হটাত দেখা
হটাত দেখা
সকাল ৮ টা। রোহিত অফিস এ যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে, এই এক রোজের ঘটনা, যতই ও সবকিছু টাইম এ করুক সময়টা প্রত্যেকদিনই ছলচাতুরি করে এগিয়ে যায়। রেডি হয়ে কোনমতে খেয়ে দেয়ে মাকে টাটা করে ছুটলো সে মেট্রো স্টেশন এর দিকে। মেট্রো স্টেশন এ পৌঁছতেই দেখে আজ ৮ঃ১৫ এর মেট্রো টা একটু হলেও দাঁড়িয়ে আছে বেশিক্ষণ, ঠাকুর ঠাকুর করে মেট্রোয় উঠে পড়ে রোহিত। মনে মনে ভাবছিল আজ কি কপাল করেই না বেরিয়েছে সে, হঠাৎ তার চোখ যায় একজনের দিকে। মুহূর্তরা যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল এক পলকে। মনে হলো প্রতিটা ঘড়ির কাঁটা একসাথে থেমে গিয়েছে ওই একটা সময়ের দোরগোড়ায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই পুরোনো সময়ের স্মৃতি। রুদ্রাণী বসে মেট্রোয় তার জীবনসঙ্গী ও তার ছেলে নিয়ে। হয়তো তাকে তখনও খেয়াল করেনি, তাই রোহিত একটু আড়াল হয়ে দাঁড়ায়। মনের মধ্যে ভেসে ওঠে পুরোনো সেই মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি। সময় কিভাবে পাল্টে যায় তাইনা, আজ যে তোমায় বলছে আমি তোমায় ছেড়ে কোথাও যাবো না সেই হয়তো আজ থেকে 4-5 বছর পর অন্য কারোর সাথে ঠিক মানিয়ে গুছিয়ে নেয়, কি সুন্দর তাই না। মাঝখানে রোহিতের মত ছেলে মেয়েরা থেকে যায় যারা নিজের অতীতের ঘোরই কাটিয়ে উঠতে হয়তো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়। সত্যি বলেছিল আলেকজান্ডার "সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ"।
রুদ্রাণীর সাথে রোহিতের পরিচয় বছর পাঁচেক আগে। ও পড়ত টেকনো ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি তে বিটেক নিয়ে আর রোহিত বিটেক নিয়ে পড়ত কল্যানী ইউনিভার্সিটি তে। ওদের পরিচয় হয় একটা সেমিনার এ। পরিচয় টাও হয় খুব অদ্ভুত ভাবে। রোহিত বরাবরই কম্পিউটার নিয়ে প্রবল ঝোঁক ছিল। যথারীতি কলেজ এ ওঠার পর ও পাইথন নিয়ে একটা কোর্স করে। যার জন্য রোহিতের পাইথনের উপর দখল টা ছিল খুব ভালো। সেমিনার এ রুদ্রানী পাইথন এর অনেক জায়গা ঠিক মত ধরতে পারেনি। ওকে ওর একটা বন্ধু বলে গিয়ে রোহিতের সাথে কথা বলতে। সেই সূত্রে রোহিতের সাথে পরিচয় হয় রুদ্রানীর। সেখান থেকেই হোয়াটসঅ্যাপ এ কথা বার্তা শুরু হয় ওদের। প্রথম দিকে পড়া ছাড়া অফ টপিক সেরম কথা হতো না। আস্তে আস্তে কথা এগোতে এগোতে তাদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গভীর হয়। প্রায়শই আস্তে আস্তে দেখা সাক্ষাৎ শুরু হয়। রোহিত বরাবর ই কারোর সাথে মিশতে একটু সময় নেয়, অত তাড়াতাড়ি পারে না কাউকে চট করে আপন করে নিতে। ওদিকে রুদ্রানির ক্ষেত্রে সেটা পুরো উলটো। ও খুব সুন্দর সবার সাথে মিশে যেতে পারে, রোহিত ওকে দেখে অবাক ই হতো যে এত তাড়াতাড়ি মিশতে পারে কি করে কেউ, না চিনে এত সুন্দর আপন করে নেওয়ার ব্যাপার টা ওর খুব ভালো লাগতো রুদ্রানীর মধ্যে। ধীরে ধীরে রোহিতের মধ্যে রূদ্রানীর জন্য এক অদ্ভুত ভালোলাগা জন্মাতে শুরু করে। যেন মনে হয় ওর যে রুদ্রানী বললে ও সারা জগৎ হাতের মুঠোয় করে নিতে পারবে। কিন্তু মনে ভয় একটা ছিলই। আগের দুজনের ক্ষেত্রেও তো এরম হয়েছিল এবারেও যদি তাদের মতো