ভালোবাসা
ভালোবাসা
প্রায় দুই বছর আগে, রত্নদীপ প্রতিদিনই তার বাড়ির কাছের একটি নদীর পাড়ে বেড়াতে আসতো। আসলে সে তার ব্যস্ত জীবনের কাজের ফাঁকে ক্লান্তি দূর করার জন্যে সেখানে আসতো এবং একা কিছুটা সময় কাটাতো।
একদিন সে নদীর পাড়ে একটা গাছের তলায় ছায়ায় বসে রয়েছে। তার চোখ পড়লো একটি মেয়ের ওপর সে কোণের সাজে দাঁড়িয়ে রয়েছে রত্নদীপ মনে মনে ভাবে হয়তো কারোর অপেক্ষা করছে।
কিছুক্ষণ পর সেই মেয়েটা রত্নদীপের পাশে সেই গাছের তলায় এসে বসে এবং কাউকে ফোন করে কাঁদতে থাকে।মেয়েটার ফোনের সাউন্ড অনেকটা জোরে থাকায় রত্নদীপ বুঝতে পারে যে সেই মেয়েটা যাকে কল করে চলেছে সেই ব্যাক্তি তাকে ব্লক করে দিয়েছে।
রত্নদীপ তার কান্নার শব্দ শুনে তাকে প্রশ্ন করে "আপনি কে?কোথায় থাকেন?এভাবে কাঁদছেন কেনো?"
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রত্নদীপকে বলে "আমার নাম তণু,আমি অনেক দূর থেকে এসেছি এখানকার রাস্তা ঘাট কিছুই চিনি না"
রত্নদীপ তণুকে বলে "আপনি আপনার বাড়ির ঠিকানা আমায় দিন আমি কথা দিলাম আপনাকে আমি সঠিকভাবে আপনার বাড়ি পৌঁছে দেবো"
তণু চোখের জল ফেলতে ফেলতে উত্তর দেয় 'না, আমি বাড়ি ফিরব না, আমি আমার পরিবারের সকালের বিরুদ্ধে গিয়ে একজনকে ভালোবেসে ছিলাম আর সে আমায় কথা দিয়েছিলো সে আমায় ভালোবেসে বিয়ে করবে। আমাদের পাঁচ বছরের সম্পর্ক আমার পরিবার থেকে আমাদের সম্পর্ক না মেনে নেওয়ায় আমরা ঠিক করি আমরা পালিয়ে বিয়ে করব,সে আমায় এই জায়গার ঠিকানা দেয় এবং আমি এখানে প্রায় ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি কিন্তু আমার অপেক্ষা আর শেষ হয় না।আমি সময় মতো পৌঁছে গেলেও সে আর আমায় নিতে আসেনি, আমি তাকে শুধু ফোন করে গেলাম তারপর আধ ঘন্টা আগে আমার ফোনে একটা মেসেজ ঢোকে," আমি শুভ বলছি,আমার বাড়ি থেকে তোমায় মেনে নেবে না তাই আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না আমার বিয়ের জন্যে পাত্রী ঠিক হয়ে গেছে,তুমি আমায় আর কল বা মেসেজ করবে না,ব্লক করলাম বাই"।আমি তাই এখানে বসে বসে শুভকে ফোন করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু সে আমার ফোন তুলছে না,এখন আমি কোথায় যাবো?আমি আর বাঁচতে চাই না।'
রত্নদীপ তণুর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে বুঝিয়ে তার বাড়িতে নিয়ে আসে।
রত্নদীপ তণুকে বলে তার যখন আট বছর বয়স তখন সে তার বাবাকে হারায় তারপর থেকে তার মা ই তাকে বড় করে,তার যখন কুড়ি বছর বয়স তখন তার মা মারা যায় এখন সে একাই থাকে।
রত্নদীপ এবং তণু একসঙ্গে থাকার ফলে আশেপাশে পাড়াপড়শি তাঁদের নিয়ে নানারকম সমালোচনা করতে থাকে এই সব সমালোচনা তাদের কানে গেলে তারা একে অপরকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়।এভাবে প্রায় দের বছর কেটে যায়।
একদিন তণু সাংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে তাদের বাড়ির কাছের একটা দোকানে আসে। সেখানে এসে তণু দেখে কয়েকজন মহিলা দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথোপকথন করছিলেন,তার কানে কিছু কথা আসে,
"এই সেই মেয়ে,আমাদের রত্নদীপ যাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এসেছে"
"হ্যাঁ, ছেলেটার তো মা বাবা কেউই নেই। আসলে এত টাকা পয়সা আলা বাড়িতে কে না বিয়ে করতে চাইবে, বদরের গলায় মুক্তের মালা"
