STORYMIRROR

Miss Writer

Horror

4  

Miss Writer

Horror

পিশাচের মায়া: অশরীরীর আস্তানা"

পিশাচের মায়া: অশরীরীর আস্তানা"

5 mins
1

শিরোনাম: অশরীরী তৃষ্ণার্ত সত্তা


এই দিকটা এমনিতে বেশ ছিমছাম আর নির্জন। কোলাহলমুক্ত শান্ত পরিবেশ বলেই হয়তো আমার ছেলেটার টিউশন আমি এই এলাকাতেই ঠিক করেছিলাম। আমাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটা সুন্দর দোতলা বাড়িতে থাকে ওর টিউশনি পড়ানোর ম্যাডাম। ছেলেটি পড়াশোনায় বরাবরই বেশ ভালো ছিল। ওর খুব একটা বন্ধুবান্ধব কোনদিনই ছিল না, সব সময় নিজের মতোই থাকত। পাড়ায় সেরকম আড্ডা বা পাড়ার ছেলেদের সাথে মিশত না; স্কুলের বা কলেজের তিন-চারটে বন্ধুবান্ধব ছিল, তাদের সাথেই মাঝেমধ্যে এদিক-ওদিক যেত। কিন্তু কে জানত, ওই শান্ত রূপের আড়ালে এক ভয়ংকর অন্ধকার ডানা মেলছে! এই ঘটনাটি আজ থেকে ঠিক চার মাস আগের। ম্যাডামের একমাত্র ছেলের সাথে যে অলৌকিক ও লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছিল, তা আজ ভাবলেও আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে।শুরুটা হয়েছিল খুব সূক্ষ্মভাবে। ছেলেটির আচরণের মধ্যে হঠাৎ করেই কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। যে ছেলেটা সাধারণ ডাল-ভাত আর অল্পস্বল্প খাবারে অভ্যস্ত ছিল, সে হঠাৎ করেই মাংসের প্রতি তীব্র আসক্ত হয়ে পড়ল। সকাল-বিকেল শুধু একটাই জেদ—"আমি মাংস খাবো।" ওর বাবার কাছ থেকে হাতখরচের কথা বলে রোজ রোজ টাকা নিয়ে ও বাইরে চলে যেত। তারপর রেস্তোরাঁ থেকে নানারকম মাংসের পদ কিনে এনে গোগ্রাসে গিলত। বিরিয়ানি, মোমো, চিকেন পকোড়া, চিকেন চাপ—রীতিমতো রাক্ষসের মতো শুধু চিকেনের হরেক রকম আইটেম খেত সে। ওর মা প্রথম প্রথম ভাবতেন, বয়সের দোষে হয়তো ছেলে বাইরে ফাস্টফুড খাওয়ার নেশায় পড়েছে। তিনি বিষয়টি অতটা গুরুত্ব দেননি।কিন্তু আসল রহস্য ঘনীভূত হলো এক মাস পর। অত মাংস আর ভারী খাবার খাওয়া সত্ত্বেও ছেলেটি দিন দিন অদ্ভুতভাবে শুকিয়ে যেতে লাগল। ওর চোখের নিচে কালির দাগ গাঢ় হতে শুরু করল, চেহারাটা দেখাত ঠিক যেন একটা জীবন্ত কঙ্কাল। পড়াশোনাতেও ও দিন দিন ভীষণ খারাপ করতে শুরু করল। ঠিক এরপর থেকেই শুরু হলো ছেলেটির আসল এবং চূড়ান্ত রকমের অস্বাভাবিক আচরণ। মাঝরাতে ও ঘরের ভেতর একা একা অদ্ভুত স্বরে হাসত, আর ওর মাকে এমন কিছু কদর্য ও ভয়ংকর কথা বলতো—যা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক সন্তান তার মাকে বলার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না! সেই কথাগুলোর গলার স্বরও যেন ওর চেনা গলার আওয়াজ ছিল না, ছিল বড্ড ভারী আর কর্কশ।সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল পরের দিন সকালে। সকালে যখন ছেলেটি স্বাভাবিক হতো এবং ওর মা কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করতেন, "তুই আমার সাথে কাল রাতে ওরকম ব্যবহার কেন করলি?" ছেলেটি তখন সম্পূর্ণ অবাক হয়ে কপালে হাত দিয়ে বলত, "মা! আমি? আমি তো কাল রাতে ঘর থেকেই বের হইনি। আমি তো তোমাকে কিচ্ছু বলিনি!" ওর চোখের সেই নিষ্পাপ চাউনি দেখে স্পষ্ট বোঝা যেত—ও সত্যিই কিছু মনে করতে পারছে না। কিন্তু রাতের সেই ভয়ংকর রূপ আর দিনের বেলার এই সরলতা—এই দুইয়ের দোলাচলে ম্যাডাম তীব্র চিন্তায় পড়ে গেলেন। শুধু তাই নয়, ম্যাডাম মাঝেমধ্যেই অনুভব করতেন, যেন ওনাদের ছাদের উপরে গভীর রাতে কেউ হাঁটাহাঁটি করছে, কিংবা ঘর থেকে আচমকা কেউ বেরিয়ে যাচ্ছে বা ঘরে কেউ ঢুকছে!ছেলের এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে দিশেহারা হয়ে ওর মা অবশেষে ছেলেটির দিদার (নিজের মায়ের) সাথে এই বিষয়ে কথা বলেন। সব শুনে দিদা তখন ছেলেটির মাকে নিজের কাছে ডেকে পাঠান এবং সেখান থেকে ওনারা দুজনে মিলে এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সিদ্ধ বাবার কাছে যান। সেই বাবা সমস্ত কিছু শুনে ধ্যানস্থ হয়ে যা জানালেন, তা শুনে ওনাদের বুক কেঁপে উঠল। বাবা পরিষ্কার বললেন যে, ছেলেটির ওপর কোনো সাধারণ ভূত নয়, বরং এক আদিম 'পিশাচ' ভর করেছে। আর সেই ভয়ানক আত্মা নাকি আজ থেকে নয়, দীর্ঘ চার বছর ধরে ছেলেটির পিছনে লেগে রয়েছে! এই সমস্ত পিশাচ আত্মা নোংরা জায়গা পছন্দ করে, অথচ ছেলেটির মা ছিলেন ভীষণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং মারাত্মক ঠাকুর-দেবতার ভক্ত। বাবা জানালেন, ওই অশুভ আত্মার কারণেই ওদের বাড়িতে কোনো রকম ঠাকুর-দেবতা বা পবিত্র শক্তি আসতে পারছে না। এমনকি পড়াশোনায় ভালো ছেলেটাকে ওই পিশাচ কোনো কিছুতেই কনসেনট্রেট বা মনোযোগ দিতে দিচ্ছে না, ভেতর থেকে ওকে পুরো শেষ করে দিচ্ছে।পরিস্থিতি আরও ভয়ানক রূপ নিল যখন বাবার নির্দেশ মতো বাড়িতে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হলো। বাবা কিছু তাবিজ আর কবচ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এখনই ওগুলো ছেলেটিকে পরানো যাবে না, তাই ও যেন দেখতে না পায় এমনভাবে ওর বিছানার তলার লুকিয়ে রেখে দিতে হবে। আর ছেলেটির মাকে একটি বিশেষ'সুরক্ষা কবচ' দিলেন, যাতে ওই আত্মাটি মায়ের কোনো ক্ষতি করতে না পারে। কারণ, পিশাচের চোখে এখন ওর নিজের মাই ছিল সব থেকে বড় শত্রু, যে তার পুজো-আচ্চা দিয়ে আত্মাটিকে তাড়াতে চাইছে। বাবা ঘর নিয়মিত পরিষ্কার রেখে ধূপধুনো দেওয়ার পরামর্শও দিলেন।কিন্তু ধুনোর গন্ধ দিতেই ছেলেটার ভেতরের সেই পিশাচটার ছটফটানি আর রাগ সব থেকে বেশি বেড়ে যেত। ওই পবিত্র সুগন্ধ সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারত না। একদিন তো সে চরম সীমায় পৌঁছে গেল। ধূপের গন্ধ পেতেই সে তীব্র কর্কশ গলায় চিৎকার করে ওর নিজের জন্মদাত্রী মাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, "তুই এই বাড়ি থেকে চলে যা! তুই চলে গেলেই সব শান্ত হবে। তুই দূর হ এখান থেকে!"