অসমাপ্ত হৃদয়ের গল্প
অসমাপ্ত হৃদয়ের গল্প
অধ্যায় ১: প্রথম দেখা
গ্রীষ্মের এক স্নিগ্ধ বিকেল। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানগুলোর সামনে মানুষের ভিড়, তবু বাতাসে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। অয়ন প্রথমবার রিয়ানাকে দেখেছিল ঠিক সেইদিন—একটা পুরোনো কবিতার বই হাতে, চুলে হালকা বাতাসের দোল, আর চোখে এমন একটা গভীরতা, যেটা প্রথম দেখাতেই মানুষকে থমকে যেতে বাধ্য করে।
অয়ন নিজের জন্য "নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী"র কবিতার বই খুঁজছিল, কিন্তু চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল রিয়ানার দিকে। মেয়েটি যেন নিজের জগতেই হারিয়ে ছিল। মাঝে মাঝে বইয়ের পাতার ওপর হাত থেমে যাচ্ছে, আর তার চোখে একটা অদ্ভুত ভাঙা আলো—যেন হাসিতে মোড়ানো এক গোপন যন্ত্রণা।
অয়নের বন্ধুরা তাকে ডাকছিল, কিন্তু সে যেন শুনতেই পেল না। রিয়ানার দিকে তাকিয়ে সে অনুভব করল—জীবনে এমন কেউকে সে কোনোদিন দেখেনি। তার মনে হচ্ছিল, মেয়েটার হাসির আড়ালে নিশ্চয়ই কোনো গভীর গল্প লুকিয়ে আছে।
হঠাৎই, রিয়ানার হাতে থাকা বইটি মেঝেতে পড়ে গেল। অয়ন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সেটা তুলে দিল। তাদের চোখ প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হল।
রিয়ানা চমকে উঠলেও একটা নরম হাসি দিয়ে বলল, "ধন্যবাদ... কখনো কখনো হাত কাঁপে।"
অয়ন হেসে বলল, "কবিতার বই তো এমনই, হাত কাঁপিয়ে দেয়।"
রিয়ানা একটু অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে—এই মানুষটার চোখে অদ্ভুত এক আন্তরিকতা ছিল। কিছু বলার আগেই রিয়ানা হালকা মাথা নেড়ে বইটা নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেল। অয়ন তাকিয়ে রইল।
সে জানত না—এই অচেনা মেয়েটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে উঠবে।
অধ্যায় ২: দ্বিতীয় দেখাকলকাতার শরৎ সন্ধ্যা। রাস্তার দুই ধারে শিউলি ফুলের গন্ধ, আকাশে ম্লান কমলা আলো। অয়ন সেদিন অফিস থেকে ফিরছিল ধীর পায়ে, মাথায় তখনো সেই মেয়েটির কথা—যার চোখে ছিল অনুচ্চার যন্ত্রণা, যার হাসি ছিল অসম্পূর্ণ।
বইয়ের দোকানের সেই মুহূর্ত যেন কয়েকদিন ধরে তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতে পারেনি সে।
ঠিক তখনই, কলেজ স্কোয়ারের পাশে ছোট্ট চায়ের দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক চেনা অবয়ব তার চোখে পড়ল। সাদা ওড়নাটা বাতাসে একটু উড়ছে, আর মেয়েটি নিচের দিকে তাকিয়ে মোবাইলে কিছু লিখছে—হ্যাঁ, সে-ই। রিয়ানা।
অয়ন যেন থমকে গেল।
চা-ওয়ালা তাকে দেখে বলল, "দাদা, চা লাগবে?" কিন্তু অয়নের কানে কিছুই ঢুকল না। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল রিয়ানার দিকে, যেন আবার সুযোগ হারাতে চায় না।
রিয়ানা মাথা তুলে তাকাতেই অয়নের দিকে হালকা অবাক হওয়ার হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
"আপনি?" — রিয়ানার গলায় বিস্ময় আর স্বাভাবিক হাসির মিশ্রণ।
অয়ন একটু হেসে বলল, "হ্যাঁ… আবার দেখা হয়ে গেল মনে হচ্ছে।"
রিয়ানা তেমনি চুপচাপ হাসল।
"আপনি এখানে আসেন?" — অয়নের প্রশ্ন।
রিয়ানা বলল, "মাঝে মাঝে… যখন মনটা খুব ভিড় করে যায়। এখানে একটু নিরিবিলি পাই।"
অয়নের মনে প্রশ্ন জাগল—মনটা ভিড় করে যায়? কেন?
