Siddhartha Singha

Inspirational


3  

Siddhartha Singha

Inspirational


ধর্ম-অধর্ম

ধর্ম-অধর্ম

10 mins 643 10 mins 643

সক্কালবেলায় নিখিল এসে বলল, কীগো জগবন্ধুদা, এখন কেমন আছ? জ্বর ছেড়েছে? 

জগবন্ধু পিঠের তলায় বালিশ গুঁজে আধশোয়া অবস্থায় বললেন, তা ছেড়েছে। তবে একদম কাহিল হয়ে গেছি রে। গায়ে কোনও জোরই পাচ্ছি না। একদিনের জ্বরেই কেমন যেন কাবু করে দিয়েছে। তা, কাল কি গিয়েছিলি? 

— যাব না? উফ্, কাল যা হল! আমার মনে হয়, এর পর কোথাও কোনও অনুষ্ঠান করার আগে, কাকে কাকে আমন্ত্রণ জানাবেন, তার তালিকা তৈরি করার সময় এই সংগঠনের উদ্যোক্তারা অন্তত হাজার একবার ভাববেন। শুধু ভাববেনই না, তাঁদের ঠিকুজি-কুষ্ঠি জেনে, তবেই আমন্ত্রণ পাঠাবেন। 

— কেন রে? কাল আবার কী হল? জগবন্ধু উৎসুক হয়ে জানতে চাইলেন ব্যাপারটা।


দিন কতক আগেই প্রাণোপ্রিয়া মহারাজের চিঠি পেয়েছিলেন জগবন্ধু। প্রাণোপ্রিয়া তাঁর খুব ছোটবেলাকার বন্ধু। এখন ভোল পাল্টে সবার কাছে প্রাণোপ্রিয়া মহারাজ হয়ে উঠলেও, ওঁর আসল নাম ছিল প্রাণগোপাল নন্দী। মাঝখানে বহু দিন কোনও যোগাযোগ ছিল না। তবে মাঝে মাঝেই এর তার কাছে খবর পেতেন, উনি এখন গোটা পৃথিবী ঘুরে ঘুরে প্রাণীহত্যার বিরুদ্ধে জোরদার প্রচার চালাচ্ছেন। যখন তখন উড়ে যাচ্ছেন আমেরিকা, চিন, জাপান, ইংল্যান্ড। ধন্য ধন্য পড়ে যাচ্ছে চারিদিকে। যেখানেই উনি বক্তৃতা দিতে যাচ্ছেন, সেখানেই ওঁর কথা শুনে শ্রোতারা নাকি এতটাই মোহিত হয়ে যাচ্ছেন যে, আমিষ ছাড়া যাঁদের মুখে এত দিন কিছুই রুচত না, তাঁরাও সে সব ছেড়েছুড়ে ঘাসপাতা খেতে শুরু করে দিচ্ছেন। 

জগবন্ধু এ সব যত শোনেন, ততই অবাক হন। কারণ, প্রাণগোপালকে উনি খুব ভাল করেই চেনেন। তাঁর মনে পড়ে যায়, সেই সব দিনের কথা। 

তখনও ওঁরা হায়ার সেকেন্ডারি দেননি। এই প্রাণগোপালই একবার কালীপুজোর আগের রাতে, যেখানে ওঁরা আড্ডা মারতেন, সেই পোড়ো শিবমন্দিরে বড় একটা মুখ-বন্ধ চটের ব্যাগ নিয়ে এসে হাজির। ব্যাগের ভিতরে কী যেন খানিক বাদে-বাদেই ছটফট করছিল। জিজ্ঞেস করতেই উনি বলেছিলেন, পাশের পাড়ার অবনীদা বাড়ি ছিলেন না। সেই সুযোগে পাইপ বেয়ে তাঁর বাড়ির ছাদে উঠে খোপ খোপ করা কাঠের পেটির ছিটকিনি খুলে তাঁর পোষা কতগুলো পায়রাকে চুরি করে নিয়ে এসেছি। আজ রাতে আমরা সবাই মিলে এগুলো রান্না করে খাব। 

কিন্তু কাটবে কে? বলতেই, উনি বলেছিলেন, এগুলো আবার কাটার কী আছে? আমি তো আছি। 

সেই রাত্রেই ওই পায়রাগুলোর ঘাড় মটকে, ছাল ছাড়িয়ে ছোট ছোট পিস করে উনিই কেটে দিয়েছিলেন। কেউ কেউ হাত লাগালেও মূলত রান্নাটা উনি একাই করেছিলেন। সে দিন এত আনন্দ হয়েছিল যে, সেই রাতের চড়ুইভাতির কথা এখনও ভোলেননি তিনি। 