"ঠিকই বলেছ,এই মেয়েটা এসে ওর ঘাড়ে চেপে বসেছে ,এমন মেয়েকে তো বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া উচিত"
তণু তাকে নিয়ে এইসব সমালোচনা শুনে জিনিসপত্র না কিনেই কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে চলে যেতে চায়, কিন্তু তার সামনে একটি গাড়ি এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায় এবং তণু জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
তণু যখন চোখ খোলে তখন সে নিজেকে হাসপাতালে পায় আর তার পাশে রত্নদীপ বসে চোখের জল ফেলছে ইতিমধ্যে ডাক্তার রত্নদীপকে ডেকে বাইরে নিয়ে যায়।
তণু নিজের পায়ে চলতে পারে না,সে এখন হুইল চেয়ারে। এবং প্রতি মুহূর্তে সে নিজেকে দোষ দেয় আর সেদিনের এক্সিডেন্টের আগে ঘটা ঘটনাটা তণু রত্নদীপকে জানায়। তণু মানসিক ভাবে ভেঙে পরে এবং নিজেকে দোষ দেয় যে তার কারণে রত্নদীপের জীবন নষ্ট হয়ে গেছে।
তণুকে খুশি করার জন্যে রত্নদীপ তাকে নিয়ে বেড়াতে আসে।
তণু রত্নদীপকে জিজ্ঞেস করে "আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
রত্নদীপ কোনো উত্তর না দিয়ে তণুর চোখ দুটো একটা কাপড়ের সাহায্যে ঢেকে দেয়,রত্নদীপ সঠিক স্থানে পৌঁছে তণুর চোখের কাপড়টা খুলে দেয়। সে চোখ খুলে দেখে একটা নদীর পাড় আর একটা বড়ো গাছের তলায় হুইল চেয়ার এ সে বসে তার সামনে রত্নদীপ তণুর দুই হাত ধরে তাকে বলে "এই সেই জায়গা যেখানে তোমার সাথে আমার প্রথম দেখা,আমি যখন তোমায় প্রথম দেখেছিলাম তখনই তোমায় ভালোবেসে ফেলেছিলাম।যদি তুমি সেদিন তোমার ঘর ছেড়ে এখানে না আসতে তাহলে হয়তো আজ আমার সঙ্গে তোমার কোনোদিনও পরিচয় হতো না। তুমি আমার জীবনে আসার পর আমি জীবনের মানে বুঝতে পেরেছি,তুমি না আসার আগে আমার জীবন ছিল পুরোই বেরঙিন কিন্তু তুমি আসার পর সব বদলে গেছে মনে হয় যেনো আমি আমার পরিবার ফিরে পেয়েছি। তোমার মধ্যে আমি আমার বাবা মাকে খুঁজে পাই।আজকে তোমাকে এখানে আনার কারণ আজকের দিনেই ঠিক এই সময় তুমি এই জায়গায় তোমার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়।আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি তণ,আমাকে কোনোদিনও ছেড়ে যেও না।তোমাকে ছাড়া আমার জীবন অন্ধকার, তুমিই আমার পরিবার।আর তুমি যেমনই হও না কেনো আমার কাছে তুমিই সেরা।
কিন্তু তুমি যদি চাও আমি তোমাকে তোমার বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে পারি,তোমার খুশিতে আমার খুশি।আমি তোমার বাড়ির ঠিকানা খুঁজে তোমার মা বাবার সঙ্গে কথা বলেছি তারা তোমায় ফিরিয়ে নিতে চায়।"
কথা শেষ করে রত্নদীপ দেখে তণুর চোখ থেকে জল পড়ছে।রত্নদীপ তার চোখ মুছে দেয়।
তারপর তণু বলে " আমার জন্যে এত কিছু করলে তুমি আমি কিভাবে যে তোমার ঋণ শোধ করব জানি না,অসংখ্য ধন্যবাদ।তবে আমি কিন্তু তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না" বলে তণু মুচকি মুচকি হাসে আবার সে বলে "আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি এই স্বার্থপরতার দুনিয়ায় আমি নিরস্বার্থ ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি তোমার মধ্যে,আমি তোমার মায়াতে আটকে পড়েছি।এবার আমি কি ভাবে যাবো তোমায় ছেড়ে?পাগল।"
দুইজনের চোখেই জল,তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে এবং মুচকি মুচকি হাসে বলে "I love you tanu"
"I love you 2 Ratnadeep"