কিন্তু সে জিজ্ঞেস করল না। শুধু পাশে দাঁড়িয়ে রইল। দুজনের মাঝে নীরবতা নেমে এলো—কিন্তু তা অস্বস্তিকর নয়, বরং অদ্ভুত শান্ত।
রিয়ানা হঠাৎ চা-ওয়ালাকে ডাকল, "দাদু, দুধ-চা একটা দিন।" তারপর অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি? চা খেতে ভাল লাগে?"
অয়ন হেসে বলল, "চা আমার কাছে অজুহাত… মানুষের সঙ্গটাই আসল।"
এই কথায় রিয়ানার চোখ হালকা কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, সে কিছু বলতে চেয়েছিল—কিন্তু বলতে না পেরে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। তার চোখের নিচে সেই হালকা ক্লান্তি, সেই চাপা কষ্ট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
চা হাতে পেয়ে সে ধীরে ধীরে বলল, "আপনি জানেন… কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের জীবনে খুব সহজে সুখ আসে না।" তার গলা আচমকা ভারী হয়ে গেল।
অয়ন শান্ত গলায় বলল, "সব ঠিক আছে তো?"
রিয়ানা একটু হেসে মাথা নাড়ল, "হ্যাঁ, ঠিক আছে… শুধু পুরনো কিছু স্মৃতি মাঝে মাঝে ভর করে। সব স্মৃতি সুন্দর হয় না, জানেন তো।"
অয়ন বুঝল—ওর ভিতরে লুকিয়ে আছে বড় কোনো আঘাত।
তবু সে কিছু জিজ্ঞেস করল না। চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে রইল—কারণ কখনো কখনো নীরব থাকা-ই সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।
চা শেষ করে রিয়ানা বলল, "ঠিক আছে, আজ যাই…" তারপর একটু থেমে নরম গলায় যোগ করল, "আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।"
সে চলে গেল ধীরে ধীরে।
অয়ন তাকে হেঁটে যেতে দেখল, আর বুঝল—এই মেয়েটি তার জীবনে শুধু আকস্মিক পরিচয় নয়, আরও কিছু হয়ে উঠছে।
অধ্যায় ৩: সম্পর্কের বাঁকঅয়ন আর রিয়ানার দেখা এখন আর আকস্মিক নয়। প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন তারা কলেজ স্কোয়ারের সেই একই জায়গায় বসে চা খেত, গল্প করত, কিংবা কখনো শুধু নীরবতায় সময় কাটাত।
রিয়ানা ধীরে ধীরে খুলছিল নিজের ভেতরের দরজাগুলো—যেগুলো এতদিন বন্ধ ছিল। তবে পুরোটা কখনই নয়… সেই বন্ধ দরজার পিছনে যে কষ্ট লুকিয়ে আছে, সেটা সে এখনো কাউকে জানাতে প্রস্তুত নয়।
এক বিকেলে, রোদ যখন হালকা সোনালি, রিয়ানা হঠাৎ বলল, "জানেন অয়ন, মানুষ কখনো কখনো ভুল সময়ে ভুল মানুষের কাছে নিজের সবটুকু দিয়ে ফেলে। তারপর সারা জীবন সেটা ভুলে থাকতে হয়।"
অয়নের মনে কেঁপে উঠল কিছু। সে জিজ্ঞেস করল না—কাকে দিয়েছিল সে? কী হারিয়েছিল সে? শুধু নরম গলায় বলল, "কিন্তু সব মানুষ তো একরকম নয়, রিয়ানা। কেউ কেউ আসে শুধু ভালোবাসা শেখাতে।"
