নীলাঞ্জনার বৃষ্টিময় প্রেমকাব্য
নীলাঞ্জনার বৃষ্টিময় প্রেমকাব্য
নীলাঞ্জনা বৃষ্টিময় প্রেমকাব্য
কলমে-শ্রেষ্ঠা ওরফে মেঘ
চারিদিক বাঙালির সব থেকে বড় পুজো দুর্গা পুজোর গন্ধে ভরে আছে। আজকে অষ্টমী। নীলাঞ্জনার মন কিছুটা ভালো আবার কিছুটা খারাপ কারণ এবারে এখনও পর্যন্ত একদিনও পুজোতে ঠাকুর দেখতে বেরাতে পারেনি কারণ রাস্তাঘাটে প্রচুর জল আর শুধুই বৃষ্টি হচ্ছে। তবে আজ যতই হোক অষ্টমী আর মাত্র দুদিন তারপর যে পুজো শেষ। নীলাঞ্জনা আজকে সকাল সকাল স্নান করে একটা লাল রঙের শাড়ি পরে হালকা গোলাপি লিপস্টিক আর গাঢ় কাজল পরে অল্প সাজগোজ করে নিয়ে তার বাড়ির ছাদটায় চলে এসেছে। আর তার হাতে ছিল একটা ডায়েরি। নীলাঞ্জনা ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চোখের কোনের সামান্য জল'টা মুছে ডায়েরি'টা খুলল আর পড়তে লাগল,
প্রিয় মায়াবতী নীলা,
এই পুজোতে আর হয়তো আমাদের দেখা হল না, তবে সামনের পুজোতে আমি মহালয়ার দিন অবশ্যই তোমার বাড়ি আসব আর দশমী অবধি তোমাদের সকলের সাথে ভালোভাবে পুজো কাটাব, স্পেশালি তোমার সাথে।
ইতি
তোমার বেহায়া প্রেমিক পুরুষ
ব্যস ডায়েরি'টা পড়া শেষ করতেই শুরু হলো আবার টিপ টিপ বৃষ্টি। নীলাঞ্জনার চোখের জল যেন বৃষ্টির সাথেই মিশে গাল বেয়ে পড়ছে কারণ এই ডায়েরিটাতে একটা ছোট্ট চিঠি ছিল যেটা আজ থেকে পাক্কা ন'বছর আগে কেউ নীলাঞ্জনাকে দিয়েছিল। আর এই চিঠির লেখা যেন চিঠিতে নিবন্ধ ছিল কারণ নীলাঞ্জনার সেই বেহায়া প্রেমিক পুরুষ আজও আসেনি। নীলাঞ্জনা ডায়েরি'টা হাতে নিয়ে আকাশের পানে চেয়ে আছে, ঠিক তখনই ওর খুব নিকটে ওর কানে আসে এক পুরুষালি ভারি কণ্ঠস্বর যে ওকে ডাকছে, কেমন আছো নীলাবতী?
নীলাঞ্জনা পেছনে ফিরে তাকায়, তবে ও ঠিক বুঝতে পারছে না ওর সামনের পুরুষ মানুষটি আসলে কে! তাই ও সরাসরি সেই পুরুষের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ল।
— কে আপনি? ঠিক চিনতে পারলাম না তো আপনাকে!
ওর সামনে থাকা সেই পুরুষটি ওকে বলল, আমি কাব্য।
— কাব্য?
— আজ্ঞে ম্যাডাম, তা তুমি কেমন আছো নীলাবতী?
কাব্যের মুখে নীলাবতী ডাক'টা শুনে নীলাঞ্জনার যেন বুক কেঁপে উঠল। সারা শরীর বেয়ে একটা শিহরণ জেগে উঠল।
নীলাঞ্জনা মনের এক নীরব দুঃখ নিয়ে বলে,
— আজও মনে রেখেছ তাহলে আমায়?
কাব্য সামান্য হেসে,
— কি করে ভুলি বলো! তুমি তো আমার মায়াবিনী নীলাবতী যাকে আমি আমার কিশোর বয়স থেকে ভালোবেসে এসেছি আর এই বিষয়'টা আর কেউ জানুক বা না জানুক তুমি তো জানতে তাই না!
নীলাঞ্জনা মনে অভিমান নিয়ে বলে,
— তুমি যদি আমায় সত্যি ভালোবাসতে তাহলে আমায় মনে রাখতে আর ন'বছর আগে বলেছিলে যে তুমি আমাদের বাড়িতে আসবে আমরা সবাই একসাথে পুজো কাটাব। আর আজ ন'টা বছর কেটে গেছে। এখন তুমি আসলে আমার খোঁজ নিতে! এতদিন একটা বারের জন্যও মনে পড়ল না আমার কথা?
কাব্য হাঁটু গেড়ে নীলাঞ্জনার সামনে বসে,
— কি করে ভুলতে পারি আমি এই মায়াবিনীকে? তোমাকে ভুলে থাকা আমার যে পক্ষে সম্ভব নয় নীলা!
