ব্ল্যাক ফাইলের রহস্য
ব্ল্যাক ফাইলের রহস্য
আরিয়ানের রুমটা যেন এক টুকরো রহস্যপুরী। ঘরের এক কোণে বইয়ের তাক ভর্তি ফরেনসিক সায়েন্স আর ক্রিমিনাল সাইকোলজির মোটা মোটা সব বই। ডেস্কে ছড়ানো-ছিটানো কিছু কেস ফাইল, আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ থেকে হালকা সুগন্ধ ভেসে আসছে। জানালার ভারী পর্দাগুলো টানা, বাইরে তখন গোধূলির ম্লান আলো। ঘরের ভেতরটা মৃদু আলোয় আচ্ছন্ন, শুধু পড়ার টেবিলের ল্যাম্পটির আলোয় ধুলিকণাগুলো স্থির হয়ে ভেসে আছে।
চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে মির্জা সাহেব কাপটা পিরিচের ওপর রাখলেন। টুন করে একটা মৃদু শব্দ হলো, যা ঘরের নিস্তব্ধতাকে যেন আরও গভীর করে তুললো। তিনি কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখের চশমার লেন্সের আড়ালে অদ্ভুত কোনো রহস্যের ছায়া। শান্ত অথচ গম্ভীর স্বরে বললেন,
“বুঝেছ, আরিয়ান? সব অপরাধ লজিক দিয়ে ধরা যায় না। কখনো কখনো অপরাধীর আবেগই সবচেয়ে বড় সূত্র।”
আরিয়ান তার পুরোনো চামড়ার সোফাটায় গা এলিয়ে বসে ছিল। তার সামনে রাখা ছোট টেবিলে একটা ফাইল খোলা। সে মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।
“জি স্যার, ঠিক বলেছেন। সাইকোলজি দিয়ে আমরা তাদের মনের গলিতে ঢুকতে পারি, কিন্তু অপরাধের আসল কারণ খুঁজে বের করতে হলে তাদের আবেগও বুঝতে হয়।”
মির্জা সাহেব দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললেন। সেই দীর্ঘশ্বাসে যেন অনেকগুলো অমীমাংসিত মামলার ক্লান্তি মিশে ছিল। তিনি সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। প্যান্টের ভাঁজে হাত দিয়ে একবার কোটটা ঠিক করে নিলেন, তারপর কবজির ঘড়ির দিকে তাকালেন। মৃদু হাসির রেখা তার ঠোঁটে, কিন্তু চোখের দৃষ্টি অন্য কোথাও।
“আচ্ছা তাহলে আসি, ডিটেকটিভ। আজ রাত ৯ টায় ব্রাজিলের উদ্দেশ্যে রওনা হবো। কিছু প্রস্তুতিও বাকি আছে।”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকালো। টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলোর দিকে তার নজর চলে গেল।
“হঠাৎ ব্রাজিল কেন?”
মির্জা সাহেব ঠোঁটের কোণে সিগারেট চেপে ধরে লাইটার জ্বালালেন। মৃদু আলোয় তার গম্ভীর মুখটা এক মুহূর্তের জন্য চকচক করে উঠল। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে তিনি বললেন,
“তোমার মনে আছে, আরিয়ান, সেই ব্ল্যাক ফাইল ঘটনাটার কথা?”
আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হ্যাঁ, অবশ্যই মনে আছে স্যার। কত কষ্ট করে, জীবন বাজি রেখে আমরা সেই গ্যাংটাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলাম।”
মির্জা সাহেবের মুখের ভাব আরও গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি নিচু গলায় বললেন,
“আমরা যে গ্যাংটাকে ধরেছিলাম, আরিয়ান, সেটা আসলে তাদের একটা চাল মাত্র। পুরো খেলাটার ছিল কেবল ছোট্ট একটা অংশ। এই পুরো নেটওয়ার্কের পেছন থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ জগতের এক ভয়ংকর নাম— পিসিসি মাফিয়া।”
তিনি কয়েক মুহূর্ত থামলেন। ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
“এরা সাধারণ কোনো অপরাধী চক্র নয়। গোটা বিশ্বের শীর্ষ দশ মাফিয়া সংগঠনের মধ্যে এদের নাম উচ্চারণ করা হয় ভয়ের সঙ্গে। ক্ষমতা, অর্থ আর প্রভাব— সবই তাদের হাতে।”
আরিয়ান কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মির্জা সাহেব হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।
“গত এক মাস ধরে আমি ব্রাজিলিয়ান অথরিটিদের হাই-অফিসারদের সঙ্গে এই বিষয়টা নিয়ে কাজ করছি। এবার অপারেশনটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাচ্ছে। সময় খুব কম। আজ রাত ৯টার ফ্লাইটেই আমাকে রওনা হতে হবে।”
কথাগুলো শুনে আরিয়ান যেন কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। সে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে বলল,
“স্যার, এত বড় একটা বিষয় ঘটছে, আর আমাকে কিছুই জানালেন না?”
মির্জা সাহেব ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার সামনে গিয়ে থেমে তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন,
“তুমি ছুটিতে ছিলে, আরিয়ান। আমি চাইনি ছুটির মাঝখানে তোমাকে আবার কোনো বিপদের মুখে ঠেলে দিতে।”
দরজার লক খুলে তিনি একবার পেছন ফিরে তাকালেন। তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
“যাই হোক, ফিরে এসে সব বলব।”
আরিয়ান কিছু বলার আগেই মির্জা সাহেব দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল, আর ঘরে নেমে এলো এক অস্বস্তিকর নীরবতা।
কিন্তু আরিয়ানের মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—"মির্জা স্যার কি কোনো কিছু লুকাচ্ছেন ?"
বিঃদ্রঃ দ্বিতীয় পর্বে আমরা জানব এই ঘটনার আসল রহস্য। গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান মতামত জানাবেন।