রিয়ানা মাথা নিচু করল। তার চোখে যেন একটা অজানা ভয়ের ছায়া।
"আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে শিখিনি। বুঝলেন?"—তার গলায় ব্যথা।
অয়ন শান্ত স্বরে বলল, "বিশ্বাস করতে শেখা তোমার দায়িত্ব নয়… সেটা দেখানোর দায়িত্ব যার প্রতি তুমি ভরসা করবে।"
রিয়ানা তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। প্রথমবার—একদম প্রথমবার—তার চোখে অয়নের প্রতি সমর্পণ, বিস্ময় আর অদ্ভুত নিরাপত্তা দেখা গেল।
সেদিনের কথোপকথন ছিল তাদের সম্পর্কের প্রথম বাঁক—যেখানে নীরব পরিচয় থেকে তারা ধীরে ধীরে একে অপরের প্রয়োজন হয়ে উঠছিল।
এক নতুন অনুভূতি
এরপরের দিনগুলোতে রিয়ানা আরও বেশি হাসত, আরও বেশি নিজের কথা খুলে বলত। অয়ন বুঝতে পারছিল—মেয়েটি ধীরে ধীরে তার ভেঙে পড়া বিশ্বাসের ওপর নতুন করে একটা ছোট সেতু বানাচ্ছে… আর সেই সেতুর ওপর একমাত্র দাঁড়িয়ে আছে অয়ন।
একদিন হাওয়া খুব ঠান্ডা ছিল। দু’জন চা খেতে খেতে রিয়ানা বলল, "তুমি থাকলে মনে হয়… আমি আবার নতুন করে শুরু করতে পারি।"
অয়নের বুকের ভেতর হালকা কম্পন তৈরি হল। সে ধীরে বলল, "তোমার যেদিন ইচ্ছে হবে, আমিই থাকব পাশে।"
রিয়ানা একদম চুপ। শুধু চোখে এক ফোঁটা পানি চিকচিক করল, যেটা সে লুকিয়ে ফেলল হাসির আড়ালে।
তবে রাত যত গাঢ়, সত্য তত কাছে
যখন দুজনের সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে লাগল রিয়ানার আচরণে।
কখনো হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া, কখনো অযথা দূরত্ব তৈরি করা, কখনো নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া—অয়ন সবই টের পাচ্ছিল।
একদিন অয়ন বলল, "রিয়ানা, কিছু কি বলার আছে? তোমাকে বদলে যেতে দেখছি।"
রিয়ানা শুধু বলল, "যা দেখছ… সবটাই সত্যি। কিন্তু সব সত্যি বলা যায় না, অয়ন।"
তার চোখে সেই পুরনো কষ্টটা আবার ফিরে এল। যে কষ্ট এখনো পুরোটা উন্মোচিত হয়নি—যা তাদের সম্পর্ককে সামনে আরও কঠিন এক মোড়ে নিয়ে যাবে।
অধ্যায় ৪: ভাঙনের শুরুশরৎ শেষ হয়ে আসছে। রিয়ানার আচরণ গত কয়েকদিন ধরে এমনভাবে বদলে গেছে যে অয়ন বুঝতেই পারছিল না—কোথায় সে ভুল করল? নাকি ভুলটা তার নয়, সময়ের?
রিয়ানার ফোন কল কমে গেল, মেসেজের উত্তর আসতে দেরি হতে লাগল, দেখা করতে বললে কোনো না কোনো অজুহাত থাকত। আর দেখা হলেই সে আগের মতো হাসত না, কথাও কম বলত। যেন ছায়া হয়ে গেছে সে।
এক সন্ধ্যায় কলেজ স্কোয়ারের পাশে সেই চেনা বেঞ্চটায় বসে ছিল দু’জন। অথচ আজকের নীরবতা ছিল অস্বস্তিকর, ভারী, চাপা অস্থিরতায় ভরা।
অয়ন ধীরে বলল, "রিয়ানা… আমি কি কিছু ভুল করেছি? তুমি কেন এমন হয়ে যাচ্ছ?"
