বিকাশ দাস

Romance


3  

বিকাশ দাস

Romance


প্রথম প্রেম

প্রথম প্রেম

9 mins 724 9 mins 724

জলছবি



ফেসবুকের মাধ্যমে নির্মাল্য ও চন্দ্রিমার বন্ধুত্ব। নির্মাল্য তার নিজের কবিতা প্রতিদিন পোস্ট করতো। চন্দ্রিমার খুব ভালো লাগতো। নির্মাল্য চন্দ্রিমার ইনবক্সে কবিতা পোস্ট করে তার কাছ থেকে মন্তব্য জানতে চাইতো।

কবিতা আর মন্তব্যের দোলার আদান-প্রদানে দু’জনেই হারিয়ে যেতো দিশাহীন পথের অন্ধ বিবরে।

নির্মাল্য জানাতো এই কবিতাগুলো পোস্ট করলাম। কেমন হলো বলো।

“ভালোবাসা বুকের গভীরে হৃদয় আঁকড়ে থাকতে ভালোবাসে / গাছগাছালি রোদ্দুর ছায়ার নিবিড়ে অরণ্য বাঁধনজোড়ার ফাঁসে”।  

 “দুঃখ না পেলে / আমার কবিতা কবিতা হয়ে ওঠেনা /বৃষ্টির আদল বৃক্ষনিবিড় হয়ে ওঠেনা /শব্দের বরাৎ কুসুমসঙ্গী হয়ে ওঠেনা”।

আজ এই কবিতাটা লিখলাম । তোমার মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম। 

“তুমি এসো / সুখ-দুঃখ লাগা চালে ডালের দোসরে / আমার কবিতায় শব্দের ঝাঁকা উজার করে

এসো / চাল মাপা অন্ন কৌটোর সংসারে /স্বর্গ মাখা ঘরের ভেতর দু’হাতের সংস্কারে /তুমি আমার লক্ষীশ্রী/তুমি আমার ভাগ্যশ্রী”।

নির্মাল্যর কবিতা চন্দ্রিমাকে ভাবিয়ে তুলতো ।চন্দ্রিমা জবাব দিতো। 

-       জানো? কবিরা পলাতক স্বভাবের হয়। শুধু নিজের সুখের জন্য লেখে। কবিতাকে একা ছেড়ে উধাও। কবিতা বিপদ সংকটে পড়লে তখন কবি তার উদ্ধারের কথা ভাবে না। যেন সবকিছু থেকে বঞ্চিত । তাই কবিতা আমার মন টানে না।তুমি কিন্তু রাগ করোনা। এটা আমার নিজস্ব মতামত।


রোজ রাতে ওদের ফেসবুকে চ্যাটিং আর বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা সওয়াল জবাবের দোলাচল চলতো।

বন্ধুত্বের নিবিড় বন্ধনে এক দু’জনের অন্তর অজান্তে বেঁধে নিতো। পরস্পরের সান্নিধ্য উপলব্ধির গোচরে এক অপরের অধিকার হয়ে উঠতো।

ভালোবাসা যেন আকাশের মতো নীলান্ত আবার পরক্ষনে মেঘভাঙা অঝোর বৃষ্টির মাতালমি। হৃদয় নিংড়ে হৃদয়। শরীরের মন্ত্রমুগ্ধ প্রাণ।


চন্দ্রিমা বারাসাতে থাকে। বাবার বড়সর ব্যবসা । কলকাতায় তিন চারটে ফ্ল্যাট ।

নির্মাল্য ছোটোবেলায় তার বাবা মাকে হারিয়েছে । দিদি জামাইবাবুর কাছে মানুষ । দুর্গাপুরের ইঞ্জিনারিং পড়ছে।

এইভাবে ওদের নিয়মিত চলতো আলাপনের অন্তরঙ্গতা আরনিজেদের ছবি ফেসবুকে চালাচালি । মান অভিমানের পালা। 

