সেই পরীটি
সেই পরীটি
কিছু গল্পের শুরু হয় কোনো পরিকল্পনা থেকে, আর কিছু গল্পের শুরু হয় একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে। আমাদের গল্পটাও ঠিক তেমনই—যার শুরুটা আমি কখনো কল্পনাও করিনি।
সেদিন ছিল কোচিং সেন্টার থেকে ঘুরতে যাওয়ার দিন। গন্তব্য—পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল। চারপাশে পরিচিত মুখ, বন্ধুদের হাসাহাসি, ছবি তোলা, ঘোরাঘুরি—সবকিছুই ছিল একেবারে সাধারণ একটা ভ্রমণের মতো।
কিন্তু সেদিনই আমার জীবনের গল্পটা বদলে যাবে, সেটা আমি তখন জানতাম না।
আহসান মঞ্জিলের ভেতরে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ আমার চোখে পড়ল একজন খুবই সুন্দর মেয়েকে। কোরিয়ান, উজ্জল সেই নিশাচর চক্ষু দুটি, চারদিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু মনে হচ্ছিল কোথায় যাবে বুঝতে পারছে না। পরে জানতে পারলাম, সে ভেতরে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিল।
আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম,
— “Are you lost here?” (তুমি কি পথ হারিয়ে ফেলেছো?)
সে একটু ইতস্তত করে আমার দিকে তাকাল। তারপর যেন ভরসা পেল। আমি বললাম,
— “Come with me, I'll guide you!” (চলো, আমার সাথে আসো। আমি বের হওয়ার পথ দেখিয়ে দিচ্ছি।)
তারপর যা হলো, সেটা আজও আমার কাছে অদ্ভুত সুন্দর একটা স্মৃতি।
সে আমার হাত ধরে আমার সাথে হাঁটতে শুরু করল।
সেদিন হয়তো আমাদের কাছে ব্যাপারটা ছিল শুধুই একজন পথহারা মানুষকে পথ দেখানো। কিন্তু কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পগুলো শুরু হয় এমন ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই।
আমরা দুজন একসাথে বেরিয়ে এলাম।
তারপর তার পরিবারের সঙ্গে দেখা হলো। আশ্চর্যের ব্যাপার, তার পরিবারও আমাদের একসাথে দেখে বেশ খুশি হয়েছিল। ওর বাবা মা যেনো উরছিলো আকাশে, খুব খুশি।এদিকে ওর মুখটা লাল টকটকে হয়ে উঠেছিল, কি যে সুন্দর লাগছিলো তাকে! অসম্ভব সে রূপ, লাল টকটকে ফুলের মতো লাগছিলো। আর আমার বন্ধুরা?
ওদের কথা না বললেই নয়!
ওরা যেন জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা সেদিনই নিয়ে ফেলেছিল।
একজন বলল,
— “ভাই, বিয়ে কবে? ডিজে আনতে হবে তো!"
আরেকজন তো আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
— “বিয়ে কনফার্ম! আমরা সাক্ষী! বল শালা কবুল বল তিনবার! আর ভাবিও, কবুল বলেন।"
ও কিছু না বুঝে কবুল বলে দিলো, আমিও মজায় মজায় বলে দিলাম।
সেদিনই বন্ধুরা আমাদের বিয়ে পর্যন্ত দিয়ে ফেলেছিল। তখন আমরা শুধু হাসছিলাম। কে জানত, সেই মজা একদিন আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটা হয়ে থাকবে?
কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি।
আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল একটা রিসোর্টে। আমরা সেখানে তিন দিনের জন্য ছিলাম। আমি ভাবিনি, সেই মেয়েটিকেও আবার সেখানে দেখতে পাব।
কিন্তু ভাগ্য বোধহয় সেদিন আমাদের নিয়ে একটু বেশিই খেলছিল।
হঠাৎ দেখলাম—সে-ও একই রিসোর্টে।
মনে হলো, আহসান মঞ্জিলের সেই ছোট্ট ঘটনাটা যেন কেবল শুরু ছিল। এরপর ধীরে ধীরে আমাদের কথা বাড়তে লাগল। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে একটা অদ্ভুত টান—আর সেই টান কখন যে ভালোবাসায় পরিণত হলো, সেটা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারিনি।
রাতে খাবার পর যখন ছাদে যাচ্ছিলাম, তখব সে ও আমার সঙ্গে গেলো। ছাদ খালি হতে বেশি সময় লাগলো না, কিন্তু তারই মধ্যে ঘটলো এমন ঘটনা যা সব ছেলেরি শেষ রাতের স্বপ্নের মতো, সে আমায় চুমু খেলো।
রিসোর্টের সেই তিন দিন আজও আমার কাছে অন্যরকম।
সেখানে আমরা একে অপরকে একটু একটু করে চিনেছিলাম। হাসি, গল্প, একসাথে সময় কাটানো—সবকিছুর মাঝেই যেন একটা নতুন সম্পর্ক জন্ম নিচ্ছিল।
সেদিন হয়তো আমরা জানতাম না, এই কয়েকটা দিন আমাদের জীবনের এত বড় একটা অধ্যায়ের শুরু হয়ে থাকবে।
তারপর সময় চলে গেছে।
দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছর।
জীবনে অনেক কিছু বদলেছে। পরিস্থিতি বদলেছে, মানুষ বদলেছে, আমাদের চারপাশ বদলেছে। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি—আমাদের গল্পটা।
আজ চার বছর হয়ে গেছে।
চার বছর আগে আহসান মঞ্জিলের ভেতরে যে মেয়েটি পথ হারিয়েছিল, সে হয়তো সেদিন জানত না যে একজন অচেনা মানুষের হাত ধরে বেরিয়ে আসার সেই মুহূর্তটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে উঠবে।
আর আমিও জানতাম না, একজন পথহারা মানুষকে পথ দেখাতে গিয়ে আমি নিজেই জীবনের একটা নতুন পথে হাঁটতে শুরু করেছি।
পেছনে তাকালে মনে হয়—সবকিছু যেন কোনো উপন্যাসের মতো।
একটা ঐতিহাসিক স্থাপনা।
একজন পথহারা মেয়ে।
একটা বাড়ানো হাত।
একটা ছোট্ট ভ্রমণ।
একই রিসোর্টে আবার দেখা।
বন্ধুদের পাগলামি।
আর তারপর চার বছরের ভালোবাসা।
হয়তো ভালোবাসার গল্প সবসময় প্রথম দেখাতেই শুরু হয় না। কখনো কখনো ভালোবাসা শুরু হয় একজন মানুষকে তার পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করার মাধ্যমে।
সেদিন আমি শুধু তাকে আহসান মঞ্জিল থেকে বের হওয়ার পথ দেখিয়েছিলাম।
কিন্তু কে জানত—
সেই পথটাই একদিন আমাদের দুজনকে একে অপরের জীবনে নিয়ে আসবে।
চার বছর পর আজও সেই গল্প চলছে।
আর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার?
এই গল্পের শেষ অধ্যায়টা এখনো লেখা হয়নি। হয়তো আমৃত্যু, হবে নাহ!
সে হয়তো সেদিন পথ হারিয়েছিলো, কিন্তু সেই ভুলটির মাধ্যমেই প্রকৃতি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মানুষটিকে আমার বুকে স্থাপন করলো৷

