মানুষের কালো ছায়া
মানুষের কালো ছায়া
কেতকী আমার এক দূর সম্পর্কের দিদি। থাকত আরো দূরে। রাইপুরে। জামাইবাবু ওখানে একটি পেট্রোল পাম্পে ম্যানেজার। শুনেছিলাম একটি দু কামরার ভাড়া বাড়িতে ওদের নিঃসন্তান সংসার। আমি আচমকা গিয়ে পড়ে একটু অস্বস্তি বোধ করছিলাম। আসলে আমার অফিসের একটি কাজেই গিয়েছিলাম রাইপুরের কাছে। ভাবলাম যাই একবার... ওদের বাড়ির ঠিকানা জানতাম না। অনেক দিন আগে জামাইবাবুর কাছে শুনেছিলাম ওর পেট্রোল পাম্পটা নাকি ওখানকার একটি কোল মাফিয়া দশরথ সাহু বলে একজনের। হেভিওয়েট। 'দ্যসু' নামে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়।
দুপুর দুটো হবে। দ্যসুর নাম করতে বাস কন্ডাক্টরই ঠিকানা দিয়ে দিল। নেমে একটা সাইকেল রিকশায় চেপে পৌঁছলাম সেখানে। ও মা, এ তো পেট্রোল পাম্প নয়; একটা বিশাল অট্টালিকা। সামনে সব দামী দামী বিদেশী গাড়ি। বুঝলাম বাস কন্ডাক্টর ভুল করে পেট্রোল পাম্পের জায়গায় দশরথের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দিয়েছে।
সিকিউরিটি গার্ডকে পেট্রোল পাম্পের অ্যাড্রেসটা জিজ্ঞেস করতে বাড়ির গেটের কাছে গিয়ে দেখি জামাইবাবু। একটি কালো রঙের সুমোতে উঠতে যাচ্ছেন। আমি অবাক হলাম একটু। এগিয়ে গেলাম বোকা বোকা মুখে ওর দিকে। জামাইবাবু হেসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন উনি এখন সাহুর সেক্রেটারি। বাড়িতেই ডিউটি।
জামাইবাবুই আমাকে বাড়ির ভেতর নিয়ে গেল। বুঝলাম ওনার বিশেষ কদর এই সাহু বাড়িতে। একবারে অন্দরমহলে নিয়ে গিয়ে আমাকে স্বয়ং দশরথ সাহুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। দশরথ আমাকে খাতির করে বসালেন ওনার সুবিশাল ঘরে। আলাপ করিয়ে দিলেন ওনার স্ত্রী কেতকী সাহুর সঙ্গে।
তারপর এগারোটা বছর কেটে গেছে। দিদি জামাইবাবুর কোনও খবর নেই। তবে মনে আছে সেদিন বিকেলে কালো সুমোতে করে আমাকে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেওয়ার সময়ে জামাইবাবু বলেছিলেন, "ইংরাজী ভাষায় শরীর কে 'body' বলে। এই 'body' শব্দটির একটি সমার্থক বা synonym হল 'constitution'। যেমন লোকটি সবল বলতে ইংরাজীতে বলা হয় 'The man has a strong constitution.'। আমাদের, প্রত্যেকটি মানুষের, শরীর-মনের 'vertical constitution' বা উল্লম্ব গঠনটা কিন্তু পৃথিবীর যেকোন রাষ্ট্রের 'constitution' বা সংবিধানের চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের স্বগর্বে সাংবিধানিক ঘোষণা করার আগে আমাদের প্রত্যেকের উচিত একবার নিজেদের vertical constitutionটাকে স্মরণ করা। তাহলে আমরা দেখব কেমন প্রতিবার যুক্তি আবেগকে ছাপিয়ে গেছে। মস্তিষ্কটা আমাদের প্রত্যেকের কিন্তু হৃদয়ের চেয়ে খানিকটা ওপরে। সারাটা শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার ফাঁকে ফাঁকে মস্তিষ্ক কিন্তু হৃদয় ও তার আবেগের ওপরেও চোখ রাখছে। আমাদেরও আবেগকে যুক্তির চোখে দেখা উচিত।"