আজ সারাদিন কোথায় ছিলে? এতো দেরি কেন? ইত্যাদি।

বলেছিলাম নীল শাড়িটা পড়ে ছবি দিতে । তুঁতে রঙের সালোয়ার কামিজে ছবি পোস্ট করতে। এই রঙে তোমাকে ভালো মানায়। টুকরো টুকরো কথার বন্ধনে ওদের দু’চোখ অস্থির হয়ে উঠতো।

চন্দ্রিমা কথায় কথায় নির্মাল্যকে বলতোঃ

-           ভালো রেজাল্ট চাই। জীবনে কিছু করে দেখাতে হবে । তুমি আমার গর্ব। আর্থিক চিন্তা করনা। আমি আছি।

প্রত্যকদিন এক দু’জনের খোঁজ খবর না নিলে ওরা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারতো না।


চন্দ্রিমা ফোনে নির্মাল্যকে জানায়।

-           তুমি কলকাতা আসবে না?  

-           হ্যাঁ। আসবো তো! তোমাকে তো বলেছি আমার দিদি সোনারপুরে থাকে । প্রতি বছর দিদির বাড়ি আসি ফোঁটা নিতে ।

চন্দ্রিমা ভাইফোঁটার দিনটার জন্য অপেক্ষায় ছিলো।

 

নির্মাল্যর ইতিমধ্যে ক্যাম্পাসে চাকরিও পেয়েছে ।বাঙ্গালোরে পোস্টিং। যবে থেকে চন্দ্রিমা জানতে পেরেছে সে বাঙ্গালোরে চলে যাবে । মনটা খুব খারাপ । এতোদিন নিশ্চিন্ত ছিলো জেনে , সে অন্তত কলকাতার কাছাকাছি আছে। যদিও নির্মাল্য শেষমেশ কলকাতা ফিরে আসার ইচ্ছের কথা চন্দ্রিমাকে জানিয়েছিলো।

চন্দ্রিমা নির্মাল্যকে ফোনে জানালোঃ   

-           কলকাতায় চাকরি পেলে না ? চেষ্টা করো যাতে কলকাতায় হয় । তাহলে খুব ভালো হয় ।

-           হ্যাঁ। নিশ্চয়। সেই চেষ্টা করছি যখন তোমার ইচ্ছে। আচ্ছা, বাঙ্গালোর কি খারাপ? ওখানকার আবহাওয়া খুব সুন্দর। কেরিয়ারের জন্য ভালো। অনেক সুযোগ সুবিধে। তুমি কি বলো?

-           তুমি যেটা ভালো বুঝবে।

-           কলকাতায় তেমন সুযোগ সুবিধে নেই। থাকলেও নামমাত্র।

-           হ্যাঁ। ঠিক বলেছো। কিন্তু আত্মীয় স্বজনদের কাছাকাছি থাকাটা ভালো।তোমাকে আমার কিছু বলার আছে ।

-           আচ্ছা বলেই ফেলো। 

সাহস করে চন্দ্রিমা জানায়।

-           আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।

নির্মাল্যর উত্তর। 

-           না ভালোবেসে ? আমি কতটা মানুষ না জেনে। একেবারে সোজা বিয়ের পিঁড়িতে! আগে একটু ভালোবাসা বাসি হোক।তারপর তো বিয়ে টিয়ে। বিয়ে তো আর পালিয়ে যাচ্ছেনা।

-            জানি বিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেনা। কিন্তু বিয়ে মানে তো বুঝলাম আর টিয়ে মানে কি?

-           (নির্মাল্য হেসে) আরে বাবা, টিয়ে মানে কিছু নয়। এটা সেটা এতো কথা ধরো কেন বলোতো? 