আর একবার, মূলত ওঁরই পাল্লায় পড়ে কয়েক জন বন্ধু মিলে ‘আমরা বড় হয়ে গেছি’ প্রমাণ করার জন্য শুধু সিগারেট ফুঁকেই ওঁরা ক্ষান্ত হননি, এর ওর পকেট হাতড়ে যা জোগাড় হয়েছিল, তাই দিয়েই কয়েক ক্রোশ দূরের হাইওয়ের ধারের একটা পাতি হোটেলে ঢুকে ‘আমরা ও সব জাত-পাত মানি না’ জাহির করার জন্য ঘটা করে হাতরুটি আর গরুর মাংস খেয়েছিলেন। 

দিনের পর দিন রং-বেরংয়ের প্রজাপতি ধরে একটা বড় কাচের বয়ামে ভরে রাখতেন প্রাণগোপাল। এবং দিন কতক পরে ওগুলো মরে গেলে, সেগুলি ফেলে দিয়ে ফের প্রজাপতি ধরে, মরে যাবে জেনেও সেই বয়ামে ভরে রাখতেন। 

যিনি এই রকম একের পর এক কাণ্ড ঘটিয়েছেন, সেই প্রাণগোপালই কিনা এখন প্রাণীহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন! আর তাঁর কথা শোনার জন্য পড়াশোনা জানা সমাজের বিদগ্ধ লোকেরা সেখানে গিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন! কী হল কী দেশটার! 

তাঁর ছেলেবেলাকার বন্ধু সেই প্রাণগোপাল, থুড়ি, প্রাণোপ্রিয়া মহারাজ, বলতে গেলে গোটা পৃথিবী জয় করে দিন কতক আগে দেশে ফিরেছেন। ফিরেছেন এই কলকাতায়। জীবনে সে ভাবে কিছুই করতে পারেননি উনি। না-ছিলেন লেখাপড়ায় ভাল, না-জোটাতে পেরেছিলেন ভদ্রস্থ কোনও চাকরি। তার পর হঠাৎ করেই কোথা থেকে যে কী হল, কাউকে কিছু না জানিয়েই হুট করে উধাও হয়ে গেলেন উনি। 

লোকমুখে জগবন্ধু শুনেছিলেন, উনি নাকি মাঝে মধ্যেই দেশে ফেরেন। দু’-চার দিন থাকেনও। তার পরেই আবার পাড়ি দেন ভিনদেশে। গোটা বিশ্ব জুড়েই নাকি তাঁর ভক্ত ছড়িয়ে আছে। তা, এত দিন পরে দেশে ফিরে ওঁর বুঝি তাঁর কথা মনে পড়েছে, তাই ঠিকানা জোগাড় করে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু আগের রাত থেকেই প্রচণ্ড জ্বর হওয়ায় উনি আর যেতে পারেননি। 

কিন্তু যেহেতু প্রত্যেকের নামে নামে আসন-সংরক্ষিত করা, তাই উনি আমন্ত্রণপত্রটা নষ্ট করতে চাননি। দিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর অত্যন্ত স্নেহভাজন এই নিখিলকে।


কার্ডে উল্লেখিত অনুরোধ অনুযায়ী অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক পনেরো মিনিট আগেই প্রেক্ষাগৃহে ঢুকে পড়েছিল নিখিল। ঢুকেই বুঝেছিল, আমন্ত্রণপত্রের অনুরোধ শুধু সে-ই নয়, তার মতো সকলেই মেনেছেন। এবং আমন্ত্রণপত্রের নির্দেশ অনুসারে কেউই বারো বছরের নীচের কোনও বাচ্চাকে সঙ্গে করে আনেননি। আর, যাঁরা এসেছেন, তাঁরা সম্ভবত সোজা বাড়ি থেকেই এসেছেন। একেবারে ধোপদুরস্থ পোশাকে। এবং যাঁরা এসেছেন, তাঁরা কেউই এলিতেলি কেউ নন, প্রত্যেকেই জ্ঞানীগুনী, সমাজের বিশিষ্ঠ এক-একজন কেউকেটা। গোটা প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে অদ্ভুত এক সুগন্ধি ম ম করছে। ফুলে ফুলে সাজানো চারিদিক। 

