ব্রহ্ম পরিবর্তন
ব্রহ্ম পরিবর্তন
সকালে হোটেলের ঘরে ব্রেকফাস্ট করছিল মৃণাল। বাবা তখন ওকে জিজ্ঞেস করেছিলেন নবকলেবর সম্পর্কে। মৃণাল হা করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। ওরা সবে দুদিন হল বেড়াতে এসেছে এই সমুদ্র শহরে। আজ নাকি নবকলেবর বলেছিলেন বাবা। এই দিন পুরোনো মূর্তিটা বাতিল হয়ে নতুন মুর্তি পান জগন্নাথ দেব। এই বিশেষ ব্যাপারটা ঘটে প্রতি আট, বার বা উনিশ বছর অন্তর একটি বিশেষ দিনে। নবকলেবর সম্পর্কে অনেক কথাই বলছিলেন বাবা। মৃণাল শুনছিল মন দিয়ে।
এখন সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে এসে যখন মা বাবা আর ওর ছোট বোন বুবলি সমুদ্রে চান করতে ব্যস্ত তখন মৃণাল বালিতে বসে ভাবছে কয়েকটা কথা। নবকলেবর সম্পর্কে ও সত্যি কিছুই জানত না। বাবার সৌজন্যে জানল। তবে যা শুনল তার মধ্যে কয়েকটি কথা ওকে বিশেষ ভাবে ভাবাচ্ছিল। ব্রহ্ম পদার্থ বলে একটা কিছু আছে যেটা পুরোনো মূর্তির ভেতর থেকে বার করে নতুন মূর্তির ভেতরে রাখা হয়।
এটা রাতে করা হয়ে থাকে এবং এটা করার সময় গোটা মন্দির চত্বরটাতেই ইলেকট্রিসিটি অফ করে দেওয়া হয়। যাঁরা এই পবিত্র কাজটি করেন তারা হাতে দস্তানা পরে থাকেন আর তাদের নাকি সবার চোখ বাঁধা থাকে। মৃণাল ভাবছিল জগন্নাথের মূর্তিটা কাঠের...
আসলে রসায়নে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মৃণালের মাথায় তখন কাঠ, ইলেকট্রিসিটি, দস্তানা, ইত্যাদি ব্যাপার গুলো একটা রহস্যের বলয় তৈরী করছে। ওটা কি একটা মন্ত্রপূত পাথর নাকি সোণার তৈরি তুলসীপত্র বা কোন তান্ত্রিক যন্ত্র এই ছেঁদো স্পেকুলেশনে কোনওই উৎসাহ নেই মৃণালের। ও শুধু যুক্তি দিয়ে অনুধাবন করতে চায় ব্যাপারটা। কী এমন হতে পারে যার সংস্পর্শে আসার আগে হাতে দস্তানা পরতে হয়, আলো নিভিয়ে দিতে হয় এবং চিরাচরিত একটা শাশ্বত প্রথা বা নিয়ম কে অগ্রাহ্য করে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূর্তিকে পাথর বা ধাতু ব্যবহার না করে কাঠ দিয়ে তৈরি করতে হয়।বাবা বলেছিলেন কিছু অভিজ্ঞতার কথা যা জানিয়েছেন তাঁরা যাঁরা হাতে নিয়েছেন বলে দাবি করেন ঐ পদার্থটিকে। ওটা নাকি একটা খরগোশের মত লাফায়। কেউ বলেছেন ওটা চুলের মত কিছু একটা। এমনও নাকি শোনা গেছে যে একজন জিনিস টিকে স্পর্শ করবেন বলে হাতের দস্তানায় একটা ফাঁক রেখেছিলেন এবং স্পর্শও করেছিলেন কিন্তু স্পর্শ করার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই মারা যান।
এই যে মূর্তিটা প্রতি আট বারো বা উনিশ বছর অন্তর পালটে দেওয়া হয় সেটা কি এই কারণে যে মূর্তির কাঠটা খারাপ হয়ে যায়। এত যত্নে রাখার পরও কেন খারাপ হয়ে যায় কাঠটা? আচ্ছা, তাও যদি হয় তাহলে কেন একেবারে একটা ধাতুর মূর্তি গড়ে নেওয়া হয় না? গোটা মন্দিরের ঐ বিরাট চত্বর জুড়ে কারেন্ট অফ করে তবেই কেন এই ব্রহ্ম পরিবর্তন করা হয়? যদি গোপনীয়তার কথাই ধরা যায় কতটা জায়গা লাগে ব্রহ্ম পরিবর্তন করার জন্য? গোটা মন্দিরটা?
