STORYMIRROR

SHUBHAMOY MONDAL

Drama Horror

3  

SHUBHAMOY MONDAL

Drama Horror

দেনা পাওনা - ৩

দেনা পাওনা - ৩

4 mins
180


বিরিঞ্চিবাবু থাকেন স্টেশনের পাশেই, একটা দোতলা বাড়ির ছাদের চিলেকোঠার ঘরে। ঘরটা বেশ বড়ই, সঙ্গে ছাদটাও ব্যবহার করতে পারায় কাজে কর্মে বেশ সুবিধেই হয় তাঁর। 


আমি তাঁর সঙ্গে দেখা হলে, কোনো রাখ ঢাক না করেই বলে দিলাম আমার তাঁর কাছে আসার কারণটা। তিনি কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে বুঝতে চেষ্টা করলেন - আমি সত্যিই ঐ কারণেই এসেছি কিনা।


তারপর বললেন - আই কার্ড দেখি? আমি তাঁকে আমার সাইকোমেট্রি রীসার্চ স্কলারের আই কার্ডটা দেখালাম। দেখলাম, আমার পরিচয়পত্রটা দেখে তিনি বেশ সন্তুষ্টবোধ করলেন।


তারপর বললেন - অনুপমা আর জ্যোতিপ্রিয়র সম্পর্কের কথা জানতে চাইছেন তো? কিন্তু আমি তো ঐভাবে অত শত গুছিয়ে দেখিইনি কখনও ওদের ঐ বিষয়টা। আপনাকে বরং আমাদের সবটা খুলেই বলি, আপনিই তার থেকে আপনার দরকারী তথ্যগুলো বেছে নেবেন না হয়?


আমি ঘাড় নেড়ে তাঁকে সম্মতি জানাতে তিনি শুরু করলেন এইভাবে - 

আমার থেকেই শুরু করি। আমি ছোট থেকে অনাথ আশ্রমে বেড়ে উঠেছি, তাই নিজের বংশ পরিচয় দিতে পারছি না। 


দর্শন আমার অতি প্রিয় বিষয় ছিলো। পরে অতিপ্রাকৃত বিষয়, ভৌতিক কার্যকলাপের বিশ্লেষণ ও সমাধানের দিকে চলে আসি।


আমার স্কুলে সবথেকে প্রিয় টীচার ছিলেন - কল্পনা ম্যাডাম, আমরা স্কুলের ম্যাডামদের দিদি বলেই ডাকতাম। ওনার স্বামী ছিলেন খুব নাম করা ডাক্তার, সার্জেন অচিন্ত্য ঘোষালিয়া। 


আমি যখন মাস্টার ডিগ্রীর পর রিসার্চ করবো বলে এখানে এলাম তখনই একদিন কল্পনাদি ডেকে পাঠালেন আমায় তাঁর বাড়িতে। গেলাম, মাম তখন সবে মাধ্যমিক পাস করেছে। ও হো, অনুপমার ডাক নাম ছিলো মাম।


দিদি বললেন - মাম তো দর্শন নিয়ে পড়বে বলছে রে। ভুগোলে নাকি ভালো নাম্বার ওঠে না, ফাঁকিবাজ আর বলবি কাকে? তুই বাবা তবে একটু গাইড করে দে ওকে। তাঁকে আর দ্বিতীয়বার বলতে হয়নি, আমি তারপর টানা দুবছর, প্রত্যেক রবিবার ওকে দর্শন পড়িয়েছিলাম।


মুখে দিদি বললেও আমি ওনাকে মায়ের চোখে দেখতাম। মাম ছিলো আমার খুব আদরের বোন। দাদা বা ভাই না থাকায়, ওরও খুব প্রিয় দাদা ছিলাম আমি। আমরা ভাই বোনে খুব আনন্দে কাটিয়েছি সেই দিনগুলো।


পরে তো মাম বাংলা নিয়ে পড়বে বলে রবীন্দ্র ভারতীতে এসে ভর্তি হলো। এই বাড়ির নিচের একতলার ঘরটা তখন গার্লস মেস ছিলো। মামকে আমিই এখানে নিয়ে এসেছিলাম - হঠাৎ পথ দুর্ঘটনায় ওর মা বাবা পরলোকে চলে যাবার পর।


তখন থেকেই ও একটু বেশীই আবেগপ্রবণ, একটু সহানুভূতিকামী, একটু উদাসী মত হয়ে ওঠে। ওর তখন মাস্টার্স চলছে। 


পরে, রিসার্চ করার সময় ওর গাইড স্যারের বাড়িতেই বোধ হয় ওর সঙ্গে জ্যোতিপ্রিয়র দেখা হয়েছিলো। সেও তখন রবীন্দ্রনাথ ও অতিপ্রাকৃত বিষয়ের ওপর রিসার্চ করতে রবীন্দ্র ভারতীতে এসেছিলো।