ঠিক ছ’টায় প্রেক্ষাগৃহের সমস্ত আলো নিভে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের পর্দাও উঠে গেল। মঞ্চে তখন কারুকাজ করা রাজসিক সিংহাসনে ধ্যনমগ্ন হয়ে বসে আছেন— প্রাণোপ্রিয়া মহারাজ। 

তাঁকে দেখেই সবাই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। উঠে দাঁড়াল নিখিলও। কিন্তু না। কাউকেই এক মুহূর্তের বেশি দাঁড়াতে হল না। মহারাজের হাতের ইশারায় সবাই যে যাঁর আসনে বসে পড়লেন।

নেপথ্যে শুরু হল জলদগম্ভীর গলায় স্তোত্রপাঠ। তার পর মহারাজকে মাল্যদান। চন্দন পরানো। উত্তরীয় পরানোর পালা। পাশাপাশি তিন মন্ত্রী এবং পাঁচ জন মাল্টি মিলিওনিয়ার ব্যবসায়ীকে প্রধান অতিথি হিসেবে মঞ্চে ডেকে বরণও করে নেওয়া হল। তাঁদের মধ্যে থেকেই দু’-চার জন সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিলেন। যার মূল বক্তব্য—প্রাণোপ্রিয়া মহারাজ কত বড় মাপের মানুষ। তাঁর উদ্দেশ্য কত মহৎ এবং তিনিই যে স্বয়ং ঈশ্বরের দূত, তা কী ভাবে বারবার প্রমাণিত হয়েছে… ইত্যাদি ইত্যাদি। 

অবশেষে শুরু হল মূল অনুষ্ঠান। প্রাণোপ্রিয়া মহারাজের ভাষণ। উনি বলতে লাগলেন— প্রাণীহত্যা মহাপাপ। কেউ কখনও ভুল করেও প্রাণীহত্যা করবেন না। কারণ, এই পৃথিবীতে আপনার যেমন বেঁচে থাকার অধিকার আছে, একটা ক্ষুদ্র-অতিক্ষুদ্র প্রাণীরও সমান অধিকার আছে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার। দেখবেন, বন্যা বা দুর্যোগের সময় চারিদিক যখন জলের তলায়, তখন একই গাছের ডালে বিষাক্ত সাপ আর নিরীহ মানুষ কী সুন্দর পাশাপাশি অবস্থান করে। কেউ কাউকে উত্যক্ত করে না। ওই ভাবে থাকুন না… না। কেউ কাউকে হত্যা করবেন না। দুর্বল দেখে আপনি যদি কোনও প্রাণীকে হত্যা করেন, তা হলে আপনার চেয়ে শক্তিশালী কোনও প্রাণী এসে কিন্তু আপনাকে হত্যা করবে। সুতরাং নো প্রাণীহত্যা। না। মাছ খাবেন না। মাংস খাবেন না... 

ঘোষক আগেই বলে দিয়েছিলেন, মহারাজের বক্তব্যের পরে যদি কারও মনে কোনও প্রশ্ন উঁকি মারে, তা হলে তিনি সেটা সরাসরি মহারাজকে করতে পারবেন। কিন্তু তাঁর ভাষণ শেষ হওয়ার আগেই অতি উৎসাহী এক শ্রোতা অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহ থেকেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, মাছ খাব না! মাংস খাব না! তা হলে খাব কী? 

এতক্ষণ গোটা প্রেক্ষাগৃহ নিশ্চুপ ছিল। এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চুপ হয়ে গেলেন প্রাণোপ্রিয়া মহারাজও। কয়েক মুহূর্তমাত্র। তার পরেই উনি বললেন, কে বললেন? উঠে দাঁড়ান। 

উনি এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই গোটা প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে একটা হালকা আলো ছড়িয়ে পড়ল। সেই আলোয় চোখ ঘোরাতেই নিখিল দেখল, মাঝামাঝি রো-য়ের একটি সিটের সামনে একজন দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু ওরই নয়, সবার চোখই তখন তাঁর দিকে। কারণ, একটা তীব্র আলোর গোলক তাঁর উপরে পরে আর পাঁচ জন থেকে তাঁকে আলাদা করে দিয়েছে। আর তাতেই, প্রশ্নটা যে উনিই করেছেন এবং মহারাজ যে তাঁকেই উঠে দাঁড়াতে বলেছেন, সেটা বুঝতে কারওরই কোনও অসুবিধে হল না। 