 

চন্দ্রিমা স্পষ্ট করে জানায়।

-           দ্যাখো, আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি ।এতদিন মুখ ফুটে বলতে পারিনি এই যা। আজ বলে দিলাম। বাকিটা তোমার দায়িত্ব। যা বলবে স্পষ্ট করে বলে দিও।

নির্মাল্যর উত্তর।

-           হ্যাঁ। জানি।

নির্মাল্যকে চুপচাপ দেখে চন্দ্রিমা বলেঃ

-           জানি। আমি সুন্দরী নই। তাই আমাকে তোমার মনে ধরেনি।

-           না না একি বলছো ? তোমাকে আমার ভালো না লাগলে আমার পরিবারের এতো কথা তোমাকে শেয়ার করতাম কেন? বুঝতে পারছো না ? তোমাকে আমার ভালো লেগেছে বলেই তো? এবার ভাইফোঁটায় সোনারপুর আসছি । জানোই তো সবুরে মেওয়া ফলে।

-           (চন্দ্রিমা অভিমানি সুরে) তুমি আমাকে না ভালবাসো, তাহলে বলে দাও । বিরক্ত করবো না। আজ থেকে নো ফেসবুক নো হোয়াটশপ। নো কল। 

***

নির্মাল্যও চন্দ্রিমাকে মনে প্রাণে চায়। কিন্তু সোজাসুজি বলতে পারেনি বহুবার চেষ্টা করেও। নির্মাল্য ভাবতে পারেনি সে চটকরে বিয়ের প্রস্তাব আঁকড়ে ধরবে।

ইদানিং তাদের মধ্যে কোন কথাবার্তা হয় না। যোগাযোগও নেই। এক মাস হয়ে গেলো। চন্দ্রিমা ভাবলো আর হয়তো নির্মাল্য ফোন করবে না। চন্দ্রিমার অভিমান, নির্মাল্য যতদিন ফোন করবে না সেও তাকে ফোন করবে না।

কিছুদিন পর নির্মাল্য প্রোফাইল গিয়ে দেখে ওর নাম ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বাদ দিয়েছে। রাগ অভিমানের পালা চলতে থাকলো। ইনবক্সে কারোর কোন সওয়াল জবাব নেই।

এবার নির্মাল্য ভাইফোঁটায় দিদির বাড়ি সোনারপুর আসবে। ওদের বন্ধুত্বের সম্পর্কের সব কথা দিদিকে জানিয়ে রাখবে।।

নির্মাল্যর মন চন্দ্রিমার জন্য ছটফট করতো কথা বলার জন্য। সে জানিয়ে দিতে চায় যে সেও তাকে ভালোবেসে।  

ফি বছরের মতো নির্মাল্য ভাইফোঁটায় দিদির বাড়ি এলো।নির্মাল্য এসএমএস করে জানিয়ে দিলো ভাইফোঁটায় দিদির বাড়ি আসছি। 

নির্মাল্য দিদিকে চন্দ্রিমার কথা জানানোর আগে জামাইবাবুকে জানিয়ে রাখলো। যাতে জামাইবাবু দিদিকে মানিয়ে নিতে পারে।

জামাইবাবু শুনে বললো। শালাবাবু চিন্তা করোনা। নো টেনশন ।তোমার জিজাজি হাজির।  

দিদিতো শুনে হতভম্ব।

নির্মাল্য দিদির হাত ধরে বলতে লাগলো।

-           দিদি তুই কিছু একটা কর। চন্দ্রিমা খুব ভালো মেয়ে। একবার ওর সাথে কথা বল। তোদের যদি পছন্দ হয় , তাহলে কথা আগে বাড়াস। যদি সে রকম লাগে আমি আর ওর সাথে কোন যোগাযোগ রাখবো না । কথা দিলাম।

দিদি মাথা নাড়িয়ে বললো ঠিক আছে।

-          ফোন নম্বর দে। ফোন করে দেখি । তোর ফোন যখন অভিমান করে তুলছে না। আননোন নম্বর দেখলে ফোন তুলতে পারে।

দিদি চন্দ্রিমাকে ফোন করলো । প্রথম বার রিং হয়ে গেলো কিন্তু তুললো না । আবার ফোন করার পর তুললো ।

-           কে চন্দ্রিমা বলছ ? 