এরপর মৃণাল নিজেকে করে সেই প্রশ্নটা- ব্যাপারটা যদি নিছক নিয়মরক্ষার জন্য হয়ে থাকে তাহলে অন্য কথা কিন্তু যদি অন্য কোন কারণ থেকে থাকে এই বিশেষ অনুষ্ঠানটির পেছনে তাহলে ওঠে প্রশ্নটা, সেই প্রশ্নটা: কী গুরুতর কার্য সিদ্ধি হয় এই নিয়মটি পালনের ফলে?
বাবা বলছিলেন একটা থিওরির কথা। ঐ থিওরি অনুযায়ী ব্রহ্ম পদার্থ হল পারা বা পারা জাতীয় কোন জিনিস যা একটা ছোট পাত্রে রাখা থাকে মূর্তির ভেতরে। বেশ, যদি তাই হয় তাহলেও তো সেই প্রশ্নটাই ওঠে-কেন? কী হয় তাতে? মূর্তির ভেতরে ঐ জিনিসটি রাখলে কার কী উপকার হয়?... ভাবছিল মৃণাল। যদি অন্য কোন জিনিস হয় ব্রহ্ম পদার্থ তাতেই বা কার কী উপকারে লাগে ওটা?
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন ব্রহ্ম পদার্থ আসলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হৃদয়। অন্য অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে ব্রহ্ম পদার্থ হল একটি আর্ক রিয়াকটর। অনেকটা ঐ মারভেল কমিকসের টোনি স্টার্কের আর্কটির মত। শ্রীকৃষ্ণ কি তাহলে একটা রিয়াকটর ব্যবহার করতেন? হয়ত সুদর্শন চক্রটিকে ঐ আর্ক রিয়াকটরটির সাহায্যে চার্জ করা হত... এখন কী কাজ করে ঐ রিয়াকটর? কাকে চার্জ করে ওটি এখন?
এটা কি কোন নিউক্লিয়ার সাইন্স। কেন চামড়ার সাথে ব্রহ্ম পদার্থ সম্পর্কে আসার চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে মরে যায় একটা সুস্থ মানুষ। কী কারণে জগন্নাথ মন্দিরের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মন্দির চত্বরে লাগানো ১৬টি সিসি টিভি ক্যামেরাই সরিয়ে দেন ব্রহ্ম পরিবর্তনের সময়? মন্দিরের চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর কেন ইলেকট্রিসিটি ডিপার্টমেন্টকে বলে মন্দির তথা আশপাশের সমস্ত জায়গার পাওয়ার সাপ্লাই কাটিয়ে দিলেন? ইলেকট্রিসিটি তো ইলেকট্রিসিটি, কেন অমাবস্যার অন্ধকার রাতে সারা হয় এই কাজটি? কীসের এত গোপনীয়তা? কেন এত চুপচাপ? কেন কটা মাত্র লোক বাদ দিয়ে বাকি সব্বাইকে মন্দিরের বাইরে রাখা হয় এই ব্রহ্ম পরিবর্তনের সময়? পুরোনো বিগ্রহ গুলিকে হাতে পাওয়া গেলে তবু একটা কথা ছিল। অন্তত একটা কিছু বোঝার চেষ্টা করা যেত কিন্তু তার কোনও উপায় নেই। ঐ বিগ্রহ গুলিকে মন্দিরের ভেতর একটি বিশেষ জায়গায় মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয় ঐ রাতেই।
দুপুরে ভাত খেয়ে হোটেলের ঘরে নিজের খাটে শুয়েছিল মৃণাল। মনে পড়ল বাবা বলেছিলেন প্রভুর রক্ষক "দৈতাপতি"দের কথা আর ব্রহ্ম পরিবর্তন করতে পারেন "বারগ্রাহি"দের কথা।
২০১৫ সালে কী যেন একটা ঘটেছিল... মৃনাল দেখল একটা পান মুখে পুরে তখন ওর বাবা উপন্যাসটা সবে খুলছেন। ও বাবাকে জিজ্ঞেস করল ২০১৫ সালে ঘটা ব্রহ্ম বিভ্রাট নিয়ে।