মহারাজ বললেন, ওকে মাইক্রোফোন দাও। 

কেউ এতক্ষণ খেয়ালই করেননি, গোটা প্রেক্ষাগৃহ জুড়েই চার-ছ’টা রোয়ের পর পরই কডলেস মাইক্রোফোন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন উদ্যোক্তাদের লোকেরা। তাঁদেরই একজন তড়িঘড়ি করে তাঁর দিকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিলেন। 

মহারাজ বললেন, বলুন, কী বলছেন… 

অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে ‘কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না’ ভেবে অনেক কিছুই বলা যায়। কিন্তু আলো ঝলমল প্রেক্ষাগৃহে, কানায় কানায় ভর্তি প্রেক্ষাগৃহে, বিশিষ্ঠ জ্ঞানীগুণিজনদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে যাওয়াটা যে কত কঠিন কাজ, সেটা বোধহয় এই প্রথম বুঝতে পারলেন উনি। তবু মহারাজ বলেছেন দেখে, বারকতক ঢোক গিলে, নিজেকে একটু সামলে নিয়ে লোকটি বললেন, না... বলছিলাম... মাছ মাংস যদি না খাই, তা হলে খাব কী? 

মহারাজ বললেন, কেন? মাছ মাংস ছাড়া কি আর কিছু খাবার নেই? ফল মূল আনাজপত্র... ও সব খান... বলতে বলতে উনি ধর্মের দিকে চলে গেলেন। বললেন, আমাদের ধর্ম বলেছে, জীব হত্যা মহাপাপ। জীব মানে প্রাণী। প্রাণী মানে কিন্তু শুধু মানুষ নয়, গরু, ছাগল, ভেড়াও নয়, এমনকী আরশোলা, টিকটিকিও নয়, মনে রাখবেন, প্রাণী মানে যার প্রাণ আছে, সে-ই প্রাণী। অর্থাৎ, একটা পিঁপড়েও কিন্তু প্রাণী। সুতরাং আইনে না বললেও, আমাদের ধর্ম কিন্তু বলেছে, একটা মানুষকে খুন করলে যে পাপ হয়, একটা পিঁপড়েকে খুন করলেও সেই একই পাপ হয়। তা হলে আপনারাই বলুন, অন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র নিজেদের পেট ভরানোর জন্য আপনারা কি সেই পাপ করবেন? না, আমাদের ধর্ম মেনে নিরামিষ খাবেন? 

উনি আরও অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু প্রাণোপ্রিয়া মহারাজের কথা শুনে লোকটা দমে গেলেও নিখিল আর স্থির থাকতে পারল না। উসখুস করতে লাগল। আর এত লোকের মধ্যেও সেটা নজর কাড়ল মহারাজের। তাই তাকে ও রকম করতে দেখে মহারাজ প্রশ্ন করলেন, আপনি কি কিছু বললেন? 

নিখিল আশপাশে তাকাতে লাগল। কাকে বলছেন এ কথা! 

ঠিক তখনই মহারাজ বললেন, আপনি আপনি, আপনাকে বলছি। আপনি কি কিছু বলবেন? 

সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল নিখিল। দাঁড়ানো মাত্র সেই তীব্র আলোর গোলকটা ওই লোকটার উপর থেকে ঝট করে তার মুখের উপরে এসে পড়ল। এতক্ষণে হালকা আলোয় চোখটা অনেকখানিই সয়ে এসেছিল। অল্প আলোতেও সব কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল সে। কিন্তু হঠাৎ করে তীব্র আলোর গোলকটা তার চোখে এসে পড়তেই আশপাশের সব কিছুই কী রকম যেন অন্ধকার হয়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কে যেন তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন একটা মাইক্রোফোন। সেটা মুখের সামনে নিয়ে নিখিল সরাসরি প্রাণোপ্রিয়া মহারাজের দিকে তাকিয়ে বলল, আমাদের ধর্ম মানে কোন ধর্ম? 

