অতৃপ্ত আত্মার মরণ-ডাক: অভিশপ্ত সিলিং
অতৃপ্ত আত্মার মরণ-ডাক: অভিশপ্ত সিলিং
পর্ব ১: নতুন ঠিকানা, পুরোনো ছায়া
১৩ বছরের ঋতিকার জীবনটা কখনোই সহজ ছিল না।
বাবার অবহেলা, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ এবং মায়ের তীব্র লড়াই—সবকিছুই সে খুব কাছ থেকে দেখেছে।
মামার বাড়িতে থাকার সময় মায়ের আত্মসম্মানে আঘাত লাগায়,
মা শিবানী পাশের পাড়ায় একটা বড় বাড়ি ভাড়া নেন।
শিবানী ছিলেন পরম ঠাকুর ভক্ত।
তিনি ভাবলেন, এই নতুন বাড়িতেই হয়তো তাঁদের জীবনে একটু শান্তি ফিরবে।
কিন্তু তাঁরা জানতেন না, এই ঘরের এক অন্ধকার ইতিহাস রয়েছে।ঠিক দুই বছর আগে, এই ঘরেরই সিলিং ফ্যান থেকে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল ১৮-১৯ বছরের এক তরুণ।
তার নাম ছিল আকাশ।
একটা মেয়ে তাকে ভালোবাসার নামে চরম প্রতারণা করেছিল,
আর সেই কষ্ট সহ্য করতে না পেরেই আকাশ এই পথ বেছে নেয়।
তার সেই অতৃপ্ত আত্মা ওই ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ক্ষোভ আর একাকীত্ব নিয়ে ঘুরে বেড়াত।
ভাড়া আসার কয়েকদিন পর থেকেই ঋতিকা ঘরের মধ্যে এক অদ্ভুত উপস্থিতি টের পেতে শুরু করল।
মাঝরাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, ঋতিকা দেখত সিলিং থেকে একটা চাদর বা দড়ির মতো কিছু একটা ঝুলছে।
আর ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটা ছেলে।
ছেলেটার চোখ দুটো ছিল অসম্ভব করুণ, কিন্তু তার মধ্যে এক তীব্র টান ছিল।
প্রথমে ভয় পেলেও, আস্তে আস্তে ঋতিকা খেয়াল করল ছেলেটি শুধু তাকেই দেখা দেয় এবং তার সাথে ফিসফিস করে কথা বলে।
পর্ব ২: মরণ-ডাক
দিন যত যেতে লাগল,
আকাশ ঋতিকার ওপর তার প্রভাব বাড়াতে শুরু করল।
সে ঋতিকার মনের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ আর কষ্টগুলোকে উসকে দিত।
বলত,
"এই পৃথিবীতে কেউ কাউকে ভালোবাসে না ঋতিকা।
তোমার বাবাও তোমাকে চায়নি,
ছেড়ে চলে গেছে।
এই সমাজও তোমাদের ভালো চোখে দেখে না। তার চেয়ে তুমি আমার কাছে চলে এসো। আমরা দুজনে অন্য এক জগতে শান্তিতে থাকব।
"১৩ বছরের একটা সরল মেয়ের মনে এই কথাগুলো বিষের মতো কাজ করতে শুরু করল।
আকাশ তাকে প্রতিনিয়ত উসকানি দিত যাতে ঋতিকাও তার মতো সিলিংয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে।
ঋতিকার আচরণে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে লাগল। সে সারাদিন চুপচাপ ঘরের কোণে বসে থাকত,
একা একা কার সাথে যেন কথা বলত। শিবানী ভাবতেন,
হয়তো বাবার চলে যাওয়ার ট্রমা থেকেই মেয়েটা এমন করছে।
তিনি নিয়মিত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন,
কিন্তু ঘরের ভেতরের অন্ধকার শক্তি তখন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
পর্ব ৩: আসুরিক শক্তি
একদিন দুপুরে শিবানী যখন রান্নাঘরে কাজ করছিলেন,
হঠাৎ ঋতিকার ঘরের ভেতর থেকে একটা ভারী চেয়ার উল্টে যাওয়ার শব্দ হলো।
শিবানী বুক কাঁপানো এক আশঙ্কায় ছুটে গেলেন ঋতিকার ঘরে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তাঁর চোখ কপালে উঠল। সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না ঝুলিয়ে, চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে ঋতিকা গলায় ফাঁস লাগানোর চেষ্টা করছে!
তার চোখ দুটো উল্টানো,
চেনা ঋতিকাকে চেনা যাচ্ছে না।
শিবানী চিৎকার করে ছুটে গিয়ে ঋতিকাকে জড়িয়ে ধরে চেয়ার থেকে নামিয়ে আনলেন।
কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল এক অলৌকিক কাণ্ড।
১৩ বছরের একটা রোগা মেয়ের গায়ে যেন অসুরের শক্তি ভর করল!