রিয়ানা কিছুক্ষণ চুপ রইল। হাওয়ার দোলায় তার চুল উড়ে অয়নের গালে লাগল। কিন্তু সেই স্পর্শেও আর কোনো উষ্ণতা ছিল না।
সে খুব ধীরে বলল, "ভুলটা তোমার নয়, অয়ন। ভুলটা আমিই। আমি ভেবেছিলাম… আমি সত্যি সত্যি নতুন করে শুরু করতে পারব। কিন্তু পারছি না।"
অয়ন চোখ বড় করে তাকাল। "মানে? তুমি কি আমার উপর ভরসা করো না?"
রিয়ানা মাথা নিচু করল, "ভরসা করি… কিন্তু নিজের উপর করি না। মানুষ যখন বার বার ভেঙে যায়, তখন সে আর কাউকে সুখ দিতে পারে এটা বিশ্বাস করা খুব কঠিন।"
অয়নের বুকের ভেতরে ব্যথা জমে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে রিয়ানার হাত ধরতে চাইল, কিন্তু রিয়ানা হাত সরিয়ে নিল।
অয়ন থমকে গেল।
"রিয়ানা, তুমি কি আমার থেকে দূরে যেতে চাও?"
রিয়ানা চোখ বন্ধ করে বলল, "চাই না… কিন্তু যেতে হবে। কখনো কখনো সম্পর্ক বাঁচাতে দূরে যেতে হয়।"
অয়ন হতাশ হয়ে বলল, "এ কেমন যুক্তি? আমি তো তোমাকে ধরে রাখতে চাই! তুমি কেন দূরে সরে যাচ্ছ? কী এমন হয়েছে?"
রিয়ানা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। তার চোখের কোণে জমা হওয়া পানি শেষমেশ শব্দ হয়ে বের হল— "অয়ন… আমার অতীতটা তুমি জানো না। আর সেই অতীত এখনো আমাকে ছাড়েনি। আমি যতই পালাতে চাই, সে ততই আমাকে ধরে টেনে নিয়ে যায়।"
অয়ন হতভম্ব। "তুমি আমাকে বলতে পারো না ওটা কী? আমি তোমার পাশে আছি।"
রিয়ানা মাথা নাড়ল, "না, সব সত্যি বলা হলে কিছু সম্পর্ক বাঁচে না। তুমি আমার সত্যিটা শুনে বদলে যেতে পারো। আমি সেটা চাই না।"
অয়ন ব্যথিত কণ্ঠে বলল, "তাহলে আমি কি তোমার কাছে শুধু একটা মুহূর্ত ছিলাম?"
রিয়ানা তাকাল তার দিকে—চোখ লাল, ভিজে, কাঁপছে। "না অয়ন… তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা। কিন্তু সুন্দর জিনিসগুলোই মানুষ বেশি হারায়।"
অয়ন এবার ভেঙে পড়ল, "তুমি যদি চলে যাও, আমিও ভেঙে যাব।"
রিয়ানা উঠে দাঁড়াল। হাওয়া আরও ঠান্ডা হয়ে এলো, চারপাশে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণ নীরবতা।
সে ধীরে বলল, "ভাঙা জিনিস জোড়া লাগে… কিন্তু সব ভাঙন সারানো যায় না, অয়ন। আমাকে যেতে দাও।"
অয়ন শেষবারের মতো তার দিকে হাত বাড়াল—কিন্তু রিয়ানা হাত ধরল না।
সে ফিরে হাঁটতে লাগল। প্রতিটা পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে দূরত্বটা বেড়ে গেল। আর অয়ন বুঝল—এটাই তাদের সম্পর্কের প্রথম সত্যিকারের ভাঙন।
সন্ধ্যার আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, তাদের সম্পর্কের আলোও যেন নিভে গেল অন্ধকারে।
অধ্যায় ৫: বছর পরে ফিরে দেখাবছরগুলো কেটে গেছে। অয়ন এখন বড় কোম্পানির ম্যানেজার, ব্যস্ত জীবনে সে প্রায় সবই নিয়মিত করছে। তবে রিয়ানার স্মৃতি কখনো মুছে যায়নি। তার হাসি, চোখের গভীরতা, কষ্টের ছায়া—সব কিছু এখনও তার মনে জীবন্ত।
একদিন কলেজ স্কোয়ারের পাশে থাকা সেই চায়ের দোকানে হঠাৎ অয়ন দেখতে পেল এক পরিচিত অবয়ব। রিয়ানা।
রিয়ানা, যিনি এত বছর ধরে অচেনা দূরত্বে হারিয়ে গিয়েছিলেন, আজ এখানেই দাঁড়িয়ে। তার চুল কেটে ছোট, চোখে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু হেসে উঠলে আগের মতো উজ্জ্বল।
অয়নের মন কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে কাছে গেল।
রিয়ানা তাকাল। প্রথমে চেনা চোখের অচেনা উষ্ণতা। সে হালকা হেসে বলল, "অয়ন… তুমি কি কল্পনা করছি, নাকি সত্যি?"
