ্যা বেলা এখান থেকে সোজা ওর বাড়ি গেলাম। গিয়ে বললাম ওকে। ও চুপ করে গেলো আমার কথা শুনে। শুধু ঘাড় নাড়লো। আমি এই বলে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মাথার পিছন দিকে খুব জোরে লাগলো। মাটিতে পরে যেতেই বাদল আমার ওপর উঠে ছুড়ি দিয়ে কোপাতে লাগলো গলায় -- খুব গলার জোর না তোর, দেখ তোর গলার কি করি আমি -- বলে আমায় গলায় ছুরি দিয়ে মেরে যেতে থাকলো।"


ঈশানের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেলো শুনে। ওর গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছেনা। হাতে সিগারেটের ছাই জমে জমে প্রায় শেষ। ঘুরে তাকানোর ও সাহস পাচ্ছেনা।


"ও ঈশান বাবু, আরেকটা চা দেবো আপনাকে?" হালকা ভাবে ভোলা দার গলা ভেসে এলো।


ধড়ফর করে উঠে পড়লো ঈশান। ওর সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। পাশে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই।


"মেয়েটা কি এসেছিল ?"


"না বাবু, আজকে তো এলোনা। দাড়াও তোমায় আরেকটা চা দি। কাল রাতে ঘুম হয়নি বুঝি ঠিক করে?"


রেডিও থেকে একটা গলা ভেসে এলো -- "গড়িয়াহাট এর একটা ফ্ল্যাটে গতকাল রাতে একটি ছেলে তার বান্ধবী কে কুপিয়ে খুন করে। আওয়াজ শুনে প্রতিবেশীরা পুলিশ কে খবর দিতে তারা গিয়ে মেয়েটির মৃত দেহ উদ্ধার করে। এখনো অব্দি forensic report অনুযায়ী গলায় ছুড়ি দিয়ে বারং বার কোপানোর কারণে মৃত্যু হয় মেয়েটির। ছেলেটির নাম বাদল এবং মেয়েটির নাম বর্ষা। পুলিশ পৌঁছনোর আগেই ছেলেটি পালিয়ে যায়। সে এখনো অব্দি নিখোঁজ..... আমাদের পরের খবর - আবহদপ্তর অনুযায়ী বৃষ্টির আর কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বর্ষা কেটে গিয়ে শরৎ এর আগমন হতে চলেছে খুব শিগগির..."



Rate this content
Log in

More bengali story from Ayan Dutta

Similar bengali story from Romance