শেষ বেঞ্চের ভালোবাসা
শেষ বেঞ্চের ভালোবাসা
নবম শ্রেণির প্রথম দিন। স্কুলের মাঠে নতুন ক্লাসের উত্তেজনা, বইয়ের গন্ধ, বন্ধুরা সবাই নতুন ব্যাগ, নতুন জুতা পরে হাজির।
ক্লাসরুমে সবাই যখন নিজের জায়গা ঠিক করছে, তখন দরজায় এসে দাঁড়ায় **আরিন**। মুখে শান্ত এক হাসি, চোখে কেমন যেন হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি। গ্রামের এক স্কুল থেকে ট্রান্সফার হয়ে এসেছে। চশমা পরা, খুব বেশি মিশুক নয়।
ক্লাস টিচার ওকে ক্লাসে নিয়ে এসে বলে,
> “এটা আমাদের নতুন ছাত্র, আরিন। সবাই ওকে সাহায্য করবে।”
সবাই তাকায়, কিন্তু কেউ এগিয়ে যায় না। কারণ নতুন ছেলেকে নিয়ে সবাই একটু কৌতূহলী।
কিন্তু ঠিক তখনই, শেষ বেঞ্চ থেকে এক মেয়ে হাত তুলে বলে,
> “স্যার, ও আমার পাশে বসতে পারে।”
তার নাম **তিথি**। ক্লাসের সবচেয়ে হাসিখুশি মেয়ে। চঞ্চল, কিন্তু মনটা একেবারে নরম।
ওদের চোখ দুটো প্রথমবারের মতো একে অপরের দিকে তাকায়।
সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অজানা আকর্ষণ, যেন দুটো মন অনেক দিন পর একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে।
দিন যায়, সপ্তাহ কেটে যায়।
তিথি আর আরিন এখন ক্লাসের সবচেয়ে ভালো জুটি—প্রেম নয়, বরং এক অসম্ভব সুন্দর বন্ধুত্বের।
তারা একসাথে বই পড়ে, একে অপরকে নোট দেয়, আর মাঝে মাঝে গোপনে একে অপরের দিকে তাকায়।
তিথির হাসি দেখলেই আরিনের দিনটা ভালো যায়।
আর তিথির খাতা ভরা থাকে ছোট ছোট আঁকায়—
একটা ছেলের ছবি, যে চশমা পরে হাসছে।
একদিন ক্লাসে ম্যাথের শিক্ষক বললেন,
> “এই অঙ্কটা যে পারবে, তার জন্য একটা চকোলেট।”
সবাই ব্যর্থ, আরিন হাত তোলে। সমাধান করে। শিক্ষক চকোলেট দেয়।
কিন্তু ক্লাসের সবাই অবাক হয়ে দেখে, আরিন নিজের চকোলেটটা রেখে দেয় তিথির ডেস্কে।
তিথি হেসে বলে,
> “তুমি খাবে না?”
> আরিন ছোট্ট গলায় বলে,
> “তোমার হাসি আমার চকোলেটের চেয়েও মিষ্টি।”
তিথি কিছু বলে না, কিন্তু চোখ দুটো কেমন ভিজে ওঠে।
একদিন বিকেলে স্কুল ছুটি হওয়ার পর হঠাৎ ভারী বৃষ্টি।
সবাই ছাতা নিয়ে চলে যায়, কিন্তু তিথি ছাতা আনেনি।
আরিন এগিয়ে এসে বলে,
> “চলো, আমি রেখে যাই।”
তারা একই ছাতার নিচে হাঁটে। তিথি হালকা ভেজে, আরিনের চোখে শুধু তিথির মুখ।
রাস্তার পাশে হালকা কুয়াশা, বৃষ্টির গন্ধ, আর নিঃশব্দে এক অদ্ভুত নীরবতা।
হঠাৎ তিথি বলে,
> “আরিন, তুমি যদি একদিন না আসো, আমার ক্লাস একদম ভালো লাগে না।”
আরিন থেমে যায়।
নিচু গলায় বলে,
> “তোমার ছাড়া আমার দিনই চলে না, তিথি।”
বৃষ্টির মধ্যে ওদের মুখে মৃদু হাসি।
প্রেম? হয়তো এখনো নয়। কিন্তু অনুভূতিটা প্রেমের থেকেও গভীর।
এক মাস পর খবর আসে—
আরিনের বাবা ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছেন অন্য জেলায়।
আরিনকে স্কুল ছাড়তে হবে।
শেষ দিন স্কুলে তিথি আর কিছুই বলতে পারে না।
বইয়ের মাঝে একটা চিঠি রেখে দেয়—
> “তুমি হয়তো দূরে চলে যাবে, কিন্তু আমি তোমার দেওয়া সেই চকোলেটের মোড়ক এখনো রেখে দিয়েছি। কারণ তাতে তোমার ভালোবাসার গন্ধ আছে।”
আরিন চিঠিটা পেয়ে চুপচাপ চোখ মুছে ফেলে।
ওদের বিদায়টা ছিল বৃষ্টির দিনে,
যেখানে শব্দ ছিল শুধু বৃষ্টির,
কিন্তু ওদের চোখের ভেতর ছিল হাজার কথা, বলা হয়নি কোনোটা।
পাঁচ বছর পর।
কলেজে একদিন তিথি লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ছে।
পেছন থেকে কেউ বলে,
> “এই বইটা তুমি এখনো পড়ো?”
তিথি ঘুরে দেখে—
চশমা পরা, সেই চেনা হাসি, সেই চোখের শান্ত দৃষ্টি—
আরিন।
তারা দুজনই কিছু সময় চুপ থাকে। তারপর তিথি বলে,
> “তুমি ফিরে এসেছো?”
> আরিন হেসে বলে,
> “না, আমি তো কখনো যাইনি। তোমার মনে আমি সবসময় ছিলাম।”
তিথির চোখ ভিজে ওঠে,
আর ওরা বুঝে যায়—
শেষ বেঞ্চের ভালোবাসা কখনো শেষ হয়নি।
🌺 শেষ কথা:
এটা সেই ভালোবাসা যা প্রকাশ না করেও চিরজীবন টিকে থাকে।
যেখানে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই,
তবুও একটা চিরন্তন বন্ধন আছে—
শেষ বেঞ্চে বসা দুইটা হৃদয়ের গল্প,
যারা একে অপরের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল জীবন।