বাবা মা না থাকলেও মাম কাউকে বলতো না সেকথা। স্বাভাবিকভাবে, কারোর সাথে পরিচয় করার সময় বলতো - বাবা ডাক্তার আর মা টীচার। তাঁরা আছেন না ছিলেন তার উল্লেখ করতো না কখনও।


আমায় সে একদিন এই প্রসঙ্গে বলেছিলো - জানো দাদা, আমার না সবসময় মনে হয় বাবা মা আমার সঙ্গেই আছে। অসাবধানে রাস্তা পার হতে গিয়ে কতবার মনে হয়েছে - আমার হাতটা ধরে কেউ যেন টেনে আমায় সরিয়ে নিলো ছুটন্ত বাসের সামনে থেকে!


তো, তারই আবদারে, জোরাজুরিতে আমার প্লানচেট করা শুরু। কিন্তু প্রথম দিকে একটু অসুবিধা হতো - ভালো মিডিয়াম ছিলাম না আমি তখন, মাম তো নয়ই। তাই, খোঁজ চলছিলো এমন একজনের যার এবিষয়ে উৎসাহও আছে আর ধকলটাও নিতে পারবে!


জ্যোতিপ্রিয়কে সেই জন্যই মাম ডেকে নিয়ে আসে একদিন। পারস্পরিক পরিচয়, গল্প গুজব কথাবার্তার পর একদিন সন্ধ্যায় আমরা প্ল্যানচেটে বসি।


দিদির একটা ছবি সামনে রেখে, তাঁকে শুধুই আমার টীচার হিসাবে পরিচয় দিয়ে, তাঁর সম্পর্কে সব ডিটেলে বলেছিলাম জ্যোতিপ্রিয়কে। শুধু বলিনি যে মাম তাঁরই মেয়ে।


সেদিনই প্রথম আমরা সফল হলাম। দিদি জ্যোতিপ্রিয়কে মিডিয়াম করে কথা বললেন - মামকে সাবধানে থাকতে বললেন। মা বাবা যে সবাই একদিন হারায় তাও বললেন। তাঁরা হয়তো অসময়ে হঠাৎ চলে গেছেন কিন্তু সেটাকে মেনে নিয়ে, সময়ের সাথে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে, এগিয়ে যেতে বললেন।


মাম তাঁদের মিস করে, একা থাকতে কষ্ট পায় জানালে দিদি বললেন - সে এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে। একজন জীবনসাথী খুঁজে নতুন জীবন শুরু করতেও বললেন। তাতে নাকি একাকীত্বও কাটবে, আর সে যদি ভালো মানুষ হয় তবে সুখে শান্তিতে নতুন করে জীবন ভরে উঠবে আবার। 


দিদি জ্যোতিপ্রিয়কে ইঙ্গিত করে এও বললেন যে এই ছেলেটিও খারাপ না, সম্ভবত মামকে ও নাকি খুব পছন্দও করে।


সেদিন ঐ অবধিই চললো। প্রথমবারের ঐ ধকল সামলে নিয়ে জ্যোতিপ্রিয়র জ্ঞান ফেরাতেই সেদিন রাত কাবার হয়ে গেলো। পুরো একসপ্তাহ বিশ্রাম নিয়ে তবে পরের প্লানচেটে বসা সম্ভব হলো।


শুধু, মামের মা বাবার সঙ্গে তার কথা বলাতে পারার খুশীতে আমি তখন রোজই প্লানচেট করতে বসতাম। জ্যোতিপ্রিয় মিডিয়াম হওয়ায়, সে-ই শুধু জানতে পারতো না আমাদের কি কথা হয়।


সাধারণত, প্লানচেটের আগে যখন আমি সব গোছগাছ করতাম, ওরা দুজন তখন ছাদে গল্প করতো, ঘুরে বেড়াতো। জ্যোতিপ্রিয়র সম্পর্কে তখন বাকি সকলের মতই আমাদেরও খুব উচ্চ ধারণা ছিলো।


এরপর হঠাৎ একদিন ওরা বর কনের সাজে দক্ষিণেশ্বর থেকে বিয়ে করে এসে হাজির। আমাকে নিয়ে গেলো ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের কাছে। আমি আর ওদের গাইড প্রফেসর - এই দু'জন হলাম ওদের বিয়ের সাক্ষী। ওরা নিজেদের দাম্পত্যজীবন শুরু করলো।


গ্রাম থেকে জ্যোতিপ্রিয়র বাবা মা এসে ওদের নতুন সংসার সাজিয়ে দিয়ে গেলেন - পাশেই একটা ভাড়া বাড়িতে। শুনেওছিলাম এবং খুব স্বাভাবিক কারণেই ছেলের এই হঠাৎ বিয়ে করে ফেলাটা একদমই পছন্দ হয়নি তাঁদের।


ক্রমশঃ



এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Drama