পার্ফেক্ট কাপল
পার্ফেক্ট কাপল
"একবার দেখা করবে?"
আবদার করা মানুষটির সাথে প্রেমিকা হিসাবে আমার সেটাই ছিল প্রথম ও শেষ বারের জন্য দেখা করা। সেদিন নার্ভাসনেসের কারণে ব্যাগে রাখা গোলাপ, জুঁইয়ের মালা কোনটাই দেওয়া হয়ে উঠেনি, যার খোঁটা এখনও শুনি। হ্যাঁ সেদিন সে নয়, আমি ফুল কিনেছিলাম, কারণ আমি জানতাম মানুষটা ভালোবাসতে জানলেও ভালোবাসা প্রকাশে ঠিক পটু না। কিন্তু আমি যে উপন্যাস প্রেমী বালিকা, যার দুচোখে স্বপ্ন তার মানুষটা প্রথম দেখায় তাকে গোলাপ দেবে, জুঁই কিংবা বেলিফুলের মালা পরিয়ে দেবে। সেদিন কোনটাই হয়ে উঠেনি। সেদিনের ফ্রেমবন্দি স্মৃতি বলতে, কিছু ছবি। আর মন বন্দি যে পুরো মানুষটাই..
ওই যে প্রথম দেখাতে তার আগলে রাখা, হাত ধরে রাস্তা পার করে দেওয়া, পৌঁছে দেওয়া। গালে খাইয়ে দেওয়া এন্ড রাস্তায় গাড়িতে আমার ধাক্কা খাবার সময়ে তার অস্থিরতা আমি আজও ভুলিনি। সেদিনের স্পর্শ বলতে হাত ধরা ও হাতে ঠোঁটের আলতো স্পর্শ ব্যাস এইটুকুই। সারাদিন ভালোবাসি বলে পাগল করা লোকটি, সেদিন একবারের জন্যও ভালোবাসি বলতে পারেনি। ইশ্ আমার কত শখ ছিল কিন্তু লোকটা সব বরবাদ করে দিল!
----
ডায়রিটা বন্ধ করে মুচকি হাসলো তানফা, গল্পটা বহুবছর আগের। এখন আর আগের সেই যুবতী মেয়েটা নেই। অনেক কাল আগেই যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যকে আপন করে নিয়েছে। সময়ের সাথে অনেক কিছুই বদলে গেছে, শুধু বদলায়নি তাদের ভালোবাসার সম্পর্কটি।
মিরহান সেই প্রথম দিনের মতোই আছে, তবে তার মধ্যে দুটো পরির্বতন এসেছে। একটা হলো, এখন আর ভালোবাসা প্রকাশে কার্পণ্য করে না, আর একটা তানফার জন্য উপহার আনতে ভুলে যায় না। দুজনের সংসার জীবন আজ ৫০ বছরের হলো কিন্তু এখনও ঝগড়া কমলো না।
এর মাঝে মিরহান লাঠিটা ধরে কাঁপতে কাঁপতে তানফার পাশে এসে বলল, "বুড়ি হয়েছ কিন্তু এখনও বই পড়া কমলো না।"
তানফা মুখ বেঁকিয়ে বলল, "আর আপনি কী? বুড়ো বেডা হয়েও আগের মতোই রয়ে গেছেন।"
মিরহানের একটু ভাব বাড়ল, ভাব নিয়ে বলল, "বয়স হয়েছে তো কী! আমি সেই ২৫ বছরের যুবক আছি, সেই প্রথমদিন প্রেমে পড়ার মতো।"
"এই বুড়ো খবরদার মিথ্যা কথা বলবেন না, আমি আপনাকে একদম বিশ্বাস করি না।"
"কেন কেন?"
তানফা মুখ বেঁকিয়ে বলল, "খুব বলতেন না, আপনি আমার প্রেমে পড়েন নি তাহলে কী এইটা?"
মিরহান রোমান্টিক মুডে বলল, "কী বলো জান, আমি তো আগের মতোই আছি। মন করলে এখনোও মেয়ে পটাতে পারি।"
তানফা রেগে গেল, ক্ষেপে গিয়ে বলল, "বুড়ো বেডা, শখ কম না। ৭৫ বয়সে এসে বলছে মেয়ে পটাবো। বলছি ভুলে গেছেন আমি কে!"
