STORYMIRROR

SHUBHAMOY MONDAL

Drama Horror Tragedy

3  

SHUBHAMOY MONDAL

Drama Horror Tragedy

দেনা পাওনা - শেষ পর্ব

দেনা পাওনা - শেষ পর্ব

5 mins
150

দেনা পাওনা - শেষ পর্ব


শুভময় মণ্ডল 


বিয়ের পর একদিন মামকে বাধ্য হয়ে এটা মানতেই হয়েছিলো যে তার মা বাবা বেঁচে নেই। সেদিন প্লানচেটে ওর বাবা এসেছিলেন। আর প্রথমবারের জন্য সেদিনই তাঁর মিডিয়াম হয়ে গিয়েছিলাম আমি! 


তিনি তাদের আশীর্বাদ করেছিলেন আর জ্যোতিপ্রিয়কে অনুরোধ করেছিলেন - মামের খেয়াল রাখার জন্য, ওর যত্ন নেবার জন্য।


সেদিন ওটাই আমাদের শেষ প্লানচেট ছিলো। তার পর আর কোনোদিন জ্যোতিপ্রিয় আমার ঘরে আসে নি। আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি, এমনকি দেখা হলেও কোথাও সে না দেখার ভান করে চলে যেতো।


অনুপমাদের বসত বাড়িটায় তার বাবা মা গত হবার পর সে আর যেতে চায়নি কখনও। ওর বাবার স্কুল জীবনের এক জুনিয়র ভাই খুব অসুস্থ, প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় এসে ওঁর চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। তারপর তিনিই ওদের সবথেকে কাছের এবং ভীষণ বিশ্বস্ত এক পারিবারিক বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন।


তিনিই তখন ওদের বাড়িটাতে এসে থাকতেন - তাঁর নিজেরই চিকিৎসার স্বার্থে। আর ভাড়া হিসাবে, মাসে কুড়ি হাজার টাকা করে জমা করে দিতেন অনুপমার অ্যাকাউন্টে।


শ্বশুর শাশুড়ি জীবিত নেই জানতে পেরে জ্যোতিপ্রিয় খুব খুশী হয়েছিলো বলে তো আমার মনে হয়নি। বরং পরবর্তীকালে মাম দু'চারবার যখনই এখানে এসেছিলো, ওর আচরণে সুপ্ত আফশোস দেখতে পেয়েছিলাম। আমার হাসিখুশী মিষ্টি বোনটা, দিনদিন কেমন যেন ক্লান্ত, রুগ্ন, অকালে ভেঙে পড়া চেহারার, এক বৃদ্ধায় পরিণত হচ্ছিল খুব দ্রুত।


প্রথমদিকে এড়িয়ে গেলেও পরে বলতো - জ্যোতিপ্রিয়র লোকদেখানো ঐ আদর্শবাদী আর জ্ঞানী চেহারার পিছনের মানুষটা বড় ভয়ঙ্কর দাদা। আমার স্বর্গীয় মা বাবার সম্পর্কেও ওর কথা শুনলে তোমারই মরে যেতে ইচ্ছে হবে। আর আমি সব হাসিমুখে সহ্য করি।


এরপরই একদিন এলো সেই ভয়ঙ্কর দিনটা - নিচে থেকে বারবার কলিং বেল বাজানোয় বেশ রেগেমেগেই নিচে নেমে এসে দেখি - নিজের পেটটা দুহাতে ধরে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে মাম। বললো - কদিন ধরেই ওদের ঐ বসত বাড়িটা বিক্রি করে, টাকা এনে দিতে চাপ দিচ্ছিলো জ্যোতিপ্রিয়। আজ, ওকে চমকে দেবার জন্য নিজের মেডিকেল রীপোর্ট দেখিয়ে মাম বলতে গিয়েছিলো যে সে বাবা হতে চলেছে।


কিন্তু তাতে খুশী হবার জায়গায় রেগে গিয়ে সে মামকে জিগ্গেস করে - বাড়ি বেচার ব্যাপারে সে কি ভেবেছে! বাচ্ছা আসলে তার খরচ চালাবার জন্য টাকা তো লাগবেই। আর তার যেহেতু চোদ্দ গুষ্টির কেউ নেই, তো সেই বাচ্ছার সব দায় দায়িত্বও তো ওর মা বাবাকেই এসে নিতে হবে! সুতরাং মা হবার আগে মামের কর্তব্য তার বাড়িটা বিক্রি করা!


মাম নাকি শুনে সরাসরি বলে দেয় - তার মত এত আদর্শ, বিচার জ্ঞান থাকা একটা মানুষ কি করে নিজে বাবা হবার জন্যও এমন শর্ত রাখতে পারে? ব্যস, এভাবেই শুরু হয় বাক বিতণ্ডা। আর তার শেষ হয় - তার পেটে জ্যোতিপ্রিয়র জুতো সমেত পায়ের একটা জোরালো লাথি খেয়ে মাম জ্ঞান হারানোর পরে।


জ্ঞান ফিরলে, তাকে আসেপাশে আর কোথাও দেখতে পায়নি মাম। প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর তীব্র রক্ত ক্ষরণ নিয়ে, সে ছুটে এসেছে দাদার কাছে তাই প্রাণে বাঁচার জন্য!