-           হ্যা চন্দ্রিমা বলছি । আপনি কে?

দিদি সোজাসাপটা বলে দিলো আমি অনামিকা বলছি।

-           হ্যাঁ। বলুন। আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না।

-           জানি। তুমি আমাকে চিনতে পারবে না।

-           আপনি আমার ফোন নম্বর কোথায় পেলেন?

-           তোমার সাথে দেখা করতে চাই। তোমার সময় হবে? 

-           কি ব্যাপারে বলুন ত।

-           সেটা না হয় দেখা হলে বলবো।

-           দেখুন, আপনাকে আমি চিনিনা জানিনা।কি ব্যাপার যদি না বলেন তাহলে কি করে আপনার সাথে দেখা করি বলুনতো?

দিদি আর চন্দ্রিমার প্রেশার না বাড়িয়ে...

-           তুমি কি নির্মাল্যকে চেনো?

-           হ্যাঁ। চিনি। ও আমার ভালো বন্ধু।

-           ওকে তোমার মনে পড়ে না?

-           পড়বে না কেন?

এর মধ্যে চন্দ্রিমা আঁচ করতে পেরেছে যে নিশ্চয় ইনি নির্মাল্যর দিদি । কেননা ভাইফোঁটার সময় নির্মাল্যর দিদির বাড়ি আসার কথা।আজ তো ভাইফোঁটা । নির্মাল্য ঠিক দিদির বাড়ি এসেছে ।

-           এই নাও । নির্মাল্য সাথে কথা বলো।

দিদি নির্মাল্যকে ফোনটা দিয়ে বললো এই নে কথা বল।

-           কি চন্দ্রিমা, কেমন আছো ? এতো অভিমান । এতোবার ফোন করলাম আর তুমি ফোন ধরলে না। তুমি সোনারপুর আসতে পারবে ? না আমরা তোমার বাড়ি আসবো।

-           (চন্দ্রিমা ভেবে ) ঠিক আছে আমি সোনারপুর আসছি। ঠিকানাটা বলো।

নির্মাল্য ঠিকানাটা দিলো।

-            আমি কাল সকাল সকাল আসবো।

নির্মাল্য বললো। 

-           তোমার বাড়িতে জানিয়ে এসো।

-           তোমাকে সে কথা বলতে হবে না। আমার বাড়ির সবাইকে আগেই জানিয়ে রেখেছি। তোমার মতো আমি ভীতু নই।

নির্মাল্য হেসে উত্তর দিলো...

-           এতে আবার ভীতুর কি পেলে?

-            (চন্দ্রিমা জোর গলায়) তোমাকে ভালোবেসেছি তাই সোজাসুজি বিয়ের কথা জানিয়েছি।। তুমি তো বললে আগে ভালোবাসা তারপর বিয়ে । এটা শুনে মনে হল তুমি আমাকে ভালোবাসোনি । এতোদিনে কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।

নির্মাল্য ইয়ার্কির ছলে বললোঃ 

-        পকেট গড়ের মাঠ থাকলে কি সম্পর্ক গড়ে? তুমি কি একাই ভালবাসতে জানো? একটু বাজিয়ে নিতে হয়, সখা। আর নো রাগ । নো ফারদার ইয়ার্কি। প্রমিশ।


চন্দ্রিমা দিদির বাড়ি এসে হাজির। দিদি দরজা খুলে দিলো।

-           চন্দ্রিমা!

-           (চন্দ্রিমা দিদির পা ছুঁয়ে) হ্যাঁ দিদি।

দিদি চন্দ্রিমাকে বসার ঘরে নিয়ে এলো।

নির্মাল্য চন্দ্রিমাকে দেখে মনে মনে ভাবলো, সত্যিই চন্দ্রিমা পরমা সুন্দরী । ছবির চেয়ে বেশি সুন্দর। দিদির পছন্দ হবেই

নির্মাল্যর চন্দ্রিমাকে জিজ্ঞেস করল...

