Sushanta Kora Chirkut

Drama


3  

Sushanta Kora Chirkut

Drama


বিবাহবার্ষিকী

বিবাহবার্ষিকী

5 mins 1.2K 5 mins 1.2K

মাঠের একপাশে গোবরটা কুড়িয়ে এদিক ওদিক তাকালো বুড়ি । যদি আরো কিছুটা পাওয়া যায় তবে আজকেই উঠোনটা লেপে দেওয়া যাবে । যা ধুলো উড়ছে ! অবশ্য পৌষের মাঝামাঝি চলছে ধুলো তো উড়বেই ।রাহুলের বাবা প্রায় বকে ; কি গো উঠোনটা লেপে দিতে পারোনা , কত ধুলো উড়ছে দেখছো তো । কতবার বলেছে বুড়ি যে এখন মাঠে খুব একটা গোবর পাওয়া যায় না । তবুও কথা কানেই নেয় না । একটু এগিয়ে বাঁশতলাটার নীচে আর একটু পেয়ে গেল বুড়ি । পুরোটা না হোক আর্ধেকটা লেপা যাবে’খন । গোবর হাতে নিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালো । সুয্যিমামা মাথার উপরে । টনটন করে রোদ দিচ্ছে । কে বলবে শীতকাল , গরমে গা পুড়ছে আর থেকে থেকে ঝোড়ো হাওয়া । গা হাত পা ফেটে চড়চড় করছে । রাহুলের বাবা একটা ভেসলিনের বড় কোটো এনে দিবে বলেছে । আপন মনেই হাঁটছিল বুড়ি । হুঁশ ফিরলো নিতাইয়ের ডাকে – দেওর হয় , খুব ঠাট্টা ইয়ার্কি মারে । 


- বৌদি আমাদের ঘরটো একবার লেপে দিও তাহলে ।

- তোমার দাদাকে বল । উয়োর অনেক সময় । আমার ঘরে অনেক কাজ আছে ।

নিতাই কলসিতে জল ভরছিল । হাসতে হাসতে চলে গেল বুড়ি ।

 রাহুল ইস্কুল থেকে এলো কিনা কে জানে । ছেলেটা এত খেলে যে বলার কিছু নাই । সারাদিন খেলা আর খেলা । খাবারও খাবে না । ওর বাবার কাছে কম বকা খায় না ! 

- রাহুল এসেছিস? উঠোনে পা পড়তেই জোরে আওয়াজ দিলো বুড়ি ।

- উফফ । এত জোরে চেঁচাও কেন বলতো । খানিক আগে এলাম । 

- ভাত খাবি না?

- না । ইস্কুলে খেলাম ।

- অ । আমাকে খানিক জল এনে দিস তো কল থেকে । আজ উঠোনটো লেপে দেব । এখন খানিক মুড়ি খাই দাঁড়া ।

- আমি রতনদের উঠোনে খেলছি । আমাকে ডেকে দিবে’খন ।


কিছু বলার আগেই রাহুল হাওয়া । বুড়ি হাসবে না কাঁদবে ! ছেলেটা দিনকে দিন বেজায় বদমাশ হচ্ছে । থালাতে মুড়ি আর খানিক তরকারি নিয়ে মাখাতে লাগলো । ইস্কুলের মাস্টার বলেছে রাহুলের মাথা বেশ ভালো । অনেক দূর পড়বে ও । একটা টিউশনি আছে । গাঁয়ের সবাই পড়ে । ওউ বলেছে এক কথা । মাঝে মাঝে খুব চিন্তা হয় । কতদূর রাহুলের বাবা পড়াতে পারবে কে জানে । রিকশা চালিয়ে আর কতই বা ইনকাম ! এখন তো টোটোর যুগ । কেউ চাপেই না রিকশাতে । মালিক বলেছে সামনের মাসে একটা টোটোর ব্যবস্থা করে দেবে । 

থালা ধুতে ধুতে জোরে হাঁক দিলো বুড়ি । খানিক পর রাহুল হাজির ।


- এই নে । দু বালতি এনে দিলেই হবে ।

- দাও । বলে বালতি হাতে ছুটলো কলতলার দিকে ।

বুড়ি ঝাঁটা নিয়ে আগে উঠোনটা পরিষ্কার করলো । কত ধুলো বাপরে ! উঠোনের ধারে এই বাঁশের ঝাড় থাকলে ঝামেলাই বটে বাপু । সবসময় পাতা পড়বে । আর বুড়ির হয়েছে মরণ । কতবার ঝাঁট দেবে ! 