অয়ন শুধু মাথা নাড়ল। কণ্ঠে কিছু শব্দ এল না।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর রিয়ানা বলল, "বছরগুলো সহজ ছিল না। অনেক কিছু বদলেছে… অনেক মানুষ এসেছে গেছে।"
অয়ন ধীরে বলল, "তুমি কি সুখী?"
রিয়ানা চোখ নামিয়ে বলল, "আমি… চেষ্টা করছি। তবে কিছু কিছু স্মৃতি এখনও ভীষণ ভারী। সেই স্মৃতি গুলো মাঝে মাঝে আমাকে কাঁদায়।"
অয়ন তার হাত ধরল, হালকা, অথচ দৃঢ়ভাবে। "আমি এখনো চাই, আমরা কথা বলি। আমি চাই, সব ভুল বোঝাবুঝি আর কষ্ট—আমরা ভাগাভাগি করি।"
রিয়ানা প্রথমে কিছু না বলে শুধু তার চোখে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, "ঠিক আছে, অয়ন। একবার চেষ্টা করি।
তাদের এই দেখা ছিল শুধুমাত্র একটি নতুন শুরু। যদিও অতীতের ছায়া এখনও তাদের সঙ্গে ছিল, তারা দুজনই জানত—এবার তারা একসাথে এগিয়ে যাবে। তবে কি সত্যিই সব কিছু ঠিক হবে, সেটা সময়ই দেখাবে।
অধ্যায় ৬: সত্যের মুখোমুখিরিয়ানা আর অয়ন বছরের পর আবার দেখা করল কলেজ স্কোয়ারের সেই ছোট চায়ের দোকানে। বাতাসে হালকা ঠাণ্ডা, চারপাশে শিউলি ফুলের সুবাস। কিন্তু বাতাস যতই মিষ্টি হোক, দুজনের মনে ছিল এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা। বছরের স্মৃতি, ব্যথা, আর অর্ধেক কথোপকথনের ফাঁক—সব কিছু তাদের কাছে অমিমাংসিত বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
অয়ন ধীরে বলল, “রিয়ানা, সব বছর ধরে আমি শুধু তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি। আজ, আমি চাই—সব সত্যি বলো, যা কখনো বলার সাহস হয়নি।”
রিয়ানা গভীর নিশ্বাস নিল। চোখে দাগ করা ক্লান্তি আর নীরব কষ্ট।
“যখন আমরা ছাড়লাম, তখন আমার জীবন একেবারে অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল,” বলল সে। “পরিবারে সমস্যা, বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতা, আর নিজের ভুল—সব মিলিয়ে আমি ভেঙে পড়েছিলাম। আমি ভয় পেতাম কাউকে বিশ্বাস করতে। আমি জানতাম, যদি তোমাকে সব সত্যি দেখাই, তুমি নিজেও ব্যথিত হবে।”
অয়ন ধীরে তার হাত ধরল। “ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তোমার পাশে আছি, সব সময়।”
রিয়ানা চোখ মুছল, একটু হেসে বলল, “আমি সেই সময় তোমাকে সব সত্যি বলিনি। আমি চেয়েছিলাম, তুমি শুধু সুখী থাকো। কিন্তু নিজের কষ্ট থেকে বাঁচতে গিয়ে আমি আমাদের সম্পর্কটাকেই ঝুঁকিতে ফেলেছি।”
