অমাবস্যার অপচ্ছায়া : মর্গের সেই আত্মা
অমাবস্যার অপচ্ছায়া : মর্গের সেই আত্মা
পর্ব ১: অমাবস্যার অভিশপ্ত রাত
সংসারে টুকটাক অশান্তি হরহামেশাই হতো। কিন্তু আজকের ঝগড়াটা যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। স্বামী রমেন বাবুর তীক্ষ্ণ কথার আঘাতে ৫৫ বছর বয়সী সারদা দেবীর বুকটা অভিমানে ভেঙে আসছিল। আর এক মুহূর্তও এই ঘরে থাকতে ইচ্ছে করছিল না তার। চোখের জল মুছতে মুছতে, মাঝরাতেই তিনি হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।
বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেদিন ছিল কার্তিক মাসের ঘোর অমাবস্যা। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, চাঁদের লেশমাত্র নেই। রাগের মাথায় সারদা দেবী খেয়ালই করেননি যে তাড়াহুড়োয় তার মাথার দীঘল কালো চুলগুলো খোলাই রয়ে গেছে। গ্রামের জনহীন, পিচঢালা অন্ধকার রাস্তা ধরে তিনি একাই হেঁটে যাচ্ছিলেন।
রাস্তার ঠিক একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল মহকুমা হাসপাতালের পুরনো মর্গটি। দিনের বেলাতেও যেখান দিয়ে মানুষ একা যেতে ভয় পায়, রাতে সেখানে শ্মশানের নীরবতা। সারদা দেবীর রাশি খুব হালকা, জ্যোতিষীরা বলেছিল সহজে নজর লেগে যায়।
মর্গের ভাঙা ভেন্টিলেটরের ঠিক ওপাশ থেকে একজোড়া অদৃশ্য চোখ তার দিকে তৃষ্ণার্ত নজরে তাকাল। বাতাস আচমকা ভারী হয়ে উঠল। হাড় কাঁপানো একটা ঠাণ্ডা স্রোত সারদা দেবীর পিঠ বেয়ে নেমে গেল। তিনি টের পেলেন না, কিন্তু এক অশরীরী ভয়ঙ্কর ছায়া ঠিক তার পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করল।
পর্ব ২: বদলে যাওয়া সারদা দেবী
রাত দুটো নাগাদ সারদা দেবী যখন বাড়ি ফিরে এলেন, তখন তার রাগ অনেকটাই পড়ে গেছে। রমেন বাবু আর ছেলে আকাশ তখন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল। সারদা দেবী নিঃশব্দে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। বাইরে থেকে তখনো তাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকই লাগছিল।
কিন্তু আসল ভয়ঙ্কর রূপটা প্রকাশ পেল পরদিন সকাল থেকে। যে সারদা দেবী ভোরবেলা উঠে ঘরদোর পরিষ্কার করতেন, ঠাকুর ঘরে পুজো দিতেন, তিনি আজ বেলা দশটা পর্যন্ত বিছানা থেকেই উঠলেন না। পুত্রবধূ রিয়া যখন চা নিয়ে ঘরে ঢুকল, সে দেখল ঘরের সব জানালা শক্ত করে বন্ধ।
সারদা দেবী কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। রিয়া জানালাটা খুলতে গেলেই সারদা দেবী এক অদ্ভুত, খসখসে গলায় চিৎকার করে উঠলেন, "বন্ধ কর! বন্ধ কর বলছি! আলো আমি সহ্য করতে পারছি না!" রিয়ার হাত থেকে চায়ের কাপটা পড়ে গেল। মায়ের চোখের মণি দুটো কেমন যেন স্থির আর চড়ুই পাখির মতো লাগছিল। সারদা দেবী সারাদিন ঘর অন্ধকার করে শুয়ে রইলেন, বিন্দুমাত্র খাবারও মুখে তুললেন না। কিন্তু বাড়ির কেউ তখনো বুঝতে পারেনি, রাতের অন্ধকারে কী ঘটতে চলেছে।
পর্ব ৩: মাঝরাতের রাক্ষস
অন্ধকার নামার সাথে সাথেই সারদা দেবীর শরীরের ক্লান্তি যেন এক জাদুমন্ত্রে গায়েব হয়ে গেল। যেখানে তিনি সারাদিন এক ফোঁটা জলও খাননি, রাতে ডাইনিং টেবিলে বসে তিনি রাক্ষসের মতো গোগ্রাসে খেতে শুরু করলেন। প্লেটের পর প্লেট ভাত, তরকারি নিমেষের মধ্যে শেষ করে দিলেন।
সবচেয়ে ভীতিজনক ছিল তার চাহনি। তিনি নিরামিষ খেতেই ভালোবাসতেন, কিন্তু মাঝরাতে আচমকাই তিনি স্বামী রমেন বাবুকে ডেকে তীব্র কর্কশ গলায় বললেন, "বাজার দিয়ে এখনই জ্যান্ত মাছ নিয়ে আয় বলছি! আমার কাঁচা মাংস খেতে ইচ্ছে করছে!"
রমেন বাবু অবাক হয়ে বললেন, "এই মাঝরাতে কোথায় মাছ পাবো সারদা? তোমার শরীরটা কি ঠিক আছে?" এই কথা শুনতেই সারদা দেবী নিজের ছেলে আকাশকে ডেকে চোখের মণি দুটো উল্টে পৈশাচিক গলায় হুমকি দিলেন, "তাড়াতাড়ি মাছ এনে দে, নাইলে তোর ঘাড় মটকে দেবো!"