— আমাদের ধর্ম তো একটাই— হিন্দুধর্ম। 

— ওটা কোনও ধর্মই নয়। 

— হিন্দুধর্ম কোনও ধর্মই নয়! মহারাজের বুকের ভিতর থেকে বিস্ময়ভরা শব্দটা বেরিয়ে আসতেই দর্শকদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। নিখিলের কানে ভেসে এল টুকরো টুকরো নানা মন্তব্য। কেউ বললেন, লোকটা কে? কেউ বললেন, কে আমন্ত্রণ জানিয়েছে একে? কেউ আবার বললেন, ইডিয়েট না কি? 

তবু তারই মধ্যে নিখিল দৃঢ়স্বরে বলল, না। শুধু হিন্দু কেন? ধর্ম বলে গোটা পৃথিবীতে যা প্রচলিত আছে, সেগুলির কোনওটাই ধর্ম নয়। 

হলের মধ্যে গুঞ্জন আরও বাড়তে লাগল। পিছনের লোকেরা মাথা তুলে, উঁকিঝুঁকি মেরে তাকে যেমন দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন, তেমনি সামনের দিকে যাঁরা বসে ছিলেন, তাঁরাও সিটে বসেই যতটা পারা যায় শরীরটা বেঁকিয়ে তাকে দেখার জন্য হাঁকপাক করতে লাগলেন। তাঁদের কারও কারও চোখে তখন অপার বিস্ময়— উজবুকটা কে! 

আশপাশের লোকেরা তার কথায় বিরক্ত হচ্ছেন বুঝতে পেরেও এতটুকুও দমল না নিখিল। উল্টে মহারাজের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল সে, ধর্ম বলতে আপনি কী বোঝেন? 

খুব ধীরস্থির ভঙ্গিতে মহারাজ বললেন, ধর্ম মানে, ধৃ যুক্ত মন। মানে, যা ধারণ করে, সেটাই ধর্ম। ধর্মের মূল কথাই হল, সত্য কথা বলো। মানুষকে ভালবাসো। পরের উপকার করো। বাবা মা-কে শ্রদ্ধা করো। গুরুকে ভক্তি করো। গরিবদের সাহায্য করো। রোগীদের সেবা করো। মেয়েদের মায়ের মতো দেখো। এবং ক্ষমা করো। অর্থাৎ মূল কথা হল— ভাল হতে গেলে একটা মানুষের মধ্যে যে যে গুণ থাকা দরকার, সেটাই ধর্ম। আর হ্যাঁ, এটা শুধু আমাদের ধর্মেরই নয়, পৃথিবীতে যত ধর্ম আছে, সব ধর্মেরই মূল কথা হল এটা। মানে, মানুষকে যা সঠিক পথে নিয়ে যায়, শান্তি দেয়, ভাল রাখে, সেটাই ধর্ম। 

নিখিল বলল, আমার মনে হয়, আপনি যা বললেন, সেটা শুধু যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিছক একটা কেতাবি বুলিমাত্র। এটা কোনও ধর্ম নয়। ধর্ম সম্পর্কে বহু ব্যবহৃত একটা ব্যাখ্যা মাত্র। আসলে, ধর্ম কী জানেন? 

এটা জি়জ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে যিনি ওর দিকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ওই রো-য়ের একেবারে ধার ঘেষে যতটা পারা যায় ঝুঁকে মাইক্রোফোনটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। সেটা দেখে মহারাজ বললেন, নিয়ো না। নিয়ো না। ওকে বলতে দাও। 

কিন্তু মহারাজ বললে কী হবে, উদ্যোক্তাদের একজন ততক্ষণে মঞ্চে উঠে নিখিলের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করে দিয়েছেন, আপনি কি জানেন, আপনি কার সঙ্গে কথা বলছেন? গোটা বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি ভক্ত ছড়িয়ে আছে এনার। ইনি গোটা পৃথিবী অন্তত একশো বার ঘুরেছেন। ধর্ম নিয়ে প্রচার করেছেন। আর আপনি তাঁকে প্রশ্ন করছেন, ধর্ম কী জানেন! আপনার কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে? 

হাতের ইশারায় তাঁকে থামতে বলে নিখিলের উদ্দেশ্যে মহারাজ বললেন, বলুন, আপনার কাছেই শুনি, ধর্ম কী... 