-           তাহলে বলুন ম্যাডাম। কেমন পড়াশোনা চলছে ?

-           আগামী মাসে পরীক্ষা ।তুমি কবে বাঙ্গালোর যাচ্ছ?

-           হ্যাঁ যাবো। ডিসেম্বর মাসে। এতো রাগ অভিমান কিসের? বেশি রাগ স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়। তুমি কি একটু আধটু ইয়ার্কি বোঝ না?

চন্দ্রিমা কোন উত্তর না দিয়ে বলল...

-           কলকাতা আসার চেষ্টা করছো না? 

-           হ্যাঁ ম্যাডাম। সেই রকম প্ল্যান আছে। ডু নট ওয়ারি।

চন্দ্রিমা শান্ত স্বরে বললো... 

-           দ্যাখো, তোমাকে ছাড়া আর আমি থাকতে পারছিনা। তোমরা আমার বাড়ির সঙ্গে যতো তাড়াতাড়ি পারো কথা বলো। আর আমি অপেক্ষা করতে পারছিনা।

নির্মাল্য চন্দ্রিমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো...

-           জান আমিও তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারছিনা। কিন্তু আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে। আগে চাকরি আর কিছু সঞ্চয় করে নিতে দাও। তারপর জমিয়ে বিয়ে। তুমি তো জানো আমি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে । আমার দিদিই সব । দিদি জামাইবাবুর ঘাড়ে বসে খাচ্ছি দাচ্ছি। তাদের প্রতি আমারাও কিছু দায়িত্ব আছে। কি বলো?

চন্দ্রিমার উত্তরঃ

-           একশো বার। যারা তোমার জন্য এতো কিছু করছে। তাঁদের সম্মান দিতেই হবে। তাঁদের কথা সব থেকে আগে ভাবতে হবে।

নির্মাল্যর চন্দ্রিমার কথা শুনে খুব ভালো লাগলো। বড়লোকের মেয়ে হলে কি হবে? কর্তব্যপরায়ণ মন আছে।

কিছুদিনের মধ্যে নির্মাল্যর দিদি জামাইবাবু চন্দ্রিমার বাড়ি গিয়ে সব কথাবার্তা পাকাপাকি করে এলো।

নির্মাল্যর একটাই খটকা চন্দ্রিমা বড়লোকের একমাত্র মেয়ে। অগাধ সম্পত্তি । সুখ স্বাছন্দে মানুষ হয়েছে। অভাব কষ্ট কি জানেনা। অর্থ আবার অনর্থের কারণ না হয়ে যায়। চন্দ্রিমার পরিবার অর্থবান বলে চন্দ্রিমার কোন অহংকার আছে বলে মনে হলো না।

চোখে মুখে সাংসারিক বোধের দৃষ্টি। সবাইকে নিয়ে চলার মতো। মনে হচ্ছে ভবিষ্যতে ঠকবো না। 

অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে নির্মাল্য কলকাতায় ট্রান্সফার নিলো। একটা ছোটোখাটো বাড়ি ভাড়াও নিলো। দিদির ওখানে আর কতদিন থাকা যায় জেনে। ওদেরও তো নিজের সংসার আছে। প্রাইভিসি আছে। যদিও দিদি জামাইবাবুর একটু রাগ হয়েছিলো।

 

চন্দ্রিমার বাবা নির্মাল্যকে ফ্ল্যাট দিতে চেয়েছিলো। চন্দ্রিমাও কোন জোর করেনি। নির্মাল্য চন্দ্রিমাকে খোলাখুলি জানালো।

-           আমি যা কিছু করবো আমার নিজের যোগ্যতায়। তোমাকে ধানদূর্বার আশীর্বাদ দিয়ে আমার হাতে তুলে দিলেই হবে। তুমি রাগ করোনা। লোকে কি বলবে? আমার এসব আত্মসম্মানে লাগে।