নিজের মায়ের মুখে এমন হিংস্র কথা আর পশুর মতো আচরণ দেখে আকাশ আর রিয়ার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মাঝরাতে তারা লক্ষ্য করল, সারদা দেবী নিঃশব্দে সদর দরজা খুলে বাইরের অন্ধকারের দিকে হেঁটে চলে যাচ্ছেন।
পর্ব ৪: ওঝার হুঙ্কার
সারদা দেবী ভোরবেলা যখন ফিরে এলেন, তখন তার সারা শরীরে কাদা মাখা, মুখ থেকে একটা আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছে। আকাশ আর দেরি না করে পাশের গ্রাম থেকে নামকরা সিদ্ধপুরুষ তান্ত্রিক ওঝাকে ডেকে আনল।
ওঝা মশাই ঘরে ঢোকা মাত্রই সারদা দেবী খাটের এককোণে গিয়ে খাঁচায় বন্দী হিংস্র পশুর মতো হিসহিস শব্দ করতে লাগলেন। ওঝা পরিস্থিতি দেখেই বুঝে নিলেন খেলাটা কতটা গম্ভীর। তিনি ঝোলা থেকে মন্ত্রপুত সর্ষে আর জল বের করলেন।
আসন পেতে বসে ওঝা যেই সারদা দেবীর মুখে মন্ত্রপুত জল ছিটালেন, অমনি সারদা দেবী এক তীব্র, বুক ফাটানো নারীকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন। সেই গলা সারদা দেবীর নয়, অন্য কারোর! ওঝা তার হাতের লাঠিটা মেঝেতে সজোরে ঠুকে হুঙ্কার দিয়ে জিজ্ঞেস করল, "বল তুই কে? কেন এই মহিলার পবিত্র শরীরে আশ্রয় নিয়েছিস? কোথা থেকে এসেছিস তুই?"
সারদা দেবীর শরীর থেকে তখন এক কর্কশ অট্টহাসি ভেসে এলো, "হাঃ হাঃ হাঃ! আমি একে ছাড়ব না! এই শরীর এখন আমার!"
পর্ব ৫: মীরার স্বীকারোক্তি
ওঝা এবার তার হাতের বিশেষ ঝাঁটা আর সর্ষে পড়া দিয়ে সারদা দেবীর পিঠে আঘাত করতে লাগলেন। শরীরে কোনো দাগ হচ্ছিল না, কিন্তু ভেতরের আত্মাটি যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল।
ওঝা আবার ধমক দিয়ে বলল, "নাম বল তোর! পরিচয় না দিলে তোকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেবো!" এবার সারদা দেবীর মুখ দিয়ে সেই অশরীরী আত্মা কেঁদে উঠে বলল, "আমার নাম মীরা! আমি হসপিটালের ওই মর্গে একা পড়েছিলাম। কেউ আমার খোঁজ নেয়নি!"
ওঝা জিজ্ঞেস করল, "এই ভদ্রমহিলাকে তুই কোথায় পেলি?" মীরা হিংস্র অথচ যন্ত্রণাকাতর গলায় বলল, "সেদিন অমাবস্যার রাতে ও যখন মর্গটার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন ওর মাথার চুলগুলো খোলা ছিল। আর ওর রাশিটাও বড্ড হালকা! এমন নরম শরীর আমি হাতছাড়া করতে পারলাম না। তাই ওর ঘাড়ে চেপে বসেছি। আমি অনেকদিন ভালোমন্দ খাইনি, তাই ওর শরীর দিয়ে মাছ-মাংস খাচ্ছিলাম!"
সব শুনে বাড়ির সবার চোখ ভয়ে এবং বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে গেল। ওঝা তখন কঠোর স্বরে বলল, "তোর ভোগ শেষ হয়েছে মীরা। আজকেই তোকে এই শরীর ছাড়তে হবে!
পর্ব ৬: নিম গাছের সেই অলৌকিক প্রমাণ
মীরা নামের সেই প্রেতাত্মা ওঝার মন্ত্রের তেজের সামনে আর টিকতে পারছিল না। সে আর্তনাদ করে বলল, "ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি! আমি চলে যাব! আমাকে আর মেরো না!"
ওঝা চাল পড়া ছুঁড়ে দিয়ে বলল, "তুই যে সত্যি চলে গেছিস এবং আর কোনোদিন ফিরে আসবি না, তার প্রমাণ কী দিয়ে যাবি?" মীরা তখন সারদা দেবীর কণ্ঠ ব্যবহার করে বলল, "আমি যখন এই শরীর ছেড়ে বেরোব, তখন ওই মাঠের মাঝখানে যে মস্ত বড় বুড়ো নিম গাছটা আছে, সেটার একটা বড় ডাল ভেঙে দিয়ে যাব। ওটাই আমার শেষ চিহ্ন।"
বলার ঠিক পরের মুহূর্তেই সারদা দেবী এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন। ঠিক সেই সেকেন্ডেই, বাড়ির বাইরে মাঠের দিক থেকে মটমট করে একটা বিকট শব্দ হলো, যেন কোনো বিশালাকার জিনিস ভেঙে পড়ল!
আকাশ আর রমেন বাবু টর্চ নিয়ে ছুটে বাইরে গেল। তারা দেখল, মাঝমাঠের সেই শতবর্ষী প্রাচীন নিম গাছটার একটা মস্ত বড় মোটা ডাল অলৌকিকভাবে ভেঙে মাটিতে পড়ে আছে, অথচ তখন বাতাসে কোনো ঝড় ছিল না। পরদিন সকালে যখন সারদা দেবীর জ্ঞান ফিরল, তিনি আবার আগের মতোই হাসিখুশি, স্বাভাবিক। অমাবস্যার রাতের পর কী ঘটেছিল, তার বিন্দুমাত্র স্মৃতিও তার মনে নেই। অশুভ আত্মার বিদায়ের পর পরিবারটিতে আবার সুখ আর শান্তি ফিরে এলো।
[সমাপ্ত]