রুদ্রানী হয়, তখন? রোহিতের এর আগেও দুজন জীবনে এসেছিল, একজনের সাথে এতটাই ঘনিষ্ঠ বন্ধন হয়েছিল ওর, যে অন্য একটা ছেলের সাথে মেয়েটাকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ও নিজেকে সামলাতে পারেনি। ওর সবথেকে কাছের বন্ধু সম্যক ওকে জানায় এরম ঘটনা তার ই সাথে গিয়ে ও দেখে এই কাণ্ড। এখন সবাই বলে ছেলেরা নাকি কাঁদে না, আরে মশাই তারা কি মানুষ না নাকি? ওদেরও মন বলে একটা জিনিস থাকে, তাতে থাকে ছোট্ট ছোট্ট কিছু আশা, সেগুলোকেই যত্ন করে রক্ষা করে তারা নিজেকে খুশি রাখে। যখন সেই আশা চোখের সামনে ক্ষতবিক্ষত হয়, তখন আর নিজেকে ঠিক রাখা যায় না। ঠিক এটাই হয়েছিল রোহিতের ক্ষেত্রে। ওই দৃশ্য ও নিতে পারেনি। গোটা একটা বছর লেগেছিল ওর ঐ ঘোর কাটিয়ে উঠতে। সেই ভয়টা আবার পেল রুদ্রানীর ক্ষেত্রে। কিন্তু সত্যি বলতে মন জিনিসটা এতটা বেহায়া, বার বার একই নদীর জলে ঘুরে ফিরে ডুব দেয়, ওই যে মানুষ ভালবাসার কাঙাল, রোহিত ও তার মধ্যেই পড়ে। তাই তখন মাথা এক কথা বললেও মন বলল আরো একবার ভালবাসার আগুনে জ্বলে পুড়ে যাওয়া যাক। ওই যে হিন্দি সিনেমার একটা সেই ডায়ালগ আছে না যেখানে মেয়েটা বলে "মেরে ইতনি ভি করিব মত আও মাইন তুমহে বরবাদ কর দুঙ্গি, আর প্রত্যুত্তরে ছেলেটা বলে "মেইন বরবাদ হোনা চাহতা হু" মনের ক্ষেত্রেও সেরকমই অনেকটা হয় কাহিনী। সব কিছু জেনে বুঝেও সেই আগুনের দিকেই হেঁটে যায়। রোহিত ও মনের কথা শুনে একদিন রুদ্রানীর জন্মদিনে সম্যকের সাথে সব প্ল্যান করে ওকে একটা ক্যাফে তে সবার সামনে প্রপোজ করে রোহিত। রুদ্রানীও এক্সেপ্ট করে ওর প্রপোসাল। প্রথম প্রথম দিন গুলো যেন ছবির মত কাটছিল। রুদ্রানীর দিক থেকেও একদম সমান চেষ্টা পেতো ও। রোহিত ভেবেছিল ওকেই ও সসম্মানে তার জীবনসঙ্গিনী করে রাখবে। দুজনের হবে এক সুন্দর সুখের সংসার। কিন্তু সময় না বড্ড বেদনাদায়ক। ভালো সময় যেন থাকতেই চায় না বেশিদিন।
ওদের রিলেশন এর দেড় বছর বেশ সুন্দর কাটলো। সবথেকে বড় ব্যাপার রোহিত প্রচণ্ড মানিয়ে নিতে পারত। যেটা রুদ্রানীর পছন্দ নয় সেই জিনিস দ্বিতীয় বার কোনোদিন করত না রোহিত। ছবি তুলতে খুব ভালবাসতো রুদ্রানী। তাই রোহিত নিজের টাকা জমিয়ে ওর জন্য একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনেছিল শুধু ওর মুখের ওই হাসিটার জন্য। বিভিন্ন উৎসব এ ঘুরতে যাওয়া সময় বের করে প্রিন্সেপ ঘাট থেকে রবীন্দ্র সরোবর, দিন গুলো যেন সোনালী যুগের চলচ্চিত্রের মতো কাটছিল। রোহিত আবার চলচ্চিত্রের বিশাল বড় ভক্ত। ও ভালবেসে ওকে সুচিত্রা বলে ডাকতো। রুদ্রানী ওকে ভালবেসে উত্তম ডাকতো। ঠিক যেন সেই উওম সুচিত্রা জুটি। কিন্তু এই খুশি আর দীর্ঘস্থায়ী হলো না। আর পাঁচ মাসের মধ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটলো যে ওদের এত সুন্দর ভালবাসায় পড়লো এক কষ্টের যবনিকা।