আমি তখনই একটা অটোয় চাপিয়ে তাকে নিয়ে দৌড়ালাম কাছেই থাকা সাগর দত্ত হাসপাতালে। তখন এই হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে বেশ কয়েকজন খুব নামকরা গাইনোকোলজিস্ট বসতেন। মামের বাবাকেও চিনতেন তাঁদের কয়েকজন। আমার এক বন্ধুও ওখানে টেকনিশিয়ানের পোস্টে কাজ করছিলো তখন। মামকে তাই সহজেই ভর্তি করানোয় এবং আইসিইউতে নিয়ে যাওয়াতে বিশেষ সমস্যা হয়নি।


কিন্তু তার ব্লিডিং হয়েছিলো জলের মত। অটোর সীট পুরো ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছিলো রক্তে। দুদিনে চার ইউনিট রক্ত দিতে হলো। ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্তের টান থাকায়, আমি অনুচিত জেনেও পরপর দু'দিন রক্ত দিয়েছিলাম। আর দু' ইউনিট রক্ত ব্যবস্থা করা গিয়েছিলো।


কিন্তু, এত জনের এত চেষ্টার পরেও আমার বোনটাকে বাঁচাতে পারলাম না। তৃতীয়দিন সকালে ও আমায় ডেকে অনেক কষ্টে বললো - দাদা, পুলিশ কাছারি করতে যেও না। আমার যা দেনা ছিলো আমি শোধ করে দিয়েছি। এবার তার পাওনা সেও বুঝে পাবে। আমার এই শেষ ইচ্ছেটুকু তুমি রেখো দাদা।


চলে গেলো বোন। শ্মশানে তার দাহ চলছে, শ্মশানযাত্রী শুধু একা আমি। গঙ্গার ধারে বসে আছি, হঠাৎ দেখি - ভাটায় জল নেমে গিয়ে বেরিয়ে আসা নদীর কাদামাটিতে কে যেন লিখছে - তোমার বোনের খুনের অপরাধীর বিচার হবে, এমন বিচার, যা দেখে তুমিও সেদিন তোমার এই কষ্ট ভুলে যাবে!


আজ আপনার কথা শুনে বুঝলাম, আমার বোন তার খুনের বিচার শুরু করে দিয়েছে। পারলে এখন গিয়ে জ্যোতিপ্রিয়কে বাঁচান। তার পরিণতি যে কি ভয়ঙ্কর হবে, সেটা দেখার জন্য যে আমিও অপেক্ষায় আছি সেই কবে থেকে।


আমি বিরিঞ্চিবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলগ্রামের ঐ স্কুলে গেলাম। ক্লাস নাইনের ছেলে মেয়েদের সাথে কথা বলার সময় দারুণ অদ্ভুত একটা খবর শোনালো একজন।


ছেলেটি পড়াশুনায় খুব ভালো নয়, হাতের লেখার স্পীডও খুব কম। তাই স্যারের লেখা দেখে দেখে নিজেও ঐ স্পীডে লিখতে চেষ্টা করে সে।


ছেলেটি বললো, তার নাকি খুব অদ্ভুত লেগেছিলো দেখে যে, দেনাপাওনা গল্পের ঐ নোটস লেখানোর সময়, তাদের স্যার মানে জ্যোতিপ্রিয়বাবু ঐ বন্ধনীর বাক্যগুলো লিখছিলেন না, ওগুলো নিজের থেকেই ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা হয়ে যাচ্ছিলো!


এই ব্যাপারটা তার ক্লাসের আরও দু'তিন জন খেয়াল করেছিলো, কিন্তু স্যারের কাছে বকা খাওয়ার ভয়ে কেউই কিছু বলেনি! ক্লাস এইটের ছেলেদের কাছেও শুনলাম একই কথা - স্যারের লেখার পাশে অদৃশ্য কেউ যেন লিখে দিচ্ছিলো ঐ অদ্ভুত লাইনগুলো!


এরই মধ্যে, পাশের গ্রামে এক ছাত্রীর বিয়েতে গিয়ে, তারা পণ কেন দিচ্ছে না তার পাত্রকে? তাদের মেয়ের সর্বনাশ হবে এরপর শ্বশুরবাড়ি গেলে - এইসব বলে, বিয়েটাকেই প্রায় ভেঙে দিতে বসেছিলেন জ্যোতিপ্রিয়।


তাঁর এই অস্বাভাবিক আচরণ ভালো চোখে না দেখলেও, তাঁকে সসম্মানে স্থানান্তরিত করে নিয়ে গিয়ে তখনকার মত সমস্যার সমাধান করে তারা। কিন্তু এরপর কোন বিয়ে বাড়িতে গেলেই তাঁর ঐরকম আচরণ এবং ঔদ্ধত্য বাড়তে থাকায় সবাই তাঁকে এড়িয়ে যেতে শুরু করে।


ওদিকে, সেই মামলায় তাঁর এইসব আচরণের ভিডিও ফুটেজ ও সাক্ষী হাজির করিয়ে দিতেই প্রমাণিত হয়ে যায় আদালতে যে জ্যোতিপ্রিয় পাগলামির স্বীকার, তাঁর মানসিক অবস্থা স্থিতিশীল নয়। স্কুল শিক্ষকতা করার তিনি যোগ্য নন। জ্যোতিপ্রিয়র চাকরি তো গেলোই, সেই সঙ্গে আদালতের নির্দেশে একরকম বাধ্য হয়েই মানসিক রোগের চিকিৎসাকেন্দ্রে তাঁকে চিকিৎসাধীন রাখতে হলো।


এর কয়েক মাস পর এক বাংলা দৈনিকের মাঝের পাতায় এক কোণে, ছোট্ট করে বের হলো একটা খবর - মানসিক ভারসাম্যহীন একটি লোক, পেটের যন্ত্রণা নিয়ে সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায়, নিজের পেটে হাসপাতালের বেডেরই একটা ভাঙা হাতল ঢুকিয়ে নিয়ে রক্তাক্ত হয়ে, আত্মহত্যা করেছে।



এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Drama