STORYMIRROR

POUSHALI KUNDU

Romance

4  

POUSHALI KUNDU

Romance

জাহান্নাম

জাহান্নাম

5 mins
5

নদীর ঘাটে নৌকাটা বাঁধা আছে .......তাতে বছর পঁচিশের মকবুল মাথার তলায় হাত দিয়ে চোখ বুজে শুয়ে আছে ...... সকালের এই সময়টা তার বড়ো ভালো লাগে ...... ..... হঠাৎ শুনতে পেলো ও মকফুল তাড়াতাড়ি চল বাবা ওপারে হাট বসে গেলোতো .....

মকবুলের জায়গায় মকফুল শুনেই চোখ না খুলেই বুঝে গেলো লক্ষ্মী জ্যাঠা এসে গেছে ........ আজ মাছ না আনতে পারলে তোর জেঠি ও ই আঁশ বটিতে আমার আঁশ ছাড়াবে ... মকবুল হেসে বলে আমি নদী থেকে মাছ ধরে দেবো চিন্তা নেই ..... কিন্তু জ্যাঠামশাই একটু অপেক্ষা করতে হবে তো আর কয়েকজন আসুক ..... হাটের দিন আজ ... বলতে বলতে কয়েকজন এসে পড়লো মকবুল উঠে পড়ে এবারে ..... হাল চালিয়ে নৌকা ঘুরিয়ে ওপারে চলল সবাই জানে মকবুল ছেলে হিসাবে খুব ভালো আর নৌকা খুব ভালো চালায় ....এই গ্রামেরই ছেলে ... সে...... তার চেহারাটা দেখবার মতো .... গায়ের রঙ মাঝারি পেশীবহুল চেহারা ... তার চোখ দুটো ভারি সুন্দর ... বড়ো মায়াবী ....

ওপারে যাত্রী নামিয়ে সে নৌকায় বিশ্রাম নিতে লাগলো ..... অগ্রহায়ণ মাস রোদটা গায়ে লাগে না .... তাও একটু ছায়ায় নৌকা বাঁধল এই ঘাটে অনেক মেয়ে বৌকে দেখা যায় ..... কেউ জল নিতে কেউ বা প্রয়োজনীয় কাজ করতে আসে .... এদের মধ্যে একটা মেয়েকে সে প্রায় দেখতে পায় নাম সন্ধ্যামনি ..... তাকে ওই নাম ধরে ডাকতে শুনেছে .... .

বয়স ১৮ কি ১৯ হবে ... একটু লম্বা রোগাটে গড়ন .... মাঝারি রঙ ... মুখটা দেখলে মায়া লাগে .... বাসনকোসন জামা কাপড় সব নিয়ে আসে নদীর ঘাটে বেশ কিছুক্ষণ কাজ সেরে তার পর বাড়ী ফেরে .... মকবুল নৌকায় শুয়ে থাকে বেলা বাড়ছে .... ওপাশ থেকে আবার কয়েক জন এলে আবার নৌকা নিয়ে ফিরবে ..... ঘাটে এখন কেউ নেই .... হঠাৎ মকবুল দেখে একটা মেয়ে হাতে ছোট কাপড়ের পুটুলী নিয়ে তার নৌকায় সটান উঠে এসে বসল ..... এবারে সে দেখল এতো সেই মেয়েটা সন্ধ্যামনি ..... বলল চলো ... এ কেরম ব্যাপার হলো ?

মকবুল বলল কোথায় যাবে? সন্ধ্যাম নি বলল জাহান্নামে ..... মকবুল হেসে বলল ও জায়গা আমার জানা নেই ....

মেয়েটা এবারে কেঁদে ফেলল... মকবুলের খুব মায়া লাগলো .... কিন্তু এই ভেবে একটু ভয়ও হলো.....

মেয়েটা হিন্দু ...তার নৌকায় এখন কেউ নেই .....

কেউ যদি দেখে মেয়েটা এই ভাবে কাঁদছে তাহলে কি ভাববে ?

তাই সে সান্তনার সুরে বলল কি হয়েছে আমাকে বলতে পারো ....

মকবুল যা বুঝলো তা হলো .... সন্ধ্যামনির মা বাবা নেই ..... দাদা বৌদি আর তাদের তিন ছেলে মেয়ের সংসারে তার ঠাঁই ...... সেখানে সে সারাদিন প্রাণপাত পরিশ্রম করে ..... সব কাজ করে ... আধ পেটা খেতে দেয় ....তাও তাদের মন ভরেনা আজতো তার বৌদি তাকে চড় মারলো...... তাও বিনা দোষে ..... অনেক সহ্য করেছে .... আর না .... মকবুল বলে দিনকাল ভালো না .... তুমি মেয়ে মানুষ .... একবার যদি ইজ্জত চলে যায় তখন কি করবে ? কত খারাপ মানুষ চারিধারে খুবে বেড়াছে তুমি বাড়ীতে ফিরে যাও ...

সন্ধ্যামনি মকবুলের কথা শোনে ..... সে বোঝে তার ফিরে যাওয়াই উচিত .... অগত্যা বাড়ী ফিরে গেলো কেউ অবশ্য জানতে পারলোনা যে সে চলে যেতে চেয়েছিলো ....