নিখিল বলতে শুরু করল, প্রত্যেকের ধর্মই আলাদা। 

— প্রত্যেকের ধর্মই আলাদা! অবাক হয়ে এ দিকে ও দিকে তাকাতে লাগলেন মহারাজ। প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে আবারও গুঞ্জন শুরু হল। কেউ কেউ বুঝি ফিক করে হেসেও ফেললেন। 

তবু নিখিল বলল, হ্যাঁ। আলাদা। যেমন জলের ধর্ম নীচের দিকে নামা। আগুনের ধর্ম পোড়ানো। আর জীব জগতের ধর্ম হল— খাদ্য এবং খাদকের। 

— মানে? 

— মানে একটাই, বড় জিনিস সব সময় ছোট জিনিসকে খাবে। এটাই ধর্ম। এত দিন ধরে যেটা হয়ে এসেছে, সেটাই স্বাভাবিক। এর ব্যাতিক্রম হলেই সর্বনাশ। বিপর্যয় নেমে আসবে ধরাধামে। ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। আর তাতেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। 

মহারাজ এ বার একটু গলা চড়ালেন, তা বলে, আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব, মানুষ হয়ে জন্মেও মানব ধর্ম পালন করব না? 

— কেন করবেন না? করুন। যিনি যেমন তিনি তেমন ধর্ম পালন করুন। 

— কে ঠিক করবে, কার কী ধর্ম? 

— ঠিক করার তো কিছু নেই। যিনি যা, সেটাই তাঁর ধর্ম। যেমন, যোদ্ধার কাছে যুদ্ধই ধর্ম। সাধুর কাছে সন্ন্যাসটাই ধর্ম। ডাক্তারের কাছে রোগীকে সুস্থ করে তোলাটাই ধর্ম। 

— তা বলে অবলা প্রাণীকে আমরা রক্ষা করব না? 

নিখিল বলল, না। যে যেমন সে তেমন ভাবেই নিজেকে রক্ষা করবে। এটাই ধর্ম। 

— তা বলে ওই খাদ্য আর খাদকের জোয়ারেই গা ভাসিয়ে দেব? তাদের খাব? 

— না খেলে কী খাবেন? 

মহারাজ বললেন, কেন? ফল মূল শাকসবজি… 

— গাছের প্রাণ আছে, এটা আবিষ্কার হওয়ার আগে এই সব কথা বললে তাও নয় মানা যেত। কিন্তু এখন মানি কী করে? 

— কেন? না মানার কী আছে? 

নিখিল বলল, আপনি মাছ মাংস খেতে বারণ করছেন। কাদের খেতে বারণ করছেন? না, যারা ইচ্ছে করলে পালালেও পালাতে পারে। আর কাদের খেতে বলছেন? যারা আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য সারাক্ষণ অক্সিজেন জুগিয়ে যাচ্ছে, যারা অসহায়, যারা হাজার চেষ্টা করলেও নিজের জায়গা থেকে একচুলও নড়তে পারবে না, তাদের! এটা কী মানা যায়? না, মানা উচিত? 

ও আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মাইক স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রেক্ষাগৃহ অন্ধকার হয়ে গেল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মেসিন বন্ধ হয়ে গেল। শোনা গেল, জেনারেটর খারাপ। চলবে না। গরমে হাসফাঁস করতে লাগলেন সবাই। সব ক’টা দরজা জানালা হাট করে খুলে দেওয়া হল। কখন কারেন্ট আসবে কে জানে! 

দল বেঁধে বেঁধে লোকজন প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে লাগলেন। বেরিয়ে এল নিখিলও। নিজের মনেই বিড়বিড় করতে লাগল, লোডশেডিং হওয়ার আর সময় পেল না! 

কিন্তু বাইরে বেরিয়ে ও যেন আকাশ থেকে পড়ল। দেখল, টিকিট কাউন্টারে আলো জ্বলছে। পাখা চলছে। তার মানে লোডশেডিং নয়!


তখনই ওর মনে হল, ওর কথার পরিপ্রেক্ষিতে মহারাজ হয়তো যথাযথ কোনও উত্তর দিলেও দিতে পারতেন, কিন্তু উদ্যোক্তারা বোধহয় কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি। তাই বিদ্যুৎ সংযোগ ছিন্ন করে ওই অপ্রীতিকর অবস্থাটার হাত থেকে অনুষ্ঠানটাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন ওরা... 

নিখিল এ কথা বলতেই, হো হো করে হেসে উঠলেন জগবন্ধু। নিখিলও হাসি চেপে রাখতে পারল না। সেও হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল। 



Rate this content
Log in

More bengali story from Siddhartha Singha

Similar bengali story from Inspirational