মিরহান কাঁচুমাচু করে বলল, "আজ্ঞে না মহারানী আমি ভুলিনি আপনি কে! আপনি আমার সন্তানদের মা, আমার নাতি নাতনীর দাদীমা। আর আমার মনের রানী।"
"বুড়ো বয়সে ভীমরতী।"
"আহ্ বউ, কী বলো, একটু প্রেম করবে তা না। আজ আমাদের ৫০ বছর পূর্ণ হলো বিয়ের। কত স্মৃতি তাই না।"
তানফা সেই আগের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, "হ্যাঁ আপনি বিয়ের দিন গাড়িতে আমাকে বকেছিলেন।"
মিরহান মাথায় হাত দিয়ে বলল, "আল্লাহ! এই মেয়ে এতো স্মৃতির মধ্যে ওই কথা মনে রেখেছে! আল্লাহ আমাকে নিয়ে নাও, এই দিন দেখব বলে বেঁচে আছি।"
তানফা ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠে বলল, "হ্যাঁ আপনি তো ওই কথাই বলবেন। আপনার তো আমাকে ভালো লাগে না, আমি থাকবো না আর এখানে।"
মিরহান বিরবির করে বলল, "বয়স হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেই আগেই মতোই বাচ্চামী আছে, ড্রামা কুইন একটা।"
কথাটা ভাগ্যিস তানফার কান পর্যন্ত যায়নি, নাহলে নিশ্চয়ই তুল কালাম হতো। এর মাঝে ওদের নাতনী এসে ওদেরকে নিয়ে গেল। ৫০ বছরের বিবাহ বার্ষিকী, সেলিব্রেশন না করলে হয়! হইচই করে সময় কাটলো।কেক কাটা শেষে, ওদের নাতনী বলল, "দাদাভাই দিদুনকে কীভাবে প্রোপজ করেছিলে আর একবার করে দাও তো।"
তানফা আবারও মুখ বেঁকিয়ে বলল, "তোমাদের দাদু প্রপোজ করেনি, শুকনো মুখেই ভালোবাসা বলে চলেছে এতকাল।"
মিরহানও কম যায় না, সে বলল, "দিদিভাই তোমার দিদুন হয়তো ভুলে গেছে, সে আমার এই শুকনো ভালোবাসাতেই এতগুলো বছর আমার সাথে রয়ে গেছে।"
তানহা বিরক্ত হয়ে বলল, "আমার থাকাই ভুল হয়েছে, বেরসিক লোক একটা।"
মিরহান হেসে পাশে রাখা একটা ফুলেরবুকে থেকে কাঁপা কাঁপা হাতে একটা ফুল তুলে নিয়ে তানফার সামনে গিয়ে বলল, "স্পেশাল ভাবে কখনো বলা হয়নি, তবে আছে সুযোগ পেয়েছি তাই বলে দিচ্ছি।
সবাই হইহই করে উঠল।তানফা একটু লজ্জা পেল, ছেলে মেয়েদের সামনে এই বুড়ো কী করছে! নামানোর চেষ্টা করল কিন্তু মিরহান আজ বলেই ছাড়বে। বলতে শুরু করল, "যেদিন প্রথম গোলাপী শাড়ি পড়া এক মেয়েকে দেখেছিলাম সেদিনই আমি আমার মনটাকে তার নামে লিখে দিয়েছিলাম। ভাগ্যের জোরে সে আমার অর্ধাঙ্গিনী, আমার সন্তানদের মা। তবে তার আগে তার একটা পরিচয় সে আমার জান, ভালোবাসি জান। অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি। লাভ ইউ।"
সবাই উত্তর দেবার জন্য চিৎকার করে উঠল। তানফার চোখে পানি, কোনো উত্তর দিল না। মিরহান বলল, "লাভ ইউ।"
এবারেও সবাই চুপ। মিরহান কয়েকবার বিরক্তিহীন ভাবে বলল, কিন্তু প্রতিবারই তানফা নিশ্চুপ। শেষে দিল এক ধমক, "এই মেয়ে শুনতে পাও না। লাভ ইউ।"
ওপাশ থেকে উত্তর আসলো," লাভ ইউ টু।"
সবাই লাফিয়ে উঠল। মিরহান হেসে বলল, "একটুও বদলানে না, আগের মতোই আছো।"
তানফাও হাসলো। মৃদু হেসে বলল, "আপনি তো কখনোই বদলে যেতে বলেননি উল্টে আমার সমস্ত কিছুতেই অবাধ আশকারা দিয়েছেন, কীভাবে বদলাবো বলুন।"
ওরা দুজন হাসলো, সাথে উপস্থিত সকলে। বিয়ের এতবছর পরেও ওদের সম্পর্ক ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে, এককথায়, পার্ফেক্ট কাপল।
তানফা ঘরে এসে দেখল, বিছানায় দুটো গোলাপ ফুল আর একটা বেলী ফুলের মালা রাখা আছে। ওর চোখ ছলছল করে উঠল, মানুষটা এখনো মনে রেখেছে? মিরহান ওকে বিছানায় নিয়ে বসালো। একটা গোলাপ ওর হাতে ধরিয়ে দিল, আর একটা কানের পাশে সাদা চুলের মাঝে গুজে দিল। আর বেলিফুলের মালাগুলো দুহাতে পরিয়ে দিল।তানফার নিজেকে সেই ১৯ বছরের যুবতী মনে হচ্ছে, যে আশা করে সেদিন ফুল কিনেছিল আজ সে আশা পূর্ণ হয়েছে। মিরহান মুগ্ধ হয়ে তার জানকে দেখছে, বয়স হয়েছে, চামড়ায় পরিবর্তন এসেছে, চুলে পাক ধরেছে তবুও তার মনের রাজকন্যা এখনো সেইরকমই আছে। এখনও সেই আগের মতো ওর চোখে রূপবতী একটা মেয়ে। আসলে ভালোবাসা সবরূপেই সুন্দর।
তানফা মিরহানের বুকে মাথা রেখে বলল,,
"লাভ ইউ টু।
মিরহান হা হা করে হেসে উঠে বলল, "লাভ ইউ।"
- সমাপ্ত।