মকবুলও ওপার থেকে লোক নিয়ে এপারে এলো ..... লোকদের নামিয়ে একেবারে স্নান করে বাড়ী ফিরল ..... খেতে বসে দেখল ..... আম্মি আজ তার সবচেয়ে পছন্দের খাবার দিয়েছে .... ভাত .... পাঠ শাক .... পিয়াজ চিচিঙ্গা আর কুঁচো চিংড়ি দিয়ে ভাজা .... খেতে খেতে মেয়েটার মুখ মনে পড়ল .... আহারে পেট ভরে খেতেও পায়না ....

পরদিন মকবুল বাড়ী থেকে ৪ টে কলা নিয়ে নৌকায় রাখলো ....

এ পাড় থেকে লোক নিয়ে সে ওপারে পৌঁছে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল কখন সন্ধ্যামানি আসবে .... কিছুক্ষণ পর দেখল এক বালতি কাপড় নিয়ে কাচবে বলে আসছে .... মকবুলকে দেখে সে একটু হাসলো .... এই সময়ে মকবুল নৌকা থেকে নেমে ঘাটের সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে এমন ভাব করে মেয়েটার পাশে ৪টে কলা রেখে দিয়ে চলে এলো ....

সন্ধ্যামনি অবাক ..... মকবুল হেসে বলল আমাদের গাছের তাই ভাবলাম তোমাকে দিই.... সন্ধ্যা মনে মনে খুব খুশী হলো ..... তার কপালে ভালো কিছু জোটেনা ..... সে যেখানে বসেই খুব তৃপ্তি করে দুটো কলা খেলো আর বাকি দুটো বালতির নীচে রেখে কাঁচা জামা কাপড় তার ওপর ঢাকা দিয়ে নিয়ে গেলো ...... মকবুলের মনটা আজ একটা কি আনন্দে যেন ভরে গেলো ....

এরপর থেকে তিন মাস কেটে গেলো ..... মকবুল এই তিনমাসে প্রতিটা দিন কিছু না কিছু খাবার সন্ধ্যামনির জন্য এনেছে .... তাদের মধ্যে সেভাবে কোনো কথা হতো না কিন্তু চোখের ভাষা আর আত্মিক টানে কোথায় যেন দুটি হৃদয় জুড়ে যাচ্ছিল .... 

কিন্তু আজ সাতদিন হলো সন্ধ্যা ঘাটে আসছে না ..... মকবুলের কাউকে জিজ্ঞাসা করার কোনো উপায় নেই .... হঠাৎ তার কানে কিছু কথা আসে ঘাটে দুজন বলাবলি করছে.... আজকাল কেউ নিজের জন এরম কাজ করে? ওই টুকু মেয়ে তার সাথে কিনা বাবার বয়সী একটা বুড়োর বিয়ে দিচ্ছে আর একজন বলল টাকার লোভে .....ওই বুড়ো কচি মেয়ে পেয়ে ওদের অনেক টাকা দিচ্ছে তো .... ছিঃছিঃ কি পাপ যে করছে .....

মকবুল স্থির হয়ে বসে আছে নৌকার ওপর .... সে ভাবতে পারছেনা আর কিছু .....

আরও কিছুদিন পরে ওই ঘাটে নৌকাতে সে বসে আছে একজন লোক এসে বলল ও মাঝি আজ আর অন্য লোকে তুলোনা ..... আমাদের একটু ছাতিমপুরে পৌঁছে দিতে হবে .... মকবুল বলতে যাচ্ছিল সে যাবে না কিন্তু তার আগেই লোকটা বলল নতুন বর বউ যাবে .... বকশিস পাবে .....

না বকশিসের লোভে নয় সন্ধ্যাম নি কে একবার দেখার জন্য সে না করল না....

হঠাৎ ঘাটে কোলাহল শোনা গেলো .... মকবুল দেখল সন্ধ্যামনি হাতে একটা পুটুলি নিয়ে সবার আগে নৌকায়ে এসে উঠল ..... মকবুল দেখে মেয়েটা কেঁদে কেঁদে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে .... তারও চেখে জল এসে গেলো .... সন্ধ্যা আস্তে করে বলল চলো এবারে জাহান্নামে আমাকে পৌঁছে দিয়ে এসো...... মকবুলের মনটা ডুকরে কেঁদে উঠল .... তার সেই বুড়ো বর আর দুচারজন এসে নৌকায় উঠল ....

মকবুল নৌকার মুখ ঘোরালো ..... অন্যদিন সে অনেক জোড়ে হাল চালায় কিন্তু আজ যেনো তার হাত চলছে না .... ছাতিম পুর এলো সবাই এক এক করে নামল শেষে সন্ধ্যা নামার আগে মকবুল বলল যদি কোনো দিন এই জাহান্নাম থেকে জান্নাতে যেতে মন হয় তাহলে আমাকে একটা খবর দিও ..... আমি এসে নিয়ে যাবো ....সন্ধ্যা মনির মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল এই কথা গুলো তার বেঁচে থাকার রসদ পেলো .... মকবুল ফিরে চলল...

তার চোখের সামনে বার বার সব ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল...

... ................. এখন শুধু অপেক্ষা ....................



Rate this content
Log in

More bengali story from POUSHALI KUNDU

Similar bengali story from Romance