রুদ্রানীর একটা ছেলে বেস্টফ্রেন্ড ছিল। রোহিতের তাতে কোনোদিন কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ ওর একটাই দাবি বন্ধুরা সব সময় আগে, ওরাই সবসময় পাশে থাকে সবার আগে। তাই ওর তাতে কোনো আপত্তি ছিল না। তখন কে জানত এই বেস্টফ্রেন্ডই হবে এই সম্পর্কের বিনাশকর্তা। ছেলেটার নাম সমর। একবছরের মাথায় পরিচয় হয়েছিল রোহিতের ওর সাথে রুদ্রানীর একটা বন্ধুর পার্টিতে। ওর বেশ ভালই লেগেছিল ওকে। এবং এর জন্য রোহিত বলেছিল এরম বেস্টফ্রেন্ড পাওয়া বিশাল ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু আসল ঘটনা শুরু হয় দুই বছর হবার কিছুদিন আগের দিয়ে। রুদ্রানী প্রতিদিনই একটা টাইম বার করে রাখতো রোহিতের সাথে কথা বলার জন্য। আর হোয়াটসঅ্যাপ এ সব সময় একটা দুটো মেসেজ করে হলেও জিজ্ঞেস করত যে রোহিত কি করছে কোথায় আছে। কিন্তু দিন সাতেক হলো সেরম ভাবে কথা বলা তো দূর ওই সেপারেট টাইম এ ফোন টাও রুদ্রানী করছে না। জিজ্ঞেস করলেই বলছে একটু চাপ এ আছি অথচ এদিকে প্রায় ই ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ এ অন্ হয়ে বসে থাকতো। একদিন ওই টাইম এ রোহিত ওকে ফোন করে দেখে ওর ফোন ব্যস্ত। "একি ও তো আমাদের টাইম টায় কারোর কল অ্যাটেন্ড করে না, সে যেই হোক একসেপ্ট মা বা বাবা" আজ হঠাৎ এক ঘন্টা ধরে কি এত কথা বলছে! রোহিত তবুও সন্দেহ করে নি। ভেবেছে সত্যি হয়তো কিছু মুশকিল হয়েছে। কিন্তু এই করে করে কেটে যায় দুটো মাস। কিন্তু রুদ্রানীর চাপ আর কমে না। এবার ধীরে ধীরে সন্দেহ জাগে রোহিতের মনে। আরো প্রগাঢ় হয় সেটা যখন সে ফেসবুক এ ওর বেস্টফ্রেন্ড এর সাথে ছবি দেখে। ও এই দুটো মাস দেখা করা তো দূর, দেখা করার কথা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেনি, যেখানে ও প্রতি মাসে অন্তত দুবার হলেও দেখা করে। রোহিত ভাবে সম্যকের সাথে এবার একটু কথা বলবে। সম্যক এর একটা দুর্দান্ত ট্যালেন্ট হলো ও হলো বাংলার জেমস বন্ড। কার কোথায় কি ব্যাপার কি চক্কর চলছে সব খবর ও ঠিক ই খবর পেয়ে যেত। সম্যক কে বলতে ও বলল রোহিত কে "সাত দিন সময় দে আমি দেখছি"। সাত দিন পর রোহিত সকালে উঠে দেখে সম্যক এর টেক্সট " আজ বিকেল চার টা রবীন্দ্র সরোবর নজরুল মঞ্চের গেট টা দিয়ে ঢুকবি , দেরি করবি না কথা আছে খুব দরকারী।" রোহিত ভাবে "বাপরে কি এমন দরকার ও তো এরম ভাবে ডাকে না কোনোদিনও" রোহিত ডট পাঁচটায় চলে যায়। দেখে সম্যক দাঁড়িয়ে। ওর মত টাইম পানকচুয়াল ছেলে আর দুটো হয় না। যাই হোক সম্যক ওকে দেখে বলল " চ তোকে একটা জিনিস দেখাই" দিয়ে ও রোহিত কে নিয়ে যায় ভেতরে। কিছুটা চলার পর ও দেখলো রুদ্রানী, একি রুদ্রানী এখানে কি করছে? সাথে ওর সেই বেস্টফ্রেন্ড সমর। সমরের কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে আছে রুদ্রানী। তার কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটলো সেই হৃদয় বিদারক ঘটনা। সমরের ঠোঁট মিশে গেলো রুদ্রানীর ঠোঁটের সাথে। রোহিত পুরো এক মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেলো। মনের মধ্যে যেন দাঙ্গা বেঁধে গেছে,ওর মনে হচ্ছে পায়ের তলার মাটি যেন হঠাৎ সরে গেল। মনে হলো এই দৃশ্য দেখার আগে ও অন্ধ কেন হয়ে গেল না? ও ওখান থেকে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে গেল। বাসের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল গিয়ে এই ভেবে যে আর থেকে কি লাভ। সম্যক গিয়ে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলে "তুই পাগল হয়েছিস, এই তুই ছেলে সুইসাইড সব সমস্যার সমাধান নাকি, চল বাড়ী যাবি......."