***

নির্মাল্য চন্দ্রিমার বাড়ি থেকে ফেরার পথে এক্সিডেন্টে গুরুতর আহত হয় । পুরো শরীর রক্তাত। জ্ঞান ফিরলে দেখে সে হসপিটালে । সামনে চন্দ্রিমা বসে। দু’চোখ কান্নার জলে একাকার।

চন্দ্রিমা নিজেকে একটু সামলে নির্মাল্যর হাতে হাত রেখে বললোঃ 

-           নির্মাল্য। আই লাভ উ। চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। উপরে ঈশ্বর আছেন।

নির্মাল্য চন্দ্রিমার হাত শক্ত করে ধরে জানালোঃ 

-           জানি। তুমি তোমার চেয়েও আমাকে বেশি ভালোবাসো। তুমি আমাকে ছেড়ে যাবেনা। আমিও কথা দিচ্ছি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।


নির্মাল্য তখনও বুঝতে পারেনি যে তার এক পা কেটে দেওয়া হয়েছে ।না হলে সারা শরীরে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তো । তাকে আর বাঁচানো যেতো না । ডাক্তারবাবু দিদিকে বলতে শুনেছিলো । নির্মাল্যর মনে হলো সমস্ত আকাশ তার মাথার উপর ভেঙে পড়ছে।। স্বপ্ন ভেঙে চুরমার।

সকালে বেলা ঘুম ভাঙতেই নির্মাল্য দেখলো তার চোখের দৃষ্টি আবছা লাগছে। সামনে দাঁড়িয়ে দিদি জামাইবাবু। অথচ চিনে নিতে অসুবিধে হচ্ছে। সব যেন অন্ধকার।

-           কি শালাবাবু কেমন আছো? সব ঠিক হয়ে যাবে।  

নির্মাল্য নিজের হাত বাড়িয়ে...  

-           দিদি আমি ঠিক করে দেখতে পারছিনা।

দিদি সান্ত্বনা দিয়ে... 

-           না রে ডাক্তার বলেছে ও কিছু নয় । মাস ছয়কের মধ্যে দেখবি সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এতো বড় এক্সিডেন্ট। বুঝতেই পারছিস।

-           দিদি। আমার এক পা! 

দিদি আশ্বাস দিয়ে... 

-         আজকাল তো সার্জারি করে দিব্যি পা লাগানো যায় । এতো কি ভাবছিস ? আবার তুই আগের মতো চলা ফেরা করতে পারবি । আজেবাজে চিন্তা করে নিজেকে কষ্ট দিস না। নতুন জীবন ফিরে পেয়েছিস, ভাই। উপরে ঈশ্বর আছে। আস্থা রাখ।

নির্মাল্য দিদিকে জিজ্ঞেস করলোঃ 

-           চন্দ্রিমা আসেনি ? না রে। ও বলেছে আসবে। ও তোর খবর বরাবর নেয়। 

নির্মাল্য বুঝতে পেরেছে , চন্দ্রিমা হয়তো জেনেছে ওর এক পা নেই । এখন সে পঙ্গু, অথর্ব। এই কারণে হয়তো চন্দ্রিমা আর আসছে না। আমাকে ভুলে যেতে চায়। সম্পর্ক রাখতে চায়না।

ঠিকই তো। এ সম্পর্ক ভেঙে দেওয়াই ভালো।

নির্মাল্য দিদিকে কাছে ডেকে বলে।

-           দিদি ওকে তুই আলাদা করে বলে দিস। ওর বাড়িতেও জানিয়ে দিস। বিয়ে করা সম্ভব নয়। সত্যি পঙ্গু ছেলের সাথে কি থাকা যায়! আমার জন্য কারো জীবন নষ্ট কেন হবে? অবশ্য ওরাও চাইবেনা এ সম্পর্ক হোক।

নির্মাল্য মুচড়ে ভেঙে পড়লো। মনে মনে ভাবতে লাগলো। আমার কারণে ওর জীবন নষ্ট করে কি লাভ। নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিয়ে মনে মনে ভাবলো ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য করেন।