রাহুল এনে দিল দু বালতি জল ।

- বাবু শোন না । আর এক বালতি , আর এক বালতি এনে দে না ।

- না না । আমি খেলতে যাবো । মুখ বেজাড় করলো । 

- যা না আমার সোনা তুই । এনে দে যা ।


যাবেনা যাবেনা করে শেষমেশ গেল । এই ছেলেটার মাথায় একবার খেলার নেশা চাপলে তাকে বাগাড় দেওয়া মুশকিল । গোবরটা একটা বালতিতে ভালো করে জল দিয়ে গুলছে বুড়ি । বুড়ির মা মাঝে মাঝেই বলতো এই শীতকালে মাসে দু একবার করে যেনো উঠোনটো নিকিয়ে দিস । ঘরে লোককিদেবী পসন্ন হয় । মা মারা গেল দু বছর হলো । খুব ভালোবাসতো বুড়িকে । একটাই মেয়ে বলে কথা । বিয়ের বিদেয়ের সময় সে কি কান্না । একবার তো অজ্ঞানই হয়ে গেছিল । গোলা গোবরটা নিয়ে উঠোনে ছড়াচ্ছে আর ঝাঁটা দিয়ে ভালো করে নিকোচ্ছে বুড়ি । বেশ কপাল করে বউ পেয়েছে কিন্তু গনশা । একা হাতেই গোটা ঘরটা সামলায় । গনশা তো শুধু টাকা এনে বৌয়ের হাতে দিয়ে দেয় । বাকি সব বৌয়ের জিম্মায় ।

উঠোন নিকানো হলে বুড়ি বালতি ধুতে কলতলায় গেল । এখনো মনীষার মায়ের রান্না হয় নাই । ওই তো এখনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে ওদের উঠোন থেকে । কলতলার পাশে ক্লাবের ঘরে রাহুলের গলা পাওয়া গেলো । ওখানেই কাটুন দেখে । বালতি ধুয়ে হাঁক দিলো বুড়ি ।


- রাহুল চান করবি চ । অনেক বেলা হলো । তোর বাবা এসে আমাকে বকবে নাহলে ।

- দাড়াও দাড়াও যেছি ।

- এখনই চ । নাহলে আমি আর চান করাবো না । বুঝবি তখন ।

ঘর ঢুকতেই রাহুল দৌড়ে এলো ।

- আর খানিকটুকু দেখতে দিলে না কাটুনটো ।

- অনেক দেখলি । আবার কাল দেখবি । জামা প্যান্ট খুলে চ বাথরুমে তাড়াতাড়ি । তোর বাবা এলো বলে দেখ না । আমাকে বকবে এবার ।

বুড়ি তাড়াতাড়ি রাহুলকে চান করিয়ে ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলো । ছেলেটা অনেকদিন থেকে বলছে একটা টিভি নিতে । কিন্তু কে বোঝায় যে কত খরচ । ওতো টাকা কোথায় । তাও ওর বাবা বলেছে একটা সেকেন হ্যান টিভি যদি পায় কিনে নেবে । সেরকম কিছুই তো দিতে পারেনা ছেলেটাকে । 

ঘরের বাইরে রিকশার প্যাঁক প্যাঁক শোনা গেল । বুড়ি চেনে এই আওয়াজটা । এটা রাহুলের বাবার লয় মনীষার বাবার রিকশার হর্ন । এবারই তাহলে রাহুলের বাবা ঢুকবে । একটু পর রিকশার হর্ন দিয়ে ঢুকলো গনশা । 

- রাহুলের চান হয়েছে তো ?

- হ্যাঁ হ্যাঁ । চান খাওয়াদাওয়া করিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলম । তুমি চান করো যাও তাড়াতাড়ি । আমি ভাত বাড়ি ।

- থলিটা নিয়ে আসো । রিকশায় আছে ।

বেশ ভারী । মাছ এনেছে ওর বাবা । দেখে তো বুড়ি সেই খুশি আবার বিরক্তও হলো ।

- কি গো মাছ নিয়ে এলে কেন আজ । আজ তো শনিবার । নিরামিষ ছিল যে ।

- বাবলু জাল ফেলেছিল দীঘিতে । কম দামে পেলম নিয়ে এলম । টাটকা আছে । ভেজে রেখে দাও কাল খাওয়া যাবে না হয় ।

- কি যে করো না । একদিন নিরামিষ সেটাও পালছো না ।

- বা রে । আজ আনবো না কেন । আজকের দিনটা যে ইস্পেশাল ।

- কি ইস্পেশাল ?

- ভুলে গেছো ?

- ধুর বলো না ।

- আজকের দিনেই তো ঘরে তুলেছিলাম তোমাকে । মনে নেই ?

এমা তাই তো । কাল অব্দি মনে ছিল । আজ কাজ কাজ করে একদম ভুলে গেছে । লজ্জায় মাথা নিচু করে মুচকি হাসলো বুড়ি ।

- বাবু খেতে পেলো না ।

- রাতে রেঁধে দেব । একটা শনিবার আমিষ খেলে কিছু হবে না ।

হো হো করে হেসে উঠলো গনশা।



Rate this content
Log in