ভয়ের চূড়ান্ত রূপটা দেখা গেল আর কিছুদিন পর। এক গভীর রাতে হঠাৎ করেই ছেলেটি নিজের ঘর থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। সদর দরজা হা হা করে খোলা। মাঝরাতে ম্যাডাম আর ওনার স্বামী আতঙ্কে পাড়াপড়শিদের ডেকে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন। চারদিকের অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা চিরে সবাই যখন হন্যে হয়ে ওকে খুঁজছে, তখন বহুদূরের এক নির্জন মাঠের দিকে নজর গেল। সেই খাঁ খাঁ মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল একটা একা তালগাছ। টর্চের আলো ফেলে সবাই যখন সেই তালগাছের গোড়ায় পৌঁছাল, তখন যা দেখল তা বিশ্বাস করার মতো ছিল না। গভীর রাতে, কনকনে ঠান্ডায় ছেলেটা একা একা ওই গাছের নিচে মাটিতে বসে অদ্ভুতভাবে বিড়বিড় করছে আর শূন্যে তাকিয়ে হাসছে। যেন পাতাল থেকে উঠে আসা কোনো অপশক্তির সাথে সে গভীর কোনো মন্ত্রে মগ্ন! চোখের সামনে সেই দৃশ্য দেখে সবার রক্ত জল হয়ে গিয়েছিল।এরপরের ঘটনাটা ঘটেছিল সেদিন বিকেলে, যেদিন আমি নিজে আমার ছেলেকে নিয়ে ওনার বাড়ি গিয়েছিলাম। পড়াশোনা চলাইকালীন হঠাৎ পাশের ঘর থেকে একটা বিকট গোঙানির আওয়াজ পাওয়া গেল। ম্যাডাম আতঙ্কিত হয়ে পড়ানো ফেলে দৌড়ে গেলেন, আমিও কৌতূহল আর ভয় নিয়ে ওনার পিছন পিছন গেলাম। ঘরের দরজা খুলে আমরা যা দেখলাম, তাতে আমাদের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। ওই শান্ত ছেলেটার চোখ দুটো পুরো উল্টে গেছে, গায়ের শিরাগুলো দপদপ করছে। ও ঘরের এক কোণে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে এমনভাবে ফুঁসছিল, যেন কোনো হিংস্র পশুর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ওর মুখ দিয়ে লালা ঝরছিল আর ও এমন একটা ভাষায় বিড়বিড় করছিল যা এই পৃথিবীর নয়। ম্যাডাম তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে ভগবানের নাম জপ করতে লাগলেন। ছেলেটা তখন খিলখিল করে এক অমানুষিক গলায় হেসে উঠল—সেই হাসিতে কোনো মায়া ছিল না, ছিল চরম হিংস্রতা। ঘরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে ভারী আর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ এই হাড়হিম করা তাণ্ডব চলার পর, ছেলেটি হঠাৎ একটা তীব্র চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল এবং অচেতন হয়ে গেল।বাবার নির্দেশই ছিল, ছেলেটি যখন একটু বশে আসবে বা শান্ত হবে, তখন ওনাকে সরাসরি সেই বাবার কাছে নিয়ে যেতে হবে। পরবর্তীতে অনেক কষ্ট করে ওনাকে সেই বাবার আশ্রমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ পুজো-অর্চনা, কঠোর তান্ত্রিক বিধি এবং ঝাড়ফুঁকের পর, অবশেষে চার বছরের সেই অভিশপ্ত পিশাচের হাত থেকে ছেলেটিকে চিরতরে মুক্ত করা হয়। আজ সে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে, আবার পড়াশোনাতেও মন দিয়েছে। তবে বিজ্ঞান যাই বলুক না কেন, চার মাস আগের সেই অভিশপ্ত বিকেল, মাঝরাতের সেই নির্জন তালগাছ তলার দৃশ্য আর চোখের সামনে দেখা পিশাচের সেই ভয়ংকর রূপ আমি কোনোদিন ভুলব না।


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Horror