একাকী
একাকী
রমেন মুখার্জি এখন পচাত্তরের কোঠায়। চোখে চশমা, মাথার চুল সাদা হয়ে গেছে, পায়ের ভরসা একটা লাঠি। ছোট্ট এই একতলা বাড়িতে সে এখন একা থাকে। বাড়িটার নাম ‘শান্তিকুঞ্জ’। নামটা রেখেছিলেন তার স্ত্রী সাধনা, অনেক বছর আগে।
সাধনা এখন নেই,তিন বছর হল উনি মারা গেছেন।
ছেলে কৌশিক থাকে কানাডায়। প্রথমদিকে ফোন আসত, মাসে দু-তিনবার। এখন শুধু হোয়াটসঅ্যাপে মাঝেমধ্যে মেসেজ পাঠায়—“বাবা কেমন আছো?” রমেন ও ছেলের মেসেজে উত্তর দেন—“ভালো আছি রে।” অথচ কতবার বলতে চেয়েছেন, ভালো নেই, খুব একা লাগে। কিন্তু পারেন না। বাবা মানে শক্ত—এটাই তো সে শিখিয়েছে ছোটো থেকে ছেলেকে।
প্রতিদিন ভোর ৬ টায় রমেন হাঁটতে বের হন। আশেপাশের কিছু মানুষ তাকে চেনে, কেউ কেউ নমস্কার করে। কিন্তু সেসব পরিচয় নাম-ধামহীন, সম্পর্কবিহীন। কেউ জিজ্ঞাসা করে না, "আজ দুপুরে খেয়েছেন তো?" কিংবা "আজ একটু কম হাঁটলেন কেন?"
বাড়ি ফিরে এসে তিনি চা এককাপ বানান এককাপ। আগে বানাতেন দু'কাপ।মর্নিং ওয়াক থেকে এসে চায়ের জল বসিয়ে স্ত্রীকে ঘুম থেকে ডাকতেন ।কিন্তু এখন স্ত্রী নেই তাই এক কাপ চা আর খবরের কাগজটা হাতে বারান্দায় বসে থাকেন। পাখি দেখে, গাছ দেখে, ছেলেবেলার স্মৃতি মনে পড়ে। মাঝে মাঝে স্ত্রীয়ের ছবি নিয়ে কথা একা একা
বলেন—“আজ দোতলার ছেলেটা খুব চেঁচামেচি করছিল, তুমি থাকলে নিশ্চয়ই বকতে…” তারপর হঠাৎ থেমে যান।
রাতগুলো সবচেয়ে কঠিন। টিভির শব্দে নিঃসঙ্গতা একটু চাপা পড়ে, কিন্তু একসময় সেটাও থেমে যায়। ঘরের নিস্তব্ধতা কানে কানে বলে—“তুমি একা।” ঘুম আসে না, পুরোনো অ্যালবাম খুলে দেখেন—ছোট কৌশিকের ছবি, স্ত্রীয়ের শাড়ি পরা হাসি মুখ। হাত বুলিয়ে বলেন, “ভুলে যাস না আমাদের, বাবারা খুব একা হয় রে...”
একদিন সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ বারান্দায় এক ছোট ছেলেকে খেলতে দেখে রমেন হাঁক দেন, “এই শুনো, নাম কী তোমার?”
ছেলেটা বলল, “জ্যাঠা আমি নীরব। আমি পাশের বাড়িতে থাকি।এই এক সপ্তাহ হল এখানে এসেছি ”
তারপর থেকে নীরব মাঝে মাঝে আসে। গল্প করে, আঁকা দেখায়, রমেন বাবুর সঙ্গে ক্যারাম খেলে।
নীরব একদিন ক্যারাম খেলতে খেলতেবলে,
“তোমার তো কেউনেই?”
রমেন একটু হেসে বলে ওঠেন “না, ছিল একসময়। এখন আছি আমি আর আমার গল্পগুলো।”
নীরব চুপ করে থাকে, তারপর হঠাৎ বলে ওঠে , “তাহলে আমি তোমার গল্প শুনব।”
সেইদিন রাতে বহুদিন পর রমেন ঘুমিয়ে পড়েন এক টুকরো শান্তি নিয়ে।রমেন জানেন, বয়স যতই হোক, একাকীত্ব একটা অভ্যাসের মতো। কিন্তু কোনো এক চুপচাপ বিকেলে, যদি কারও শিশুমুখে আবার একটু আলো পড়ে—তাহলে নিঃসঙ্গতার দেয়ালে একটু চিড় ধরেই।