— তাহলে এতদিন কোথায় ছিলে তুমি?
— আমি তোমাকে যখন ভালোবেসেছি তখন তোমাকেই আমার জীবনসঙ্গিনী বানাব আর এই কারণেই আমি ন'টা বছর আগে যখন তোমায় ওই ডায়েরিতে চিঠি'টা লিখে দিয়ে গিয়েছিলাম ঠিক তার পরদিনেই আমি আমার বাবা মায়ের সাথে ওয়াশিংটনে গিয়েছিলাম কারণ তুমি জানো যে সেখানে আমার বাবার বিজনেস আছে।
নীলাঞ্জনা কাব্যকে এবার উঠিয়ে দাঁড় করালো।
— সবই বুঝলাম কিন্তু এতদিন কোথায় ছিলে সেটা তো বললে না?
কাব্য এবার একটু শ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করে,
— ধৈর্য্য ধরুন ম্যাডাম বলছি আমি।
— হুম বলো।
— তখন যে ওয়াশিংটনে গিয়েছিলাম আর ফিরতে পারিনি কারণ বাবার বিজনেসের সব রেসপনসিবিলিটি ওইখানেই পার্মানেন্টের জন্য হয়ে গিয়েছিল। আর এটা জাস্ট মা বাবা জানতো কিন্তু আমায় জানায়নি, তার জন্যই ভেবেছিলাম যে নেক্সট ইয়ার দুর্গা পুজোতে আমি মা বাবা সবাই একসাথে তোমাদের বাড়িতেই পুজো কাটাব কিন্তু সেটা আর করতে পারলাম না।
নীলাঞ্জনা এবার দুই হাত ভাঁজ করে বলে,
— তাহলে এতদিন পর আসলে কেন?
— আমি আমার মায়াবিনীকে আমার সঙ্গে করে নিয়ে যাব তাই আর এখন আমি বাবার বিজনেসটাই সামলাচ্ছি। কারণ বাবা আজ থেকে ২ বছর আগে আমাকে আর মাকে রেখে চিরবিদায় নিয়েছেন।
কাব্য এবার আর কোনও কথা না বাড়িয়েই নীলাঞ্জনার সামনে নিজের দু কান ধরে বলে,
— মায়াবিনী আমায় ক্ষমা করে দিন। আজ কিন্তু আমি অনেক প্ল্যান নিয়ে এসেছি আপনাদের বাড়িতে। কিছুদিন আগেই আমি দেশে ফিরেছি আর আজ আপনাদের বাড়িতে এসেছি আপনাকে আমার অর্ধাঙ্গিনী করে নিয়ে যাব বলে। কিন্তু দেখুন আপনার এই নিরীহ মানুষ'টার জন্য কোনো মায়া হচ্ছে না, যে মানুষ'টা বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে।
নীলাঞ্জনা এবার ফিক করে হেসে ফেলে বলে,
— এই বেহায়া পুরুষ।
কাব্য এবার নিজের বুকের বাম পাশে এক হাত দিয়ে বলে,
— হায় নীলাবতী তোমার রূপে যেমন মায়া আছে তেমন তোমার কথাতেও মায়াভরা। আর এই 'বেহায়া পুরুষ' শব্দ'টা জাস্ট তোমার মুখে শোনার জন্য আমি কতদিন অপেক্ষা করেছি জানো?
— এত পাকা পাকা কথা না বলে চুপচাপ নিচে চলো আমার সাথে, নাহলে বৃষ্টির মধ্যে কাকতাড়ুয়া বানিয়ে ছাদে দাঁড় করিয়ে রাখব বলে দিলাম।
কাব্য এবার হা হা করে হেসে বলল,
— আমার দুরন্ত নীলা কত বড়ো হয়ে গেছে! আমি তোমায় একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরব নীলা?
নীলাঞ্জনা কোনও উত্তর না দিয়েই নিজে থেকে কাব্যকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। কাব্যের বুকে মুখ গুঁজে নীলাঞ্জনা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— অবশেষে আমার কাব্য আমারই হলো। জানো কাব্য আমি প্রতিবছর তোমার আসার অপেক্ষায় দিন গুনতাম বিশেষ করে এই পুজোর সময়। কারণ কোনো এক পুজোর সময় তুমি আসবে বলেও আসোনি। ঠিক তেমনই আমি আজও দাঁড়িয়ে ছিলাম তোমার অপেক্ষায়। আর আজই তুমি আসলে আমার কাছে।
কাব্য নীলাঞ্জনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
— কাব্য যে তার নীলাঞ্জনাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ, তাই তো কাব্য ছুটে এসেছে তার নীলার কাছে।
মেঘলা আবহাওয়া, চারিদিকে বৃষ্টি পড়ছে আর কোনও এক বাড়ির ছাদে একে অপরকে গভীর আলিঙ্গন করে দাঁড়িয়ে আছে কাব্য আর নীলা।
--- সমাপ্ত--