জগন্নাথের সেবাইত কিছু দ্বৈতাপতির গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের জেরে সেবার ১০০০ বছর পুরোনো ঐ ব্রহ্ম পরিবর্তন প্রথায় কিছু বিঘ্ন ঘটে। ব্যাপারটা আদালত অবধি গড়ায়। তখন এক দ্বৈতাপতি মিডিয়ায় দাবী করেন যে তিনি ব্রহ্ম পদার্থটিকে দেখেছেন এবং খালি হাতে কোনও দস্তানা ছাড়াই ওটাকে স্পর্শ করেছেন। ঐ দ্বৈতাপতি আরও জানান যে ব্রহ্মকে নাকি স্নান করানো হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা যেটি ঐ দ্বৈতাপতি বলেন মিডিয়াতে সেটি হল যে ব্রহ্ম পদার্থটিকে স্বচক্ষে দেখে থাকলেও এবং সেটিকে নিজের হাতে স্পর্শ করে থাকলেও তাকে ব্যাখ্যা করা ওনার পক্ষে সম্ভব নয়। না, উনি কিন্তু নৈতিকতার কথা বলছিলেন না।
ওনার মতে ঐ বিশেষ জিনিসটিকে চেষ্টা করলেও কেউ ব্যাখ্যা করতে পারবে না।ফিরে গেল মৃণাল নিজের চিন্তার জগতে। কয়েকটা তথ্য শুধরে নিচ্ছিল ও মনে মনে- এমন কিছু যেটাকে স্নান করান যায় অর্থাত জলের সংস্পর্শে আনা যায়, খালি হাতে স্পর্শ করা চলে অথচ ভাষায় বোঝানো যায় না। খুব জটিল কিছু? কোন যন্ত্র? হয়ত এখন অকেজো বা... মৃণাল আন্দাজ করছিল যে হয়তো ঐ দ্বৈতাপতি ভদ্রলোক বেশি দূর লেখাপড়া শেখেননি তাই ওনার পক্ষে জটিল কোনো যন্ত্রের ব্যাখ্যা দেওয়া সহজ নয়। আরেকটা ব্যাপারও ততক্ষণে ভাবাতে আরম্ভ করেছে মৃণালকে -২০১৫ সালে বিঘ্ন ঘটায় ব্রহ্ম পরিবর্তন রাতে না হয়ে দিনের বেলা হয়, ঐ সকাল দশটা নাগাদ। তাহলে এর ফলে কী ক্ষতি হল? বা প্রশ্ন করা চলে আদৌ কি কোনও ক্ষতি হল এর ফলে আর যদি কোনও ক্ষতি হয়ই তাহলে সেটা কার হল...
সম্ভব এটাও যে আসল ব্রহ্ম পদার্থটা আর নেই এখন। এত বছর পর কোনো কারণে উধাও হয়ে গেছে। এখন ওর জায়গায় রয়েছে হয়ত ওরই একটি মডেল। জগন্নাথের কাঠের শরীরটার ভেতরে একটা চোরা কুঠুরি। অন্ধকার ঘুটঘুটে। কোথাও এক ফোঁটা আলো নেই। গোটা শহরটা জুড়ে আজ লোড শেডিং। কানে আসছে শুধু সমুদ্রের গর্জন। অমাবস্যার রাতে জলে চলছে দাপাদাপি। রীতিমতো একটা ধস্তাধস্তি। আন্দাজে এগিয়ে যায় মৃণাল। দেখে একজন রোগা লম্বা লোককে জলে ডুবিয়ে দিচ্ছে কিছু ষণ্ডা- মার্কা টাকমাথা লোক। মরণাপন্ন মানুষটি তার একটি ফর্সা হাত বাড়িয়ে চেপে ধরে মৃণালের জামার কলারটা। টেনে নেয় মৃণালকে জলের ভেতর। হাঁপিয়ে ওঠে মৃণাল। চেতনা ফিরে পেয়ে উঠে বসে খাটে। ঘামছে তখন ও রীতিমত।
পাশের খাটে ঘুমিয়ে আছে বাবা। মা আর বুবলি কোথাও গেছে বোধহয়। একটু জল খায় মৃণাল। ঘড়ি দেখে ও। বিকেল পাঁচটা। খাট থেকে নেমে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ায় মৃণাল। নিচে রাস্তা ভর্তি লোক, থিকথিক করছে। একটা চাপা গুজব কানে আসে ওর। সামনে একটু দূরে সমুদ্র। মানুষ, ভাবে মৃণাল, এরা সমুদ্রটাকেও রেহাই দেয়নি। ওপর দিকে তাকায় মৃনাল। আকাশ। আছে অথচ নেই। নেই অথচ আছে। পদার্থ। অপদার্থ। ব্রহ্ম।