অয়নের চোখে দৃঢ়তা, কণ্ঠে শান্তি। “সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা একসাথে সব ঠিক করব। তুমি একা নয়।”
রিয়ানা চোখে পানি ধরে বলল, “আমি শুধু চাই, তুমি জানো—যত কষ্টই হোক, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।”
সেই মুহূর্তে তারা বুঝল, অতীতের ছায়া যতই গভীর হোক, সত্যিকারের ভালোবাসা এবং বিশ্বাস সবকিছুকে অতিক্রম করতে পারে। তারা ধীরে ধীরে সেই আঘাত, ভুল বোঝাবুঝি, এবং ভাঙা সম্পর্কের অংশগুলো মুছে ফেলতে শুরু করল।
এই অধ্যায়ে, তারা কেবল অতীতের মুখোমুখি হয়নি, বরং একে অপরের প্রতি নতুন বিশ্বাস, সহানুভূতি, এবং ভালোবাসার সূত্রেও শক্তি খুঁজে পেয়েছে।
অধ্যায় ৭: শেষ চিঠিরিয়ানা বাড়ি ফিরে এসে এক নিঃসঙ্গ ঘরে চুপচাপ বসল। আজকের দেখা তার মনকে এক অদ্ভুত শান্তি আর ব্যথার মিশ্রণ দিচ্ছিল। সে জানত, অয়নের সঙ্গে দেখা হলে শুধু কথাবার্তা নয়, অনুভূতিগুলোও পুনর্জীবিত হয়। তাই সে ঠিক করল—যা মনে আসে সব কাগজে লিখবে, যেন চিঠিটিই তার হৃদয়ের আওয়াজ হয়ে ওঠে।
চিঠি লেখা শুরু করল—
"প্রিয় অয়ন,
আজ তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে আমি বুঝতে পেরেছি—যতই কষ্ট হোক, কিছু সম্পর্ক আবার নতুন করে জীবন্ত হতে পারে। বছরগুলো আমাদের দূরে নিয়ে গেল, কিন্তু তোমার জন্য আমার ভালোবাসা একটুও কমেনি।
আমি জানি, অতীতের ছায়া সহজে মুছে যায় না। কিন্তু আমি চাই, আমরা একসাথে সেই ছায়াগুলো অতিক্রম করি। সব যন্ত্রণার মাঝেও তুমি আমার জীবনের আলো।
আমি জানি, কিছু কিছু সত্য তুমি আজও জানো না—যেগুলো আমাকে ভেঙে ফেলে। কিন্তু আমি আজ সাহস পেয়েছি। আমি চাই, আমরা একে অপরের জন্য নতুনভাবে শুরু করি। আমি চাই, আমার হাতে তোমার হাত থাকুক, আর একসাথে হেঁটে যাই জীবনের পথে।
যদি কখনো তুমি ভয় পাও, মনে রেখো, আমি তোমার পাশে আছি। তুমি শুধু আমার প্রিয়তম মানুষই নও, তুমি আমার জীবনের আশ্রয়।
সদা তোমার,
রিয়ানা"
চিঠি শেষ করে রিয়ানা কাঁপা হাত দিয়ে কাগজ ভাঁজ করল। চোখে ভিজে উঠল অমর নীরবতা। সে জানত, এই চিঠি শুধুই শেষ চিঠি নয়—বরং নতুন শুরু। নতুন বিশ্বাস। নতুন আশা।
কেননা ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না; শুধু তার প্রকাশের রূপ বদলায়। এবং আজ, রিয়ানা সেই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ নিয়েছে।