সে এক ঝটকায় তার মাকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
শিবানী একা তাকে সামলাতে না পেরে চিৎকার করে পাড়ার লোক ডাকলেন।পাশের বাড়ি থেকে ৪-৫ জন হট্টাকট্টা পুরুষ মানুষ ছুটে এলো ঋতিকাকে ধরে রাখতে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়,
সেই ৪-৫ জন মিলেও ঋতিকাকে চেপে ধরে রাখতে পারছিল না।
সে তীব্র আর্তনাদ করে অতিপ্রাকৃতিক শক্তিতে সবাইকে সরিয়ে দিচ্ছিল আর দেয়ালে মাথা খুঁড়ছিল।
তার মুখ দিয়ে তখন অন্য এক খসখসে গলা বের হচ্ছে,
"আমাকে ছেড়ে দাও!
আমি চলে যাব! ও আমাকে ডাকছে... আমি ওর সাথে যাব!
ও একা আছে!"
পর্ব ৪: তান্ত্রিকের প্রবেশ
কিছুক্ষণ পর ঋতিকা হঠাৎ করে শান্ত হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
যখন তার জ্ঞান ফিরল,
সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
শিবানী যখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন সে কেন এমন করছিল,
ঋতিকা অবাক হয়ে বলল,
"আমি আবার কী করলাম মা?
আমি তো কেবল ঘুমাচ্ছিলাম!"
ঋতিকার নিজের হুশে আসার পর আগের কোনো কিছুই মনে থাকত না।শিবানী এবার নিশ্চিত হলেন যে এটি কোনো মানসিক রোগ নয়,
এর পেছনে কোনো অশুভ শক্তির হাত রয়েছে।
নিরুপায় হয়ে এবং ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি এক ক্ষমতাশালী তান্ত্রিকবাবাকে ডেকে আনলেন।
তান্ত্রিকবাবু ঘরে পা রাখতেই ঘরের থমথমে বাতাস টের পেলেন। তিনি তাঁর ঝাড়ফুঁক, মন্ত্রপূত জল এবং বিশেষ পুজো-আচ্চা শুরু করলেন।পুজোর সময় ঋতিকা আবার ছটফট করতে লাগল, কিন্তু তান্ত্রিকের মন্ত্রের জোরে অশুভ শক্তি কিছুটা দমে গেল। তান্ত্রিকবাবু শিবানীকে ঘরের আসল ইতিহাস খুলে বললেন। তিনি বললেন,
"মা, এই ঘরে যে ছেলেটি আত্মহত্যা করেছিল, সে আসলে এক মেয়ের প্রতারণার শিকার হয়ে মারা যায়। তার অতৃপ্ত আত্মা এখন ঋতিকাকে সেই মেয়ের জায়গায় দেখছে এবং তাকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে চাইছে। আমার পুজো একে সাময়িকভাবে শান্ত রাখতে পারবে, কিন্তু তোমরা যদি এই মেয়েকে বাঁচাতে চাও, তবে আজ রাতেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও।
"পর্ব ৫: মুক্তি ও নতুন সকাল
তান্ত্রিকের কথা শুনে শিবানী আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না।
জিনিসপত্রের মায়া ত্যাগ করে,
সেই রাতেই ঋতিকা আর তার ছোট বোনকে নিয়ে কাপড়ের দুটো ব্যাগ গুছিয়ে সোজা অন্য এক পাড়ায় চলে গেলেন। সেখানে সাময়িকভাবে একটা ছোট ঘর ভাড়া নিলেন।সেই অভিশপ্ত বাড়ি এবং আকাশের চাদর জড়ানো ছায়া থেকে দূরে আসার পর ঋতিকা আস্তে আস্তে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠল।
সেই রাতে কী হয়েছিল বা তার আগে সে কাকে দেখতে পেত,
সে সম্পর্কে ঋতিকার মনে আর কোনো স্মৃতি রইল না।
সে আবার আগের মতো হাসিখুশি, চঞ্চল মেয়েতে পরিণত হলো।
শিবানী তাঁর ঠাকুরভক্তি আর মাতৃত্বের জোরে তাঁর মেয়েকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন।
আর ঋতিকা?
সে হয়তো কোনোদিন জানতেই পারবে না, এক অতৃপ্ত আত্মার মরণ-ডাকের কতটা কাছাকাছি সে পৌঁছে গিয়েছিল। এক নতুন সকালের আলোয় দিদি আর বোন মেতে উঠল খেলায়, আর শিবানী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ঠাকুরের চরণে মাথা ঠেকালেন।
(সমাপ্ত)