চোখের থেকে ভালোবাসার আশ্রয় সরিয়ে দেওয়াই শ্রেয়। হৃদয় থেকে অনুরাগের স্পর্শ মুছে ফেলায় ভালো। চন্দ্রিমা নিজের জন্য অন্য জীবন বেছে নিক।

আমাকে ভুলতে হবে আমিও একদিন ঘরের স্বপ্ন দেখেছিলাম। চন্দ্রিমা সুখে থাক।। সুস্থ থাক।

কিছুদিনের মধ্যে ধীরে ধীরে নির্মাল্য সামলে উঠলো। প্রায় মাস খানেক হসপিটালে চিকিৎসার পর সামনের রবিবার সকালে ছাড়া পাবে।


দিদি জামাই বাবু হসপিটালে আগেই এসে পৌঁছে গেছে। নির্মাল্যকে নিয়ে একটু পরেই বেরোবে।

নির্মাল্য আর চন্দ্রিমার কথা পাড়ে না। মনে মনে ভাবে ভালোই হয়েছে চন্দ্রিমা সব সম্পর্ক চুকিয়ে বুকিয়ে শেষ করে দিয়েছে। 


দিদি নির্মাল্যকে হুইলচেয়ারে হসপিটালের গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই নির্মাল্য দেখতে পেলো একগোছা রজনীগন্ধার ফুলে সাজানো তোড়া সোনালি রুপোলি রিবনে বাঁধা চন্দ্রিমার হাতে। সাথে একটা খাম নিয়ে হসপিটালের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে। পড়নে সোনালি জড়ির পাড় জড়ানো তুঁত বরণ শাড়ি। 

চন্দ্রিমা নির্মাল্যর কাছে এসে ওর হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে নম্রতার সঙ্গে বললো। 

-           কেমন আছো ?

নির্মাল্য চোখে মুখে হাসি ছিটিয়ে...

-           ভালো আছি।

নির্মাল্য ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে খামের উপরে চোখ পড়লো রক্তের কালিতে বড়ো করে লেখা ‘নির্মাল্য গুহ রায়’ ।

নির্মাল্য খাম খুলে কাগজের ফালি বার করে দু’চোখ নিংড়ে দেখলো যেন কিছু লেখা চিঠির মতো।

“তোমার জীবনে আমার জীবন বাঁচিয়ে রাখতে চাই। এ পুণ্যি থেকে আমাকে বঞ্চিত করো না। আমার জীবন ধন্য মনে করবো। তোমার সমস্ত পৃথিবী জুড়ে আকাশের ফুলেল জলছবির সংরাগে একাকার হয়ে থাকবো। কথা দিলাম”।

ইতি

তোমার চন্দ্রিমা।


চন্দ্রিমা নির্মাল্যর কাঁধে হাত রেখে হুইলচেয়ার ধীরে ধীরে টেনে এনে থামালো গাড়ির সামনে। আকাশে মেঘ নেই। রোদ্দুরের শুভ্রতা ওদের দু’জনকে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। দু’জনের পবিত্রতার সম্পর্কের গন্ধের আলিঙ্গনে পৃথিবীর অন্তঃপুরে নতুন জলছবির সংরাগ।

নির্মাল্যর দু’চোখ জলের উতরোলে চন্দ্রিমার স্পর্শে যে তার হৃদয় মননে সারা পৃথিবীর কোলাহল ছাপিয়ে শুধু চন্দ্রিমার কণ্ঠস্বরের অনুরণন তার অন্তরে অন্তরে বেজে যাচ্ছে। মন প্রাণের নিভৃতে সাতপাকের নিবিড় খোছাদনা তলায় প্রজাপতয়ে এক উজ্জ্বল জলছবি দৃষ্টির অন্তরালে।   


Rate this content
Log in

More bengali story from বিকাশ দাস

Similar bengali story from Romance