কিছু কিছু মুহুর্ত আমাদের মধ্যে এমন একটা বিভেদের রাজপ্রাসাদ তুলে দেয় যে তা ভাঙতে যুগ লেগে যায়। ভালোর মধ্যেও খারাপের এই জঘন্য আহ্লাদের গণ্ডিতে মাঝে মাঝে মন বেহায়া হয়ে যায়, বুঝতে পারে না উত্তাল ঢেউ কোন দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তীরে উন্মুক্ত সেই ফাকা তরীটিকে, ভারাক্রান্ত মন তখন ইচ্ছের এপিটাফ গুলো মুছে দিতে চায় কিন্তু পারে না। সেই অদ্ভুত ইন্দ্রজালে জড়িয়ে থাকে সবসময়, অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ায় সেই আলোর কিরণ যা খুঁজতে খুঁজতে এক অদ্ভুত ভুলভুলাইয়া তে আটকা পড়ে যায়, জানি না কোনোদিন তার থেকে রেহাই পাওয়া যায় নাকি, তবে বৃষ্টির একটা ফোঁটা যেমন গোটা দেহকে ভিজিয়ে দিতে পারে না তেমনি একটা ছোট্ট ঘটনা কি জীবনের সেই চক্ররেল কে আটকাতে পারে, তবে হ্যা একটা দাগ কিন্তু থেকেই যায়, খুব গাঢ় না হলেও মাঝে মাঝে খেয়াল এলে কষ্ট হয়, রোহিতের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল। বেপরোয়া হয়ে গেছিল কিচ্ছু ভালো লাগতো না, মদপান সিগারেট থেকে একশত মাইল দূরে থাকা ছেলেটা আজ তিন টে সিগারেট না খেলে ঠিক থাকতে পারে না। জীবনে সবথেকে কষ্টের জিনিস কি জানত, মার থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে অন্ধকারে কান্না করা, রোহিত প্রতিদিন রাতে কষ্ট পেতো, কাঁদত আর ভাবতো যাকে ভেবেছিল নিজের রানি করবে সে কিনা আজ অন্যের গল্পের আসল চরিত্র হবে, কেন তখন বুঝলাম না কেন আবার সেই ফাঁদে পা দিলাম এই ভেবে কাঁদতে থাকে.......
"পরবর্তী স্টেশন রবীন্দ্র সরোবর, দরজা খুলবে ডানদিকে" মেট্রোর ঘোষকের কন্ঠে ঘোর কাটে রোহিতের। নামতে হবে। রুদ্রানী তার জীবনসঙ্গীকে নিয়ে নেমে গেলো অন্য গেট দিয়ে। রোহিত আর সে খেয়াল করেনি। দুজনেই দুদিক দিয়ে বেরিয়ে অগুন্তি লোকের ভিড়ে মিশে যায়। সব প্রেমে আবেগঘন সমাপ্তি ঘটে না, কিছু কিছু কাহিনী এই ভাবেই শেষ হয় আর সেই কাহিনীর ট্রাজিক হিরো হিসেবে থেকে যায় রোহিতের মতো ছেলে মেয়েরা।।

