ভেড়ি
ভেড়ি
ঘুটঘুটে অন্ধকার আকাশ। একটা গুমোট দম চেপে আছে অনেকক্ষণ। প্রায় দুশো একর জমি। শুধু ভেড়ি আর ভেড়ি। মাছ চাষ হয় এখানে। শুধু মাছ চাষ। নানা রকমের মাছ। ছোট বড় মাঝারি। রুই মৌরলা মৃগেল ইলিশ কই তেলাপিয়া সব সব। এই সব ভেড়িই একসময় সেনেদের ছিল। তাও হল মন্দ নয় এক শতাব্দীরও আগেকার কথা। এখন অবিশ্যি মালিকানা পাল্টেছে। অনেক লোক সব একটু একটু করে কিনে নিয়েছে ভেড়ি গুলো। প্রতিটি ভেড়িরই প্রায় এখন আলাদা আলাদা সব মালিক। আলাদা আলাদা সব মালিকানা এখন ভেড়ি গুলোর। যত মালিক তত ভেড়ি। যত ভেড়ি তত মালিক। সেনদের আমলে সাকুল্যে চারটে ভেড়িই ছিল: পলাশী, সাকেনা, বধনা আর ঠাড। না, এই নাম গুলোর ইতিহাস আজও অধরা। পরে এই চারটে বিশাল বিশাল ভেড়িদের কেটে আরো অনেক ছোট ছোট ভেড়ি বেরিয়ে এসেছে। সময় সব পাল্টে ফেলে। গজিয়ে উঠেছে অনেক সব ছোট ছোট বাঁশের তৈরি চালা বা কুটির। এখানে থাকে সপরিবারে সব মাছ চাষিরা। ঘোষ দাস বল ভেড়িদার বা ভেড়ির মালিকরা সব হিসেব বোঝে নিজ নিজ ভেড়িতে পোষা জাঁদরেল সব গোমস্তা বা ম্যানেজারের কাছ থেকে। গোমস্তা সব থাকে এইখানেই তবে একটু দূরে আর যখনতখন এসে তদারকি করে যায়। জল দেখা থেকে শুরু করে কখন কী মাছ চাষ হবে সবই গোমস্তারা সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে থাকে আবহাওয়া ছাড়াও আরও অনেক সব ব্যাপার। পান থেকে চুন খসলে মাছচাষির রক্ষে নেই ওদের 'বড়বাবু' ঐ গোমস্তাদের হাত থেকে। এক দুফোঁটা জল আকাশ থেকে পড়ছে সবে। হাবু বাঁশের গেটটা একটু তুলে ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে আবার যথাস্থানে নামিয়ে রাখে। চাঁপা সবে ভাত নামাচ্ছে। হর একটা চাটাই পেতে কাঁথা মুড়ি দিয়ে পড়ে আছে। একেবারে অসার। বেঁচে আছে কি? হাবু গামছা দিয়ে মাথা গা মুছতে মুছতে চাঁপাকে জিজ্ঞেস করে, 'মা, বাবা ফেরেনি এখনও?'। পাতে ভাত দিতে দিতে চাঁপা না-সূচক মাথা নাড়ে। আজও ফেন ভাত নুন দিয়ে, ভাবে হাবু। এই নিয়ে টানা চারদিন। বৃষ্টিটা বাইরে বেশ ঝমঝম পড়ছে। বাঁশের গেটটা একটা ক্যাঁচ আওয়াজ করে একটু ফাঁক হয়। ঢোকে বাবা। মুখে ধরা কাতলাটা তখনও ছটফট করছে। হাবু হাততালি দিয়ে ওঠে। হাসে চাঁপা। হর কেশে ওঠে খুব জোরে।
